আসামের ভাষা-আন্দোলন
বাংলাদেশের অহংকার অমর একুশে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের সকল মাতৃভাষাপ্রেমীর কাছে এই দিনটি অহংকারের; এই দিনটির জন্য শুধু বাংলাদেশ বা বাঙালিই নয় বিশ্বের সকল মাতৃভাষাপ্রেমিই আজ গর্ব অনুভব করে। অমর একুশের ইতিহাসে যেমন বীর ভাষা-শহীদেরা আছেন তেমনি আসামের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১১ জন বীর শহীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস যেমন একদিনে সৃষ্টি হয়নি তেমনি আসামের ভাষা আন্দোনের ইতিহাসও একদিনের সৃষ্টি নয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে রক্তস্নাত এক মহান অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছিল তেমনি ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় যা অস্বীকার করার উপায় নেই। শিলচরের এই ১৯৬১ এর ১৯ মে একদিনে আসেনি; দেশভাগের পর থেকেই শুরু হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ রাজশক্তি, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ঐক্যমতে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে ভারত -পাকিস্তান ভাগ হলো; ভাগ হওয়ার পূর্বে পাকিস্তানের দাবী ছিল বেঙ্গল ও আসাম এই দুটি প্রদেশেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে কিন' হলো উল্টো; পশ্চিম পাকিন্তানের সঙ্গে পাঞ্জাব প্রদেশ এবং আসামকে ভারতের সঙ্গে রেখে অখন্ড বেঙ্গলকে ভাগ করে পূর্ব পাকিন্তানের সঙ্গে যুক্ত না করে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত হলো। কিন' দেশ ভাগ হওয়ার পূর্বে ১৯৪৭ এর ৭ জুলাই বৃহত্তর সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ৫৫,৫৭৮ ভোটের ব্যবধানে সিলেট পাকিস্তানে থাকার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় অথচ সেসময় গণভোটের রায় না মেনে সিলেটের তিন চতুর্থাংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। এই তিন চতুর্থাংশের মধ্যে হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ,এবং শিলচর ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়। দেশ ভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালিদের সংখ্য বৃদ্ধি ও সাহিত্য-সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। এবং আসামের শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দিতে গড়ে ওঠে বাঙালি জনপদ। এর প্রভাব পরে আসামের সমাজ ও রাজনীতিতে। ১৯৪৮ সালের মে মাসে গোহাটি শহরে বাঙালিদের ওপর আগ্রাসন চলতে থাকে। এবং ১৯৫০ সালে কিছু উগ্রবাদী অসমিয়া সম্প্রদায় শুরু করে ‘বাঙাল খেদা’ আন্দোলন। অসমিয়া জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি এবং অসমিয়া ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম ও সরকরি ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাদের লক্ষ্য। তখন ১৯৫২ সালের একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আসাম রাজ্যের বাঙালিরা সংগঠিত হতে থাকে।
পাকিস্তান সরকার যেমন ঘোষণা দিয়েছিল “উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা” তেমনি ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের ইন্ধনে উগ্রবাদী অসমিয়াদের আন্দোলনের মুখে ১৯৬০ সালে ৩ মার্চ আসামের তৎকালীণ মূখ্যমন্ত্রী বিমল প্রসাদ চালিহা বিধান সভায় অসমিয়া- ভাষাকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা হবে বলে প্রস্তাব করেন। ১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক বাংলাভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ আসামের বাংলাভাষা-ভাষীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঐ প্রস্তাবের প্রতিবাদে ১৬ এপ্রিল শিলচরে এক নাগরিক সভা আহ্বান করেন। ঐ সভাতে অধ্যাপক শরৎচন্দ্র নাথকে আহ্বায়ক নির্বাচিত করে ভাষা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটি প্রস'তি কমিটি গঠিত হয়।
এরপর শিলচরে ২ ও ৩ জুলাই চপলাকান্তের সভাপতিত্বে দুই দিন ব্যাপী ‘নিখিল আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার’ গানটি গেয়ে অনুষ্ঠান শুরু এবং ঐ সম্মেলনে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবী জানানো হয়। বাংলাভাষা-ভাষীদের এই আন্দোলন-সম্মেলন-মৌলিক অধিকারের দাবী উপেক্ষা করে ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসাম রাজ্যের সর্বত্র অসমিয়া ভাষা প্রয়োগের জন্য বিধান সভায় ‘রাজ্যভাষা-বিল’ উত্থাপিত হয় এবং পাস করা হয়। এই রাজ্যভাষা-বিল উত্থাপন এবং পাস করার মাধ্যমে আসামের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের দাবী উপেক্ষিত হয়। তখন এই আইনের প্রতিবাদে বাংলা ভাষার স্বপক্ষ শক্তি আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে এবং বাংলা ভাষার দাবীতে ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। এই আইনের প্রতিবাদে পণ্ডিত রাজমোহন নাথের সভাপতিত্বে ১৯৬০ সালেরই ১৮, ১৯ ও ২০ নভেম্বর শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিন ব্যাপী বিশাল সম্মেলন। সম্মেলনে গৃহীত এক স্দ্িধান্তে বলা হয় “যদি আইন করে বাংলা ভাষাকে অসমিয়া ভাষার সমমর্যাদা দেয়া না হয় তবে বাঙালী সমাজের মৌলিক অধিকার ও মাতৃভাষা আসামের বাংলা ভাষা অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো বৃহত্তর আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।” এই সম্মেলনের পরে শিলচর,করিমগঞ্জ,হাইলাকান্দির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে (শ্রী পরিতোষ পাল চৌধুরী, কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হরেন্দ্রনাথ জ্যোতিষশাস্ত্রী, শ্রী নির্মলকৃষ্ণ মুখোপধ্যায়, সন্নাসী উপগুপ্ত, অতুল পাল প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য) ‘কাছাড় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে এবং সরকারকে চরমপত্র দেয়।
‘সংগ্রাম পরিষদ’ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৬১ সালের ১৯ মে থেকে সমগ্র কাছাড়ে (বর্তমান বরাক উপত্যকা) বাংলাকে সরকারী ভাষা করার দাবীতে অহিংস-অসহযোগ (সত্যাগ্রহ) গণ-আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৬১ সালের ১৮ মে রাত বারোটার পর থেকে বিভিন্ন বয়সের বাংলা ভাষা-ভাষীরা শিলচর রেলস্টেশনে অহিংস অবস্থান ধর্মঘট পালনের জন্য সমাবেত হতে থাকে। রাত ভোর হয়। ১৯ মে সকাল থেকে উত্তেজিত জনতার প্রতিরোধের মুখে সমস্ত দোকানপাট বন্ধ থাকে বন্ধ থাকে ট্রেন, ট্রেন চালাতে ব্যর্থ হয় সরকার। বেলা বাড়ার সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী জনতার ঢল নামতে থাকে; ছিল অহিংস আন্দোলন অথচ পুলিশ জোর করে অনেককেই গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স’ানে নিয়ে যায়। দফায় দফায় লাঠিচার্জ, কাঁদুনেগ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশের সঙ্গে রেল-কর্মচারিরাও যোগ দেয় এবং বেলা আড়াইটার দিকে রেলস্টেশনে কর্তব্যরত বিএসএফের সদস্যরা হঠাৎ গুলিবর্ষণ শুরু করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে ১১ জনের মধ্যে তৎক্ষণাৎ শহীদ হন ৯ জন এবং ২ জনের একজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পরদিন রেলস্টেশনের পুকুরে পাওয়া যায় এবং অন্যজন হাসপাতালে মারা যায় রাতে। (১ম অংশ)
#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি
