ময়না //আফরোজা অদিতি

কারওয়ান বাজার। কাঁচাবাজারে এসেছে রীমা। তেজগাঁ বিজ্ঞান কলেজের উল্টা দিকে রীমার বাসা। রীমা কারওয়ান বাজার থেকেই বাজার করে। প্রায় বেশির ভাগ মিন্তিই ওর চেনা। তবে আজ রিকশা থেকে নামতেই দৌড়ে এলো ঝাঁকা মাথায় অন্য এক মিন্তি। ওর কাছে এসে বলল, ‘আম্মা মিন্তি লাগবো?’ ছোটখাটো মেয়েলি মুখ। ওকে দেখে মায়া হলো রীমার। বললো, ‘ তুই ঝাঁকা বইতে পারবি?’ ‘পারমু আম্মা। না পারলে চলবো ক্যান? খাইতে পামু না তো।’ ‘তুই তো ছেলেমানুষ, এই কাজ করিস কেন?’

মিন্তি একটু হাসে। ‘কি করমু আম্মা, বাপে থাইকাও নাইকা। কোথায় য্যান চইলা গ্যাছে। মা একলা, অশিক্ষিত মানুষ।কাম না করলে খামু কি?’ ওর কথা শুনে রীমার মন জুড়ে দুঃখ ছেয়ে যায়। বাজার করে মিন্তির মাথায় দিয়ে ওর পেছন পেছন হাঁটতে থাকে। রিকশা পর্যন্ত নিয়ে যাবে মিন্তি। রিকশায় মালামাল তুলতে তুলতে একটু হাঁফায় মিন্তি। ‘তোর নাম কি?’ রীমা জিজ্ঞেসা করে ওকে। ‘ময়না।’ ‘ময়না! পাখির নামে নাম। তবে এই নাম তো মেয়েদের!’ ‘আমি তো মাইয়াই। পোলা সাইজা থাকি।’ রীমা বিস্মিত।ময়না আবারও বলে, ‘আম্মা, আমারে কামে রাখবেন?’ ‘তুই কাজ করবি?’ ‘হ আম্মা, করুম। আমার মায়ে কইছে কেউ যদি বাড়িতে কামে রাখে তাহলে বাড়িতে কাম করুম। আর কাম না করলে খামু কি?’ রীমার মেয়েটাকে দেখে একটা মায়া হয়েছিলো, এখন ওর কথায় বুকের ভেতর একটা দোলা লাগে। স্নেহের দোলা। ভালোবাসার দোলা। দায়িত্বের দোলা। ওকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে আসে রীমা।

রীমার এক ছেলে এক মেয়ে। নিশি, রিশাত। নিশি ক্লাস নাইনে পড়ে, রিশাত সিক্সে। রীমা বাড়িতে ঢুকতেই দৌড়ে আসে ওরা। বলে, ‘এটা আবার কে মা?’ ‘ও ময়না। আজ থেকে আমাদের বাড়িতে থাকবে’ মা বলে। ময়না থাকে। টুকটাক কাজে সাহায্য করে। নিশি আর রিশাতের সঙ্গে থাকে, খেলা করে।রীমা বই কিনে দিয়েছে ওকে। নিশি লেখাপড়া শেখায় ওকে।

নিশি রিশাত খুব ভালো ছেলেমেয়ে। কখনও ঝগড়া করে না, মারামারি তো নয়ই। বাবা-মাকে যখন তখন যা তা বায়না করে ব্যস্ত করে না। ওরা ময়নাকে পেয়ে খুব খুশি। কখনও ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না। ও গরিব বলে কখনো অবহেলা করে না, ঘৃণা করে না।বেশ কিছুদিন কেটে যায়। নিশি একদিন মাকে বলে, ‘মা, ময়নাকে স্কুলে ভর্তি করে দাও। আমরা যেরকম পড়ি সেই রকম ওরও তো লেখাপড়া শেখার দরকার আছে। ও তো মানুষ।’ ওর মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসে। ঠিকই বলেছো। ভর্তি করে দেবো।ময়না খুব খুশি। স্কুলে ভর্তি হয়েছে।স্কুলে ভর্তি হলেও ময়না কাজে অবহেলা করে না কখনও। কাজ করে। স্কুলেও যায়। অবসর সময়ে পড়ে আর সেলাই শেখে।

ঈদ আসছে। এবারের ঈদে ওদের বাড়িতে ফুফু, ফুফা, ফুফাতো ভাই-বোন এসেছে। ওদের ভীষণ আনন্দ। পরীক্ষাও শেষ, ঈদও আসছে। পড়া নেই। শুধুই আনন্দ। আনন্দ আর আনন্দ। ওরা খেলছে। ময়না এসে বলে, ‘নিশি আপু, আমিও খেলবো।’ ‘ঠিক আছে, আয়। কাজ নেই তো এখন?’ ‘না।’ মাথা এপাশ ওপাশ করে ময়না। ওরা রুমালে চোর চোর খেলছে। ময়না বসতেই ফুফাতো বোন রীতা উঠে গেলো। ‘ না, ও খেললে আমি খেলবো না।’ ‘কেন?’ নিশি জিজ্ঞেস করে। ‘ও কাজ করে। কাজের মানুষের সঙ্গে আমি খেলি না।’ ‘তাতে কি? ও তো কাজ করে খায়।আর তুমি আমি তো বসে বসে খাই। আমরা তো ওর থেকে কতো বড়ো।’ নিশির কথায় রীতা কেঁদে ফেলে। ‘কি তুমি এতো বড়ো কথা বললে? বাবা-মায়ের ঘাড়ে বসে বসে খাই!’

নিশি বলে, ‘ ঠিকই তো রীতা। আমরা তো বাবা-মায়ের ঘাড়ে বসে বসেই খা্‌ই। আমরা এখন লেখাপড়া করি, যতোদিন লেখাপড়া শিখে একটা কাজ না পাবো, ততোদিন তো বাবা-মায়ের ঘাড়ে বসেই খেতে হবে।আর ময়না তো কাজও করে আবার পড়েও।’ নিশির কথায় শান্ত হয় না রীতা। কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় ফুফুর কাছে। ফুফু শুনে রেগে আগুন। ‘কি কাজের মেয়ের পক্ষ নিয়ে এতো বড়ো কথা? থাকবো না, চলে যাবো।’

ননদকে বোঝাতে চেষ্টা করে রীমা। ‘ভাই-বোনে লেগেছে। আপা ঠিক হয়ে যাবে। আপনি রাগ করবেন না। ময়নাকে শাসন করছি, কেন খেলতে গিয়েছে?’ ময়নাকে ডাকতেই কাছে এসে দাঁড়ায়। দুইচোখ ছলছল করছে ওর। রীমা কিছু বলার আগেই বলে, ‘আম্মা, আর খেলবো না। মাফ করে দ্যান।’ ‘ঠিক আছে যা। এরকম করবি না তো? ওরা মেহমান, মেহমানদের সম্মান করতে হয়। মেহমানের যাতে অযত্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। বুঝেছিস। ’ ‘হ্যাঁ।’ ময়না চলে যায়। কিন্তু চোখ উপচে পড়ে জল। ওর কান্নায় নিশি আর রিশাতের মন খারাপ হয়ে যায়। অনুযোগ করে মাকে।

‘ওকে বকলে কেন মা? ও তো কোনো অন্যায় করেনি।’ মা কাছে টেনে নেয় ওদের। একটু হাসে। বলে, ‘মাঝে মাঝে এরকম করতে হয় নিশি। সংসারে সুখ দেখতে গেলে এরকম করা প্রয়োজন।’ ‘কেন?’

‘কেন! আমি যদি ময়নাকে না বকতাম, তাহলে তোমার ফুফু রাগ করে চলে যেতো। তোমাদের ফুফু চলে গেলে তোমাদের বাবা কষ্ট পেতো। ঈদের আগে তোমাদের বাবার সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি মনোমালিন্য যদি হতো, তাহলে কি তোমাদের ভালো লাগতো?’ ‘লাগতো না মা।, নিশি-রিশাত  বলে ওঠে একসঙ্গে। ‘তাহলে আমি ঠিক করেছি, ব্যস।’ ডাকো ময়নাকে ডাকো। ময়নাকে ডাকতেই এসে দাঁড়ায়। ওর মাথায় হাত দিয়ে আদর করে রীমা বলে, ‘কাঁদিস না ময়না।’ ওদের মা চলে গেলে ময়নাকে বলে  নিশি-রিশাত, ‘কাঁদিস না ময়না। আমরা আবারও খেলবো। খেলা তো একদিনের নয়।’

ময়না হেসে ওঠে। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ওর চোখ।

#afrozaaditi.com, #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615