সীমা//আফরোজা অদিতি (শেষাংশ)

সীমা জানালা দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকায়। দেখে অতীতের ছায়া। এমনভাবে কথা বলে যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে সে কথা।

জানো আমাদের সময় দেখেছি মেয়েদের বিনা দোষে শাস্তি পেতে। অনেক মেয়ের স্বামী শুধুমাত্র অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলার দোষে ডিভোর্স দিয়েছে। কোন মেয়ে ধর্ষিত হলে সেই ধর্ষিত মেয়েটি সমাজের চোখে অপাংক্তেয় হয়েছে কোন দোষ না করেও। আর কোন মেয়ে যদি স্বামী ছাড়া অন্য কোন পুরুষের সঙ্গী হতো তা হলে তো কথাই নেই। তার জন্য ছিল দোররা। কিন্তু আজ আর সে দিন নেই। আজ মেয়েরা কতো স্বচ্ছন্দ, স্বাভাবিক। অবশ্য সবই যে স্বচ্ছন্দ, স্বাভাবিক তা বলবো না। তবে অনেক সহজ।’

এতো কথা শুনতে শুনতে একটা সুক্ষ্ম কালো ছায়া ভেসে যায় সিনথিয়ার মুখের ওপর দিয়ে। সম্পত্তি বেহাত হওয়ার ভয়।

না, না, তা কখনই হতে পারে না। এই বিশাল সম্পত্তির জন্যই ওর এখানে থাকা, তা না হলে তো এখানে থাকতোই না। ওর ভালোবাসার মানুষ, অসীম কী দোষ করেছিল। সিনথিয়া শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলে। কথা বলে কাঁধে মুখ রেখে, মেপেমেপে আহলাদী ঢঙে।  শাশুড়ীকে চটাতে রাজী নয় সে।

আচ্ছা ম্যাম, ধর আমি যদি সিমেন প্রতিস্থাপনে রাজী না হই, তাহলে?

তুমি রাজী হবে না! কেন? কণ্ঠে বিস্ময় ও দুঃখ একসঙ্গে প্রকাশ পায়। সেই বিস্ময় ও দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তার আকাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়ার ব্যাকুলতা ঝরে পড়ছে। সিনথিয়া লক্ষ্য করলো কণ্ঠ দুঃখ ভারাক্রান্ত হলেও কথায় ব্যাকুলতা থাকলেও সবকিছুর সঙ্গে বিশেষ করে কথা বলার ঢঙে দৃঢ়তা জড়িয়ে আছে।

দেখ বউমা, আমরা বিংশ শতাব্দির মানুষ। আমাদের মনের সুপ্ত ইচ্ছা নাতি-নাতনীকে নেড়েচেড়ে মানুষ করা। তেল কাজল পরিয়ে দেয়া, স্নান করানো-আমার দাদীকে যেমন দেখেছি তেমনি ইচ্ছা আমার। আমি তো অমর নই। সীমা কথা বলেই চলে, তাছাড়া তোমাকে তো কিছুই করতে হবে না। আমার টাকা আছে, টাকায় সব হবে। এখন সব কিছুই উন্নত। যাদের টাকা নেই তাদের কথা আলাদা।’ কথা বলতে বলতে সিনথিয়ার হাত ধরে সামনে এনে চেয়ারে বসিয়ে বলে, তুমি কি সন্তান ধারণের কষ্টের কথা ভাবছো?

সিনথিয়া কথা বলে না। ওর মুখে দিকে তাকিয়ে আবার বলে সীমা,সন্তান ধারণ, প্রসবের একটু কষ্ট এসব তো থাকবেই। এটা প্রাকৃতিক। হবেই।  কোন বিজ্ঞান একে একবারে কষ্টশূন্য করতে পারবে না। তাবে কমিয়ে দিতে পারবে।’

সিনথিয়া তবুও কথা বলে না।

কি হলো কথা বলছো না কেন? অন্যের সিমেন নিবে না তুমি? তোমার দোষ হবে নষ্ট হবে তুমি এই ভাবছো।’ মাথা নাড়ে সিনথিয়া। সেদিক দেখে না সীমা। না দেখেই বলে, দেখ সিন, এতে তো তোমার দোষ নেই, আমি তোমাকে বলছি। দোষ যদি কিছু হয়েই থাকে আমারই হবে। আর নষ্টও হবে না তুমি। এখন এসব নিয়ে কেউ ভাবে না। আগের দিন তো নেই। তুমিই বলো আগের মতো কি সব আছে? নেই। এখন ভিখিরি নেই, বস্তি নেই। জনসংখ্যা কমে গেছে। কাজ পেয়েছে সকলে। কেউ এখন আর না খেয়ে থাকে না। মেয়েরাও বন্দী জীবন যাপন করে না।’ সীমাকে আবার নষ্টালজিয়া আক্রমণ করে।

১৯৯৯ সালে কমলাপুর ব্রিজ দিয়ে চলাফেরা করতো সময় বাঁচানোর জন্য। ও বিশ্বাস করে যে মানুষ সময়ের দাম দিতে পারে না সে জীবনে উন্নতি করতে পারে না। ব্রিজে তখন অনেক ভিখিরি ছিল। বেশীর ভাগ অন্ধ কিংবা ল্যাংড়া। এখন অন্ধদের সাহায্যে হোম তৈরী হয়েছে। প্রবীণদের জন্যও। প্রতিবন্ধীদের জন্য আজ হোম আছে। কাগজ রেখে ওঠে দাঁড়ায় সীমা।

কোথাও যাচ্ছেন ম্যাম।’

হ্যাঁ। একটু খোঁজখবর করে আসি। তুমি নিজেকে তৈরী করে নাও।’ সিনথিয়ার রাগ হল। শাশুড়ির এই কথা বলার ঢং ওর চেনা। নড়চড় হবে না এ কথার। ওর জরায়ুতে অন্যের শুক্রানু প্রতিস্থাপন করবেই সীমা। সিনথিয়া বুঝলো কিছুই করার নেই ওর। কিছু যদি করতেই পারতো তবে অসীমকে এভাবে চলে যেতে হতো না।

সিনথিয়ার বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর। বিয়ের দিন সন্ত্রাসীর গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালেই মারা যায় ওর প্রথম স্বামী অদিত। পাড়া পড়শীরা ওকে অপয়া, অলক্ষ্মী বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল কিন্তু ওর শাশুড়ির স্নেহে আজ ও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। শাশুড়ির ইচ্ছাতেই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে ডিগ্রি করেছে। ভার্সিটিতেই পরিচয় অসীমের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রণয়। শাশুড়ির ইচ্ছা ছিল বিয়ে হবে তবে এ বাড়িতে থাকতে হবে। কিন্তু এবাড়ীতেই থাকতে রাজী হয়নি ওরা। আর ওর বাড়ির লোকজন এই সম্পত্তি চেয়েছিল ওর জীবন নয়। ভালাবাসাতো নয়ই। যেদিন ওদের বিয়ের দিন ঠিক হয় সেই দিনই অসীমকে পুলিশে ধরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী হিসেবে।  ওর ঘরে নাকি বোমা পাওয়া গিয়েছিল। সিনথিয়া বুঝেছিল এটা কাদের চাল, কাদের কারসাজি। সিনথিয়া আশ্চর্য হয়েছিল অসীমের এই অবস্থায় ওর শাশুড়ি খুব ভেঙে পড়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারেনি অসীমকে। যাবজ্জীবন জেল। পরে জেলখানাতেই মারা যায় অসীম। সিনথিয়া খুব আশ্চর্য হয়েছিল একটা বিষয়ে যে অসীম দেখতে ছিল একদম অদিতের মতো। অদিত ছিল ওর মায়ের মতো।

অসীম মারা যাওয়ার পর সিনথিয়া খুব ভেঙে পড়ে। আর কখনও বিয়ের কথা ভাবেনি। সিনথিয়া চায়ের টেবিলে বসে পুরানো কথাই ভাবছিল। কিটকিট টেবিল পরিষ্কার করতে এসে ওকে উঠতে একটানা বলেই চলে, ওঠেন ম্যাম ওঠেন ম্যাম, ওঠে ম্যাম।’

সিনথিয়ার উঠতে ইচ্ছা করে না। বসেই থাকে। ওর পরিবারের জন্য এই পরিবার থেকে বের হতে পারেনি। তাছাড়া অসীম চলে যাওয়ার পর থেকে আর কোন ছেলের প্রতি আগ্রহও জন্মেনি ওর। অসীমের কাছে ও সন্তান চেয়েছিল কিন্তু হয়নি তা। সন্তান আকাঙ্ক্ষা ওর মনেও সুপ্ত আছে। তা মেটানোর জন্য দত্তক নিতে পারে, সিমেন প্রতিস্থাপনের দরকার কি। সন্তান দত্তক নিলে ধারণের কষ্টটুকু থেকে বঞ্চিত হবে কিন্তু সিমেন প্রতিস্থাপনে যা কখনও সম্ভব নয় তাই হবে। ও মা হবে, শুধু লালন-পালনে মা নয়, একজন সত্যিকারের মা। বহন করার যন্ত্রণা থেকে প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করে লালন-পালন করে একজন কষ্ট সহিষ্ণু মা হবে।

এতে তোমার লাভ? মনের ভেতরে অন্য মন ওকে প্রশ্ন করে।

আমার লাভ একটা সন্তান ও সম্পত্তি।’

সন্তান যদি তোমাকে কোন সম্পত্তি না দেয়।’

কেন দেবে না।’

ধর, যদি না দেয়।’

তাই তো, যদি না দেয়। সিনথিয়া নিজের মনে ঠিক করে রাজী হবে সিমেন প্রতিস্থাপনে কিন্তু বিনিময়ে একটা বাড়ী ও দশ লাখ টাকা চাইবে শাশুড়ির কাছে, যদি সীমা দেয় ওকে তবে রাজী হবে। কথাটা ভাবতেই ¯^w¯Í পায় সিনথিয়া। উঠে যায় ঘরে। সিনথিয়া চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিটকিটের যান্ত্রিক স্বরও বন্ধ হয়ে যায়।

অনেকদিন পর ইচ্ছা করে হেঁটে এসেছে সীমা। আগে প্রায়ই হাঁটতো কারণ প্রতিমাসেই দিন কয়েক হরতাল থাকতো। এখন অবশ্য   হরতাল নেই তবে মানুষ হাঁটে কম। কারণ গাড়ির যুগে কেউ হেঁটে হেঁটে সময় নষ্ট করতে চায় না। সীমা কমলাপুর ব্রিজের গোড়ায় এসে দাঁড়ায়। ব্রিজ দিয়ে হাঁটবে। আগে তো হাঁটতে গেলেই রাগ হতো। কী ছিল না ব্রিজের ওপর-চিরুনী, আয়না ফিতা থেকে আরম্ভ করে জামা কাপড় রুমাল পর্যন্ত। ওদিকে আবার সবজি থেকে দুধের প্যাকেট। আর ছিল মানুষের মাথা। চলন্ত মানুষের মাথা।

হাঁফাতে হাঁফাতে আস্তে আস্তে ওঠে সীমা।

ওমা! আজও আছে দোকান। অবাক সীমা। এদিকে অনেকদিন আসেনি। দোকান আছে বেশ কয়েকটি। সবগুলোর ভেতর দুটি দোকান ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খেলনা রোবট বিক্রি হচ্চে। বিক্রি করছে ওরই বয়সী প্যান্ট শার্ট পরা একজন ভদ্রলোক।

কি ব্যাপার, এগুলো বিক্রি করছেন আপনি।’

টাইম পাস করার জন্য। জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গেছে একটু বৈচিত্র আনতে চেষ্টা করছি।’

একটু হেসে বলে ভদ্রলোক। ভদ্রলোক অবসর জীবনযাপন করছেন এখন।

ওহ!  সীমাও হাসে।

ওখান থেকে সাদা কাপড়ে ঘেরা জায়গায় দাঁড়ায়। কাপড়ের গয়ে লেখা-এখানে সিমেন পাওয়া যায়। কৌতুহলী সীমা ভেতরে ঢোকে। একটা লোক চোখ বন্ধ কথা বলছে একা একা। পৃথিবী নাপাক মানুষে ভরে গেছে। বেপর্দা জালিম নাস্তিক মানুষে আজ পৃথিবী ভারাক্রান্ত। পৃথিবীর কান্না………।’

সীমার আর শুনতে ইচ্ছা করে না। একটু শুনেই বুঝে ফেলেছে এ লোক চীটার, ফেরেব বাজ।

ও ওখান থেকে বের হয়ে আবার হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে কাগজে দেয়া ঠিকানা মিলিয়ে সেখানে গিয়ে সব শুনলো, জানলো। সুবিধা, অসুবিধা দুটো দিকই শুনলো এবং জানলো। যতো অসুবিধাই থাক এই কাজটা করতেই হবে ওকে, যে কোন মূল্যে।

যেহেতু নিজে এখন অক্ষম সেহেতু সিনথিয়াই ভরসা। ওকে এই মুহূর্তে চটানো ঠিক হবে না। সবকিছু ঠিকঠাক করে প্রতিষ্ঠানের  মালিকের সঙ্গে। সম্ভাব্য তারিখও নিলো একটা। তারপর মনের আনন্দে বাড়ির পথ ধরলো। কলিং বেল চাপ দিতেই আজ কিটকিটের বদলে দরোজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো সিনথিয়াকে। সিনথিয়ার হাসিমুখ দেখে সীমা আশ্বস্ত হল মনে মনে।

#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615