ছোট্ট দুটি পরী। ওদের একজন কিম ও অন্যজন মাইকেল। বনের মধ্যে একটি গাছে ওরা বাস করতো। একদিন এক কাঠুরিয়া ঐ গাছটি কেটে টুকরো টুকরো করার জন্য তার ধারালো কুঠারখানি নিয়ে দাঁড়ালো গাছের নিচে। গাছের নিচে কাঠুরিয়াকে দেখে কিম ও মাইকেল খুব চিন্তিত হলো। চিন্তিত কিম বলল, ‘আমাদের এবার যেতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি যেতে হবে; না-হলে আমাদের সব আসবাব নিচে পড়ে নষ্ট হবে। তাড়াতাড়ি চল মাইকেল্।’ বলে তাড়া লাগালো কিম।
এরপর পরী দুজন তাদের আসবাব কাঁধে করে গাছের ওপর থেকে নামিয়ে ঘাসের ওপর রেখে দাঁড়িয়ে ভাবতে শুরু করলো। কোথায় যাবে ওরা। কিন্তু তাদের যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না! ঐ বনে যতো পুরানো থাকার মতো উপযুক্ত গাছ ছিল তা কেটে কেটে যে যার মতো তাদের বাড়ি নিয়ে গেছে। ওরা খুব চিন্তা করছিল। চিন্তিত কিম, মাইকেলকে বলল, ‘এখানে থাকবো কোথায়? নদী তীরে একটিও গর্ত নেই যে থাকবো! একটি গর্ত আছে সেখানে একটি খেঁকশিয়াল বাস করে কিন’ তার গায়ে বিশ্রি গন্ধ।’ ওর কথা শুনে মাইকেল বলল, ‘না, না, আমরা ওখানে যেতে পারবো না। সবসময় নাকে-মুখে কাপড় গুঁজে থাকতে পারবো না।’ ওর কথা শুনে কিম বলল, ‘চল, এগিয়ে গিয়ে দেখি কোন খালি বাড়ি পাই কিনা।’
এরপর তারা অন্য একজন ক্ষুদে পরীর কাছ থেকে একটা ঠেলাগাড়ি ধার করলো। তারা ধার করা ঠেলাগাড়িতে তাদের ছোট ছোট বিছানা, দুটি চেয়ার, টেবিল, আলমারি, মাদুর, পর্দা ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে রওয়ানা হলো। তাদের বড় অসহায় দেখতে লাগছিল। যেতে যেতে তারা একটি বড় বাড়ি দেখতে পেলো। তারা ঐ বাড়ির খোলা জায়গা দিয়ে বাগানে এলো। ঐ বাগানে ছোট্ট একটি খালি বাড়ি ছিল। বাড়িটি বাদামি রঙের এবং বিশাল একটি খোলা দরোজা ছিল। কিম বাড়িটি দেখে দৌড়ে এসে চিৎকার করে বলল, ‘ মাইকেল, এই দেখ, একটি খালি বাড়ি। আমাদের মাপ মতোই! কিন’ কীভাবে থাকবো? এখানে তো কিছু পুরানো স্ট্র ছাড়া কিছুই নেই।’ ওর কথা শুনে মাইকেল বলল, ‘এই ভালো। কিন’ মজার ব্যাপার হলো এটি একটি বদ্ধ ঘর কিম, এখানে কোন দরাজা, জানালা নেই।’ ‘এটি কোন বিষয় না, মাইকেল।’ বলল কিম। কিম আরও বলল, ‘আমরা খুব সহজেই দরোজা জানালা বানিয়ে নিতে পারবো। এখানে আমরা ভালোভাবেই আনন্দ করে থাকতে পারবো।’
বাড়িটি ঐ পরীদের জন্য উপযুক্ত ছিল। ঐ বাড়িটিতে একটিই ঘর। তারা তাদের বিছানা ঘরের এককোণে রাখলো। কিম বলল, ‘আমাদের এই বিছানা দিনের বেলা বসার শোফা এবং রাতের বেলা শোয়ার কাজ করবে।’ তারা ঘরের মাঝখানে টেবিল রেখে তার পাশে চেয়ার রাখল। এবং পিছন দিকে আলমারি রেখে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে দিলো। ঘরটি খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। ওদের কাছে জ্যামের বোতল ছিল সেটিকে ফুল রাখার জন্য টেবিলে রাখলো। মাইকেল আলমারির ওপর ঘড়ি রাখলো যেটি টিক-টিক-টক-টক শব্দে চলতে লাগলো। ঘড়ির শব্দ শুনে কিম বলল, ‘টেবিলে ফুল এবং ঘড়ির শব্দ হচ্ছে, এখন এটি বাড়ি বাড়ি মনে হচ্ছে, তাই না।’
পরীরা খুব সুখে ছিল। বড় বাড়িটির বাগানের পেছনের এই ছোট বাড়িটি ছিল ইটের তৈরি। বড় বাড়িটির ছোট দুটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে মাঝে মাঝেই বাগানে খেলতে আসতো কিন’ কখনও এই পরীদের এখানে ঢুকতো না। কেউ এখানে আসে না দেখে কিম বলল, ‘এটি আমাদের জন্য ভালো যে এই বাড়িটি বাগানের পেছন দিকে হওয়ায় কেউ আসে না কখনও। তবে মাইকেল দরোজার কি হবে? গতকালের বৃষ্টিতে ভিজে গেছে মাদুর।’ পরী দুজন এক টুকরা কাঠ কুড়িয়ে দরোজা বানিয়ে তাতে নীল রঙ করে ঝুলিয়ে দিলো। দুটি কব্জা লাগিয়ে দিলো যাতে দরোজাটি খুব সহজেই খোলা ও বন্ধ করা যায়। তারা দরোজায় কড়া লাগালো, পাশে একটি চিঠির-বাক্স লাগালো। এরপর মাইকেল বলল, ‘এখন ছোট দুটি জানালা বানানো প্রয়োজন কারণ যখন দরোজা বন্ধ করবো তখন খুব অন্ধকার লাগবে।’
তারা বাগান থেকে ভাঙা কাঁচ সংগ্রহ করে জানালা বানালো এবং তা পরিস্কার করে নীল পর্দা ঝুলিয়ে দিলো। পর্দা ঝুলিয়ে কিম বলল, ‘সত্যিই খুব সুন্দর! দরোজার নীল রঙ, কড়ার উজ্জ্বলতা এবং জানালার পর্দা দেখতে খুব ভালো লাগছে। আমাদের একটি পার্টি দেওয়া উচিত।’ কিমের কথা শুনে মাইকেল বলল, ‘হ্যাঁ। কিন' আমরা যদি পার্টি দেই তাহলে কেক তৈরি করতে হবে। কেক তৈরি করতে ওভেন আর চিমনির প্রয়োজন আর তুমি তো জান এখানে চিমনি নেই।’ তারা চিমনি বানালো আর ক্ষুদে এক পরীর কাছ থেকে ছোট ওভেনও কিনলো। তারা ওভেন বসিয়ে একটি সুন্দর কেক বানালো। ওরা এই প্রথম রুটি এবং কেক বানালো।
পার্টিতে বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে এসে কিম বলল, ‘সকলে আমাদের এই ছোট্ট বাড়িটি পছন্দ করবে। তারা ভাববে আমরা খুবই ভাগ্যবান যে এই রকম একটি বাড়িতে থাকি।’ পার্টির দিন কিম ও মাইকেল পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রান্না শুরু করলো। তারা মাদুরটি ঝেড়েমুছে, জানালা পরিস্কার করে কড়াগুলো পালিশ করলো তারপর অতিথিদের জন্য কেক রুটি বিস্কুট বানাতে আরম্ভ করলো। খুবই আনন্দে ছিল তারা। যখন ওরা রান্না করছিল তখন হঠাৎ বাইরে থেকে চিৎকার ভেসে এলো- ‘এখানে কেউ বাস করে।’ চিৎকার শুনে পরীরা জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে ছোট ছোট একটি ছেলে ও একটি মেয়েকে দেখতে পেলো। ছেলেটি খুব আশ্চর্য হয়ে এই বাড়িটির দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের দেখতে পেয়ে মাইকেল বলল, ‘হায় ঈশ্বর, ওরা যদি এই বাড়িতে বাস করতে চায় তাহলে কি হবে? আশাকরি ওরা আমাদের এখান থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইবে না।’ মাইকেলের কথা শুনে কিম বলল, ‘এর চেয়ে ভালো আমরাই জিজ্ঞেস করি।’ কিন’ পরীরা কিছু বলার আগেই দরোজায় টোকা দিল কেউ। দরোজার ছোট্ট কড়াতে শব্দ হলো – র্যাট-এ-ট্যাট-ট্যাট। কিম দরোজা খুলে দেখল ঐ দুটি ছোট্ট ছেলেমেয়ে। ছোট্ট ছেলেটি বলল, ‘হ্যালো, তোমরা কি এখানে থাকো।’ কিম বলল, ‘হ্যাঁ।’ আরও বলল, ‘আমি আশা করি তুমি কিছু মনে করোনি। বাড়িটি খালি ছিল, আর বাড়িটির মালিক কে তা জানার জন্য এখানে কেউ ছিল না, তাই আমরা কাউকে কিছু না বলেই এখানে থেকে গেছি। তোমরা কি এখানে এসে থাকতে চাও?’
কিমের কথা শুনে ছেলেমেয়ে দুটি হেসে গড়িয়ে পড়লো। ওদের মধ্যে মেয়েটি বলল, ‘না, এখানে থাকবো না। আমাদের বড় বাড়ি আছে। আমরা সেখানে থাকি, এখানে থাকবো না।’ এই কথা শুনে কিম বলল, ‘ওহ্ এই বাড়িটি তোমাদের নয়!’ ফিক করে হেসে ছেলেটি বলল, ‘এটি আমাদের কুকুর-ঘর। এখন আর আমাদের কুকুর নেই তাই দীর্ঘসময় ঘরটি খালি পড়ে আছে। আজ আমরা ধোঁয়া উঠতে দেখে এখানে এসে দেখলাম একটি চিমনি আর ছোট ছোট দুটি জানালা। আর সামনের দরোজায় কড়া।’ এরপর মেয়েটি বলল, ‘আমরা খুব আশ্চর্য হলাম এবং দেখলাম এই কুকুরের ঘরটি তোমরা সুন্দর করে সাজিয়েছ; যা আমি প্রথম দেখলাম।’
এই কথা শুনে কিম বলল, ‘এটি তোমাদের কুকুরের ঘর। তোমরা নিশ্চয় অন্য কুকুর রাখবে।’ ‘না, না, রাখবে না। মা বলেছেন কুকুর খুব বেশি ডাকাডাকি করে তাই কুকুর রাখা হবে না। তোমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।’ কিম জিজ্ঞাসা করলো, ‘সত্যি আমরা এখানে থাকতে পারি।’ ‘অবশ্যই’ মেয়েটি বলল। মেয়েটি আরও বলল, ‘আমরা কখনই তোমাদের সম্পর্কে কাউকে কিছু বলবো না। কিন’ আমরা মাঝে মাঝে এখানে এসে তোমাদের সঙ্গে কথা বলবো। তোমরা রাজী তো? তোমরা কি জান! এটি খুব উত্তেজনাকর বিষয় যে দুটি ছোট্ট পরী আমাদের বাগানের এই বাড়িতে বসবাস করে।’ ওদের কথা শুনে পরীরা খুব খুশি হলো। বলল, ‘তোমরা খুব ভালো। শোন এই বিকেলে আমাদের একটি পার্টি আছে, তোমরা এসো। তোমরা এখানে আরাম পাবে না জানি, তবে তোমরা বাইরে ঘাসের ওপর বসে রুটি,বিস্কুট খেতে পারবে।’ ছেলেমেয়ে দুটি আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। মেয়েটি বলল, ‘হ্যাঁ আমরা আসবো। আমরা তখন তোমাদের বন্ধুদেরও দেখতে পাবো। ও ছোট্ট পরী, আমার পুতুলের ছোট্ট টি-সেট যা নীল হলুদে মেশানো তা কি তোমরা পছন্দ করবে?’ মাইকেল বলল, ‘ধন্যবাদ। সত্যিই আমাদের বেশি কাপ-প্লেট নেই। আমরা তোমাদের কাছ থেকে ফেরত দেওয়ার শর্তে নিতে পারি।’ ওরা টি- সেট নিয়ে টেবিলের ওপর রাখলো।
ছেলেমেয়ে দুজন অনুমান করলো এই পার্টিতে অনেক পরী তাদের সুন্দর পোষাক পরে আসবে। ওরাও সুন্দর পোষাক পরে এসে কুকুর-ঘরের নীল দরোজায় টোকা দিলো। পার্টি খুব সাধারণ কিন্তু প্রীতিপূর্ণ ছিল।
আমি কিন্তু ঐ ছেলেমেয়ে দুটির নাম বলিনি কারণ ওরা চায় না কোন মানুষ এই পরীদের বাড়ি আসুক এবং ছোট এই পরীদের ভয় দেখাক। কিন্তু তোমরা ভাবতেও পারবে না তারা খুব ভাগ্যবান যে তাদের কুকুর-ঘর মাইকেল ও কিম নামের এই ছোট্ট পরী দুজন ব্যবহার করছে।
তোমরা জেনে রাখ, আমিও কিন্তু সেখানে যাইনি, ভালোবেসেও যাবো না কখনও।
( ছোট্ট পরীদের বাড়ি একটি অনুবাদ গল্প। মূল গল্প দি লিটল্ ব্রাউনি হাউজ, এই গল্পের মূল লেখক এনিড ম্যারি ব্লাইটন (১১ আগস্ট ১৮৯৭- ২৮ নভেম্বর ১৯৬৮ )।
