ট্রাফিক আটকে দিয়েছে বাস। পুলিশে ছেয়ে আছে রাস্তার এ-মাথা থেকে ও-মাথা। একটা মিছিল। বেশ বড়। রাস্তার ডানদিক দিয়ে আসছে মিছিল। মাথা দেখা যাচ্ছে ওটার। বড়সড় নেতানেত্রীরা মিছিলের সম্মুখভাগে। কালো ব্যানার নিয়ে হাঁটছে। ব্যানারে লেখা “গ্রেনেড হামলার বিচার চাই”। “সরকার তুমি গদী ছাড়”। “ মৃত্যু চাই না শান্তি চাই ”। মিছিলকারীদের মুখে কাফনের কাপড় বাঁধা। বাসের ভেতর সকলের সঙ্গে টিপু। উস্ক-খুস্ক চুল। ম্লান মুখ। দেখলেই বুঝা যায় খাওয়া হয়নি সারাদিন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে। দেখছে না কিছুই। এমনকি মিছিলেও আগ্রহ নেই। আনমনা তাকিয়ে আছে। মন ভালো নেই ওর। এবারে খুবই কষ্ট পেয়েছে। বাবা বকেছে। রাগ করেছে মা।
কেন এমন করে মা-বাবা ? প্রশ্নটা ঘুরে বেড়াচ্ছে মন ও মগজে। বকাবকির কী আছে আর কী-ই বা আছে রাগ করার !
বড় হয়েছে ও। বোধ-বুদ্ধি হয়েছে। শক্তি হয়েছে সবকিছু বুঝবার। বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও হয়েছে। সব কিছু বুঝবার ক্ষমতা আছে। ক্ষমতা আছে বিচার করার। এখন যা কিছু করে বা করবে বুঝেশুনেই করে বা করবে এবং তা করেও। ও এমন কিছু করবে না যাতে ওর বাবা-মায়ের মাথা নিচু হয়ে যায়। না, কখনও তা করবে না ও। এমন কিছুই করে না যাতে বোনদের অসুবিধা হয়, বাবা-মা কষ্ট পায়। ও এখন যথেষ্ট বড়, ভালো মন্দ বুঝার মতো রড় হয়েছে।
ও এখন নিজের খরচ নিজে চালাতে চেষ্টা করে। হাত খরচের জন্য টিউশনি করে। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাবা-মা, কিংবা বোনদের কাছে হাত পাতে না।
টিউশনি করুক আর অন্য যে কোন কাজ করুক বাড়ি থেকে বাইরে থাকতেই হবে। এই বাইরে থাকাটা পছন্দ করছে না কেউ। মানতেই চাইছে না যে কাজের জন্য বাইরে থাকতে হচ্ছে ওর। সকলেই ভাবছে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করছে ও। কীভাবে যে বুঝাবে কিছুই বুঝতে পারছে না।
দিনকাল ভালো না। চারদিক অশান্ত, বোমাবাজি, ধরপাকড় চলছে বেপরোয়া। সন্ত্রাসীদের হাতে মারাও যাচ্ছে অনেকে। বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে তারপর লাশ মিলছে অনেকের। কেউ বা কাজের জন্য বের হয়ে আর ফিরে আসছে না। খবরই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমে অপহরন তারপরে গুম তার পরে পাওয়া যাচ্ছে লাশ।
এই মুহূর্তে বাবার কথা হলো লোকজন নেই, কিছু একটা হয়ে গেলে মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না তিনি। থানা পুলিশ করতে পারবেন না, পারবেন না খুঁজে বের করতে। সেজন্য কাজ ছাড়া বাইরে বের না হওয়া। কেউ ডাকলে তার সঙ্গে না যাওয়া। একটাই তো ছেলে।
বাবা যে বেঠিক কিছু বলেছে তা নয়। ধরপাকড়, বোমাবাজি, খুনোখুনি সবই চলছে। এই তো সেদিন, মাত্র কয়েকদিন আগে বিশাল জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়েছে। নিহত হয়েছে, আহতও অনেক। শুধু কী জনসভায় তা নয় যেখানে সেখানে বোমা হামলা। বোমা হামলা হয়েছে সিলেটে, তারও আগে রমনার বটমূলে, যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার কথাতো সকলেই জানে। মিটিং-মিছিল-সমাবেশে আকছারই ঘটছে বোমা হামলা। বোমা হামলা হয়েছে সিপিবির জনসভায়, হয়েছে সিনেমাহলে। হযরত শাহজালালের মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়েছে বোমা। বোমা হামলায় মারা গেছে খুলনার সাংবাদিক মানিক সাহা, হুমায়ূন কবির। শুধু এরাই নয়, মারা গেছে আহত হয়েছে আরও অনেকে। বোমা হামলায় নিহত হয়েছে যারা তারা তো গেছেই, আহতদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার কোন লক্ষণ নেই।
সব ঠিক আছে তাই বলে কী ঘরে বসে থাকা যায়। কাজকর্মের তাগিদে বাইরে যেতেই হবে, হয়ও। সময়-অসময়, রাত-বিরেতে পথ-ঘাটে চলতেই হয়। এর জন্য কী রাগ করা উচিত ? উচিত নয়। কিন্তু বাবা রাগ করেছে। আর মা-তো সব সময়ই রাগ করে। এবারে রাগ করল বাবা। বাবার কথা কোথাও যাওয়া যাবে না। রাত নয়টার পরে বাড়ির বাইরে থাকা চলবে না। কিন্তু কী করবে টিপু, কাজ করতে গেলে তো বাইরে যেতে হবে। রাতও হবে।
প্রয়োজনে যদি কেউ ডাকে তাহলে কি না গিয়ে পারবে ! পারবে না। কিন্তু এই কথা বলাও যাবে না। বলতেই বাবা রেগে চড় বসিয়ে দিলো। ওরও রাগ হয়ে গেল। বাসা থেকে বেরিয়ে এল। সেই যে গতকাল বেরিয়েছে আর ফেরেনি। কী হবে ফিরে।
অন্যায় না করেও যদি বকাবকি শুনতে হয়, মার খেতে হয়, তাহলে কী হবে বাসায় ফিরে। না, আর ফিরবে না। টিপু জেদি হয়। পরক্ষণেই নরম হয়ে ভাবে, কিন্তু কতদিন ! কতদিন না ফিরে থাকবে। আর না ফিরে কী করবে ? জীবনে বেঁচে থাকতে হলে তো খেতে হয়, পরতে হয়। আর খেতে-পরতে হলে টাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু টাকা কোথায় পাবে ? টাকা পেতে হলে চাকরি করতে হবে। কে দিবে চাকরি। ওর তো লেখাপড়া শেষ হয়নি।
এই মুহূর্তে তো টাকাও নেই ওর কাছে।
টাকা নেই পকেটে। একটা-দুইটা টিউশানি করে তা দিয়ে তো ভাত জুটবে না। টিউশানিতে হাত খরচ চালানো যায়, কোন রকম খেয়ে পরে বেঁচে থাকা যায় ভালোভাবে জীবন কাটানো যায় না। ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য চাকরির প্রয়োজন আর চাকরির জন্য প্রয়োজন লেখাপড়ার।
টিপু অন্যমনস্ক জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। মায়ের জন্য বোনের জন্য মন কেমন করছে। বাবার মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। একদিনের অদেখাতেই মন কেমন করছে। সবকিছু ছায়া ছায়া ধোঁয়াসা লাগছে। ভালো লাগে না টিপুর। মনে পড়ে বোনের খুনসুটি, মায়ের আদর। চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।
বাবা যে আদর করে না তা নয়। বাবাও খুব আদর করে। বাবা প্রতিদিন সকালে ওর ঘুম ভাঙাতো। দুজনে হাঁটতে যেত রমনা পার্কে। তারপর ফিরে এসে একসঙ্গে সকালের খাবার খেত। বাবা চলে যেত অফিসে আর ওরা ভাইবোন পড়তে বসতো। রাতের খাবারও একসঙ্গে। খাবার টেবিলে হাজার রকমের হাসি, গল্প, কথায় রাতের ডাইনিং টেবিল ভরে উঠতো। টিপুর মনের পর্দায় সব ছবির মতো ভেসে যাচ্ছে। টিপুর বুকে কান্নার সমুদ্র।
ওর মন বলে, টিপু বাড়ি যাও, বাড়ি যাও টিপু।
বাড়ি যাবো, কেন যাবো, কার কাছে যাবো। একরোখা জেদি বালক টিপু।
জিদ করো না টিপু। বাড়ি যাও। এতো জিদ ভালো নয়। ওর মন কথা বলে আবার। টিপুও কথা বলে।
এতো আমার জিদ নয় ! এ আমার আত্মসম্মান।
আত্মসম্মান ! বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের আবার আত্মসম্মান ! বাবা মা তো সন্তানের ভালোর জন্যই বকে। তোমাকেও তোমার ভালোর জন্য বকেছে। বাবা-মাকে দিয়েই তো তোমার পরিচয়। তোমার সম্মান।
সব মেনে নিলাম। তাই বলে কী যখন-তখন বকবে। মারবে আমাকে। আমি এখন বড় হয়েছি।
বাবা-মায়ের কাছে বড়-ছোট কী! বাবা-মায়ের কাছে তাদের সন্তানেরা ছোটই থাকে সবসময়।
টিপুর মন কেমন করে। সিট থেকে উঠে দাঁড়ায় ও। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। বাস থেকে নামার জন্য এক পা বাড়ায় কিন্তু পরক্ষণেই বসে পড়ে।
না যাবো না। কেন মারবে আমাকে এমন করে। এক-আধটু বকা দিতে পারে। কিন্তু গায়ে হাত দেওয়া। নাহ, কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি এখন বড় হয়েছি। বাবার মতো বড় না হতে পারি কিন্তু বড় তো হয়েছি।
না, তোমার ইচ্ছা মতো চলার পক্ষে তুমি ঢের ছোট।
ওর ভেতরের মনটা আবার কথা বলে। না, আমি বড় হয়েছি, বড় হয়েছি। আমি বাড়ি যাবো না। যাবো না, যাবো না।
কোথায় যাবে না খোকা। ওর পাশে বসে থাকা ভদ্রলোকের দরদী কন্ঠ।
টিপু লজ্জা পায়। একটু জোরেই কথা বলে ফেলেছে ও। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলে, না না কিছু না।
কিছু তো নিশ্চয় খোকা। কী হয়েছে বলতো। ভদ্রলোকের দরদ মেশানো কথায় ওর মনের ভেতর কান্না গুমরে ওঠে চোখে জল টলটল করে।
পাশে বসা ভদলোকের মায়া হয়। মাথায় হাত রাখে। আদর করে। বলে, দেখ বাবা আমি তোমার চেয়ে অনেক বড়। তোমার বাবার মতো। কী হয়েছে আমাকে বলো। টিপুর মনের ভেতর তোলপাড় হয়ে যায়। ম্লান কন্ঠে বলে, বাবা বকেছে, মেরেছে।
কেন ?
রাত করে বাড়ি ফিরেছি তাই।
তোমার বাবা তো ঠিকই বলেছে। দেশের অবস্থা ভালো নয়। দেশের এই অস্থিতিশীল অবস্থার জন্য বাবার তো চিন্তা হতেই পারে। সেই চিন্তা থেকে উদ্বেগ আর উদ্বেগ থেকে রাগ। সেই রাগের থেকেই তোমাকে বকেছে, মেরেছে। হতেই পারে। মনে রাখবে বাবা-মা সব সময় সন্তানের ভালো চায়।
টিপু কথা বলে না।
ভদ্রলোক আবারো বলে, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে সারাদিন খাওনি। বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়েছ, তা যাবে কোথায়।
কোথায় যাবো ঠিক করিনি। তো বাসায় আর ফিরবো না।
বাবা মা রাগ করলে বাড়ি থেকে চলে আসতে নেই খোকা। বাড়ি যাও।
একটু চুপ করে থেকে ভদ্রলোক উদাস কন্ঠে বলে, জানো তোমার মতো আমারও একটা ছেলে ছিল। একদিন বকেছিলাম। বকার পরে রাগ করে ভাত খেল না। তারপর কোথায় যে গেল আর ফিরে এলো না। এখনও আসেনি। আমার বুকের ভেতর খুব কষ্ট খোকা। বরফ চাপা কষ্ট। তোমার বাবারও মনে হয় আমার মতো এমনি কষ্ট হচ্ছে। ভদ্রলোকের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
ভদ্রলোকের চোখের জল দেখে টিপুর মন খারাপ হয়ে যায়। ভাবে, এমন করে বাড়ি থেকে চলে আসা ঠিক হয়নি। ওর বাবাও মনে হয় ওর জন্য কাঁদছে। আর মা। মা তো খুব নরম মনের মানুষ। মা ওকে ছাড়া কখনও খায় না। নিশ্চয় মা না খেয়ে আছে।
না-না বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। আমি বাসায় যাবো। বাসায় যাবো। রাস্তার সাইনবোর্ড পড়তে চেষ্টা করে।
বোমের আওয়াজ। চারদিক ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। টিপু উঠে দাঁড়ায়। নামতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। আর একটা বোম। বাসের ভেতর চিৎকার হুড়োহুড়ি। এবারে পেট্রোল বোমা। বাসে আগুন। টিপু হতভম্ব। ভদ্রলোক তাড়া লাগায়। ওঠ ওঠ। চল চল।
গেটে জটলা। দোতলা বাস। ওপরে নিচে যাত্রীরা সব একাকার। ধাক্কাধাক্কি। কে কার আগে নামবে। শিশুদের কান্না। টিপুরও কান্না পায়। কান্না চেপে সিটা থেকে উঠে দাঁড়ায় কিন্তু বের হতে পারে না।
টিপু কী করবে ভাবছে। জানালা দিয়ে লাফ দাও খোকা। পাশের ভদ্রলোক বলে। ভদ্রলোকও বের হতে পারেনি। টিপুর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। টিপু লাফ দিতে চেষ্ট করে কিন্তু পারে না। প্রচন্ড শব্দে বাসের ডিজেল ট্যাঙ্ক বাস্ট করে। আগুন লেগে যায়। পেট্রোল বোমার আগুন। লকলকে আগুনের শিখা জানালা দিয়ে বাসের ভেতরে ঢুকে যায়। ভদ্রলোক ওকে জানালা থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করে পারে না। নিজেই পড়ে যায়। পেছনের যাত্রীদের পায়ে হাত পা থেতলে যায়। থেতলে যায় পিঠ। পুরো বাসে লেগে গেছে আগুন। টিপুর গায়ে আগুন।
টিপু উঠতে চেষ্ট করে কিন্তু পারে না। দুই হাত ওপরে তুলে ডাকে বাবাকে, মাকে। বাবা, বাবা, মা বলে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে চায়; পারে না। বাসের আগুন ধরা সিটের ওপর লুটিয়ে পড়ে টিপু।
#afrozaaditi.com #আফরোজা অদিতি
