“এতো ধোঁয়ায় ভরিয়ে রেখেছো কেনো ঘর। আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। একটু কম খেতেও তো পারো। একটু কম খেলে আমি খুশি হতাম। আবার তোমাকেও দেখতে পেতাম।” কথাগুলো বলেই সখি ঘরের জানালা খুলে দেয়। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেছে। সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারে না সখি। বমি পায়।
একটা ছোটো ঘর, যে-ঘরের জানালাটা এই মাত্র খোলা হলো। আর যাকে সখি কথাগুলো বললো সে সখির বর। এ ঘর, এ বর সেই ছোটোবেলার খেলাঘরের মতো। এ ঘরে কোনো দুঃখ নেই, কান্না নেই, আছে শুধু হাসি, গান আর সুখ। প্রতিদিন এখানে চাঁদ-সূর্য একসঙ্গে খেলা করে। এখানে ধূলাবালির রান্না হয় না, রান্না হয় সত্যিকারের আগুনে-পানিতে সত্যিকারের ভাত-তরকারি। এ জীবন স্বপ্নের মতো, কল্পনার মতো কিন’ সত্য। এখানে সখি আর সখির বর বাঁশী দুজনে ভীষণ খুশি। এখানে কখনও বিদ্রোহের ঝড় ওঠে না। শুধু অভিমানে মিষ্টি পিয়ানোর সুরমূর্ছনায় আকাশ আলোকিত করে পূর্ণিমার চাঁদ জোছনা ঝরায়। এখানে ষড়ঋতু খেলা নেই আছে শুধু বর্ষা আর বসন্তের আসা-যাওয়া। সখি জানালা খুলতেই দেখতে পায় প্রিয়ার চোখের মতো স্বপ্নময় আকাশ। আকাশের গায়ে উড়ছে একঝাঁক পাখি। সখি আকাশে ওড়া পাখির দিকে চেয়ে থাকে। ওর মনেও পাখির মতো উড়ে যেতে ইচ্ছা জাগে। ওর মন উড়েও যায় ঐ পাখিগুলোর কাছাকাছি। খুব আনমনা খুব চিন্তাকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ স্বচ্ছ দিঘিতে ভাসা হাঁসের প্যাক প্যাক ডাকে সম্বিত ফিরে পায়।
কি সুন্দর হাঁস!
এ্যাই এ্যাই শোনো না। দেখে যাও। স্বামীকে ডেকে সখি আকাশের পাখি আর দিঘিতে ভাসা হাঁস দেখায়। এগুলো অতিথি হাঁস। বাঁশী পেছন থেকে সখিকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘনচুলের অরণ্যে নাক ডুবিয়ে হাঁসের খেলা দেখে। সখিদের বাড়ির কিছুটা দূরেই ওদের ধানক্ষেত। বাঁশী সারাদিন জমিতে কাজ করে। বাড়ি ফেরে সন্ধ্যায়। তারপর এই ছোটো ঘরেই সময় কাটায়। বই পড়ে, কবিতা পড়ে, কবিতা লেখে। নাটকও লেখে বাঁশী।
সখি নিজের হাতে সংসারের কাজ করে। সব্জিবাগান, ফুলের বাগান, রান্নাবান্না সব-সব একা হাতেই করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্পস্বল্প সেজেও নেয়। হাতে থাকে রেশমি চুড়ি। যার রিনিকিঝিনিকি বাজনায় স্বামীর ঘুম ভাঙাতে সখির ভীষণ ভালো লাগে। সখির গহনার মধ্যে পছন্দ গলায় ধান তাবিজ, কানে মাক্ড়ি। সখির স্বামীরও তাই পছন্দ। বিকেলে কাজকর্ম সেরে হাতমুখ ধুয়ে কাপড় ছেড়ে কপালে একটা টিপ দেয়। কারণ স্বামীর বড়ো গোল লাল টিপ খুব পছন্দ।
সখির স্বামী বাঁশী এম.এ পাশ করেছে কিন’ গ্রামেই চাষবাস দেখাশোনা করে, নিজেই ট্রাক্টর চালায়। সারাদিন মাঠে কাজকর্ম করে বিকেলে ঘরে ফিরে দু’জনে বসে থাকে মুখোমুখি। গল্প করে, গান করে, কবিতা পড়ে। কখনও রবীন্দ্র্রনাথ কখনও নজরুল কখনও জীবনানন্দ, কখনও স্বরচিত।
দু’জনের সুখের সংসার।
সব সুখ নিয়ে প্রতিদিন প্রভাত আসে সখি-বাঁশীর খেলাঘরে। আজকের সকালে সখি পরেছে সবুজ ডুরে শাড়ি। চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে বাঁশীর ঘুম ভাঙিয়ে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিলো।
চা খেতে খেতে বাঁশী বলে, ‘বউ, আজ কোনো কাজ নেই। সংসার থাকবে অগোছালো, রান্না হবে না, হাঁটাহাঁটি হবে না, ছোটাছুটি হবে না, আজ শুধুই দু’জনে মুখোমুখি, গভীর সুখে সুখী।’ বাঁশীর কথা শুনে সখি কৃত্রিম ঝংকার দেয়। ‘আহা, খেতে হবে না বুঝি। বলি-ও আমার রাজকুমার ভাতটা কি আকাশ পরী না আলাদীনের দৈত্য এসে দিয়ে যাবে।’
বাঁশী গম্ভীর কণ্ঠে বলে, ‘আজ খাওয়া নেই। আজ শুধু আমার চোখে চোখ রাখা, হৃদয়ে হৃদয়, হাতের স্পর্শে হাত, দেখবে খিদে নেই। পৃথিবী তার অমৃতভাণ্ডার শূন্য করে ঢেলে দেবে আমাদের মাঝে। খিদে! ও বাবাজি আসবেই না।’
‘হুঁ। বললেই হলো।’ মুখ ফিরিয়ে সখি বসতেই বাঁশী জোর করে দু’হাতে ওর মুখ তুলে ধরে বলে, ‘দেখবে, দেখবে। এই দেখো।’
বাঁশীর কাজ দেখে সখি লজ্জা পায়।
‘কি যে না তুমি!’ এরপর আর কথা হয় না। দু’জন চুপচাপ বসে থাকে। ওদের চারপাশে শুধুই নিরবতা, শুধুই হাওয়ার শব্দ। আর কোনো শব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর সখি বায়না ধরলো-কবিতা শোনাও।
‘এখন না সোনা বউ।’ বাঁশী বলে।
‘না, না এখনই।’ অভিমানী কণ্ঠে বলে সখি আর এদিক ওদিক ছেলেমানুষের মতো মাথা নাড়ে। ওর আহ্লাদে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে স্বামী তার বালিকা বধূকে।
শোনায় কবিতা :
তুমি আমার চেনা বাঁশীর সুর
আমার হৃদ কাননের মল্লিকা, আমার চেতনার
উজ্জ্বল পল্লবী, তুমি প্রভাতের আলোর মতো
স্বচ্ছ সুন্দর তুমি সত্য!
তুমি আমার নিরব হৃদয়ে
বিভোর বাসনার করতালি, আমার উৎকলিত
সোহাগ মাধুরী তুমি আমার বিধৃত কামনা,
আমার সুললিত সুমধুর সুর যুতবিশ্রুত বাণী,
তুমি আমার বিপুল বিশ্বের কালজয়ী উপন্যাস।
কবিতা শেষ করে বউকে বলে, ‘কি হলো, খুশি তো?’ সখি ফিক করে হেসে ফেলে, ‘হ্যাঁ মশাই হাাঁ।’ এরপর ওরা ঘর থেকে বের হয়। পায়ে চলা পথ বেয়ে ধান জমির আইলে এসে দাঁড়ায়। বাতাসে সবুজ ধানের মাতামাতি দেখে বাগানে এসে বাঁধানো বেঞ্চে বসে। বাগানে নানারকম ফুলের গাছ। ফুলও ধরেছে। ফুলে ফুলে উড়ছে প্রজাপতি, ফড়িং।
‘ঐ ফুলে বসা প্রজাপতিটা দাও না। আমি নেবো।’ সখি বায়না করে।
‘এই, পাগলি, ওটা কি ধরা যাবে। নাকি আমি ধরতে পারবো। তাছাড়া ওদের ধরতে নেই। কি হবে ওদের ধরে। থাক না ওরা ওদের মতো সুখে। প্রকৃতির সন্তান ওরা। বাঁশীর কথা শুনে তার সোহাগী বউয়ের অভিমান বেড়ে যায়।
‘না, না, আমাকে ধরে দাও। দিতেই হবে।’
‘আবার ছেলেমানুষি করিস বউ। এতো ছেলেমানুষি করে না লক্ষ্মী বউ। তাহলে কপালে দুঃখ থাকে।’
‘থাক দুঃখ। আমাকে দাও।’ বউএর আবদার মেটাতে বাঁশী একবার, দুইবার চেষ্টা করলো কিন্তু প্রজাপতিটা ভীষণ চালাক, ধরা দিলো না। বাগান থেকে বের হয়ে পথ চলতে শুরু করে ওরা। আজ ওরা ঠিক করেছে অনেক দূর যাবে। ওরা পথ হাঁটছে। ওদের এই গ্রামের শেষসীমায় একটা ফলের বাগান আছে। সরকারি খাস বাগান। সখি শুনেছে আগে নাকি কোনো এক হিন্দু জমিদারের ছিলো। সে ভদ্রলোক মারা গেছে। মারা যাওয়ার পর থেকে ওটা সরকারের। (চলবে)
