তখন ছিল ফেব্রুয়ারি এবং শীতকাল খুব তাড়তাড়ি এসেছে। শিশুরা সুখী ছিল কারণ শীতে কষ্ট না পেয়ে সূর্য তাপে গরম হয়ে ওরা খুবই সুন্দরভাবে স্কুলে যেতে পারছিল। মিস জোনস্ প্রকৃতি বিষয়ের শিক্ষক; তিনি প্রকৃতি সম্পর্কে শিক্ষা দান করেন। ক্লাস শেষে একদিন তিনি বললেন,“এই সপ্তাহে বদ্ধ ঘরের বাইরে অনেক বেশি দেখার বিষয় আছে। তাই আমি সত্যিই চাই, এই বসন্তে তোমরা তোমাদের চারপাশে ভালো করে লক্ষ্য করো এবং শোন। প্লিজ ,এই সপ্তাহ দেখ এবং শুক্রবার আমাকে জানাবে যে কোন উপায়ে কোন মজাদার জিনিস পেয়েছ তোমরা। “আমরা কোন ফুল পাবো না এটা ঠিক মিস জোনস্।” বলল বিলি। মিস জোনস্ বললেন, “যদি তুমি ঠিক ঠিক দেখ পাবে। তুমি গ্রাউন্ডসেল পাবে, হ্যাঁ অবশ্যই সাধারণ ফুলের বাইরে একটি বা দুটি গোল্ডেন হর্স পাবে। এবং যদি কান পেতে শোন তাহলে ছাফিন্স পাখির বসন্তের গান শুনতে পাবে এবং শুনতে পাবে টিট পাখিদের উচ্চস্বর।”
বিলি খুব ভালো প্রকৃতির ছেলে ছিল না। সে তার চোখ-কান ভালো কাজে ব্যবহার করলো না। পাখিরা বিলির চারপাশে পাগলের মতে গান গাইছিল কিন’ সে তাদের শুনতে পেলো না। সে অর্ধ ডজন ফুল পার হয়ে গেল কিন’ সে তাদের দেখতে পেলো না। কিন’ মিস জোনস্কে খুব পছন্দ করে বিলি এবং সত্যিই তাকে খুশি করার জন্য ব্যাকুল ছিল। সে চেষ্টা করলো প্রকৃতির ভালো চিহ্নগুলো দেখতে এবং তার মাকে দেখাতে। সে ঠিক করলো বিকেলে স্কুলের পরে প্রকৃতির আশ্চর্যজনক বিষয়গুলো দেখার জন্য হাঁটবে। কিন’ ঐ বিকেলে তার মা বিলিকে বাড়ি থেকে বের হতে দিলেন না কারণ তার চাচা বিকেলে চা-পর্বের পরে আসবেন বলেছেন। তারপরের দিন বিকেলে সে জানতো না তার এতো হোমওয়ার্ক আছে, যা শোয়ার আগে পর্যন্ত শেষ করতে পারবে না। সেহেতু তার হাঁটার কোন সময় নাই। “কিছু মনে করো না” বিলি নিজেই বলল নিজেকে। “আগামিকাল বৃহস্পতিবার। আমি আগামিকাল যাবো। আজ রৌদ্রকরোজ্জ্বল সুন্দর একটি দিন, সেজন্য কিছু ফুল ফুটতে পারে।”
কিন্তু আগামিকাল যখন এলো তখন তার মা তাকে বললেন, “বিলি, বাইসাইকেল রাখার শেডটি আজেবাজে জিনিসে ভরে আছে, আমি তাড়াতাড়ি বাইসাইকেল বের করতে পারবো না যখন বাজারে যাবো। তুমি কি বিকেলে পরিস্কার করতে পারবে, বাবা।” “ওহো মা, আমি সত্যিই হাঁটতে যেতে চাই।” বিলি বলল। “তাহলেও আমি তাড়াতাড়ি শেড পরিষ্কার করে দিবো, মনে করি সময় থাকবে।” “ধন্যবাদ সোনা বাবা” ওর মা বললেন। সেইদিন চা খাওয়ার পরে সে বাইসাইকেল রাখার শেডটি পরিস্কার করার জন্য ঢুকলো। এটি, একটি অন্ধকার ছোট জায়গা; এখানে শুধু একটি নোংরা ছোট জানালা আছে। এবং ভেতরটা জঞ্জালেপূর্ণ এবং এলোমেলো।
বিলি শেডটি পরিস্কার করতে করতে ভাবলো “তার মা যে তাড়াতাড়ি বাইসাইকেল বের করতে পারে না তা খুব আশ্চর্যের বিষয় নয়।” বিলি পাত্র ও বাক্সগুলো একটার পর একটা রাখলো এবং বস্তাগুলো গুটিয়ে গাদা করে রাখতে রাখতে ভাবলো “এই কাজ করতে করতে বুড়া হয়ে যাবো।” সেই কাজ করতে আসলেই বিলির অনেক সময় লেগেছিল। তার কাজ শেষ হওয়ার আগেই চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল এবং ঐ সময়টা হাঁটার জন্য উপযুক্ত ছিল না। বিলি আশাহত হলো। সে মিসেস জোনসের জন্য কিছুই নিতে পারবে না; মিসেস জোনস্ রেগে যাবেন এবং ওকে কোন নম্বর দিবেন না। এই কাজটা ভালো হলো না তারপরেও বিলি ভাবলো “মা বলেছেন, তাই এই বিষয় নিয়ে রাগ করে কোন লাভ নেই।”সে ঝাড়ু নিয়ে দেয়ালের কোণের মাকড়সার জাল পরিষ্কার করার চিন্তা করলো।
বিলির মা তাকে একটি মোমবাতি ও মোমবাতি-দান দিয়েছিলেন যাতে মোমবাতি দানের ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে সেই আলোতে কাজ করতে পারে বিলি। বিলি যখন মাকড়সার জাল পরিষ্কার করছিল তখন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলো কিছু একটা পাখা ঝাপটিয়ে ওর হাতে এসে পড়লো। বিলি ভয় পেয়ে বলল, “এটা কি?” এবং সে তার হাত মোমের আলোর কাছে এনে খুব আশ্চর্য হয়ে দেখলো ওর হাতের ওপর খুব সুন্দর একটি প্রজাপতি; এটির সুন্দর পাখা একবার খুলছে একবার বন্ধ করছে। বিলি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে বলল, “বছরের এই সময়ে প্রজাপতি! এই মাকড়সার জালের মধ্যে কিভাবে সম্ভব? কী সৌভাগ্য আমার!”
বিলির হাতের ওপর বসেছিল প্রজাপতিটি। সে খুব উত্তেজিত হলো। “ওহ্ মাই গুডনেস- মিস জোনস্ এটি দেখে কী বলবেন আমাকে? এটি যে কোন ফুলের চেয়ে সুন্দর, যে কোন পাখির গানের থেকে মধুর! যে কেউ ফুল খুঁজে পেতে পারে এবং পাখির গান শুনতে পারে কিন’ কেউ কি বছরের এই সময়ে প্রজাপতি খুঁজে পেতে পারে।” বিলি উচ্চস্বরে ডাকলো মাকে। “মা!মা! তাড়াতাড়ি এখানে এসো এবং ছোট একটি পিচবোর্ডের বাক্স নিয়ে এসো!” তার মা তাড়াতাড়ি বাক্স নিয়ে এলেন এবং বিলি তার মাকে প্রজাপতিটি দেখালো। “ও-মা, কি সুন্দর!” তার মা আশ্চর্য হয়ে বললেন। তার মা আরও বললেন, “বিলি, তুমি কি মিস জোনস্- কে এটি দেখাতে নিয়ে যাবে? এটি শান্ত থাকবে যখন তখন বাক্সে ভরবে।” বিলি খুব তাড়াতাড়ি বাক্সে রাখলো প্রজাপতি যাতে উড়ে না যায়। সকালবেলা প্রজাপতি নিয়ে স্কুলে গেল বিলি।
মিস জোনস্ প্রকৃতি বিষয়ের ক্লাস নিতে আসলেন। হ্যারিয়েট বলল, ও ছাফিন্সের ‘পিংক পিংক’ ডাক শুনেছে এবং জর্জ দুটি চড়ুই দেখেছে যাদের গলায় কালো বিবস আছে। ওদের কথা শুনে মিস জোনস্ বললেন,“ভালো ছেলেরা, নতুন বছরে ছোট চড়ুইদের গলার নিচে চেইনের মতো কালো পালক গজায়।” ফুলসহ অনেকগুলো ছোট হলুদ কাশের মতো গ্রাউন্ডসেল এনেছে জেনি। রোজী ডজনখানেক ছোট তারাফুলসহ আগাছা এনেছে। রবার্ট অহংকারী সুরে বলল,“মিস জোনস্ আমার বাগানের কিছু বরফ কণা এনেছি আমি।” মিস জোনস্ বললেন, “সুন্দর!” তিনি তাদের সংগ্রহের জন্য নম্বর দিলেন। সব শেষে এলো বিলির পালা। মিস জোনস্ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বিলি, তোমার কি আছে বলো আমাদের?” বিলি বলল,“আপনাকে দেখানোর মতো কিছু আছে।” বিলি তার ডেস্ক থেকে বাক্সটা বের করলো এবং সেটি খুলে একটি সুন্দর প্রজাপতি বের করলো; প্রজাপতি পাখা ঝাপটিয়ে রূমের মধ্যে উড়লো। সব বাচ্চারা আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করতে লাগলো। “আরে,আরে, এই শীতের সময়ে কি সুন্দর প্রজাপতি! বিলি তুমি খুব ভাগ্যবান! কোথায় পেলে এই প্রজাপতি?” বিলি বলল, “যদি ফুল পাখি পাই সে কথা ভেবে এই সপ্তাহের প্রতি বিকেলে হাঁটতে যাবো ঠিক করেছিলাম; কিন্তু হাঁটার জন্য সময় পেলাম না। এবং আমি বৃহস্পতিবার চা খাওয়ার পর হাঁটার জন্য বের হবো ঠিক সেই সময় বাইসাইকেল রাখার শেডটি পরিষ্কার করার কথা বললেন মা। আমি না বলতে পারলাম না; কীভাবে পারি? মা যখন বললেন, আমি কাজ করতে শুরু করলাম। যখন ঝাড়- দিয়ে মাকড়সার জাল পরিষ্কার করছিলাম তখন পাখা ঝাপটিয়ে এই প্রজাপতিটি আমার হাতে এসে বসেছিল।” মিস জোনস্ বললেন,“এটি ময়ূর প্রজাপতি। প্রকৃত সুন্দর, বিলি। কিছু প্রজাপতি ময়ূরের মতো এবং কিছু রেড অ্যাডমিরালের মতো; পুরো শীতকাল ঘুমায় এরা; এই প্রজাপতি তোমাদের শেডটি ঘুমের জন্য পছন্দ করেছে। ওরা ঘুমানোর জন্য অন্ধকার কোন পছন্দ করে।”
“আমি সৌভাগ্যবান, তাই না?” বলল বিলি।
“ঠিক! তুমি তোমার মায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েছ এবং মায়ের কাজ করে দিয়েছ,খুব ভালো।” বললেন মিস জোনস। মিস জোনস্ আরও বললেন,“তোমার নিজের কাজের মাধ্যমে তোমার সৌভাগ্য এসেছে। আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি নম্বর দিবো বিলি- বেশি নম্বর ভালো কাজের জন্য এবং প্রজাপতি পাওয়ার জন্য; খুব ভালো এমনি কাজ করো।” বিলি খুব খুশি হলো।
আমি ভাবছি, তোমরাও যদি তোমাদের শেডের অন্ধকার কোনে কোন একটি ঘুমন্ত প্রজাপতি পেয়ে যাও, খুব ভালো হয় তাই না!
[বিলির প্রজাপতি, একটি অনুবাদ গল্প। বিলি’জ রাটারফ্লাই , এই গল্পের মূল লেখক এনিড ম্যারি ব্লাইটন (১১ আগস্ট ১৮৯৭-২৮ নভেম্বর ১৯৬৮)।]
