যার খাই যার পরি তার সঙ্গে রাগ করতে নাই। তাঁর নিন্দাও করতে নাই। তাঁর ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে নাই। রবী ঠাকুর বলেছেন ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’। তবে আমার কী যে হয়েছে তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি না। বিশ্বাস আনতে তুমিও সহযোগিতা করছো না। এখন তুমি আমার জন্য অনেক করছো অনেক খেয়াল রাখছো আজকাল তবুও মনে হয় সব ফাঁকি, সব তোমার দয়া। তুমি, তোমার মায়ের অমতে আমার কাছে এসেছ। এখন তুমি চলে যেতে চাও মায়ের পছন্দের তাঁর কাছে। অথচ একদিন ছিল আমার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে শুধু একবার আমাকে দেখবে বলে। রাতভর হেঁটেহেঁটে আমার দরোজায় রেখে আসতে লাল গোলাপের পাপড়ি যেন বাইরে বের হতেই আমার পা পড়ে সেই গোলাপ পাপড়িতে। কতদিন গেছে তুমি সোহরওয়ার্দী উদ্যানের অপেক্ষা করেছ মাত্র আধ ঘন্টা আমাকে কাছে পাবে বলে। কিন’ এখন কী যে হয়েছে তোমার সব সময় রাগারাগি করো তুমি। কোথায় যাবে বা কোথা থেকে আসছ তার জবাব দাও না।
আজ সাত দিন হয়ে গেল তুমি চলে গেছ। বাসায় মা এসেছিল জিজ্ঞাসা করল তোমার কথা। মিথ্যে বললাম। ঢাকার বাইরে গেছ। কবে আসবে তার জবাব দিতে পারলাম না। কী ভাবে দেবো বলো তুমি তো কিছু বলে যাওনি। আর মিথ্যে বলতে ইচ্ছা করে না। মিথ্যে বলতেও পারি না। জানো একদিন অফিসের পাঁচতলায় সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রেস্ট নিয়ে উঠবো ভেবে দাঁড়িয়েছিলাম
(লিফট তখনও লাগেনি) তখন আমার বস উঠছিল। আমাকে দাঁড়াতে দেখে বলেছিল দাঁড়িয়ে আছেন কেন ? আমি বলেছিলাম দম নিচ্ছি স্যার। তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘আপনি তো মিথ্যে করেও বলতে পারতেন আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি স্যার। আমি খুশি হয়ে যেতাম’। আমি হেসেছিলাম। আমি কখনও কাউকে খুশি করার জন্য মিথ্যে বানিয়ে কথা বলতে পারি না। তোমাকে তো নয়ই।
কী একটু তর্ক হলো তুমি চলে গেলে। তুমি জানো, তুমি না থাকলে আমি উদাস বাউল হয়ে যাই। আমার মনের কাছে কোনো ভালোবাসার চিঠি আসে না। তুমি নেই ভালোবাসা এখন ধূসর খামে মোড়া সাদা কাগজ। কোন রঙ নেই। তোমার পরিবার আমাকে পছন্দ করে না। তুমিও যদি না করো, না ভালোবাসো ঠিক আছে আমি তো তোমাকে পছন্দ করি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি ভালোবাসো আর নাই বাসো আমি তো তোমাকে ভালোবেসেই যাব। তোমার সঙ্গে থাকবো বলে মা বাবার সঙ্গে কতো কথার সৃষ্টি হয়েছিল। কতো বকা শুনতে হয়েছিল। বাবা বলেছিল আমার মুখ দেখবে না। বাবা তো এখনও আমার মুখ দেখতে চায় না। মা আসে কিন’ বাবা এখনও আমার বাসায় আসেনি। মোবাইল করলেও কথা বলে না। কেটে দেয়। তুমিও এই সাতদিন তাই করছো। মোবাইল ধরছো না। রিং বেজে বেজে থেমে যাচ্ছে। তুমি রিং ব্যাক করছো না। একবার ভেবেছি তোমার বাসায় চলে যাই। কিন’ তা যাবো না আমি। তোমার অসম্মান হোক এমন কাজ তো কখনও করতে চাই না। কোথায় আছো, ভালো আছো কিনা এটুকুই শুধু জানতে চাই। তুমি রাগ করো আর যাই করো আমি তোমাকেই ভালোবাসি। কোন সম্বোধন ছাড়াই যেমন চিঠি শুরু করেছিল সেইভাবেই নিচে কোন কিছু নাম না দিয়েই শুধু ডট চিহ্ন দিয়ে চিঠি শেষ করলো রুমিতা।
…
চিঠি খামে বন্ধ করে পোস্ট করতে বের হলো রুমিতা। দরোজা খুলতেই পাশের ফ্ল্যাটের বয়স্ক মহিলার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মহিলা এগিয়ে এসে বলল, কোথাও যাচ্ছেন বুঝি রুমিতা ! মাথা নাড়ে রুমিতা। পাশের ফ্ল্যাটের মহিলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। রুমিতা তো এমন নয় ! খুব হাসিখুশি মনের মানুষ। দেখা হলেই আন্টি, আন্টি বলে কাছে আসে। কথা বলে। আঙ্কেল কেমন আছে খবর নেয়। আজ কী হয়েছে ওর !
লিফট ব্যবহার না করে সিড়ি দিয়ে নামে আজ। পরিচিত মানুষের সঙ্গ এড়াতে চাইছে রুমিতা। হাঁটছে রুমিতা। পথে দেখা হয়ে গেল ছোট বেলার বান্ধবী রিশিতার সঙ্গে। এই রুমি হন্তদন্ত হয়ে যাচ্ছিস কোথায় ! অফিস নেই আজকে তোর ! বন্ধুর জন্য একটু হাসি দিলো রুমিতা। রিশিতার রিকশা এগিয়ে যাওয়াতে ওকে আর কথা বলতে হলো না। বুকের ভেতর থেকে একটা ভার নেমে গেল। রিশিতা যেমন মেয়ে সব কথা বের করেই ছাড়তো। কিন’ কাউকে কিছুই বলতে চায় না রুমিতা।
ও হাঁটছে। হাঁটছে।
দেখা হলো অফিস কলিগ শফিকের সঙ্গে। শফিক একটু এগিয়ে আসে। এবার রুমিতা না দাঁড়িয়ে পারে না।
কী ব্যাপার আপা বলেন তো অফিসে আসছেন না কয়েকদিন ! খবরও দেন নি। স্যার তো খুব রেগে আছে।
রুমিতা বলে আজ নয় কাল যাবো। আপনারা সব ভালো তো।
শফিক বলে, কী হয়েছে বলেন তো রুমিতা, আপনাকে কেমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে।
না, না, তেমন কিছু না ! এই একটু আর কী ! আপনি অফিস যান আপনার দেরী হয়ে যাবে।
শফিক চলে গেলে ও আবার হাঁটতে শুরু করে। একটা রিকশার কথা চিন্তা করে। কিন্তু খেয়াল হতেই দেখে পার্স নেই হাতে, নেই মোবাইল। ঘরে কেউ নেই হাতে চাবি থাকার কথা তাও নেই। তার মানে ঘরে তালা দেওয়া হয়নি।
ও হতাশ হয় না। কী হবে ওই ঘর-বাড়ি-আসবাব-অর্থ সম্পদ দিয়ে যদি সরিৎ না থাকে পাশে ! একটা তুচ্ছ কথা নিয়ে এই অবস্থা। শুধু বলেছিল একটিবার তোমাদের বাড়ি তোমার মায়ের কাছে নিয়ে চলো। খুব কী খারাপ কথা বলেছে ! তিন বছরের সংসার এটুকু তো চাইতেই পারে। এতেই যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়, এতেই যদি ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় তাহলে সব নষ্ট হয়ে যাক, সব চলে যাক !
রুমিতা আবার হাঁটতে থাকে পোস্ট অফিসের দিকে। আশেপাশে পোস্টবক্স নেই তাই পোস্ট অফিসেই যেতে হবে। পোস্টঅফিসের কাছাকাছি পৌঁছে দেখতে পায় পোস্টঅফিসের দিকেই হেঁটে আসছে ওর বর, সরিৎ। দুজনেই দাঁড়ায় পোস্টঅফিসের গেটে। দুজনের হাতেই চিঠি। অল্প কিছুক্ষণ পলকহীন দেখে দুজনে দুজনকে। কিছুক্ষণের জন্য স্থান কাল পাত্র সব ভুলে যায় দুজনেই। দুজন দুজনকে বলে ভালোবাসি,তবুও ভালোবাসি। ওদের হাতে চিঠি হাওয়ায় দোল খায় দুদিকে।
