লেখার জগতে পা // আফরোজা অদিতি

আমার বাবা রাজনীতি করতেন। মা-ও রাজনীতিতে বাবার সহকর্মী ছিলেন। ভাইবোনদের মধ্যে আমি বড়ো। আমি ছোটোবেলায় পাবনায় এক বাড়িতে জায়গীর থেকে লেখাপড়া করতামম। ওখানে ওদের মতো করেই আমাকে থাকতে হতো। ওই বাড়িতে কাজ করতাম, পড়তাম, স্কুলে যেতাম। কাজ আর পড়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্পের বই পড়তাম, গান শুনতাম। ওই বাড়িতে রাজনীতির চর্চা থাকলেও ওই পরিবার ছিল জোতদার পরিবার। ওই পরিবারে যিনি রাজনীতি করতেন, তিনি ছিলেন বাবার রাজনৈতিক সতীর্থ। তিনি ১৯৭০ সালে “কুড়ে ঘর” মার্কা নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জিতেছিলেন।

আমাদের গ্রামে হাইস্কুল ছিল না। একটা হাইস্কুল ছিল সেটি ছিল আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় মাইল পাঁচেক দূরে ঈশ্বরদীতে। ওখানে আমার মামা, চাচা থাকতেন। কিন’ আমার বাবার রাজনৈতিক পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমার পাবনা শহরের ওই বাড়িতে থাকা। তখন একই মতাদর্শের রাজনৈতিক দল ছিল একটি পরিবারের মতো। আমি ছোটবেলায় তাই দেখেছি, দলের মতামত গুরুত্বসহকারে মেনে চলতো সেই দলের নেতা-কর্মীরা। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

মা ও বাবা, দুজনেই চেয়েছিলেন আমি রাজনীতি করি। আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি, তখন আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ছোটদের রাজনীতি’ নামের বইটি। কিন’ বইটি পড়তে আমার একটুকু ভালো লাগেনি। আমার এই রাজনীতি বিষয়ক বই পড়তে যেমন ভালো লাগেনি তখন, এখনও লাগে না। আমার এই ভালো না লাগা, ভালো চোখে দেখেননি আমার বাবার রাজনীতি সচেতন সতীর্থ-বন্ধুরা। বাবার বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মী, আব্দুল মতিন চাচা (ভাষা মতিন) তো একদিন বাবাকে বলেই বসলেন, ‘তোমার মেয়ে বুর্জোয়া হবে। সর্বহারার মেয়ে, সর্বহারার রাজনীতির মধ্যে থাকলেও থাকে বুর্জোয়াদের সঙ্গে তাই তো রাজনীতি ভালো লাগে না ওর।’ আমি তখন সর্বহারা বা বুর্জোয়া এসব বিষয়ের কিছুই বুঝতাম না, বুঝতে চেষ্টাও করতাম না। আমার কার্ল মার্কসের কবিতা ভালো লাগে কিন’ তার রাজনীতি বিষয়ক লেখা ভালো লাগে না। আমার লেনিন, ষ্ট্যালিন-এর জ্ঞানগর্ভ লেখা সেসময় ভালো লাগেনি। এখন অবশ্য মাঝে মাঝে পড়ি। তবে কখনই বিশ্বাস করি না ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’। আমার বিশ্বাস কলমই সমাজ বদলের হাতিয়ার হতে পারে। কলমের ডগায় মানুষের অধিকারের কথা, ভালোবাসার কথা, তাদের দেনা-পাওনার কথা লিখে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে সচেতন করে তোলা যায়। তবে নিরক্ষর মানুষের মাঝে লেখা পড়ে শোনাতে হবে; ভালো কথা সুস’ কথা জীবনের কথা মানুষকে শোনালে বা বুঝিয়ে বললে মানুষ বুঝে। মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে বললে বুঝতে পারে এবং নিজেকে বদলে নিতেও পারে। বর্তমানে তো আরও সুবিধা অন্তর্জালের যুগ; একটি ভালো লেখা খুব সহজেই মানুষের মনের দরোজায় পৌঁছে দেওয়া যায়। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় না।

আমি বিশ্বাস করি, বন্দুকের মাধ্যমে শুধু হিংসাত্নক মনোভাব বাড়ে। বাড়ে নৈরাজ্য, বাড়ে হতাশা। তবে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত। তাদের কাছে, বইয়ে কী লেখা আছে তা পড়ে না শোনালে তারা জানতে পারে না। আর অন্তর্জালে তো নয়ই। আগে যেমন গ্রামে গ্রামে পুঁথি পাঠের আসর বসতো তেমনই যদি বই পড়ে শোনানোর ব্যবস’া করা যেতো তাহলে এ সমাজ বদল করার কোন অসুবিধাই থাকতো না। লেখক, কবি সহিত্যিকদের কথা ও লেখা সাধারণ মানুষের কাছে খুব কম পৌঁছায়। লেখাগুলো পড়ে শোনানোর ব্যবস’া নেই, তাই সাধারণ মানুষ বেশীরভাগ কবি,সাহিত্যিকের নাম জানে না। রাজনীতিবিদরা এই কৌশল কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতে পেরেছে। দেশের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষকে তারা, তাদের কথার ফাঁদে আটকে দিয়েছে খুব সহজেই। সাধারণ মানুষ, যতো রাজনীতিবিদদের নাম জানে, ততো কবি-সাহিত্যিক লেখকদের নাম জানে না। যতো জানে রাজনীতিবিদদের ভাষ্য, ততো জানে না লেখকদের কথা, লেখকদের ভাষা। অনেকে তো বইয়ের কাহিনী দূরের কথা বইয়ের নামই বলতে পারবে না। এই সব কথা মনে রেখে আমি লেখক হতে চেয়েছি, লিখতে চেয়েছি।

রাজনীতির বই নয়, আমি, পড়তে ভালোবাসি রূপকথার বই। ছোটোবেলায় রূপকথার বই যখন পড়তাম তখন রূপকথার নায়িকা মনে হতো নিজেকে। ডাইনিবুড়ি, রাজকন্যাকে ১৪তলা বাঁশের ঘরে আটকে রাখতো, আর রাজপুত্র এলে তার লম্বা চুলের গোছা নামিয়ে দিতো। সেই গল্প পড়ে আমার মনে হতো, রাজকন্যার লম্বা চুলের মতো আমার চুল হবে। এ.পি নারকেল তেলের বিজ্ঞাপনের মতো আমার চুলের গোছা নিয়ে থাকবে আমার বান্ধবীরা। আমার চুল শুকাতে আলনা লাগবে। সিন্ডারেলার পরীকেও আমার খুব ভালো লাগতো। অনেক সময় মনে হতে আমার যদি ওই রকম একজন পরী থাকতো, কিংবা থাকতো ঝিনুকপরীর মতো কোন পরী। কখনও বা মনে হতো আমি অলিম্পিকে যাবো, খেলবো। সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণ করবো। এইসব কল্পনা থেকেই হয়তো আমার লেখার চেষ্টা।

বাবার রাজনীতির সুবাদে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি সহ অনেক রাজনৈতিক নেতা কর্মী আমাদের বাড়িতে এসেছেন। তখনকার রাজনৈতিক অবস’া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয়েছে। ছয় দফা, এগারো দফার আলোচনা শুনেছি। ‘লালটুপি’ সম্মেলন দেখেছি। রক্ত উত্তা্‌ল হওয়া গণ-সঙ্গীত শুনেছি। এইসব শুনে আর রাজনীতিবিদদের মধ্যে থেকে অবশ্য আমার রাজনীতিবিদ হওয়ার কথা ছিল, কিন’ তা না হয়ে আমি হয়েছি অতি অধম একজন সাধারণ মানুষ। কারণ আমি, কখনই নিজে যা বিশ্বাস করি না, তা করতে পারি না। আমি, আমার বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেছি। বই পড়ার অভ্যাস করেছি। পারিবারিক পাঠাগারে রাজনৈতিক বই ছাড়াও ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুবোধ ঘোষ, পাবলো নেরুদা, বনফুল, সুকান্তসহ অন্যান্য লেখকের গল্প, কবিতা, উপন্যাস। আমি গল্প, কবিতা, উপন্যাস পড়েছি, এবং পড়ছি। হয়তো বা আমার বিশ্বাস এবং বই পড়ার অভ্যাস থেকেই আমার কিছু লেখা বই আকারে উঠে এসেছে পাঠকের সামনে। আমি চন্দ্রের জাতিকা হওয়ায় জন্মগতভাবেই আমি লুনাটিক, কল্পদেশের মানুষ! ছোটোবেলা থেকেই কল্পনা করতে ভালোবাসতাম, এখনও কল্পনা করতে ভালোবাসি; অদ্ভুত সব কল্পনা, যার মাথামুন্ডু নেই। অনেক সময় কেটে যেতো আমার এই কল্পনার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। বকা-ঝকাও খেতাম প্রচুর। চুপচাপ বসে থাকতাম। এতো গেলো আমার কল্পনার কথা। কল্পনা করা, বই পড়া ছাড়াও আছে আমার গল্প শোনার ইচ্ছা। ছোটবেলায় আমি গল্প শুনতে ভালোবাসতাম। গল্প শোনার জন্য চলে যেতাম মেজ আপার কাছে। মেজ আপা, আমার চাচাতো বোন। স্কুল টিচার। খুব ভালো গল্প বলেন। মেজ আপার গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হতো আমি যদি ওই রকম গল্প লিখতে পারতাম। আমি অনেক সময় লিখতে চেষ্টা করেছি।
কিন’ হয়নি।

ছোটবেলার আর একটি অভ্যাস ছিল গান শুনে শুনে সেইসব গান খাতায় লিখে রাখা। তখন তো টেলিভিশন ছিল না, রেডিওতে গান শুনতাম আর লিখে রাখতাম। অন্য আরো অভ্যেসের মধ্যে ছিল চিঠি লেখা। কল্পনা করে করে লিখতাম চিঠি। গল্পের মতো সাজিয়ে চিঠি লেখা ছিল আমার পছন্দের বিষয়। চিঠিতে সব বিষয়ই থাকতো তবে বেশী থাকতো ভালোবাসার কথা। ক্লাস সিক্স থেকেই আমার শরৎচন্দ্র আর নিহাররঞ্জনে হাতে খড়ি। দেবদাস, হাসপাতাল, পরিণীতা, কালোভ্রমর, মাধবীভিলা মনের ভেতর গেঁথে যাওয়া বই। পড়তে পড়তে নিজেই কখন যে বইয়ের নায়িকা হয়ে যেতাম বুঝতেই পারতাম না। আর আমার লেখা চিঠিগুলোতেও এইসব ভালোবাসার কাল্পনিক ছাপ থাকতো। এই চিঠির জন্য গালাগালও খেতে হয়েছে। তারপরেও লেখা থামেনি। আমার সব সময় মনে হতো চিঠি লিখবো তার দৈর্ঘ হবে এক মাইল লম্বা। এখন হাসি পায়। তবে হাসি পেলেও দীর্ঘ একটা চিঠি লেখার ইচ্ছা এখনও আছে। তবে একথা স্বীকার করি, আমার লেখার হাতে খড়ি এই চিঠি লেখার মাধ্যমেই। চিঠি লিখতাম আর ভাবতাম এভাবে তো গল্প-কবিতা লেখা যায়। পরে অবশ্য চিঠিতে লেখা একটা বই প্রথম পড়ি। বুদ্ধদেব গুহের লেখা ‘একটু উষ্ণতার জন্য ’। বইটি খুব ভালো লাগে। তখন ১৯৭৭ সাল। লেখাপড়া শেষে চাকরিতে যোগ দেই। বন্ধুবান্ধবের পরিধি বাড়তে থাকে। এদের মধ্যেই আমার লেখা পড়ার বন্ধু পেয়ে যাই। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এরকম কয়েকজন থাকে, যাদের অনুপ্রেরণায় তাঁর এগিয়ে যাওয়া। আমিও সেরকম কয়েকজন পেয়ে যাই। তাঁরা আমার লেখা পড়তো এবং ভালো মন্দ বিষয়ে পরামর্শ দিতো। পত্রিকায় ছাপতে দিতো। সে সময় আমাদের ব্যাংকে লেখার প্রতিযোগিতা হতো। আশির দশকে ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখে পুরস্কার পেয়েছি। এরপর আমার
এক সহকর্মী বলেন, তাঁকে এমন একটা কবিতা লিখে দিতে হবে যে কবিতাটি পছন্দ করবে তাঁর বউ! এবং বউ তার সব রাগ, অভিমান ভুলে গিয়ে ফিরে আসবে তাঁর কাছে; ঝগড়া করে বউ বাপের বাড়ি গিয়েছিল। আমি লিখে দিয়েছিলাম। অবশ্যই সেটা আমার নামে নয়, সেই সহকর্মীর নামে। এক পত্রিকায় সেটি ছাপাও হয়েছিল। আমার সেই সহকর্মীর বউও রাগ,অভিমান ভুলে গিয়ে ফিরে এসেছিল তাঁর কাছে। আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। এবং আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল, কিছু না কিছু হোক আমি লিখতে পারি। এবং তা কেউ না কেউ পছন্দ করে। বলা যেতে পারে সেই থেকেই আমার লেখার পথচলা।

আমার লেখার পাঠক-ভক্ত-বন্ধু-স্বজন সকলে আমার লেখা পড়তো পরামর্শ দিতো। প্রথমে লেখা প্রকাশ হয় আমার সহকর্মী নাট্যকার, নাট্যশিল্পী প্রদীপ কাঞ্চনের পত্রিকাতে। অফিসের ফাঁকে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতো; সেখানে আমার লেখা ছাপা হয়েছে। এখন সুইডেন থেকে ‘অনুশীলন’ নামে পত্রিকা বের করে। যখন দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় তখন থেকে লেখার প্রতি উৎসাহ বেড়ে যায়; লেখায় মনোযোগী হই। ১৯৮৪তে প্রথম বই প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিল আমার ভাই শহীদুল হাসান স্বপন (প্রয়াত)। স্বপন নিজেও লেখালেখি করতো। বই প্রকাশ হলো, অবশ্যই তা প্রেমের কবিতা; বইটির নাম ‘সেই মন নেই’; অবশ্য বইটি আমার মায়ের পছন্দ হয়নি, কারণ আমার মা রাজনীতি করতেন; তাঁর পছন্দ ছিল সেই ধরণের লেখা। বইটি দেখে আমার মা বলেছিলেন, এসব প্যানপ্যানানি কেন লিখিস? লিখতেই যদি হয় তবে সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট, সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে লেখ। মায়ের কথায়, তখন কবিতা ছাড়াও গল্প আর প্রবন্ধ লেখার চিন্তা ঢুকে যায় আমার ভেতর। গল্প প্রবন্ধ অনুবাদ বা অন্যান্য বিষয়ে লিখলেও, কবিতা আমার পছন্দ। আমি মনে করি, কবিতা হলো নরম প্রেমময়। নূপুরের মিষ্টি ধ্বনি থাকবে তার চলার ছন্দে। আর গল্প, গদ্য হলো কঠিন, পাথুরে। আমি গল্প লিখলেও আমার কল্পনাপ্রবণ মনের চাহিদা মেটাতে প্রেমের কবিতা লিখি, লিখি কাল্পনিক গল্পকথা। আমার প্রথম কল্পকথার গল্প ছাপা হয় তখনকার ‘মুক্তকন্ঠ’ নামের দৈনিকে। কবিতা, গল্প ছাপা হতো ইত্তেফাক, ভোরের কাগজ, বাংলাবাজার, জনকন্ঠে। নারী বিষয়ক রচনাও ছাপা হতো এসব পত্রিকায়। ‘কি রহস্য’ (সত্য কাহিনী অবলম্বণে লেখা) নামে ছাপা হতো ‘প্রিয়জন’ নামের পত্রিকায়। ছোটোকাগজগুলোতেও লিখেছি, লিখেছি বিদেশের পত্রিকায়। এখনও লিখি। জানি না এগুলো লেখা হয়েছে কিংবা হচ্ছে কি না। এসব লেখার পর দিন গড়িয়ে গেছে, যাচ্ছেও। আমি, লেখক হয়ে উঠতে পেরেছি কি না জানি না। এই কথা বলতে পারবে পাঠক, বলতে পারবে ভবিষ্যত।

(এই লেখাটি অনেক আগে লিখিত)

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615