ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে ঘুম ভাঙে মিতার। সকাল দশটা। এলার্ম বাজছে। ঘড়িটা কাছে টেনে এলার্ম বন্ধ করে দয়ে। এগারোটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আজ ঘুম থেকে উঠতে ভাল লাগছে না ওর। এই জীবনটাকে বড় দীর্ঘ মনে হয় এখন; অনেকটাই দীর্ঘ! মনে হয় অনেক দিন, মাস, বছর শুধু চলছে আর চলছে। আর কতদিন চলবে এভাবে? কতোদিন আর নোঙর ছাড়া নৌকার মতো ঘুরপাক খেয়ে ফিরবে একই বৃত্তে। কোনদিন কি সি’র নিশ্চিত একটা জীবন পাবে না ও? অনিশ্চিত জীবন আর কতোদিন?ওর জীবনটা এমন কেন? কেন আর দশজনের মতো হলো না। কেন এতো অশান্তি, এতো দুঃখ। সেই কতো যুগ আগে থেকে চলছে ওর এই ভেসে বেড়ানো। ওর এই দুঃখ বয়ে বেড়ানো।
ওর যখন দশ তখন একদিন ঘুম থেকে ডেকে ওর বাবা পাশের ঘরে নিয়ে লাল বেনারসিতে ঘোমটা দেয়া এক মহিলাকে দেখিয়ে বলেছিল, ‘তোর মা।’
মা এসেছে। দুই বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ওর মা ফিরে এসেছে। বুকের মধ্যে এক ঝাঁক প্রজাপতির পাখার শব্দ পাচ্ছিল সেদিন মিতা। মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে দৌড়ে এসে গলা জড়িয়ে ধরেছিল রাহিমার। খাটের ওপর লাল বেনারসিতে ঘোমটা দিয়ে বসেছিল রাহিমা, মিতার নতুন মা। মিতা ডাকে রাহিমাকে, ‘মা, মাগো।’
মিতার মা ডাক ভাল লাগে না রাহিমার। আলতো ধাক্কা দিয়ে গলা থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়। চাপা কণ্ঠে বলে, ‘আপদ।’
মিতার ছোটো মনে আঘাত লাগে। ও বুঝে কোথায় একটু ভুল হয়েছে কিন’ কোথায় তা ধরতে পারে না। কোল থেকে নেমে ঘর হতে বের হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে জল।
মিতার মা থেকেও নেই। দুই বছর আগে ওর বাবা ওর মাকে তালাক দিয়েছে। সকালে মায়ের হাতে খেয়ে বিদায় নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল মিতা। দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিল যে মা সেই মাকে স্কুল থেকে এসে আর পায়নি। মাকে ডেকে ডেকে সাড়া না পেয়ে পাশের বাড়ির করিমন খালাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘মা কোথায়?’
করিমন খালা জবাব দিয়েছিল, ‘তোর মা আর আইবো না। তোর বাপ তালাক দিছে।’ মিতা তালাক মানে বোঝে না। বলে,
‘করিমন খালা তালাক মানে কি?’
‘তালাক দিলে মা পর হইয়া যায় । তোর মা এখন এ বাড়ীর কেউ না। তোরও কেউ না।’
‘আমি তো মা-রে তালাক দেই নাই তাইলে মা ক্যান আমার পর হইব।’ কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল মিতা।
ওর কথায় করিমন খালার চোখেও অশ্রু জমে উঠেছিল। ওকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদেছিল অনেকক্ষণ। এরপর এই এই নতুন বউ। মিতা ঘুম চোখে মা বলে ভুল করেছিল কিন’ পরক্ষণেই বুঝেছিল ওর মা নয় নতুন বউ। ওর মা হলে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতো। এর আগে কতোদিন ঘুম থেকে উঠে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ডেকেছে, মা মাগো। ওর মা ওকে বুকে নিয়ে গান গেয়েছে। আদর করে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। মিতার কান্না পায়। ফুঁপিয়ে ওঠে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে কিছুক্ষণ। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায় এক সময়।
সেই দশ বছর আগে কান্নার সুর আজও থামেনি। দিনের পর দিন যায়, বছরে পর বছর। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন বউ এর অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। ঠিকমতো খাবার পেতো না কখনও। সংসারের সব কাজ করতে হতো ওকেই। স্কুল বন্ধ। এরপরেও একটু ভুলচুক তো চেলাকাঠ রেডি ছিল নতুন বউয়ের হাতে। আর বকা-ঝকা তো নিত্যদিনের ব্যাপার। একদিন নতুন বউ ঘুমিয়ে। ওকে খাবার না দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছিল। খাবার ছিল মির্টসেফে তালাবন্ধ। ক্ষুধায় কিছুই ভালো লাগছিল না। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ ওর নাম শুনে চমকে ওঠে।
নিজের নাম শুনে চমকে উঠলেও লোকটাকে চিনতে পারে না মিতা, তাকিয়ে থাকে। ওর তাকিয়ে থাকা দেখে লোকটা বলে,
‘আমাকে তুমি চিনতে পারবে না, সেই ছোট বেলায় দেখেছ। আমি তোমার লাটু মামা।’
মামা! আনন্দের একটা স্রোত বয়ে যায় ওর মনের মধ্যে।
‘মামা, আমার মা কোথায়?’ প্রথমেই মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করে মিতা।
‘আমাদের বাড়ীতে। তোমার মা, তোমাকে নিতেই তো পাঠিয়েছে।’
মিতার একটু অভিমান হয়। এতোদিন পরে মা নিতে পাঠিয়েছে। ও যাবে না। অভিমানী কণ্ঠ ওর।
‘এেেতাদিনে বুঝি আমার কথা মনে পড়ল মায়ের। আর আপনি খোঁজ নিচ্ছেন এতোদিনে।’ মিতার কথার জবাব দেয় না লাটু মামা। ওর দিকে এক বাক্স চকলেট, কেক এগিয়ে দেয়। বলে, ‘তোমার মা দিয়েছে।’ খুব ক্ষুধা পেয়েছিল। প্রচন্ড ক্ষুধায় ওখানে দাঁড়িয়েই কেক খেয়েছিল। কেক খাওয়ার কথাই শুধু মনে আছে তারপরে আর কিছু মনে নেই ওর। কিছুই জানে না। তখন না বুজলেও এখন বুঝেছে ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। আর ঘুম ভাঙার পর নিজেকে আবিষ্ক্কার করেছিল এক অচেনা বাড়িতে। ওই বাড়িতে ওর মতো, ওর চেয়ে কিছু বড়ো, বয়স্কা নানা ধরনের মেয়ে দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু পুরুষ বলতে শুধু ঐ লাটু মামা।
ঘুম ভেঙে প্রশ্ন করেছিল,‘ মা কোথায়?’
হা হা অট্টহাসিতে ভেঙে পড়েছিল লোকটি। তারপর সাজুগুজু করা এক মহিলাকে দেখিয়ে বলেছিল, ‘ওই তো তোর মা।
মিতা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। না না ও আমার মা নয় , মা হলেতো আমাকে কাছে ডাকতো। এ আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছ।
কাঁদতে কাঁদতে খামছে ধরেছিল লাটুকে। কিন’ লাটু ওকে মাটিতে ফেলে ঠাস করে থাপ্পড় লাগিয়েছিল। ওই মানুষটার গায়ের জোরের সঙ্গে পারবে কেন মিতা? ইয়া দশাই চেহারা। আর ওতো পুচকে এইটুকু এক মেয়ে। লোকটা ওকে মারতে মারতে সাজুগুজু মহিলার কাছে নিয়ে বলেছিল, ‘হামাজাদিকে সামলে রেখ হাসি।’
থাপ্পড় খেয়ে বকা খেয়েও সেদিন দমেনি মিতা। ও কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘আমি মায়ের কাছে যাব।’
ওই লোকটা ওর কথা শুনে আরও মেরেছিল। মিতা কেঁদেই চলেছিল কিন্তু মিতা জানতো না ওখানে কেঁদে কোন লাভ নেই। কান্নায় এখানকার মানুষের মন গলে না। এরা পাষাণ।
মাসি ওকে তালাবন্ধ করে রেখে দেয়। ওর চিৎকার কান্নায় কিছুই আসে-যায়নি কারও। না মাসির না ওই লোকটির। ও শুধু ক্বাঁদতে কাঁদতে ঘরের মঝেতে ঘুময়ে পড়েছিল। সন্ধ্যায় দরজা খোলার শব্দে অবাক হয়ে যায়।
‘মা’
বিস্মিত বিহ্বল আনন্দমাখা চিৎকার ওর কণ্ঠ চিরে বের হয়ে আসে।
‘মিতা!’ মিতার মা, মিতার মতো বিস্মিত, আনন্দিত, আশংকিত। মা মেয়ে বুকে বুকে। মা কাঁদে, মেয়েও। একি জীবন? মা ভাবে। এই জীবন তো ও চায়নি। হায় আল্লাহ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মা। ওকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে বলে, ‘তোর বাপ এমনি পাষণ্ড তোকেও বিক্রি করে দিল।’
মেয়েও কাঁদে। বলে, ‘তুমি আমাকে আনতে পাঠাওনি। ওই লোকটা যে বলল…’
কোন লোক? লাটু বাবু।’
মেয়ের মৌন মুখের দিকে তাকিয়ে মা বুক ভাঙা কান্নায় আহাজারি করে। দুজনের কান্নাকাটি এক সময় শেষ হয়। এরপর মেয়েকে সামনে বসিয়ে বলে, ‘আমি যা যা বলব তাই তাই করবি।’
বেশ কয়েক দিন মা মেয়েকে সামলে রাখে কিন’ মা পারবে কেন? মাসি ধমকে গেছে। টাকা কি গাছের গোটা, যে মাগনা মাগনা বসিয়ে বসিযে খাওয়াবো। মাসিকে বোঝায় মা। ‘মাসি ওতো বেশি খায় না। তাছাড়া আমিই তো খাওয়াচ্ছি।’
‘চুপ মাগি, খাওয়াচ্ছি। আমার পয়সার কি হবে? কাল থেকে কাজ করবি আমার কথা মতো না হলে পয়সা ফেরত দিবি।’
মাসির সঙ্গে কথায় পেরে ওঠে না মা। তাছাড়া দশ হাজার টাকা! অতো টাকা তো ওর নেই। তবুও মায়ের মন। মায়ের ভালবাসার তুলনা নেই। সমস্ত বোঝা নিজের কাঁধে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যা হয় হবে। মেয়েকে এখান থেকে বের করে দেবে। মা তাড়হুড়ো করে। মাসি বলেছে আগামী কালই সরকারী খাতায় নাম উঠাবে। একবার নাম রেজিষ্ট্রি হলে আর এই অন্ধকুপ থেকে বরে হতে পারবে না কোনদিন। মা মেয়েকে মুক্ত করবেই, কিন’ কেমন করে।
মা কপাল চাপড়ায়। এই মেয়েকে সে লেখাপড়া শিখিয়ে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিল। হায় কপাল! মেয়ের কথা ভেবে কুল-কিনারা পায় না মা। এ যেন অথৈ সমুদ্র। অনেক ভেবে চিন্তে এক খদ্দের এলে তাকে বুঝিয়ে বলে, ‘আমার মেয়েটাকে আপনি এখান থেকে বের করে নিয়ে যান, আমি দাসী হয়ে থাকবো।’
খদ্দের মিতার দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে যায়। খদ্দেরের বুকের তলায় যে লোভ জমা হয় মা তার কিছুই বুঝতে পারে না। মা মেয়েকে চুপ করে বের কয়ে দেয়।
মা ভেবে শান্তি পায় তার মেয়ে ভালো আছে। ভালো থাকবে। কিন’ মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। ওখান থেকে বের হয়ে এলেও মিতা ওই জীবন থেকে বের হতে পারেনি। জীবনের অন্য এক অধ্যায় শুরু হয় ওর।
খদ্দের ওকে নিয়ে ওঠায় এক হোটেলে। সেই রাতেই ওই হোটেল ঘিরে ফেলে পুলিশ। অনেকের সঙ্গে ধরা পড়ে মিতা।
চারদিন কাটে জেল হাজতে। একদিন এক অচেনা লোক এসে ওর সঙ্গে দেখা করে। বলে, ‘যা যা বলে দেব, তাই তাই বলবে কোর্টে।’
‘আপনি কে?’
আমি তোমার ভাই।’
‘আমার তো ভাই নাই।’ বিস্মিত কণ্ঠে বোকা বোকা কথা বলে মিতা। ওই লোকের কণ্ঠ ভালবাসায় ভেজা।
‘এতোদিন ছিল না, এখন আমি। আমি সবসময় তোমার পশে আছি, থাকবো।’
পরদিন কোর্ট থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে যায় মিতা যওয়ার জায়গা নেই। ওই লোকের সঙ্গে এসে ওঠে তারই ভাড়া করা এক বাসায়। এরপর চলে গেছে দুই বছর। এই দুই বছরে হাত বদল হয়েছে পাঁচবার। আর কতোবার কপালে আছে কে জানে।
মিতা এতোক্ষণ ভাবছিল। এই জীবন কি চেয়েছিল ও , আর পেল কী! এই জীবন থেকে বের হওয়ার পথ কি নেই কোন? পথ হয়তো আছে, হয়তো বা নেই, জানে না মিতা। জানার চেষ্টা করেছে, করেছে ভাল থাকার চেষ্টা, কিন’ পারেনি। একবার, এই পথে এলে, ওরা ভালো থাকতে দেয় না। মিতা জানে না, এই ওরা কারা?
সাড়ে দশটার সময় সংকেত শুনতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠে টেলিফোন। ফোন ধরেই আবার রেখে দেয়। কোন কথা বলতে ইচ্ছে করে না ওর। ফোন ছেড়ে অলস পায়ে ঢোকে বাথরুমে। কিছুই ভালো লাগছে না ওর। শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মনের মধ্যে শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খায়, এই জীবন আর কতোদিন? মুক্তি পাওয়ার কি পথ নেই কোন?
