ভয়// আফরোজা অদিতি

মাঝেমাঝে বাড়ির বাইরে যাওয়া ছাড়া বেশিরভাগ সময় বাড়িতে একলা থাকেন মমতাজ বেগম। সংসারের টুকটাক কাজ করেন, বই পড়েন। ছেলে মেয়েরা যার যার মতো চাকরি-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তিনি চাকরি করতেন। অবসরে গিয়েছেন। অবসরে যাওয়ার পরেই বদলেছে তাঁর কাজের রুটিন। অবসরে যাওয়ার কিছুদিন আগেই এই বাড়িটি কিনেছেন। প্রথম দিকে তেমন কিছু অসুবিধা হতো না কিন্তু এখন প্রায়ই মনে হয় এই বাড়িটাতে অন্য কেউ থাকে; যাকে দেখা যায় না!

প্রতিদিন রান্না করতে ভালো লাগে না। তাই যেদিন ভালো লাগে সেদিন রান্না করেন। তিনি রান্নাঘরে কাজ করছেন। বাসা শুনসান। ১৪ তলায় বাসা। পর্যাপ্ত হাওয়ার আনাগোনা। ১৪ তলার ওপরে আরও দুই তলা আছে। এই অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে পরিস্কার দেখা যায় আকাশ। ছাদের কিনার ঘেঁষে দাঁড়ালে চোখের সামনের শহরের অনেকটাই চলে আসে। মাঝেমধ্যে সূর্য ডোবার আগে ছায়া ছায়া গোধুলিতে ছাদে হাঁটতে যান মমতাজ বেগম। কালীসন্ধ্যার আগেই ঘরে ফেরেন। ছোটবেলায় দাদীর কাছে শুনেছেন কালীসন্ধ্যায় তেনারা বের হন। দাদীকে কখনও জ্বীন-পরী-ভূত-পেত্নীর নাম বলতে শোনেননি। সবসময় বলতেন ‘তেনারা’।

কড়াইয়ে তেল গরম হয়ে উঠেছে। তিনি পেঁয়াজ ছাড়লেন। যে মূহুর্তে পেঁয়াজ ছাড়লেন ঠিক তখনই ডোর-বেলের আওয়াজ পেলেন। একটু বিরক্ত হলেন। দরোজা খুলতে গেলে পেঁয়াজ পুড়ে যাবে। পুড়ে যাওয়া পেঁয়াজে তরকারী ভালো লাগে না। চুলার আঁচ কমিয়ে দিলেন। দরোজা খুললেন কিন্তু কেউ নেই। মমতাজ বেগম ভাবলেন পাশের বাসার বেলের আওয়াজ শুনেছেন হয়তো। নিজেই হাসলেন। ইদানিং এইরকম হয়েছে। মাঝেমাঝেই ভুল শোনেন। তিনি রান্নায় মনোযোগি হলেন। এমন সময় ফিসফিস আওয়াজ পেলেন। এরকম ফিসফিসানি শুনেছেন গতকাল। তিনি গিয়েছিলেন আগারগাঁও। প্রবীণ হিতৈষী কেন্দ্রে। ওখানে মিটিং ছিল। নতুন কমিটি হলো। তিনি কমিটি ছেড়েছেন এবারে। তবুও অনেকদিনের অভ্যাস। একটু কথাবার্তা, একটু দেখাশোনা। ভালো লাগে। ওখান থেকে নেমে গাড়িতে বসার জন্য দরোজা খুলছেন তখন মনে হলো কেউ বলছেন, একটু! তিনি সবসময় গাড়ির বামপাশে বসেন। ডানদিকে বসতে একটু অস্বস্তি হয়; কোন কারণ নেই তবুও হয়। তাই বাঁ পাশের দরোজাটাই খুলেছেন। তিনি পেছনে তাকিয়ে ওদের বিদায় জানিয়ে গাড়ির ভেতর তাকালেন; কেউ নেই তবে কেউ বসে থাকলে যেমন সীটটা একটু নিচু হয়ে যায় তেমনি নিচু হয়ে আছে। একটু ভয় পেয়েছিলেন। কালকের ভয়টা অবচেতনে ছিল হয়তো। তাই এই মূহুর্তে মনে হচ্ছে ফিসফিস করছে কেউ! কিন্তু আবারও শুনলেন। তার মনে হলো মা-মেয়ে কথা বলছে।
কী ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি এলে, ক্লাস বন্ধ হলো নাকি শরীর ভালো লাগছে না ? মায়ের প্রশ্ন। না মা, ক্লাস হচ্ছে। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। জ্বর আসছে মনে হয়। মেয়ে কথা বলল।
না ! গা তো ঠান্ডা।
মমতাজ বেগমের মনে হলো মেয়ের কপালে বা গলার কাছে হাত দিয়ে দেখলেন মা। হঠাৎই মমতাজ বেগমের গা ছমছমিয়ে উঠল। ভয় পেলেন। একবার মনে হলো ঘরে চলে যাবেন। ভয় করলেই ভয় জেঁকে ধরে। তিনি ভয়-ভীত ঝেড়ে ফেলে আবার রান্নার কাজে মনে দিলেন। আর কোন ফিসফিসানি শুনলেন না তিনি। তরকারি রান্না শেষ হলে খাবারঘরে তরকারির বাটি রাখতে যাবেন তখন মনে হলো তাঁর পেছর দিয়ে কেউ ওয়াসরূমে দিকে গেল। তিনি ওয়াসরূমে এলেন। না, দরোজা যেমন ভেজানো ছিল তেমনি আছে। অন্যটার দরোজা বন্ধ। ধাক্কা দিতে গিয়েও কী মনে করে দিলেন না।

আবার মনে পড়ল দাদীর কথা। দাদী বলতেন ‘তেনারা’, আমাদের সঙ্গেই থাকেন। একই সঙ্গে খান, এই সঙ্গে নামাজ পড়েন। একই বাথরূমে যান। শুধু রাতে ঘুমানোর স্থান আলাদা। দাদী অবশ্য বাথরূম বলেননি, বলেছেন পায়খানা আর পেসাবখানা। গ্রামে তো বড়োঘর, ছোটোঘর আর গোসলখানা সব আলাদা আলাদা। এখন গ্রামে অবশ্য একত্রে হয়েছে। আগে গ্রামের বড়োঘর মানে পায়খানা তো থাকতো বাড়ির চৌহদ্দীর বাইরে। দাদীর কথা এখনও মনে রেখেছেন তিনি। দাদী বলতেন ‘তেনারা’ যখন ওয়াসরূমে যান ভুল করে সেখানে কেউ ঢুকে পড়লে তাদের সঙ্গে তো নয় বাড়িতে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া মারামারি হয়। তাই সাবধান! মমতাজ বেগম সাবধান হলেন। ওয়াসরূমের দরোজা খুললেন না। এমনিতেই স্বামী মাহতাবের সঙ্গে প্রায়ই খিটিমিটি লাগছে।

মমতাজ বেগম সেই ৮ বছর বয়সে ফিরে গেছেন। তার মনে পড়ল সেদিন শেষরাতে তাঁর বাথরূম পেয়েছিল। তাঁদের বাথরূম ছিল বাগানের বাইরে শিমুল গাছের নিচে। আগেরদিন বাথরূমে গিয়েছিলেন; হঠাৎ সরসর আওয়াজে খুব ভয় পেয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। দাদী বলেছিলেন, ভয় কি, ‘তেনারা’ মনে হয় গাছে রয়েছেন। ‘তেনাদে’র মধ্যে যারা খারাপ তারা ওরকম কাজ করে। সেদিনের ভয় মমতাজ বেগমের মনে গেঁথে ছিল। তাই রাতে একা যাওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারেননি সেসময়। মাকে বলেছিলেন। সে কথা বলতেই মা বললেন, চল। গাছতলায়ও দেখি আম পড়েছে নাকি। তখন আমের সময়। বিদ্যুৎ নেই হ্যারিকেন নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। ছোটোবেলা থেকেই তিনি খুব ভীতু। তাঁর এক চাচা রাজনীতি করতেন। তাঁকে ধরতে পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করেছে। পুলিশ দেখে মমতাজ বেগম তাঁর মায়ের পেছনে লুকিয়ে পড়েছিলেন। পুলিশকে তিনি খুব ভয় পেতেন। মমতাজ বেগম ছোটোবেলার কথা মনে করে হাসলেন। তাঁর মনে হলো এতোটা বছর পার হয়েছে এখনও তেমনি ভীতুর ডিমই আছেন তিনি।

মমতাজ বেগম কিছুক্ষণ বই পড়লেন। তারপর স্নান করলেন। নামাজ আদায় করলেন। খেতে বসলেন। তরকারির বাটিতে দুই টুকরা মাছ কম কেন ? কোথায় গেল ! ভাত ঠিক আছে। তাহলে কি বেড়াল। কিন্তু এখানে তো বেড়াল আসে না। তিনি আজ ক্ষীর রান্না করেছেন। ছেলেটার জন্মদিন। বাটির ঢাকনা তুললেন। ও মা ! এ কী ! ক্ষীরের বাটির ক্ষীর কোথায় গেল ! মহা মুসিবত ! এবারে তিনি ভয় পেলেন। এমন সময় কলিং বেল। তিনি দরোজা খুলতে ভয় পাচ্ছেন। মোবাইল বেজে উঠল। আঁৎকা মোবাইলে হার্টবিট মিস হলো একটা। মোবাইল বেজেই যাচ্ছে বেজেই যাচ্ছে। এবারে হাতে নিলেন মোবাইল। মেয়ে। এই মা, দরোজা খুলছ না কেন ? তোমার কী শরীর খারাপ লাগছে।

অফিস থেকে ফিরেছে মেয়ে। মেয়ের কন্ঠস্বরে স্বস্তি পেলেন মমতাজ বেগম। তাড়াহুড়ায় পায়ের বুড়ো আঙুলে ব্যথা পেলেন। হাতের আঙুল কেটে গেল সিটকিনিতে। মেয়ে অবাক। কী হয়েছে মা। তোমাকে অসুস্থ দেখাচ্ছে। মমতাজ বেগম কিছু বললেন না। শুধু ক্ষীরের বাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615