আমার বেড়ে ওঠা // আফরোজা অদিতি

জন্মেছি গ্রামে এবং শিশু বয়সটাও কেটেছে গ্রামে। আমার গ্রামের নাম সাহাপুর। পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর সাহাপুরে আমার শিশু বয়সের বেড়ে ওঠা। যখন জন্মেছিলাম তখন ছিলো অজ পাড়া গাঁ। বাড়ির পাশে বড়ো মাটির রাস্তা; রাস্তাটি নদী থেকে উঁচু করতে শ্রকিদের সঙ্গে আমার বাবাও মাটি কেটেছিলেন। বাবা তখন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ঐ রাস্তার পাশে ছিল দুই দুইটি নদী। একটার নাম সুতা-গাং, অন্যটা খর-গাং। সুতা-গাঙের স্রোত কম আর খর-গাঙের স্রোত ছিল বেশী। এখন আর ওই নদী দুটি নেই। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। অথচ ওই নদী দিয়ে একাত্তরে আমি, নৌকাতে এসেছিলাম আমার কিশোর বয়সের বেড়ে ওঠা শহর, পাবনাতে। একাত্তরে আমি আঠারো। আমার জন্মসাল ১৯৫৩। জন্মদিন ১, জুলাই। পাবনা আমার কিশোর বেলার শহর। এখন অনেক বদলে গেছে ঐ শহর। পাবনা শহরে যখন পা রাখি, তখন আমার বয়স নয়। আমাদের গ্রামে হাইস্কুল ছিল না। একটি হাইস্কুল ছিল তা ছিল গ্রাম থেকে প্রায় মাইল পাঁচেক দূরে ঈশ্বরদীতে। ওখানে আমার মামা, চাচী, চাচাতো ভাইবোনেরা থাকতেন। আমার চাচা আমি যখন ছোটো তখনই মারা গিয়েছিলেন। আমার বাবা কৃষক নেতা ছিলেন। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারী ছিলেন। আমার বাবার রাজনৈতিক পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমার পাবনা শহরের ওই বাড়িতে লেখা-পড়া করার জন্য থাকতে হয়। সে সময় আমি যতোটা দেখেছি আর বুঝতে পেরেছি, ওই দলের সদস্যরা একটা পরিবারের মতো ছিল। দলের সিদ্ধান্ত বাবা অমান্য করেননি বা করতে পারেননি। আর আমি কখনও মা, বাবার অবাধ্য হইনি। তা ছাড়া স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে ডাক্তার হবো। স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। না হয়ে ডাক্তার, হয়েছি ব্যাংকার।

আমার বাবা সর্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। পকিস্তান সরকারের আমলে রাজনীতি করার জন্য তাকে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অব্যহতি নিতে হয়। তারপর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট পদেও থাকতে পারেননি তিনি। কারণ তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হয়েও নিজের হাতে রাস্তার জন্য মাটি কেটেছেন। গ্রামের মসজিদে নিজ হাতে পুকুর থেকে মুসুল্লিদের ওজুর পানি তুলে দিয়েছেন। গ্রামের তরুণদের জন্য ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা। সমাজ সচেতনমূলক নাটক, বিপ্লবী গান করা, বিশেষ করে সুকান্ত, নজরুল বেশি বেশি পাঠ হতো তখন। পাঠ হতো রবীন্দ্রনাথ। পাবনা থেকে যখন বাড়ি আসতাম তখন এসবের মধ্যেই কাটতো আমার বেশীরভাগ সময়। আমাদের গ্রামে বাবার প্রতিষ্ঠিত পাঠাগার ছিল। তাছাড়াও আমাদের পারিবারিক পাঠাগার ছিল। মাও সে তুং, লেনিন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, পাবলো নেরুদা ছাড়াও ছিল আরও অনেক লেখকের বই। শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, নীহাররঞ্জনসহ নানা লেখকের বই পড়েছি বাড়ির পাঠাগারে। গল্পের বই পড়ার জন্য খুব বকা খেতাম মা-সহ সবার কাছে। কারণ বই যখন পড়তাম তখন কোন সময় জ্ঞান থাকতো না, কাজের কথা মনে থাকতো না। একদিন তো চাচাতো বোনের বাড়ি গিয়ে ‘মাধবী ভিলা’ বইটি পেয়ে, পড়তে পড়তে সন্ধ্যা উৎরে গেছে কখন টের পাইনি, আর বাড়ি ফিরেই মায়ের বকুনি। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরা পছন্দ করতেন না মা। ছোটবেলায়, পড়ার বইয়ের ভেতর লুকিয়ে গল্পের বই পড়তাম।

বাবার রাজনীতি করার সুবাদে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সহ অনেক রাজনীতিবিদই তখন আসতেন আমাদের বাড়ি। ছোটবেলায় দেখেছি ফজলে লোহানি, দেবেন শিকদার, সুখেন্দু দস্তিদার, আব্দুল হক, তোয়াহা, সেলিনা বানু, আদুল মতিন(ভাষা মতিন) , টিপু বিশ্বাস, মণি সিং সহ অনেক রাজনীতিবিদকে। তাঁদের কথা শুনেছি। দেশকে ভালোবাসার কথা শুনতে শুনতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমি ছোটোবেলায়, ২১ শে ফেব্রুয়ারীর দিন কখনও জুতা-সেন্ডেল পরতাম না। খুব ভোরে প্রভাতফেরীতে যেতাম। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী / আমি কি ভুলিতে পারি’ গেয়ে গেয়ে ফুল দিতাম শহীদমিনারে। রাজনীতির মধ্যে থেকেছি কিন’ রাজনীতি করি না, পছন্দ হয় না। রাজনীতি করা থেকে আমার লেখা পছন্দ। আমি বিশ্বাস করি, সবাইকে বক্তৃতা দেওয়ার প্রয়েজন নেই, সমাজের বিবেক জাগ্রত করতে কলমকে হাতিয়ার হিসেবে নেওয়াও প্রয়োজন। সবাই সব পারে না, করে না। কেউ কেউ মিছিলে যায়, কেউ শ্লোগান দেয়, কেউ প্রাণ দেয়। কেউ অন্তরালে থেকে সমাজের বিবেককে জাগ্রত করার জন্য কাজ করে। মানুষ অনুপ্রাণিত হয় এক লেখকের ভাষায় এবং রাজনীতিবিদদের বক্তৃতায়। আমার বিশ্বাস কলম তাই আমি রাজনীতির মধ্যে থেকেও কলমকে বেছে নিয়েছি। লেখা আমার প্রাণ আমার জীবনের চলার গতি।

আবার আসি ছোটোবেলায়। আমি যখন প্রাইমারী শেষ করলাম তখন এসেছিলেন কমরেড সেলিনা বানু। উনি ‘কুঁড়েঘর’ মার্কা নিয়ে ভোট করে জিতেছিলেন। আমি বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হতাম। ক্লাস ফাইভে ফার্স্ট হয়েছিলাম। উনি আমার রেজাল্ট দেখে প্রস্তাব করেন আমাকে ঢাকা নিয়ে পড়ানোর; কিন’ তা হয় না! যেদিন পাবনা থেকে ঢাকা ফিরে যান সেদিন তাঁর বাবার বাড়ি আমাকে রেখে যান তিনি। কিন’ বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে আসার সময় হলো বিভ্রাট; আমিও বাড়ি ছেড়ে আসবো না, আমার মা-ও আমাকে বাড়ি ছেড়ে যেতে দিবে না কারণ, আমার এক ছোটো বোন (ক্যানসারে মারা গেছে ১৯৮০ সালে) আমাকে ছাড়া থাকতে পারতো না। আর আমি মাকে ছাড়া থাকতে পারতাম না। আমার মা চুলে চিরুনি দিতো কম; ছোটোবেলাতে যখন আমার মাকে চুল আঁচড়াতে দেখলেই মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, ভাবতাম আমাকে রেখে বাইরে যাবে মা। আমার বোনও সে রকম, আমি কোথাও যাবো শুনলেই কান্নাকাটি শুরু করে দিতো। তবুও পার্টির নির্দেশে যেতে হয়েছিল আমাকে। আমি গিয়েছি কাঁদতে কাঁদতে। আমার সঙ্গে কেঁদেছে আমার বোন, আমার মা। এরপর যতোবার আসতাম, যাওয়ার সময় চোখে জল থাকতোই। তাইতো বলি, আমার জীবনের এতোটা পথ পাড়ি দেওয়া সে আমার চোখের জলের ভালোবাসা। আমার বাবা, মা, ভাই, বোনদের ভালোবাসা। আমরা দুই ভাই, দুই বোন (এক ভাই, এক বোন প্রয়াত)। আমার ভাই, বোনেরা আমি পাবনা থেকে বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত কোন ভালো খাবার খেতো না। আমার সব বিষয়ে তাঁদের নজর ছিল। আমি যে বড় বোন সে সম্মান সব সময় দিয়েছে তাঁরা। যখন যা বলেছি তখন আমার জন্য তাঁরা করেছে, এখনও যে ভাই বেঁচে আছে আমার কথা মুখ থেকে পড়তে দেয় না। কিছু বললেই তা আমার সামনে হাজির করবে।

ঢাকা যেতে পারলাম না! পাবনা গভর্মেন্ট গার্লস হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। ওই বাড়িতে জায়গীর হিসেবে থাকা শুরু হলো আমার। আমি তো তখন ছোটো, কাউকে তো পড়াতে পারি না, তবুও চেষ্টা ছিল যাতে বিনা পরিশ্রমে ওখানে থাকতে না হয়। প্রতিদিন সকালে ঘর ঝাড়- দেওয়া, বিছানা গোছানো, শুকাতে দেওয়া কাপড় তুলে ভাঁজ করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া; ঐ বাড়িতে ১০/১২টা ঘর ছিল; তখন বিজলীবাতি ছিল না, হ্যারিকেনের আলোতে লেখাপড়া বা অন্যান্য কাজ করতে হতো। সবগুলো ঘরের হ্যারিকেন মুছে তেল দেওয়া, সন্ধ্যা হলে ঘরে ঘরে সেই হ্যারিকেন জ্বালিয়ে দেওয়া কাজগুলো করতাম আমি। ঐ বাড়িতে ছোটোছোটো ছেলে মেয়ে ছিল ৪ জন, তাদের সকাল-বিকাল হাত মুখ ধুইয়ে জামাকাপড় পরিয়ে দেওয়াও ছিল আমার কাজ।
এ ছাড়াও টুকটাক অনৈক কাজই করতাম। সেই সঙ্গে নিজের কাপড় নিজে ধোয়া, নিজের খাবার থালা বাটি ধুয়ে পরিস্কার রাখা। কমরেড সেলিনা বানুর দুই ভাইয়ের পরিবার একত্রে বাস করতো ওই বাড়িতে। আর ছিল অসুস্থ বড়ো বোন। যৌথ পরিবার। আমি ছাড়াও আরও মেয়ে জায়গীর ছিল ৫ জন, ছেলে জায়গীর ৫ জন। সেলিনা বানুর বড় বোনের নাম রাফিয়া বানু চুনি। আমি বাড়ির সবার মতো ওনাকে বড়ফুফু ডাকতাম। ওই ফুপুর ঘরে ঢালাও বিছানায় আমরা কয়েকজন ঘুমাতাম। আমি ছাড়া সবাই আত্মীয় ছিল। কিন’ ওরা আমাকে আত্নীয়ের চেয়ে কম ভাবেনি। বড়ো ফুপু খুব আদর করতেন আমাকে। ওনাকে বই পড়ে শোনানো আমার একটা কাজ ছিল। বই পড়ে শোনাতে খুব ভালো লাগতো আমার। ওনাকে বই পড়ে শোনাতে শোনাতে বই পড়ার অভ্যাস হয়ে যায় আমার।

ওই বাড়িতে কাজ করলেও আমার ক্লাসের পড়া, বই পড়া আর বানিয়ে বানিয়ে চিঠি লেখা চলতো। আমি খুব মজা পেতাম বানিয়ে বানিয়ে চিঠি লিখতে। ওই বাড়িতে নানা রকমের রূপকথার বই, রহস্যপোন্যাস ছাড়াও ছিল অনেক লেখকের কবিতার বই,উপন্যাস। ওখানে পড়েছি দস্যু মোহন, দস্যু বনহুর, গুলে বাকাওয়ালী, মধুমালা, বুদ্ধু ভূতুম। ঠাকুর মার ঝুলি, ঠাকুরদাদার ঝুলি সহ নানান রকম বই। বই পড়তাম আর বইএর যে চরিত্রটা ভালো লাগতো সেটা নিয়ে ভাবতাম। ওই চরিত্রটা অনেকদিন মনের মাঝে বাস করতো। বাড়ির লাইব্রেরী ছাড়াও পাবনার প্রসিদ্ধ পাঠাগার ‘ অন্নদা গোবিন্দ লাইব্রেরী’ থেকে বই এনে পড়তাম। পাবনা বাড়ির কাক্কু সামসুল হুদা ছিলেন তখনকার পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের লাইব্রেরীয়ান। উনি খুব বই পড়তেন। মাঝেমধ্যে কাক্কু আর আমাদের মধ্যে বই নিয়ে কাড়াকাড়ি হতো। বেশীরভাগ সময় কাক্কু বই নিয়ে বাথরুমেও চলে যেতেন, যাতে বই হাতছাড়া না হয়। আমি রূপকথার বই পড়তাম বেশী, এখনও পড়ি। আমার বই পড়া ছাড়াও আর একটা শখ ছিল রেডিওতে নজরুল গীতি আর রবীন্দ্র সংগীত, পল্লীগীতি হলে আমার খাতায় তা লিখে রাখা, এবং ছবি আঁকা। অনেকগুলো গানের খাতা, ছবির খাতা, আমার লেখা চিঠির গল্প, কবিতা ছিল যা ১৯৭১ এ নষ্ট হয়ে গেছে। পাকি-বাহিনীরা যখন আমাদের গ্রামের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় তখন পুড়ে গেছে ও-গুলো। ছোটোবেলার কোন গল্প বা কোন কাজের স্মারক আমার কাছে নেই।

১৯৬৭ সালে ম্যাট্রিক পাশ করি। ১৯৬৭ সালেই পাবনার ওই বাড়ি থেকে চলে আসি। পাবনা মহিলা কলেজে ভর্তি হই, হোস্টেলে থাকতে হয়। সেই সময় আমার বিয়েও হয়ে যায়। বিয়ের পরেও লেখাপড়া চালিয়ে যাই। ১৯৬৯ সালে আই.এস.সি পাশ করি। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হই কিন’ আমার অসুস’তার কারণে কলেজ করা হয় না, পরীক্ষাও দেওয়া হয় না। তারপর যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পাবনা মহিলা কলেজ থেকে বি.এ পাশ করি ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে ঢাকায় আসি। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারীতে পূবালী ব্যাংক লিমিটেডে যোগ দেই। আমি যে সময় যোগ দেই সে সময় ব্যাংক সরকারি ছিল। আমি পূবালী ব্যাংক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলাম। তখন পূবালী ব্যাংক কর্মচারী ইউনিয়ন থেকে সংস্কৃতি উৎসব হতো, পত্রিকা বের হতো, লেখার প্রতিযোগিতা হতো। আমার ছোটোবেলার লেখার চর্চা আবার শুরু করলাম। একবার ২১ শে ফেব্রুয়ারীর ওপর লেখার প্রতিযোগিতা হলে সেখানে আমার লেখা পুরস্কৃত হয়। সেই থেকেই পরম উৎসাহে আবার লেখা শুরু করি। কলিগদের সহযোগিতায় পুরাদমে লেখা চলতে থাকে। প্রদীপকাঞ্চন, আমার সঙ্গে চাকরি করতো, এখন সুইডেন প্রবাসী। ও পত্রিকা বের করতো। ঐ পত্রিকাতে কবিতা লিখতাম। এখনও সুইডেন থেকে পত্রিকা বের করে প্রদীপকাঞ্চন, সেখানেও লিখি তবে এখন শুধু কবিতা নয় লিখি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস। শিশুতোষ গল্প কবিতা উপন্যাসও লিখি এখন।

প্রদীপ কাঞ্চনের পত্রিকায় লিখতে লিখতে, ১৯৮৪ সালে সাহস করে দৈনিক ইত্তেফাকে আমার কবিতা পাঠাই। কবিতাটা বের হয়। আমার তখন লেখক নাম আফরোজা বেগম। সেই বছরই একটা কবিতার বই বের করি-‘সেই মন নেই’। বইটা খুব পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল। ওই বই বের হওয়ার পর আমি আর থেমে থাকিনি। লিখেছি। এখনও লিখছি। লিখেছি অনেক পত্রিকায়। দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাবাজার, যায় যায় দিন, মানব জমিন, জনকন্ঠ, মুক্ত কন্ঠ (এখন কাগজটা নেই)। এ ছাড়াও লিখেছি অনেক ছোটো- কাগজে(খরঃঃষবসধম), এখনও লিখি। এখন অন-লাইন পত্রিকাগুলোতে মাঝেমধ্যে লিখি। লেখা আমার নেশা। একদিন না লিখলে মনে হয় আমার কী যেন করা হয়নি। বিষাদগ্রস’ হয়ে থাকি। লেখার জন্য আমার সর্বস্ব পণ। লেখাকে এখনও আমি পেশা হিসেবে নিতে পারিনি। যে কেউ লেখা চাইলেই লেখা দেই। লেখাই আমার জীবন, লেখাই আমার ভালোবাসা। আমি চাকরি করেছি ব্যাংকে, যেখানে কাজের কোন বাঁধা-ধরা সময় নেই। কখনও কখনও ক্লিনক্যাশ (দিনশেষের হিসাব) না মিললে রাত আটটা নয়টা পর্যন্ত থাকতে হতো। দুপুরে খাওয়ার সময় ছিল মাত্র ১৫ মিনিট। তা-ও সবাই একসঙ্গে খেতে যেতে পারতো না। একজন খেলে অন্যজনকে কাজ সামলাতে হতো। সেখানে কাজ করেও আমার লেখা অব্যাহত রেখেছি। অনেকেই বলে ব্যাংক এবং সাহিত্য দুটি কাজ দুই মেরুতে অবসি’ত, আমি করি কী ভাবে। আমি চালাতে পেরেছি বা পারছি আমার ছোটবেলা স্বাধীনভাবে, রাজনৈতিক, সাহিত্যি-সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠার কারণে এবং আমার মরণপণ ইচ্ছার জন্য। ছোটোবেলার পরিবেশ মানুষের ভিত তৈরি করে। তখনকার চিন্তা চেতনায় যা গভীরভাবে প্রথিত হয় বড়ো হয়ে তাই প্রকাশ পায়।

আমি, বাংলা একাডেমীর সদস্য। অনলাইন লেখক.কম- এর সঙ্গে যুক্ত আছি। নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্রের সঙ্গে আছি। এছাড়াও সুকান্ত সাহিত্য পরিষদ, কপোতক্ষ সাহিত্য পরিষদে ছিলাম। এখন নেই। এখন জাতীয় সাহিত্য পরিষদে আছি। আছি নারী উন্নয়ন ফোরামের সঙ্গে। কবি সাযযাদ কাদিরের বুধসন্ধ্যা নামে একটি সংগঠন ছিল সেখানে প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলাম। এখন বুধসন্ধ্যা নেই। এখন আছে বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, ওখানে আছি। তবে আগের মতো সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারি না কোথাও। আমি ১৯৯৫ সাল থেকে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি, নানা জেলায় গিয়েছি, কলকাতা, আসাম গিয়েছি। অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। অনুষ্ঠান শেষে ফিরে এসেছি, কিছু কিছু স’ান দেখেছি সবটা দেখা হয়নি। ভ্রমণ বিষয়ক কিছু লিখেছি, সব লিখতে পারিনি এখনও; ভ্রমণ বিষয়ক লেখাগুলো ছাপা হয়েছে অনতর্জাল পত্রিকা শুভবাংলাদেশ-এ। এই পত্রিকাতে কবিতা,গল্প, উপন্যাসও ছাপা হয়েছে হচ্ছে। ফেসবুকে ছোটোকাগজ ‘বুনন’ এ কবিতা যাচ্ছে, যাচ্ছে মোলাকাত, লেখাদূত-এ। সময় পেলেই ডড়সধহংহবংি ২৪.পড়স পত্রিকাতে লিখি। দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা এবং অন্যনিষাদ ব্লগে লিখে। যখন যেখানে সময় পেলেই লিখি। আগে অফিস, সংসার, সাংগঠনিক কাজের ব্যস্ততায় লেখা হয়ে ওঠেনি। আমি মনে করি একটা বিশেষ সময় পর্যন্ত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করা ভালো। এরপর শুধুই লেখালেখি করা উচিত।

আমি আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে হিন্দি ও ফার্সি কোর্স করেছি। আমার মনে হয়, কোর্স করেছি মাত্র শেখা হয়নি। ভাষা বহতা নদীর মতো, ভাষাকে আয়ত্ব করতে সমস্ত জীবনটাই দিয়ে দিতে হয়। আমি অন্য দুটি ভাষা শিখেছি যাতে আমি সেই ভাষার লেখা পড়তে পারি অনুবাদও করতে পারি। একটা হিন্দি কবিতার বইও লিখেছি, একটি বই হিন্দি থেকে অনুবাদ করেছি। বাংলা ভাষা আমার প্রিয় ভাষা। বাংলা ও বাঙালি আমার প্রিয় শব্দ। তবুও আমার বিশ্বাস, আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিকে ভিন্ন ভাষাভাষির সঙ্গে আদান-প্রদানের জন্য অন্য ভাষা শেখা প্রয়োজন।

আমার বই ৫৫টি; এছাড়া অন্তর্জালে আছে ৩টি উপন্যাস।শিশুতোষ আছে, প্রবন্ধ, জীবনীগ্রন্থ আছে, আছে কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস। হাইকু, তানকা, লিমেরিক, দ্বিপদী কবিতার বই আছে। আমার কবিতার বইএর মধ্যে প্রেমের ১০০০ হাজার কবিতা নিয়ে ‘গাঙচিল মন’ নামে কবিতার বই, বাছাই গল্প, তর জন্যি ভালোবাসা (আঞ্চলিক) কবিতার বই পাঠকপ্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভূক্ত গীতিকার। আমি বিভিন্ন নামে লিখেছি। কয়েকটা পত্রিকার সঙ্গে কাজ করেছি । আমার লেখক নাম, আফরোজা বেগম, মঞ্জু আহমেদ, শেখ অদিতি। এখন লিখছি আফরোজা অদিতি নামে।

লেখার জন্য স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সংগঠন থেকে ভালোবাসা পেয়েছি। তারা পদক, সম্মাননা পেয়েছি। পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে বেড়েছে লেখার প্রতি দায়িত্ব। ‘তটিনী’ নামে একটা অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা বের করি। কমরেড আলাউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার প্রবর্তন করেছি। প্রবীণদের নিয়ে কাজ করি। ১০-১৫জন প্রবীণকে শাড়ি শীতবস্ত্র, কখনও কখনও ওষুধ দেই। জেলা শহরের কয়েকটি পাঠাগারে বিনামূল্যে বই দেই। আমার এই সব কাজ এবং লেখালেখির জন্য আমার খুব কাছের বন্ধু-স্বজন, ছেলেমেয়েরা, ছোটোভাই খুবই সাহায্য করে। লেখায় সহযোগিতা করার জন্য বন্ধু-স্বজন, ভাই, ছেলেমেয়েদের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ছেলেমেয়েরা ছাড়াও আমার কিছু তরুণ ছোটোভাইয়ের মতো স্বজন আছে যারা আমাকে খুব সহযোগিতা করে তাঁদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা রইলো।

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615