মেয়ে- চারদিকে বাজছে সেই রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল ভাষণ। তুমি
শুনতে পাচ্ছো না মা; মা, মাগো, ওই যে শোন বাজছে সেই মাতাল
ভাষণ। বাজছে রক্তে উন্মাদনা জাগানো সেইসব জাগরণী গান।
মাতাল হাওয়া চারদিকে। আবার এসেছে মা সেই মাস ; রক্তাক্ত ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ
সেই মাস। এই মাসটিতে কতো হলো! কতো হলো মা, বাংলাদেশের বয়স ?
মা- কেন রে মণিমা ?
মেয়ে- যতোদিন মা, বাংলাদেশের বয়স, ঠিক ততোদিনই তো তোমার
অপেক্ষার বয়স মা! ঠিক ততোদিনই তো আমার বাবা হারানোর বয়স!
মা, মাগো, মা আমার,অনেকদিন আগেই তো বাবার ফিরে আসার কথা,
আসেনি ! বাবা, ফিরে আসেনি মা। বাবা, আর ফিরবে না মা।
শেষ হয়ে যাওয়া সময়, শেষ হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য কেন অপেক্ষায়
থাকো মা। কেন ? আর অপেক্ষায় থেকো না মা !
মা- এ কথা বলিস না, মণিমা। আমি তো অপেক্ষা করি না, আমি
প্রতীক্ষা করি। আমার প্রতীক্ষা আছে, আছে ভালোবাসা । প্রতীক্ষার অপর
নামই তো প্রেম । প্রতীক্ষার জন্যই তো বেঁচে থাকে মানুষ, বেঁচে থাকে
ভালোবাসা। অন্য অর্থে বলতে পারিস, প্রতীক্ষা আছে বলেই আছে
ভালোবাসা। আর এই ভালোবাসা আছে বলেই বেঁচে আছে
তোর মা, এই আমি !
আমার প্রতীক্ষার অপর নাম ভালোবাসা, অন্য নাম জীবন, সোনামণি।
তা-ছাড়া তুই দেখবি, একদিন আমার ভালোবাসার জন্য তাঁকে ফিরে
আসতেই হবে। ফিরে আসবে তোর বাবা। তোর জন্যেও তাঁকে আসতে
হবে, ফিরে তাঁকে আসতেই হবে। যদি সে বেঁচে থাকে ফিরবে সে ।
তুই যে তার আত্মার অংশ, আত্মজা। আর দেশও তার আত্মার অংশ।
এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে যদি তার অস্তিত্ব থাকে, তবে তোর জন্য, এই
দেশের জন্য ফিরে তাঁকে আসতেই হবে। এ, আমার বিশ্বাস। আমার বিশ্বাস
কখনও মিথ্যা হতে পারে না মণিমা !
মেয়ে- এতো বিশ্বাস তোমার ,মা ! এতো বিশ্বাস তুমি কোথায় পেলে মা !
মা- ভালোবাসা পবিত্র হলে এ বিশ্বাস জন্মায় মা। তুই দেখিস সে ফিরবে, ফিরবেই !
মেয়ে- তুমি কী মনে করো বেঁচে আছে বাবা! বেঁচে থাকলে সে ফিরছে না কেন?
কেন ফিরছে না মা ? কেন ? বেঁচে থাকার এতোদিন পরেও, বাবা, যখন ফেরেনি মা,
তখন কি তাঁর ফেরার প্রয়োজন বা সম্ভাবনা আছে ?
মা- ভালোবাসা কি প্রয়োজনের সোনামণি ? আমার তো শুধু ভালোবাসা আছে,
প্রয়োজন নেই ! আমার ভালোবাসায় মিথ্যে নেই, মিথ্যে নয় তাঁর ভালোবাসাও।
ভালোবাসা মিথ্যে না হলে, ভালোবাসা মলিন না হলে, ভালোবাসা অভ্যাস না হলে,
মনে রাখিস,ভালোবাসার মানুষকে বিপরীত বাহুডোরে ফিরে আসতেই হয় !
তাই বলছি রে, ফিরে তাকে আসতেই হবে। আসতেই হবে মণি মা ।
ভালোবাসা, প্রয়োজনের জন্য নয়, ভালোবাসা জীবনের জন্য। প্রয়োজনের গণ্ডিতে
বাঁধা পড়লেই মরে যায় ভালোবাসা ! তাই ভালোবাসাকে কখনও মরে যেতে দিয়ো না
মণিমা । কখনও প্রয়োজন নামের লক্ষণরেখার বেষ্টনিতে বেঁধ না তাঁকে। তা-ছাড়া,
আমাদের কথা ছেড়েই দিলাম, এই দেশের কথা ভেবেই সে আসবে দেখিস !
এ-দেশ তার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা। এ-দেশ তার জীবন। দেশকে সে
খুব ভালোবাসে মণি মা ।
মেয়ে- মা, আমার মা। তোমার ভালোবাসার তুলনা নেই মা। যে নেই, যার জন্য
এতো কষ্ট তোমার, তাঁর জন্য এখনও এতো ভালোবাসা ধরে রেখেছো বুকের ভেতর !
এতো ভালো বুঝতে পারো বাবাকে তুমি, মা। তুমি, তুলনাহীনা মা, তুমি আমার
সোনামণি, মা।
[ফুপ্পির প্রবেশ]
ফুপ্পি- ভালোবাসার তুলনা নেই নাকি তোমার বাবাকে তোমার মায়ের ভালো
না বেসে উপায় নেই। তোমার মায়ের মতো ঘৃণ্য নারীকে কে আর ঘরে নিবে বল ।
মিলিটারীতে নষ্ট মেয়েমানুষ ।
মেয়ে- আর একটা কথা বলবে না ফুপ্পি। এতোদিন যা বলেছ , করেছ
কিছুই বলিনি। কিন্তু, এখন আমার মাকে একটা কথা বললে ছেড়ে কথা বলবো না।
এতোদিন মায়ের পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিল না, এখন আমি আছি। এই আমি!
আমার মায়ের মেয়ে।
মা- এসব কথা থাক মণি মা । ওরা গুরুজন তোমার।
ফুপ্পি- কেন থাকবে কেন? বলতে দাও। বলতে শিখিয়েছো , বলবে না !
তোমার মতো মায়ের মেয়ে আর কতো ভালো হবে! কতো ভালো হবে !
মেয়ে- ফুপ্পি, আর একটা কথাও না। শুধু শুনে রাখো, মায়ের জন্যই এতোদিন বলিনি কিছুই।
কী জন্য এসেছো তাই বলো । আমি জানি, কোন না কোন মতলবে এসেছো। বলে ফেলো।
আমি এখন বড়ো হয়েছি, সব কথা শোনার অধিকার আমার আছে। আর একটা কথা ,
মাকে কোন কথা না বুঝলে ! কিছু বললে, আমি চুপ থাকবো না।
ফুপ্পি- তা, থাকবে কেন? বড়ো হয়েছো , চাকরি করছো ! তাতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু,
এই আমরা না থাকলে, ভেসে যেতে কোথায় সে ধারণা আছে? নাই, তাই না ? থাকলে
এসব কথা বলতে পারতে না। অকৃতজ্ঞ তো তোমরা ।
মেয়ে- অকৃতজ্ঞ আমরা না, তোমরা । আমার মা, আর আমাকে তো এমনি এমনি
খেতে-পরতে দাও নি, কাজের বিনিময়ে দিয়েছো। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী !
তাই না !
মা- চুপ মণিমা, চুপ। এতো কথা কেন বলিস, এতোদিন যখন ….
[ চুল দাড়িতে আবৃত একজনের পৌঢ় ব্যক্তির প্রবেশ ]বাবা- ফিরে এসেছি, ফিরে এসেছি, ফিরেছি আমি !
মা- কে ? কে ? তুমি! তুমি! তুমি এসেছো, ফিরেছো তুমি… (কিছু্ক্ষণ থেমে)
এতোদিন পর ফিরে এসেছো তুমি। এতোগুলো বছর… এতোগুলো বছর তুমি…
তুমি কোথায়,.. কোথায় ছিলে! সেই ৭ মার্চ, ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে চলে গেলে ঢাকা, আমাকে রেখে একা,
এলে না, আর এলে না ফিরে !
বাবা- আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। সেই দিন সেই উত্তাল জনসমুদ্রে মন মাতাল করা
ভাষণ শুনতে শুনতে দেশ আর যুদ্ধ ছাড়া অন্য কিছুই আমার মনে ছিল না।
মনের ভেতর ছিলে না তুমি, ছিল না মণি মা, আমার মা, ভাই-বোন কেউ ছিল না,
কেউ না ! কেউ ছিল না আমার মনে ! তখন আমার মনে ছিল শুধু দেশ,
দেশের মানুষ।
আমার এতোটুকু মনে ছিল না আমি ছাড়া আমার বালিকা বধূ, আর তার
কোল জুড়ে থাকা আমার ছোট্ট সোনামণি কী করবে, কী খাবে,
থাকবে কার কাছে। মনে ছিল শুধু এই দেশ, আমার দেশ আর
স্বাধীনতা ছাড়া কিছুই ছিল না মনে, কিছুই না ।
তাই সব ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম যুদ্ধে।
মা- জানি, যুদ্ধে গিয়েছিলে। এপ্রিলের শেষ তারিখে চিঠি পেয়েছিলাম তোমার।
জেনেছিলাম যুদ্ধ করছো , কিন্তু তারপর ! ডিসেম্বর, ১৯৭১ যখন ফিরলো সবাই,
ফিরলো তোমার ভাই,বন্ধু। ফিরে এলো সকলে, যুদ্ধে গিয়েছিল যারা।
ভেবেছিলাম, বেঁচে নেই তুমি। এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে যদি থাকতে
তাহলে ফিরে আসতে তুমি। কিন্তু আসোনি। মনকে প্রবোধ দিয়েছি নেই তুমি,
তবুও আশা ছিল। কিন্তু যে তুমি ছিলে না, সেই তুমি এতদিন পর-? কোথায় ছিলে,
কেমন ছিলে?
বাবা- আমার কথা বাদ দাও। আমি কেমন ছিলাম বলবো পরে, তোমাদের কথা বলো।
বাড়ি গিয়ে শুনলাম, তুমি এখানে। এখানে কেন, বলো ! বলো আমাকে !
তোমার তো এখানে থাকার কথা নয় ! তাহলে— ?
মা- কী বলবো ! এতোদিন পরে এসে কী শুনবে তুমি! কী শুনতে চাও ! তবুও
শুনতে চাচ্ছো, বলবো। বুকের ভেতরের বন্দী কথাগুলো বের হওয়ার জন্য
চড়ুই পাখির মতো ছটফট করছে, ছটফট করছে অনেকদিন।
বলতে পারিনি আমি, বলিনি। এখন শুনতে চাচ্ছো ! বলবো !
বলবো তোমাকে। শুনতে শুনতে রাগ হবে না তো তোমার?
হবে নাতো কষ্ট?
বাবা- না, না রাগ হবে না আমার, তুমি বলো । আমি তো তোমাদের কথা
শোনার জন্যই বেঁচে আছি, এসেছি এখানে। রাগ হবে না ! কষ্ট হবে আমার।
কষ্ট তো হওয়াই উচিত আমার ! হওয়াই উচিত!
মা- তা হলে, শোন। আমার ষোল বছরের কোলে একটি সদ্যজাত শিশু ধরিয়ে
দিয়ে চলে গেলে, চলে গেলে তুমি। রেডিওতে শুনি ঢাকার খবর। চারদিকে
আগুন,বুলেট, রক্ত আর লাশ। আকাশে-বাতাসে শুধু হাহাকার। রাজধানী
শহরের সেই আগুন, বুলেট,রক্ত, লাশ আর হাহাকার একদিন ছড়িয়ে গেলো
জেলা শহরগুলোতেও। সেখান থেকে ছড়িয়ে গেলো গ্রামে। শহর থেকে
দলে দলে লোক আসছে গ্রামে। নদীর স্রোতের মতো মানুষ ! শুধুই মানুষ !
যতো বাড়ছে মানুষ, ততোই বাড়ছে শঙ্কা ! শুধুই শঙ্কা !
সেই সঙ্গে তোমার চিন্তা। আমি ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে পাগলের মতো।
নানা রকম চিন্তায় আমার ষোল বছরের জীবনটায় এক অজানা আতঙ্ক এসে
ভর করেছিল। কখন কী হয় সব অজানা, অজানা আমাদের। দিন-রাত
ভয়ে ভয়ে কাটে। তোমার মনে আছে , তুমি যাওয়ার সময়, আমাকে আর
আমার মেয়েকে রেখে গিয়েছিলে আমার বাবা-মায়ের কাছে ।
আমরা গ্রামেই ছিলাম।
১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি, এক রাত, পাকিস্তানী সেনা এলো গ্রামে।
গুলি করলো, আগুন দিলো । পুড়ে গেলো ঘরবাড়ি। মারা গেলো মা,বাবা,ভাই।
ওরা কেড়ে নিলো আমার সম্ভ্রম। অচেতন ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলো তারা।
চেতনা ফিরতেই শুনি, বাচ্চার কান্নার শব্দ ; কাঁদছে, কে যেন কাঁদছে?
এদিক খুঁজি, ওদিক খুঁজি। অনেক খুঁজাখুঁজির পর দেখি,
ছড়ানো-ছিটানো বাসন-কোসন আর আসবাবের মাঝে কাঁদছে , কাঁদছে আমার
ছোট্ট একরত্তি এই মেয়ে। কীভাবে যে বেঁচে গিয়েছিলো তা এখনও জানি না।
ওর বেঁচে থাকা ছিল আমার বোধের অতীত ! আমি, স্থবির হয়ে গিয়েছিলাম !
ওর কান্নায় আমার স্থবিরত্ব দূর হয়ে যায়। উঠে দাঁড়াই। ওকে কোলে নিয়ে
কাটিয়ে দেই সেই আঁধার রাত, আমার মৃত বাবা,মা,ভাইদের সঙ্গে। পরেরদিন
দাফন করি ওদের একা। তারপর থেকে আমি একা। শুধুই একা। রাতটা গেলো,
গেলো দিনটাও। তারপর দিন যায়, যায় রাত।
কী করবো এই চিন্তায় বুকের ভেতর শুকিয়ে গেলো আমার। খেয়ে না খেয়ে
কয়দিন থাকা যায় ? উপায় না পেয়ে আরও কিছুদিন থাকলাম ওই বাড়িতে।
কিন্তু যেদিন, চাচা আর চাচাতো ভাইকে ধরে নিয়ে গেলো রাজাকার, সেদিন
খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। মনে হলো আর নয় ! আর নয় এখানে।
অনেক ভেবে-চিন্তে ঠিক করলাম যাবো, তোমাদের বাড়ি। যা থাকে কপালে,
যে যাই বলুক, সব শুনেই থাকবো সেখানে, থাকবো আমার মেয়েটার জন্য।
গেলাম আমার শ্বশুরবাড়ি।
বাবা- গিয়েছিলে ! কিন্তু—
মা- কিন্তু, কী ?
বাবা- মা বললো , গিয়েছিলে কিন্তু না থেকে চলে এসেছো ! কেন ?
মা- কেন এসেছিলাম। বলেনি তোমার মা । কবে, কখন, কেন চলে এসেছি আমি,
কিছুই বলেনি, কিছুই বলেনি তোমার মা !
বাবা- না, কিছুই বলেনি। শুধু বলেছে, থাকোনি তুমি । কেন থাকোনি? কেন?
মা- কেন থাকিনি, সে কথা আমাকে কেন ? জিজ্ঞেস কেন করোনি তোমার মাকে ?
বাবা- করিনি আমি, তোমার কাছে শুনবো বলে । তুমি বলো।
মা- এতোদিন পরে সব শুনতে চাও, তাহলে শোন, যখন গেলাম তোমাদের বাড়ি,
তখন তোমার ভাই-বোনেরা থাকতে দিতে চাইলো না। বাড়িতেই ঢুকতে দিতেই
চায়নি ওরা। আমার মেয়েকেও রাখতে চায়নি। তবে, তোমার মা, তোমার ভাই-
বোনদের বিপক্ষে গিয়ে বলেছিল, ওরা তোমাদের ভাইয়ের বউ আর মেয়ে।
তোমাদের যেমন এ বাড়িতে থাকার অধিকার আছে, ওদেরও আছে।
তোমার ভাই বলেছিল, ‘কী যে বলো মা, ওরা, এ বাড়িতে থাকলে এ বাড়ির ভাগ,
সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে তো । এমন কথা কেমন করে বলছো, তুমি’ ?
তোমার মা বলেছিলেন, সম্পত্তি, তোদের কাছে বড়ো হলো ! আজ তোরা
তাড়িয়ে দিবি ওদের, কাল যদি তোদের ভাইটা এসে বলে, আমার বউ কই,
কোথায় আমার মেয়ে ? ওদের কেন তাড়িয়েছো ? কী জবাব দিবি তোরা।
কী জবাব দিবো আমি ?
তার চেয়ে ওরা আমাদের বাড়ি থাকবে, কাজ করবে, খাবে। আমাদের এই
বাড়িতে তো কতো মানুষই খাচ্ছে, দাচ্ছে। ওরাও খাবে। বিনিময়ে
কাজ-টাজ করবে । তোমার মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই
তোমার বোন বলল, ‘না, মা ওকে রাখা যাবে না। ও নষ্ট মেয়েমানুষ।
ওদের বাড়ি, আমার ননদের বাড়ি পাশাপাশি, আমার ননদ সব জানে সব,
বলেছে আমাকে। পাকিরা যেদিন রাইফেল সিধা ধরে জুতা মচমচিয়ে
ঢুকেছিল ওদের বাড়ি, পায়ের তলায় পিষে দিয়েছিল ওরই হাতে তৈরি
যত্নের ফুলবাগান, ছিন্নভিন্ন করেছিল সব ফুল, সেই সঙ্গে ওকেও। মিলিটারীতে
নষ্ট মেয়ে মানুষ মা, ও। ওর কথা শুনে রেগে গিয়ে বলেছিলেন তোমার মা, কেবল
কথা বাড়াও তোমরা। ওর সঙ্গে যাই হোক না কেন, ও এখনও তোমার ভাইয়ের বউ।
ও এই বাড়িতেই থাকবে। তোমার মা, শুধুই আমাকে থাকতে দিয়েছিল, আর কিছু নয়।
আমি কাজ করেছি, খেয়েছি। কাজের বিনিময়ে খাদ্য এই আর কি!
বাবা- মানলাম, ওরা অন্যায় করেছে ! কিন্তু তুমি চলে এলে কেন?
মা- কী করবো, কী করার ছিল আমার ! ঝরাপাতার মতো ভাগ্য আমার,তাই তো
চলে আসতে হয়েছিল। আমি চলে এসেছি বলে তোমার রাগ হচ্ছে ! কিন্তু আমার তো
না এসে উপায় ছিল না। সব কথা শুনলে তোমার কষ্ট হবে, কিন্তু তোমার আমার
ওপরের রাগ-অভিমান দূর করার জন্য কিছুটা হলেও তোমাকে বলতে হবে !
কিন্তু আমার তো আর বলতে ইচ্ছা করছে না।
মেয়ে- মা, তোমাকে সাফাই দিতে হবে কেন? কেন মা, কেন? যে মানুষটা ৪০ বছর
কোন খোঁজ রাখেনি তোমার-আমার, তার কাছে তোমার জবাবদিহিতা !
কেন মা, কেন? এই জন্যই ফুপ্পি এসেছে, বুঝতে পেরেছি।
মা- মণিমা …
বাবা- এই মেয়েটা …!
মা- তোমার মেয়ে।
মেয়ে- আমি কারো মেয়ে নই মা —
বাবা- আমার মেয়ে ! আমার —
মা- মনে আছে, এই মেয়েটাকে কয় মাসের রেখে গিয়েছিলে, মাত্র ৬ মাস। ছয়
মাসের মেয়েটা খিদেয় কেঁদেছে, দুধ দিতে পারিনি। জামা-কাপড় দিতে পারিনি।
শখের কিছুই দিতে পারিনি ওকে ! আমার কাছে যা টাকা ছিল, তোমার মা,
নিজের কাছে রাখার নামে নিজের করে নিয়েছিল, বলেছিল চাইলেই পাবো ।
কিন্তু, না! পাইনি। একদিনের কথা বলি, খিদেয় কাঁদছিল মেয়েটা। তোমার মাকে
বললাম, একটু দুধ খেতে চায়,দুধের ব্যবস্থা করে দিন। তোমার মা,
যেন আকাশ থেকে পড়লেন, বললেন, দুধ! দুধ কোথায় পাবো। তোমার জা’কে বল।
তোমার ভাবীর কাছে বলতেই, তোমার ভাবী বলল, তোমার ভাসুরকে বলো ।
এ হলো সেই রকম কথা। ‘ বউ যাবে বাপের বাড়ি, স্বামীকে বললে, তার স্বামী বলল,
মাকে বল। মাকে মানে বউয়ের শাশুড়ি। শাশুড়িকে বললে, সে দেখিয়ে দিলো তার
শ্বশুরকে। শ্বশুরকে বললে, সে বলল, তোমার বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা জানে
তোমার স্বামী, ওকে জিজ্ঞাসা করো ।’ স্বামীকে আর জিজ্ঞাসা করেনি বউ। তারও
আর যাওয়া হয়নি বাপের বাড়ি। আমারও হয়েছিল তাই।
যাই হোক, গেলাম ভাসুরের কাছে, ভাসুর বলল, যাদের বাপ নেই, তাদের দুধ খেতে নেই !
দুধ খাওয়ার কী আছে ! ভাত খাচ্ছে না ? তোমার টাকা থাকে দুধ কিনে মেয়েকে খাওয়াও।
তোমাদের বাড়িতে তখন ৪টা গরু দুধ দিতো। সবাই খেতো। খেতে পেতো না
শুধু আমার মেয়ে। জানো, সে সময়, তোমাকে কতো ডেকেছি। ফিরে এসো,
ফিরে এসো, বলে কেঁদেছি। ডেকেছি তোমাকে, না, আমার জন্য ডাকিনি,
ডেকেছিলাম শুধু মেয়েটার জন্য। মেয়ের মুখের দিকে তাকালে বড়ো
অসহায় লাগতো নিজেকে। অবশ্য এই আসহায়ত্বই আমাকে নিজের পায়ে
দাঁড়াতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে তুলেছিলো। তুমি নিজেও জানো, একটা মানুষের
জন্য জীবন কখনও থেমে থাকে না, কিন্তু তছনছ হয় জীবন। শুধুমাত্র
একটা মানুষ, তাঁর চলে যাওয়াতে অন্য এক মানুষের আর জীবনের দিকে
ঘুরে দাঁড়ানো হয় না !
তুমি চলে যাওয়াতে আমারও এই তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনে ঘুরে দাঁড়ানো হয়নি।
জীবনকে টেনে নিয়েছি যতদূর নিয়ে যাওয়া যায়, নিয়েছি। তোমার কাছেই শিখেছিলাম,
ভালোবাসা কাকে বলে, ভালোবাসা মানে কী। এই ভালোবাসার বোধ নিয়েই জীবনকে
এগিয়ে নিয়েছি। আর আজও বেঁচে আছি আমি। তোমার নামের লক্ষ প্রদীপ আজও জ্বলে,
জ্বলে আমার বুকের তলে, আমি আজ ছিন্নভিন্ন মানুষ ঠিকই, তবুও আমার ভালোবাসাকে
কোন ক্লেদ স্পর্শ করতে দেইনি, দেইনি মুছে যেতে, হারিয়ে যেতে। পুড়ে ছাই হয়নি তো
তোমার ভালোবাসা, হয়েছে কোহিনূরের চেয়েও দামী উজ্জ্বল আলোর পাথর,
যার নাম বর্ণালী।
সেই বর্ণময় আলোয় দীক্ষা নিলাম, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। লেখাপড়ায়তো ছিলাম ইন্টার !
একটা চাকরি, আর লেখাপড়া হয়ে উঠলো আমার ধ্যান-জ্ঞান। কিন্তু কথায় বলে না,
‘কপালে নাই ঘি, ঠকঠকাইয়া করবি কি? ‘ আমারও তাই !
কোনকিছুতেই এগোয় না। বাধা আমার সবখানে। বাড়ি থেকে বের হতে দিবে না
তোমার মা। বলল, আমরা কী খেতে-পরতে দিচ্ছি না। আমার শাশুড়ি আরও বলল,
এতো বড়ো বাড়ি, বাড়ির সব ছেলে-মেয়ে, রান্না-বান্না, চাকর-কামলা কে সামলাবে,
কে সামলাবে মেহমান,জায়গীর। বছরের ধান,কাউন, চৈতালি- এসবের দেখাশুনা
করবে কে? এ সবের জন্য কী আমি আলাদা ঝি-চাকর রাখবো ! আমি রাগ করিনি,
আমি বুঝেছিলাম রাগ করা আমাকে সাজে না । তবে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম,
আমি, এ বাড়ির ঝি নই, এ বাড়ির বউ ।
অনেক কথা-কাটাকাটি হলো, হলো তর্কবিতর্ক, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই
হলো না ! মাঝখান থেকে আমার সার্টিফিকেটগুলো ছিঁড়ে ফেললো তোমার মা।
সার্টিফিকেট তুলতে সময় লাগলো, কিন্তু আশা ছাড়লাম না। আমি চাকরির
সুযোগ পেলাম না। কিন্তু পরীক্ষা দিলাম। প্রাইভেট। আমার পরীক্ষা দেওয়া,
চাকরি পাওয়া, আজকের এই জায়গায় পৌঁছানোর জন্য কৃতজ্ঞ তোমাদের
পাশের বাড়ির ভাবীর কাছে। তিনি তোমাদের আত্মীয় নন, তিনি একটি
নারী সংগঠনের সদস্য। মাঝেমধ্যেই আসতেন তিনি। আমার মেয়ের জন্য
কখনও দুধ, কখনও বিস্কুট আনতেন।মেয়ের রং পেন্সিল, বই-খাতা,
আমার পড়ার বই সব দিয়েছেন তিনি । আমার পড়াকালীন একটা
ছোট চাকরি জোগাড়ও করে দিয়েছিলেন তিনি । এখন যে চাকরিটা করছি,
সেটাও তারই জন্য পাওয়া। তাঁর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ আমি। জীবনভর
ঋণী আমি সেই মানুষটার কাছে । আমাকে এতোদূর আসতে অনেক
কষ্ট করতে হয়েছে, কিন্তু পিছ পা হইনি। কথায় আছে না কষ্ট না করলে
কেষ্ট মেলেনা। এটা ঠিক কথা। আমি কষ্ট করেছি, তার ফলও পেয়েছি।
বকা-ঝকা খেয়েও পড়েছি। সব কাজ শেষ করে পড়েছি রাতে।
কাজ শেষ হতো কখন জানো! রাত বারোটায়। তখন পড়েছি,
পরীক্ষা দিয়েছি। ডিভিশন পাইনি, পাশ করে একটা চাকরি পেয়েছি।
মেয়েকে বড়ো করেছি। এখন বড়ো একটা চাকরি করছে আমার মেয়ে।
এই মণি মা, তোর বাবার সঙ্গে কথা বল।
মেয়ে- এতোদিন পর! এতোদিন পর তার সঙ্গে কী কোন কথা থাকতে পারে মা ?
আমার কোন কথা নাই মা ! এতোদিন পর আমাদের মনে পড়লো কেন তার তাই
জিজ্ঞেস করবো ? আর কিছু না ! এতোদিন পর কেন মনে পড়লো আমাদের,
তোমার বলো ? কেন?
বাবা- কী হয়েছিল, সব বলবো । তুই, কেমন ছিলি তাই বল ।
মেয়ে- আজ তুমি জিজ্ঞেস করছো কেমন ছিলাম ? কেমন ছিলাম আমি ! তোমাকে
বলবো সব কথা, কেমন করে ভাবলে এ-কথা ! তোমাকে তো কিছুই বলার নেই,
না, বলবো না আমি।
বাবা- কেন বলবি না মা। আমি তো ইচ্ছা করে তোদের কাছে আসিনি মা, ইচ্ছা
করে আসিনি। তুই বল মা তুই বল। আমি শুনি। তোর কথা শোনার জন্যই তো
আমার এতদূর আসা।
মেয়ে- বলবো না বলেই ভেবেছিলাম, কিন্তু মা বলতে বললো, তাই বলছি । শুনতে
খারাপ লাগবে তোমার। কঠোর হবে আমার কথা। মনে দুঃখ নিয়ো না। জীবনে যখন
তোমাকে প্রয়োজন, তখন তুমি ছিলে না বাবা। আমার যখন দরকার স্কুলের বেতন,
অংক বই, জ্যামিতি বক্স, তখন কোথায় ছিলে তুমি বাবা ? একটু আদরের জন্য মন
কাঁদতো যখন, তখন কোথায় ছিলে তুমি ? যখন ক্লাসের বন্ধুদের বাবা আসতো,
ওদের কোলে নিতো আবদার করলে চকলেট, টফি, আইসক্রিম কিনে কথা
বলতে বলতে চলে যেতো ,তখন আমি বোকার মতো শুধু তাকিয়ে থাকতাম
আমার বাবার জন্য, তোমাকে না, আমার বাবার কথা খুব মনে পড়তো।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তো । মা কষ্ট পাবে তাই কখনও আমার
মন খারাপ বুঝতে দেইনি তাঁকে ।
আমার মাঝেমাঝেই বাবা, বাবা বলে ডাকতে ইচ্ছা করতো। মনে মনে ডাকতাম আমার
বাবাকে। সারাদিন খেতে ইচ্ছা করতো না ! আমার চোখের জল, বুকের রক্ত ক্ষরণ
কেউ কখনও দেখতে পেতো না। শুধু বুঝতে পারতো আমার মা।
না, আমার জন্য কষ্ট নয়, কষ্ট হতো আমার মায়ের জন্য, আমার এই মায়ের
জন্য কষ্ট ছিল মনে। আমার মায়ের কষ্ট, লাঞ্ছনা,গঞ্জনা, কেমন ছিলো আজ তা
বুঝতে পারবে না তুমি । মায়ের হৃদয়ের রক্ত-ক্ষরণ, চোখের জল শুধু আমি দেখেছি ,
আর কেউ তো দেখেনি ! আজ সে কথা কী করে বুঝবে তুমি ? তুমি তো
ভাবতেও পারবে না, কতোটা দুঃখের হাত ধরে এসেছে এতোটা পথ আমার মা।
আমাকে বুঝতে দেয়নি তার দুঃখ । কিন্তু আমি জানতাম তার চোখের জলের কথা,
বেদনার নীল কষ্টের কথা। বুঝতে দেইনি কখনও মাকে। শুধু ডেকেছি আমার বাবাকে,
ডেকেছি,ডেকেছি। আর ডেকেছি । শুধু প্রার্থনা করেছি, তুমি চলে এসো, চলে এসো
তুমি আমার বাবা, চলে এসো আমাদের কাছে, বাবা, চলে এসো আমাদের কাছে ।
আমাদের সমাজ তো প্রতিবন্ধী, এখন কিছুটা নয়, অনেকটাই বদলেছে,
কিন্তু তখন,অল্প বয়সি বিধবা মেয়েদের পথ চলতে কতোটা কষ্ট সহ্য করতে হতো,
কতোটা বাধা তাদের অতিক্রম করতে হতো, তোমাকে তা নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে
হবে না ! আর যে মেয়েটার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না তার অবস্থার
কথা তো চিন্তাই করা যায় না ! আমার মায়ের পাশে তো দাঁড়াবার মতো
কেউ ছিল না, কেউ না ! নিজের বাবা, মা, ভাই তো কেউ ছিল না,
ছিল শ্বশুরকুলের মানুষ ! তাঁরা দাঁড়ায়নি ! দাঁড়াতে চায়নি । একলা,
একা পথ চলতে হয়েছে মাকে।
অনেক অপমান সহ্য করে, অনেক প্রলোভন, অনেক অশুভ,
শুভ হাতছানি উপেক্ষা করে, আমার মা, আমাকে নিয়ে এতোটা
পথ এসেছে ! কেন আসোনি তখন ? কোথায় ছিলে এতোদিন ?
আসোনি কেন ?
বাবা- আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম, সোনা মা। দেশের জন্য যুদ্ধ জরুরি ছিল ।
মেয়ে- যুদ্ধে গিয়েছিলে, আমি জানি । মায়ের কাছে শুনেছি সে কথা । তা ছাড়া, মায়ের
কাছে যে চিঠি লিখেছিলে তার সঙ্গে আমাকেও চিঠি লিখেছিলে একখানা। বিশ লাইনের
একটা চিঠি। তোমার জন্য নয়, আমার বাবার জন্য মন খারাপ হলে সে চিঠিটা
আমি পড়তাম। এখনও পড়ি আমি । সেই চিঠিটা পড়ি, আমার বাবার চলে যাওয়ার
দিনকে স্মরণ করে পড়ি, সেই চিঠি পড়ি স্বাধীনতা দিবসে, বিজয় উৎসবের দিন।
সবাই বাইরে বেড়াতে যায়, আমি যাই না। ঘরে থাকি। আমার বাবার ছবি দেখি,
বাবার চিঠি পড়ি। চোখের জলে স্মরণ করি তাঁকে।
তুমি যুদ্ধে গিয়েছিলে । তুমি, তোমরা যুদ্ধ করেছিলে বলেই না এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল ।
তোমাদের সাহসে, বীরত্ত্বে, তোমাদের মতো সাহসী যোদ্ধাদের বুকের লাল রক্তেই তো
আজ বাংলাদেশের বাতাসে উড়ছে লাল-সবুজ পতাকা। তুমি, এ-দেশের অহংকার।
সেই সঙ্গে আমারও অহংকার। তোমাকে স্যালুট জানাই !
কিন্তু তোমার মতো যারা যুদ্ধে গিয়েছিল , তারা অনেকেই তো ফিরে এসেছিল তখন
তুমি কেন আসোনি তখন ? না, তোমাকে দোষ দিচ্ছি না, কিন্তু না বলেও তো পারছি না।
আমার আর আমার মায়ের কষ্টের জন্য তো তুমি দায়ী, তুমি !
বাবা- এমন করে বলিস না মা, কষ্ট পাই । তোদের সব কথা বল, আমাকে একবার বাবা
বলে ডাক, একবার। আমি, তোর বাবা ডাক শোনার জন্য, তোদের কথা শোনার জন্যই
তো ফিরে এসেছি , ফিরে এসেছি মণি মা।
মেয়ে- কেন ডাকবো বলো, কোন অধিকারে বাবা ডাক শুনতে চাও তুমি। কি অধিকার
আছে তোমার এই ডাক শোনার ? তুমি যখন ছিলে না , তখন কী অবস্থায় ছিলাম
তা তুমি এ দেশের পথ শিশুদের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে। ওদের আর আমার
মধ্যে ফারাক এইটুকুই ছিল, ওদের ঘর নেই, আমি পৈত্রিকসুত্রে একটা ঘর পেয়েছিলাম।
চাচা, চাচী,দাদী,ফুপু, চাচাতো, ফুপাতো ভাই-বোন পেয়েছিলাম।
পেয়েছিলাম তথাকথিত ফ্যামিলি নামের একটা ফ্যামিলি। যেখানে ছিল না
আমার ন্যুনতম মৌলিক অধিকার। আমার শুধু ছিল দুই বেলা দুই প্লেট ভাত।
অসুখে ওষুধ ছিল না, ছিল না পথ্য। অসুখে ছিল শুধু মায়ের চোখের জল।
একটু ওষুধের জন্য,পথ্যের জন্য মাকে ভিক্ষা চাইতে হতো বাবা।
ভিক্ষাই বলবো কারণ একবার নয়, দুইবার নয়, বারবার চাইতে হতো মাকে !
তিনবার, ছয়বার চাইলে তা মিলতো একবার !
বাবা ডাকতে বলছো তাই বলছি, আমি তোমার মেয়ে। ওই বাড়ি, ওই জমির
ফসলে কী কোন অধিকার ছিল না আমার, আমার মায়ের! তুমি কী ওদের
কেউ নও বাবা? কক্ষনও কি ওদের কেউ ছিলে ? বাবা, বলতে পারো,
কেন ছোটবেলায় কারও কারও বাবা থাকে না । কেন থাকে না, বাবা, বল না।
বাবা- সোনা মেয়ে, আর বলিস না আমি শুনতে পারছি না মা ।
মেয়ে- বাবা, শুনতে না চাইলেও তো আমি তোমাকে শোনাবো বাবা। তুমি শুনতে
চেয়েছ এখন শুনবে না কেন ? না শুনলে তো তোমাকে শুনতে হবে বাবা। বাবা ডাক
শুনবে আর আমার দুঃখের কথা, কষ্টের কথা শুনবে না, তা তো হয় না বাবা!
শুনতে তোমাকে হবেই ! না শুনলে তো বুঝতে পারবে না বাবা, তোমার মতো যারা
যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেনি, তাদের স্ত্রী,পুত্র-কন্যা বা তাদের পরিবারের অন্য
সদস্য-যারা নির্ভরশীল ছিল তাদের ওপর, তাদের দিন কেমন গিয়েছে, তারা কী
অবস্থায় ছিল , বা এখনও আছে। তুমি না শুনলে তো বুঝতে পারবে না বাবা।
তুমি শুনবে আমার কাছে। তারপর গিয়ে দেখে আসবে।
মা- ও সব কথা থাক মণি মা। যে দিন চলে গেছে, তাকে মনে করে বা সামনে
টেনে লাভ কী বল । এসব কথা বললেই কী ফিরে আসবে সেই দিন !
নাকি সেই দুঃখ, সেই নীল কষ্ট মুছে যাবে!
মেয়ে- মা, জানি। আমি জানি, এসব কথা বাবাকে আজ শুনিয়ে কোন লাভ নেই।
সেই দিন আমি আর কক্ষনও ফিরে পাবো না । তবুও বলছি একটু শান্তি পাওয়ার
জন্য। আমি মা, ভুলতে পারি না আমার সেই সব দিন, ভুলতে পারি না ।
বাবা ছাড়া আমার, শৈশব, আমার কৈশোর। মা, যে শৈশব হতে পারতো দুরন্ত,
যে কৈশোর হতে পারতো উচ্ছল জীবন্ত,সেই শৈশব, সেই কৈশোর ছিল
আমার ক্লান্ত, বিষন্ন, অবসন্ন একলা দুপুরের মতো। আমার জীবনের এই একলা,
বিষন্ন দুপুর তো শুধু বাবা না থাকার কারণে মা। বলো তা ঠিক কী না ।
তোমার মনে আছে মা, সেদিনের কথা। বুবুকে পুতুল কিনে দিয়েছিল যেদিন, সেদিনের
কথা। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আজকেই এখনই বুবুর পুতুলের মতো পুতুল চাই।
খুব জিদ করেছিলাম মা আমি। বলেছিলাম, তুমি যদি না দাও, আমি চাচার কাছে চাইবো।
তুমি, আমাকে বকো নাই, বরং বুকে নিয়েছিলে। বলেছিলে, কারও কাছে কিছু
চাইতে নেই মণি মা। তোমার যা আছে তাতেই খুশি থাকবে সোনামণি, মানুষ যদি
যার যা, আছে তাই নিয়ে খুশি থাকে তাহলে সে কষ্ট কম পায়।
আর একটা কথা সবসময় মনে রাখবে সোনামণি, অন্যের খেলনা, কাপড়, বাড়ি,
তৈজসপত্র কোনকিছু দেখেই মনে কষ্ট নিবে না , কখনও আক্ষেপ করবে না।
কক্ষনও পেতে চাইবে না ওই একই রকম জিনিষ।
কখনও নিজের তুলনা করবে না কারও সঙ্গে সব সময় মনে রাখবে,
তোমার তুলনা তুমি।তুমি হবে সবার সেরা, হবে সবার চেয়ে আলাদা।
এক্সেপ্সোনাল।
সেদিন রাতেই, তুমি একটা পুতুল বানিয়ে দিয়ে বলেছিলে, এই নাও পুতুল। তোমার
বাবা থাকলে আরও সুন্দর পুতুল দিতে পারতাম । জিদ করতে হতো না তোমাকে।
তুমি মা, চোখের জল লুকাতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে। দেখতে দিতে চাওনি
তোমার চোখের জল, বুঝতে দিতে চাওনি তোমার ব্যথা, তোমার মনের কষ্ট।
তুমি বুঝতে দিতে না চাইলেও আমি ঠিকই বুঝেছিলাম মা, তোমার মনের কষ্ট।
আমার মনের মতো পুতুল আমাকে দিতে না পারার জন্য তোমার বুকের
উথালপাথাল নীলকষ্ট, তোমার নোনা-ব্যথা সব বুঝেছিলাম মা।
তারপর থেকে মা, আর কোনদিন তোমার কাছে চাই নি কিছুই।
শোন বাবা, এই রকম টুকরো টুকরো আরও অনেক কথা আছে, আছে অনেক দুঃখময়
স্মৃতি। এসব বলতে গেলে শেষ হবে না। জানো বাবা, আমার মায়ের ভালো একটা
শাড়ি ছিল না। আমাদের বাড়িতে যারা কামলা দিতো, ওদের বউ-মেয়েরা যেসব
কাপড় পরতো, সেইসব কাপড় পরতো আমার মা। সেসময় কাপড় দিতো রিলিফে।
লাইন দিয়ে সেই কাপড় আনতে হতো মাকে। আমারও ছিল না একটা ভালো জামা।
একটা ছাড়া দুইটা প্যান্ট ছিল না , বাবা। মায়ের চাকরি পাওয়ার আগে পর্যন্ত
কিছুই ছিল না আমার আর আমার মায়ের। মা চাকরি পেয়েছে, আমিও সব
পেয়েছি বাবা। সব সব,কোন অভাব রাখেনি আমার, আমার মা।
আজ তুমি ফিরে এসেছো। কিন্তু ফিরে তো আসেনি আমার শৈশব, আমার কৈশোর।
মুছে যায়নি আমার সেই সব দুঃখ, আমার চোখের জল শুকিয়ে গেছে তা ঠিক,
কিন্তু বুকের ক্ষত তো শুকায়নি । তবুও বাবা, তুমি ফিরে এসেছো বলেই, আমার
বুকের ভেতর যে কষ্ট তড়পাচ্ছিলো তা এতোদিন পরে তোমাকে বলে একটু
হালকা হলাম। বাবা, আমি তোমার মেয়ে একবার বলো বাবা।
একবার বলো বাবা । একবার বলো, আমি তোমার মেয়ে, তুমি আমার বাবা।
বাবা- এই পাগল মেয়ে, এটা কি বলার কথা। তুই তো আমারই মেয়ে। যুদ্ধে যখন গেলাম
তখন তোকে ৬ মাসের রেখে গিয়েছিলাম। সেই তো এতোটুকু দেখে গিয়েছিলাম।
কথা বললে হাসতিস। তাই, তাই বললে হাততালি দিতিস। সব মনে আছে আমার।
সব মনে আছে আমার মণিমা।
মেয়ে- তুমি কী ঠিক বলছ বাবা ! আমি তোমার মেয়ে ! তুমি আমার বাবা। কিন্তু
কেউ তো এই কথা স্বীকার করে না বাবা। ওরা সব সময় জারজ বলেছে আমাকে।
মাকে বলেছে, নষ্ট মেয়েমানুষ, বীরাঙ্গনা। পাড়া-পড়শিরা যা ইচ্ছা বলে যেতো মাকে।
ওরা কিছু বলতো না, মা যদি কিছু বলতো, মাকে ধরে মারতো তোমার বোন,
মানে আমার ফুপ্পি ! সব সময় বলতো, বীরাঙ্গনা খেতাব নিয়ে চলে যেতে সাহায্যকেন্দ্রে।
মা যায়নি। বীরাঙ্গনা খেতাব তো মা চায়নি। মায়ের শ্লীলতাহানি করেছিলো পাকিস্তানি আর
ওদের দোসররা। এতে মায়ের কী দোষ? মায়ের যদি কোন খেতাব হয় তা হবে মুক্তিযোদ্ধা
বীরাঙ্গনা নয়। আমার মা, সে রকম মেয়ে নয়। আমার মাকে আমি জানি। মা, তোমাকে
খুব ভালোবাসে বাবা, খুব !
বাবা- ভালো যদি বাসে তাহলে চলে এলো কেন।? কেন থাকলো না ও বাড়িতে।
মেয়ে- তুমি মাকে অবিশ্বাস করছো বাবা ! তুমি, চলে যাও। দরকার নেই তোমাকে।
যাও, চলে যাও।
বাবা- ভুল হয়েছে মণিমা। আর বলবো না।
মেয়ে- শোন, শুনে রাখো তুমি, আমার মায়ের মতো মা, হয় না। তুমি মানো বা না
মানো আমি মানি, আমি জানি। আর তুমি আমার বাবা হওয়ার যোগ্য নও। আমরা
চলে এসেছি ভালো করেছি ! তুমিও চলে যাও, যাও !
মা- এসব কথা থাক মণি মা । এসব পুরনো কথা বলে কোন লাভ নাই তো ।
এতে শুধু কষ্টই বাড়বে। তা-ছাড়া তাঁর মন খারাপ হবে। কী দরকার মা, তোর বাবার
মনটা খারাপ করে দেওয়ার।
মেয়ে- মা, তুমি কথা বলো না তো ! তুমি তো কখনও কাউকে কিছু বলো না।
বলতেও চাও না। কাউকে কিছু না বললে, কেউ কিছু বুঝে না মা। এসব আমি
আমার জীবন দিয়ে বুঝেছি। শোন বাবা, আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি, তখন
কাউকে কিছু না বলে আমার বিয়ের জন্য কথা পাকা করে এলো বড়ো চাচা,
আমাকে না, মাকেও না। বিয়ে নয়, ছেলেরা ৫ লাখ টাকা দিবে।
মা, রাজী হলো না। মা বলেছিল, এতো মেয়ে বিক্রি ! তাছাড়া এতোটুকু
বয়সের মেয়ে বিয়ে দিবো না। ছোট বয়সে বিয়ে হলে, মেয়েদের শরীরে, মনে চাপ
পড়ে, এতে শরীর খারাপ করে। বরং আমার মেয়ে পড়ছে, পড়ুক। পড়াটা শেষ
করা প্রয়োজন। মা, এই কথা কেন বলল এর জন্য মাকে মারলো দাদী।
এরপর মা, আমাকে নিয়ে চলে এসেছে।
আসলে, আমার মেয়ে বিয়ে দিবো না, এ কথা না বলে, বলা উচিত ছিল তোমরা
মণিমা-কে বিক্রি করে দাও।এই কথা বলতে পারেনি বলেই, মাকে অতোটা
নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল । তুমি ছিলে না কাছে। কেউ ছিল না পাশে।
মা আর আমি, আমি আর মা ভালোই তো ছিলাম। কেন এলে ? এতোদিন পর
কেন এলে ? বাবা হারানোর দুঃখ বুকে নিয়ে দিন তো চলে যাচ্ছিল। যখন
প্রয়োজন ছিল বাবা, তখন আসোনি। প্রয়োজনে যখন কাজে লাগোনি, তখন
এতো প্রশ্ন কেন বাবা! এখন আমাদের প্রয়োজন নেই বাবা, তুমি চলে যেতে পারো।
তোমাকে, আমাদের প্রয়োজন নেই বাবা।
মা- এ কথা বলে না মণিমা । হয় তো তোর বাবার কোন অসুবিধা ছিল!
তাই আসতে পারেনি। নাহলে, আমাদের ছেড়ে তোর বাবা, দূরে থাকার মানুষ না।
মেয়ে- বাবা, দেখো দেখো আমার মাকে তুমি, এই হলো আমার মা। তুমি
ফিরে এসেছো, তাইতেই মা খুশি। আমার এই মাকে তুমি সন্দেহ করো। তোমাকে
বাবা বলে ডাকতেও আমার ইচ্ছা করছে না। তুমি চলে যাও বাবা। তুমি চলে গেলেই
ভালো লাগবে বাবা।
বাবা- মণিমা, তোর রাগ করার যথেষ্ট কারণ আছে । তোদের কথা না শুনে আমার
কোন কথা বলা, কোন মন্তব্য করা ঠিক হয়নি মা। আমার ভুল হয়েছে। আমাকে
মাফ করে দে মা। আমার কথা শোন।
মেয়ে- আমার কোন কথা শোনার ইচ্ছা নেই। দরকারও নেই। তুমি গেলেই আমার
ভালো লাগবে। ভালো লাগবে !
বাবা- তুমি ওকে একটু বুঝাও। ও বাড়িতে গেলে ওরা সবাই নানান কথা বলল, তাই—
মা- ও বাড়ির কথা থাক, তুমি তোমার কথা বল। তোমার সব কথা শুনবো। মণি মা-ও শুনবে।
এতোদিন তোমার কথা শুনবো বলেই তো বসে আছি। তোমার কথা শুনবো বলে কান মেলে
শুনিনি কারও কথা। মন দিয়েও শুনিনি কারও কোন বক্তব্য বা কথা। শুধু তোমার কথা
শোনার জন্য আমার মন, আমার কান রেখেছি খোলা। তুমি বল,তোমার সব কথা বলো ।
বাবা- আমার এতোদিন কোন কথাই মনে ছিলো না। মনে থাকার অবস্থায়ও ছিলাম না।
মনে আছে শুধু যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আচমকা একটা বুলেট। তারপর
ঘুম। আর মনে নেই, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি, মরণ ঘুম। সেই ঘুম ভেঙেছে এক মাস
পনেরো দিন আগে ! ঘুম ভেঙে দেখি, বদলে গেছে আমার চুলের রঙ, মলিন হয়েছে
দেহের ত্বক। শক্তি নেই শরীরে। চলতে ফিরতে পারি না একা একা। কথাও বলতে পারি না।
আড়ষ্ট জিহ্বা। ভেতরে ভেতরে কাঁপুনি আমার। কান্নায় ভেঙে পড়লে ডাক্তার বলল, ভয় নেই !
সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ভয় যায় না। ভেজা কন্ঠে ডাক্তারকে বলি, আমি তো
ছিলাম বিশে, সুস্থ সবল একজন মানুষ। যুদ্ধ করছিলাম। যুদ্ধ করতে করতে কী ঘুমিয়ে
পড়েছিলাম? ঘুমের মধ্যে কী করে বদলে গেলাম আমি ? ঘুমের মধ্যে কী কেউ বদলে যায় ?
বলুন, ডাক্তার বলুন !
ডাক্তার বললো , ১৬ ডিসেম্বর,১৯৭১ যুদ্ধে আহত ছিলাম হাসপাতালে। ছিলাম কোমায়।
কেউ যায়নি। অবশ্য কারও যাওয়ার কথাও নয়। কেউ তো জানে না। যারা জানে, তারা
হয় তো বেঁচে নেই। প্রায় মাসখানেক হাসপাতালে থাকার পর বিপাকে পড়ে গিয়েছিল
হাসপাতাল। যুদ্ধের সময় তো অনেক বিদেশী আমাদের সহায়তা করেছে।
আমিও তেমনি এক সহৃদয় বিদেশীর সাহায্য পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে
তাঁর দেশে নিয়ে দেখভাল করেছেন। তাঁরই দয়ায়, চেষ্টায় আবার জন্ম হয়েছে
আমার। আমি ফিরে পেয়েছি আমার দেশ, আর ফিরে পেয়েছি তোমাদের।
কিন্তু আমার কথা বলার ভুলের জন্য মণি মা, রাগ করো না। ক্ষমা করো
ক্ষমা করো আমাকে।—
মা- সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছু ভেবো না তুমি। সামলে নেবো অকে আমি।
এতোদিন পর এসেছো, একটু অভিমান তো হতেই পারে ! সময়ে সব ঠিক
হয়ে যাবে দেখে নিয়ো ।
বাবা- তুমি আমাকে মাফ করে দাও। এ জীবনে তোমাদের কোন কাজে লাগলাম না।
মা- এসব কথা রাখো তো। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কী পেলাম কী পেলাম না, তার
হিসেব মেলাতে তো বসবো না আমি। তুমিও বসো না। এসবের প্রয়োজনও নেই।
তুমি বেঁচে আছো, এই আমার কাছে খুশির বিষয়। তুমি পৃথিবীতে আছো, থাকবে
এই আমার চাওয়া।
বাবা- দেখো অসীমা, যে দেশের জন্য আমার এই জীবনের না পাওয়া, যে দেশের জন্য
তোমার, তোমার মতো আর সবার অপমান, তোমাদের একলা পথ চলা, যে দেশটার
জন্য আমার মেয়ের অনাদর, অবহেলা, সেই দেশের এই অবস্থা মেনে নিতে
পারছি না আমি। মেনে নিতে পারছি না, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের অপমান,
মেনে নিতে পারছি না লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর বেদনার অপমান ।
মেনে নিতে পারছি না, যারা যুদ্ধ করেছে, করেছে স্বাধীন এই দেশ,
তাদের না খেতে পাওয়া, দেশের এই অরাজক অবস্থা মেনে নিতে খুবই
কষ্ট হচ্ছে আমার। এতো বছর পর, আমার প্রিয় দেশে ফিরে দেখছি মূল্যবৃদ্ধি,
গ্যাস,পানি সংকট, না খেয়ে আছে দুর্গত এলাকার মানুষ।
না খেয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, মৃত মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী,সন্তান।
বেড়েছে শিশুশ্রম, পাচার হয়ে যাচ্ছে নারী,শিশু। মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে
এ দেশ থেকে অন্য দেশে। এইজন্য কী করেছিলাম যুদ্ধ। আজ খোলা হাওয়ায়
ঘুরছে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, মনে হচ্ছে বেঁচে না থেকে,
মরে গেলেই ভালো হতো। তবে এই কষ্টের মধ্যেও আশার কথা শুনলাম,
যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়েছে।
মা- বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কথা এখানে থেকেই যাচ্ছে। কয়জনের
বিচার করবে সরকার ? কয়জনের বিচার করা যাবে? তাছাড়া কার কার বিচার করা যাবে?
যুদ্ধাপরাধী তো দেশ জুড়ে ! ওরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এ দেশের অলিগলি, রাজপথ,
দেশের আনাচে-কানাচে, কোনা-কানছিতে।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়, ওরা যা ছিল, এই ৪০ বছর পরে শাখা-প্রশাখা বেড়ে
দাঁড়িয়েছে ৪০ গুণ। এই ৪০ বছরে তখনকার যুদ্ধাপরাধীদের চিন্তা-চেতনা, তাদের
সন্তানসন্ততিদের মধ্যে পল্লবিত হতে হতে বিকশিত হয়েছে এই প্রজন্মের মাঝে।
শেকড়ের বিস্তৃতি ঘটেছে আজ বহুদূর।দেশের হালচাল দেখলেই তা বুঝা যায়।
তুমিও বুঝতে পারছো নিশ্চয় !
বাবা- এই কয়েকদিনের পত্রপত্রিকা পড়ে বুঝতে পারছি কোথায় আজ দাঁড়িয়ে এই দেশ !
১৯৭১ এর নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ অবস্থা ছিলো তা কী কমেছে , না একটুও কমেনি।
শুধু নারী নির্যাতন নয় বেড়েছে জ্বালাও,পোড়াও,ভাংচুর। বেড়েছে লুটপাট, ছিনতাই, হত্যা, খুন।
বিসর্জিত হয়েছে মানবিক গুণাবলী। আত্মকেন্দ্রিক হেয়ে গেছে দেশের বেশীরভাগ মানুষ।
আজ ভাই খেলছে ভাই এর রক্তে হোলি, ভাই করছে বোনের সম্ভ্রমহানী, মায়ের বুক শূন্য
করছে মায়েরই নিজের ছেলে, মাকেও দিচ্ছে না রেহাই। আজ তো বিদেশী নেই তবে কেন
আজ এ দেশের এই অবস্থা ! দেশের সাধারণ মানুষ আজ দাঁড়াবে কোথায়? কার কাছে
নেবে শিক্ষা, নেবে দীক্ষা? কে হবে সহায়? কে দাঁড়াবে তাদের পাশে ! আজ প্রয়োজন
মওলানা ভাসানীর মতো দীক্ষাগুরুর, প্রয়োজন একনিষ্ট, সৎ রাজনীতিবিদের।
মা- ঠিকই বলেছ তুমি। আজ ৪০ বছর পর দেশে ফিরে শুধু আফশোস। বুকের ভেতর
শুধু জমছে দীর্ঘশ্বাস। বুকের ভেতর জমা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বসে থাকলে চলবে না আমাদের,
কিছু একটা করতে হবে। ৪০ বছর, জীবনের এক বিশেষ মোড়, যে মোড়ে দাঁড়িয়ে
মানুষ পরিবর্তন করে জীবনের ধারা, পরিবর্তিত হয় নিজে, পরিবর্তন করে আশ-পাশ।
বাংলাদেশ এখন চল্লিশে দাঁড়িয়ে,আমরাও ! আমাদেরও সময় এখন নিজেদের
পরিবর্তিত করার, বাংলাদেশকে মনের মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে বিশ্বের কাছে
তুলে ধরার। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদেরও বিচার করতে হবে,
ফিরিয়ে আনতে হবে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক মূল্যবোধ। ফিরিয়ে
আনতে হবে নৈতিকতা, মানবিকতা। আত্মসমালোচনায় করতে হবে আত্মশুদ্ধি।
অপরের দোষ না ধরে নিজে কী করেছি, কী করছি তাই ভাবতে হবে, দেখতে হবে।
কেউ করছে না বলে, আমি করবো না কিংবা অন্যে খারাপ কাজ করছে বলে তা
আমাকেও করতে হবে, এই চিন্তা মন থেকে দূর করতে হবে। আমাদের মানুষ
হতে হবে ! সত্যিকারের মানুষ !
মেয়ে- বাবা, তোমার কথাগুলো শুনে, তোমাকে বাবা ডাকতে ইচ্ছা করছে আবার ।
বাবা, বাবা, আমার বাবা। আবার ভালো লাগছে তোমাকে । তুমি আমার মনের কথা
বলেছো ! আমার মনের মাঝে যে বাবা আছে, সেই বাবার মতো কথা বলেছো তুমি।
বাবা- মা, আমার, সোনামণি মা, আমি দেশের ভালো চাই, চাই দশের ভালো।
আমার মনে জোর আছে, কিন্তু দেহে বল নেই। আমি এখন আর যুদ্ধ করতে পারবো না।
কোন কাজে অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারবো না। আমি কিছুই পারবো না, শুধু দুঃখ
করতে পারবো !
মেয়ে- বাবা, তুমি সব পারবে। তুমি আমাদের পরামর্শ দিতে পারবে। পারবে আমাদের
সংগঠিত করে, আমাদের পাশে দাঁড়াতে, তুমি অনেক কিছু পারবে বাবা। তুমি, আমাদের,
তরুণদের একত্রিত করে দায়িত্বের কথা বলতে পারবে। তোমার, তোমাদের মতো মানুষের
প্রয়োজন এখনও ফুরিয়ে যায়নি, ফুরিয়ে যায়নি বাবা।
বাবা- ঠিক বলেছিস মা, তুই। এখন যে কাজ করতে হবে সে কাজ তো তরুণদেরই।
বাঙালি সাহসী জাতি, তরুণরা আরও সাহসী। বাঙালি তরুণেরাই তো একদিন ভাষার
জন্য লড়েছিলো, লড়েছিলো স্বাধীনতার জন্য। ভাষা, স্বাধীনতা দুটোই আমাদের করায়ত্ব,
দায়িত্ব শুধু রক্ষা করা। তোমরা, আবার প্রস্তুত হও। প্রয়োজনে আবার যুদ্ধ হবে।
এ যুদ্ধ কারও বিরুদ্ধে নয়, এ যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, এ যুদ্ধ নিজের সঙ্গে নিজের।
এ যুদ্ধ আত্মশুদ্ধির।
এ দেশ কারও একার নয়, স্বাধীনতার যুদ্ধ কেউ একা করেনি। কিংবা একাকী কোন
রাজনৈতিক দল করেনি। এ যুদ্ধ করেছে এ দেশের জনগণ। এ দেশ জনগণের। দেশের
ভালো, দশের ভালোর জন্য তোমরা এক হও। একটা ভালো কাজ করতে, মানুষের
জন্য একটা ভালো কাজ করতে একজন মানুষকে শুধু ত্যাগ স্বীকার করা
জানতে হয় আর কিছু নয় ! একটা ভালো কাজ করতে লাগে শুধু উদ্যোগ, আর
প্রেরণা। কাজ বাহবা পাওয়ার জন্য নয়, কাজ হবে শুধুই কাজের জন্য।
কাজ হবে মানুষের জন্য। তুমি, আমার মেয়ে , তোমাকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
তোমাদের স্লোগান হবে : এসো তরুণ এসো, এসো
নবীন এসো, তোমরা দেশকে ভালোবাসো ।
মেয়ে- আমিও এখন চল্লিশে ! তাই হবে, আমরা একসঙ্গে কাজ করার
অঙ্গীকারে একত্র হবো, শুধু তুমি আর মা আমার পাশে থাকো ।
সমাপ্ত :
