আমিই প্রথমে এসেছি // আফরোজা অদিতি

মিস্টার ফিলিপ তার ভৃত্য বঙকে বললেন, “আমার সাদা পাতিহাঁসগুলোকে সবুজ মাঠের পুকুরে নিয়ে যাও।”
মিসেস ফ্ল্যাপ তার ভৃত্য বিঙকে বললেন, “আমার ছাগলটিকে ঘাস খাওয়ানোর জন্য ঐ খোলা মাঠে নিয়ে যাও।”
বিঙ তার গ্রামের শেষ প্রান্তের খোলা মাঠে ছাগল এবং বঙ গ্রামের শেষ প্রান্তের পুকুরে সারি বাঁধা পাতিহাঁসগুলো নিয়ে রওয়ানা হলো। ঐ পুকুর এবং খোলা মাঠে যাওয়ার জন্য সিড়ি বেয়ে একটি দেয়াল পার হতে হয়। একই সময়ে ঐ সিড়ির কাছে বিঙ এবং বঙ-এর দেখা হলো। বঙ বুক চিতিয়ে বিঙের আগেই দেয়াল পার হওয়ার জন্য সিড়ির কাছে দাঁড়ালো। বিঙ-ও বুক ভরে নিঃশ্বাস টেনে বঙের আগেই দেয়াল পার হওয়ার জন্য ঐ সিড়ির কাছে এগিয়ে এলো।
“আমি প্রথমে এসেছি।” বঙ বলল।
“না তুমি প্রথমে আসোনি, আমি এসেছি।” বিঙ বলল।
ওর কথা শুনে বঙ বলল,“এটা কোন ব্যাপারই না, তুমি সবসময়ই কাউকে না কাউকে বলো তুমি প্রথমে এসেছ।”
বঙের কথা শুনে বিঙ বলল, “এমন কোন লোক নাই যে তোমার কনুইয়ের গুঁতো খায় নাই!”
“তুমি খুব হিংসুক একজন মানুষ” বলল বঙ। বঙ আরও বলল, “আমি পুলিশ,মি. প্লড-এর কাছে তোমার নামে রিপোর্ট করবো।”
“ঠিক আছে, যাও এবং আমার নামে রিপোর্ট করো, আমি এই পার হতে যাচ্ছি।” বিঙ চট-জলদি উত্তর দিলো।
“তুমি নিজেকে খুব চালাক ভাবো, যা তুমি না?” বঙ ক্রুদ্ধকন্ঠে বলল। “আমাকে যেতে দাও!”
“আমি আগে যাবো।” কথা বলেই বিঙ সিড়ির ধাপে তার পা উঠিয়ে দিলো। বঙ-ও তাই করলো। তারপর তারা উভয়েই সিড়ির ওপরে বসে রইলো! তারা সিড়ি পার হতে পারলো না কারণ যতোক্ষণ না দুজনের একজন ওখান থেকে সরে না যাবে ততোক্ষণ কেউই সেখান থেকে নড়তে পারবে না, পার হতেও পারবে না। দুজন দুজনের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
“আমি তোমার কানের ওপর ঘুঁষি দিবো।” শেষমেষ রেগে বলল বঙ।
“চেষ্টা করো,” বিঙ-ও ক্রুদ্ধভাবে বলল। আরও বলল “আমিও তোমাকে ঐ রকম ঘুঁষিই দিবো যে তুমি পড়ে যাবে আর সাহায্যের জন্যে চিৎকার করবে!”
তারা দুজনের কেউই সিড়িটি পার হতে না পেরে মুখ গোমড়া করে সেখানে বসে রইলো। দুজনেই অনমনীয়। তারা দুজনই বিষণ্নভাবে বসে রইলো এবং কেউ কাউকে আঘাত করলো না।
ওখানে বসে থাকতে থাকতে বঙ বলল, “আমি এখানে পুরোদিন বসে থাকলেও আগে যেতে দিবো না তোমাকে! সেজন্য এই কথাটা তুমি তোমার মাথায় ঢুকিয়ে নিয়ে পাইপ ধরাও এবং ধুমপান করো।”
“আমি ধুমপান করি না। যদিও আমি ধুমপান করতাম তবুও তোমার এই কথা আমি মাথায় ঢুকাতাম না! এই গ্রামের সকলেই জানে যে তুমি একটা নির্বোধ মানুষ!”
“হো, সকলেই জানে কার দাদি পড়তে পারে না!” বিঙের কথায় চিৎকার করে বলল বঙ।
“তোমার! এবং কার বাবা বাড়ি বানানোর চেষ্টা করেছিল এবং প্রথমেই ছাদ দিয়েছিল! হো হো এটা কি তামাশা নয়!” তৎক্ষণাৎ বলল বিঙ।
“ জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা বানিয়ে বলছো তুমি! এমন কথা বলার যোগ্য নও তুমি।” বলল বঙ।
“ এমন কথা শোনারও যোগ্য নও তুমি!” বিঙ বলল। তারপর তারা কি করবে কি বলবে ভেবে না পেয়ে চুপচাপ বসে রইলো! তাদের কথা নয় শুধু তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
তারা তাদের হাঁস এবং ছাগলের কথা ভুলে গেল। হাঁসগুলো ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে ঘুরতে গ্রামের পুকুর পেলো। তারা সেখানে মনের সুখে সাঁতার কাটতে শুরু করলো।
ছাগলটিও সেই একইভাবে একই গ্রামে সুন্দর ঘাসজমি পেয়ে ঘাস খেতে শুরু করলে।

সেখানে মি. স্ট্যাম্প-অ্যাবাউট নামে এক বৃদ্ধ এলেন। তিনি খুব বদ-মেজাজী বৃদ্ধ, সবাই জানে। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন যে দুই ভৃত্য দেয়াল পার হওয়ার সিড়িতে পাশাপাশি বসে আছে। ওদের দেখে তিনি বললেন,“এই তোমরা এখানে কী করছো, এভাবে সময় নষ্ট করছো কেন? নিচে নেমে এসে আমাকে বলো।”
বিঙ অথবা বঙ কেউই নড়লো না! দুজনেই শঙ্কিত ছিল একজন নড়লেই আর একজন সিড়ি বেয়ে উঠে চলে যাবে। সেই জন্য তারা নড়াচড়া না করে বসে রইলো এবং মি. স্ট্যাম্প-অ্যাবাউটের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলো।
মি. অ্যাবাউট খুব রেগে গেলেন এবং বললেন, “তোমরা কি অন্ধ এবং বধির? সিড়ি থেকে নামো এবং কি করছো আমাকে বলো!”
“তুমি প্রথমে বিঙ ” বঙ বলল।
“না তুমি নামো আগে।” বিঙ বলল।
“তুমি আগে নামবে পরে আমি!” বঙ শান্তভাবে বলল।
“এ সব কী!” মি. অ্যাবাউট চিৎকার করে বললেন এবং মাটিতে পা ঠুকলেন। তারপর বললেন, “এখনই সিড়ি থেকে নামো। ওখানে ঐভাবে বসে থেকে মানুষের যাতায়াত বন্ধ করেছো! এরকম কখনও দেখিনি আমি!”
“ঠিকই বলেছ- তুমি দেখো” বঙ শুরু করলো “এইটা এই রকম যে আমি এখানে প্রথম এসেছি এবং-”
“ কে আগে কে পরে আমি জানতে চাই না!” মি. স্ট্যাম্প-অ্যাবাউটের মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বললেন,“বঙ তুমি শোন – তুমিও বিঙ এই কথাটা শোন! আমাকে যেতে দাও!” কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বঙকে জোরে ঝাঁকুনি দিলেন তিনি, ঝাঁকুনি খেয়ে নিচে পড়ে গেল বঙ। তখন সে বিঙ-এর মুখে ধাক্কা দিলেন, বিঙ-ও সিড়ি থেকে নিচে পড়ে গেল। তারা মাটিতে পড়ে মাথায় ভীষণ আঘাত পেয়ে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলো।
মি. স্ট্যাম্প-অ্যাবাউট সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন বিঙ ও বঙ এর চোখের সামনে দিয়ে মাঠের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
“আমি ব্যথা পেয়েছি! দেখো কি ভয়ানক কালশিটে দাগ!” বঙ কেঁদে ফেলল।
“আমি নিশ্চিত যে, আমার পা ভেঙে গেছে!” বিঙ বলল এবং দাঁড়াতে চেষ্টা করলো। সে দূর্বলভাবে তার পা ফেলল! তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখলো।
“আমার ছাগল কোথায়?” আশেপাশে দেখতে দেখতে বলল বিঙ।
“হাঁসগুলো কোথায়?” বঙ-ও বলল। তার চোখ এমন বড় হয়ে গেল যে মনে হলো তার চোখের মণি কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে।
“তারা চলে গেছে!” বিঙ বলল। “আমি মিসেস ফ্ল্যাপকে কি করে বলবো যে আমি ছাগল হারিয়ে ফেলেছি!”
“আমিও কি তাই বলবো যখন মি. ফিলিপ হাঁস চাইবে!” হতাশায় কাতর হলো বঙ। আরও বলল, “ওহ্‌ কেন আমরা এই রকম শিশুসুলভ আচরণ করছিলাম।”
তারা হতাশ চিত্তে মি. ফিলিপ এবং মিসেস ফ্ল্যাপের কাছে গেল। ওদের দেখেই মিসেস ফ্ল্যাপ চিৎকার করে বললেন,“আমার ছাগল কোথায়?” মি. ফিলিপও চিৎকার করে বললেন,“আমার হাঁসগুলো কোথায়? যেখান থেকে পারো তাদের খুঁজে আনো,বঙ- যতোক্ষণ না তাদের খুঁজে না আনতে পারছো ততোক্ষণ একদানা খাবারও পাবে না তুমি।”
বিঙ আর বঙ দুজনেই ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর ছিল। সেই অবস’ায় তারা এখানে খুঁজলো, খুঁজলো ওখানে। তারা হাঁস এবং ছাগলের জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটলো। অবশেষে সন্ধ্যায় গ্রামের পুকুরে সাঁতাররত হাঁসগুলোকে দেখতে পেলো। যেখানে হাঁসগুলোকে পেলো সেই স’ান সিড়ি থেকে এক মিনিটেরও হাঁটা পথ নয়! বিঙ-ও সেভাবে খোলা মাঠের মধ্যে ছাগলটিকে পেলো, সেই জায়গাটাও সিড়ি থেকে এক মিনিটের হাঁটা পথ-ও নয়!
বঙ হাঁসগুলো নিলো। বিঙ-ও ছাগলটিকে ডাকলো। তারা বাড়ির পথ ধরলো- এবং পুনরায় সেই সিড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। বঙ খুব শান্তভাবে বিঙকে বলল “বিঙ, তুমি আগে!”
“না না- আমার খুব শিক্ষা হয়েছে, আমি আগে যাবো না, তুমি যাও! বিঙ বলল।
“প্রিয় বিঙ,আমি আর স্বপ্নেও কখনও প্রথমে সিড়ি পার হওয়ার কথা ভাববো না!” বঙ বলল।
“তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো, আমিও কখনও তোমার থেকে আগে যাওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি করবো না।” বিঙ বলল।
একটা রাগতকণ্ঠে মনোযোগ নষ্ট হলো ওদের। সে রাগতকণ্ঠ হলো মি. স্ট্যাম্প-অ্যাবাউটের, যিনি তার বোনের সঙ্গে দেখা করে ফিরছিলেন। “কি! এখনও তোমরা এখানে! একটু অপেক্ষা করো, যতোক্ষণ পর্যন্ত না তোমাদের ভোঁতা মাথা খুলে যায় ততোক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদের মাথা ঠুকতেই থাকবো! ঠুকতেই থাকবো! একটু অপেক্ষা করো।”
কিন্তু বিঙ আর বঙ আর অপেক্ষা করলো না! তারা দুজনেই একই সঙ্গে সিড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলো,ভারসাম্য হারালো আর মাটিতে পড়ে ব্যথা পেয়ে চিৎকার করে আবার নিজেরাই উঠে দাঁড়ালো! তারপর দুইজন দুইদিকে দৌড় দিলো।
হাঁসেরা বিস্ময়াভূত হয়ে প্যাক প্যাক শব্দ করতে করতে বঙের পেছন পেছন যেতে লাগলো এবং ছাগলটি বিঙের পেছনে গোল হয়ে লাফাতে লাফাতে ছুটলো! কী জুটি!
“হাবা-গঙ্গারাম!” মি. স্ট্যাম্প-অ্যবাউট রাগে ফেটে পড়লেন।
“গোবরমাথা! গাধা! ঘোড়া! সবই তারা!”

এবং তা সত্যি, আমি ঠিক ভাবছি, তোমরা?

[ “আমি প্রথম এসেছি”, একটি অনুবাদ গল্প। আই ওয়াজ হেয়ার ফার্স্ট, এই গল্পের মূল লেখক এনিড ম্যারি ব্লাইটন (১১ আগস্ট ১৮৯৭- ২৮ নভেম্বর ১৯৬৮)।].

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615