সীমা// আফরোজা অদিতি (১ম অংশ)

২০১৫ সালের এক সকাল। সীমা বসে আছে। সামনে চায়ের ধোঁয়া ওঠা কাপ, খবরের কাগজ। চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ পড়া সীমার অভ্যাস। কাগজের প্রতিটি লাইন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে সীমা। আগে কাগজ ভালোভাবে পড়তো না। এখন না পড়লে ভাল লাগে না। মনে হয় অনেক খবরই চোখের আাড়লে থেকে যাচ্ছে ওর। ১৯৫৭ সালে মার্চে ওর জন্ম। পঞ্চাশ পার হয়ে গেলেও ওর ভেতরে টগবগ করছে তারুণ্য। প্রাণবন্ত তারুণ্যে উচ্ছ্বল। খলবল করে হাসিতে, কথায়। নুতন পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে নিতেও পরে চটপট। গত শতাব্দির কিছু ভয়াবহতা ওকে মাঝে মধ্যে আচ্ছন্ন বিহ্বল করে রাখলেও এ পর্যন্ত নতুনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ওর কোন অসুবিধাই হয়নি। বর্তমানে অনেক সম্পত্তির মালিক। স্বামী নেই, নেই সন্তান। আছে শুধু মৃত ছেলের বউ, সিনথিয়া। স্বামী মারা গেছে দশ বছর আর ছেলে পাঁচ বছর। মাঝে মধ্যে ভীষণ একা লাগে, নিঃস্‌ঙ্গ বোধ করেন তিনি। ওর মনে হয়   হোক, মেয়ে হোক” দুই সন্তানই যথেষ্ট স্লোগানে বিশ্বাস করে ওদের একটি সন্তান নেওয়া ঠিক হয়নি তখন্‌ দুই সন্তানে বিশ্বাস করলেও স্বামীর ইচ্ছায় এক সন্তানই নিয়েছিল। ওর ইচ্ছা ছিল তিন চারটে না হোক দুটিই হোক। কিন্তু স্বামী তাঁর সিদ্ধান্তে অনঢ়। তরুণ স্বামী যদি অনঢ় না থাকতো তবে তিন চারটে ছেলেমেয়ে নিলে এখন তো ঘর এমন শূন্য হতো না।

সীমা তখন স্বামী কথার ওপর কথা বলতে পারতো না, সে সাহসও ছিল না। তাছাড়া সে সময় ওর স্বামীর কথাই ঠিক বলে মনে হয়েছে। আজ বুঝছে ঠিক হয়নি। এখন হরহামেশাই মনে হয় একটা যদি ছোট শিশু থাকতো এই ঘরে তবে খুব ভালো হতো; ওর ভালো লাগতো। শিশুটি ছোট ছোট পায়ে হাঁটতো, খেলতো, আধো আধো বোলে কথা বলতো, হাসতো। সীমা কল্পানয় ছোট একটি শিশুকে ঘরময় দৌঁড়াতে দেখতে পায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সীমা। কিন্তু এখন ভেবে কী হবে।

এই মুহূর্তে ছোটো শিশুর জন্য হাহাকার করে মন। বিংশ শতাব্দির সীমার মন কতো কিছুর জন্যই তো হাহাকার করে, ম্লান হয়, উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ব্যাকুল হয় তবুও মানিয়ে নেয়। সীমার মন অতীতে চলে যায়। ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেনি, সাতচল্লিশের দেশভাগ দেখেনি, শুনেছে। কিন্তু দেখেছে ১৯৭১-এর যুদ্ধ। অসহ্য ভয়াবহতা। নৈরাজ্য দুঃখ বেদনা আর ভয়ের সেসব দিন। গণহত্যা, নারী-নির্যাতন ছিল সে সময় এখনকার বাংলাদেশে। তখন এই দেশের নাম ছিল পূর্বপাকিস্তান; পাকিস্তানের একটি প্রদেশ। হাজার মাইল ব্যবধানে মাঝখানে ভারত রেখে হয়েছিল একটি দেশ পাকিস্তান।  এরপর দেখেছে স্বাধীনতার আনন্দ। কিন্তু তারপর! তারপরে দেখেছে অভ্যূত্থান, দেখেছে হরতাল, খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাস। অকারণ ফতোয়ায় কষ্ট পেতে দেখেছে নারী-পুরুষ-শিশু; অসহায় সাধারণ মানুষকে, দেখেছে চাঁদাবাজি, মিটিং-মিছিল, ভোট, দলবদল, নাম বদল। উচ্ছেদ, পূনর্বাসন বন্যার কষ্ট দেখেছে। কিন্তু দিন পাল্টেছে। পাল্টে গেছে মানুষের চিন্তাধারা, চেতনার বিকাশ হয়েছে। মানুষ এগিয়েছে বোধ-বুদ্ধি-চিন্তাধারায়।  সীমা নিজেকে দিয়েই বিচার করে। ওর এখন মাঝে মধ্যেই মনের ভেতর একটা সুপ্ত ইচ্ছা জেগে ওঠে, কোন একজন প্রথিতযশা কবি কিংবা বিজ্ঞানী অথবা একজন সমাজসেবী ভালো ব্যক্তিত্বের সিমেন নিয়ে পুত্রবধু সিনথিয়ার গর্ভে স্থাপন করে একজন সন্তান পেতে। সেই সন্তান ওরই পরিবারে লালিত পালিত হবে, বেড়ে উঠবে ওরই ছায়ায় ছায়ায়। ওর এই বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকার ওকেই দিয়ে যাবে। সম্পত্তি বউকে দিতে পারে কিন্তু সীমা ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না সিনথিয়াকে। ওর মনে হয় বউ সম্পত্তি পেলে ওকে একা ফেলে চলে যাবে। বউকে ও বঞ্চিত করবে তা নয়, সম্পত্তি দেবে তবে সে সম্পত্তির মালিক হবে মৃত্যুর পর। যদিও সিনথিয়া ওর সঙ্গে প্রয়োজনের বেশী একটা কথাও বলে না তবুও তো, চায়ের টেবিলে, খাওয়ার টেবিলে এসে সঙ্গে বসছে। এতো বড়ো বাড়িতে  একজন জ্যান্ত মানুষ আছে ভাবতেও ওর ভালো লাগে। সম্পত্তি পেলে এই একসঙ্গে থাকাটুকুও তো না থাকতে পারে। রোবটদের সঙ্গে কতো আর সময় কাটানো যায়। ওরা তো আর প্রোগ্রাম ছাড়া একটা কথা বা কাজ করতে পারে না তাছাড়া যন্ত্রের মাথা কি আর ওর বিংশ শতাব্দির আত্মাকে শান্তি দিতে পারে? পারে না, পারবে না। সীমা  ওর সুপ্ত ইচ্ছাটার কথা চিন্তা করতে করতে হাত বাড়ায় চায়ের কাপে। না ঠাণ্ডা। রোবট কিটকিট কে আর এক কাপ চা দিতে বেল রিডিং গ্লাসের জন্য হাত বাড়ায়। কিটকিট ওর হাতে রিডিং গ্লাস তুলে দেয় সঙ্গে খবরের কাগজ্‌। কাগজ পড়তে শুরু করে সীমা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজ পাড়ার এই অভ্যেস রপ্ত করেছে ওর প্রিয় এক কবির কথায়। বড় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল সেদিন। তা  কতো বছর আগে হবে। মনে পড়ে সীমার।

১৯৯৯এর শেষের দিকে। রাত দশটা। ফোন বেজে উঠতেই রিসিভার তোলে সীমা। ওপাশ থেকে ভেসে আসে কবি কণ্ঠ।

কি পত্রিকা রাখেন।

পত্রিকার নাম বলতেই একটা খবর পড়তে বলে। সীমা সবটুকু না পড়েই বলেছিল এটা তো সত্যি। তাই শুনে কবি বলেছিলেন আপনি খবরটি ভালো করে পড়েননি। সবটুকু ভালো করে পড়লে আর এই মন্তব্য করতেন না। না পড়ে কোন মন্তব্য করা ঠিক নয়। যখন পড়বেন মনযোগ দিয়ে যত্নসহকারে পড়বেন। আর খবরের কাগজ তো ভালোভাবে পড়া দরকার, খবরের পেছনের খবর বুঝতে পারার জন্য। খবরের ওপর আরো কিছু কথা বলেছিলেন আজ তা আর ভালভাবে মনে নেই।

সীমার মন অতীত দখল করে নিচ্ছে একটু একটু করে। ওর নষ্টালজিয়ায় ধরছে বুঝতে পেরে নিজেকে একবার ঝাঁকিয়ে তোলে বোতলে ওষুধ ঝাঁকানোর মতো, ওটা ওর অভ্যাস। এই রকম করলেই বর্তমানে ফিরে আসে। সীমা, খবরের কাগজে চোখ রাখে আবার। কাগজের মাথার ওপর লেখা একুশ শতকের দূর্দান্ত দৈনিক, প্রিয় শতাব্দি। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ওর প্রিয় কবি। এই কারণেই আজও এই কাগজটা ওর অনেকখানি জায়গা দখল করে আছে। এই পৃথিবীর রূপ পাল্টেছে, দিন বদলেছে। সীমাও বদলে নিয়েছে নিজেকে তবুও কিছু কিছু জায়গায় ও রক্ষণশীল থেকেই গেছে। কিটকিট চা রেখে গেছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতেই কাগজ পড়ছে। দারুন খবর। চোখ আটকে যায় খবরে। সিমেন ব্যাংক। এখানে সিমেন বিক্রয় করা হয়। প্রি-অ্যাকলিম্পিয়ার চিকিৎসা ছাড়াও প্রথিতযশা বিজ্ঞানী, কবি সাহিত্যিকদের সিমেন, মা হওয়ার ইচ্ছা যেসব নারীদের ইচ্ছা পুরণের জন্য জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। সীমা দুই হাত ওপরে তুলে তরুণের মতো চিৎকার করে ওঠে,  হুররে।’

ম্যাম অতো জোরে চিৎকার করো না। তোমার বুকে তো পেস মেকার।’

থাক না বউ আজ একটা ভালো খবর চোখে পড়েছে।’

কি খবর।’

পুত্রবধু সিনথিয়ার কন্ঠে আগ্রহ। ওর আগ্রহ দেখে অবাক সীমা।

সিনথিয়ার আজ হলো কি। অসীম মারা যাওয়ার পর তো কথাই বলে না সিনথিয়া। সীমা আজ খুশী হয় সিনথিয়ার ব্যবহারে। ওকে কাছে ডাকে। পাশে বসতে বলে। তারপর বলে, দেখ সিনথিয়া, দেখে যাও।’ যা কখনও করে না সিনথিয়া তাই করে। এসে শাশুড়ির পাশে এসে বসে আর খবরটা পড়ে।

এই খবর দিয়ে কি হবে?

কি হবে! ওখানে তোমাকে নিয়ে যাবো।’

কেন?

বুঝতে পারছো না? রোবট নয়, ক্লোনিং নয় তোমারই গর্ভে বেড়ে উঠবে একজন প্রথিতযশা কবি বা বিজ্ঞানীর নিষিক্ত ডিম্বাণু| আস্তে আস্তে ভ্রূণ হবে। ক্রমশ জন্ম নেবে একজন মানবশিশু।’ সিনথিয়া কোন কথা বলে না। (চলবে)

afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615