আকাঙ্ক্ষা // আফরোজা অদিতি (ছোটগল্প)

রুবির মনটা খুব খারাপ। অহেতুক মহসিনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। মহসিনের কোন দোষ নেই। দোষ রুবির নিজেরই। রুবি জানে এসব কথা মহসিন একদম পছন্দ করে না। এসব কথা বললেই মেজাজ খারাপ করে, তবুও আজ কেন যে কথাগুলি বলে ওর মেজাজটা খারাপ করে দিল। অফিস যাওয়ার সময় মেজাজটা খারাপ করে দেয়া উচিত হয়নি। কিন্তু রুবিইবা কি করবে। ওতো আর এসব কথা বলতে চায়নি, কিন্তু না বলে তো পারেও না! মহসিন ছাড়া কাকেই বা বলবে এসব কথা। অবশ্য ঠিক নাস্তা খাওযার সময়, অফিস যাওয়া মুহূর্তে কথা কয়টি না বললেই চলতো। মাঝে মাঝে রুবি নিজেই জানে না কি যে হয় ওর!

আসলে সব দোষ নিহার খালার। নিহার খালার কথা শুনে সব কথা বলতে গিয়েই তো এই বিপত্তি। রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেলে রুবি। এক ফেঁঁাঁটা চোখের পানি হাতের ওপর পড়তেই চমকে উঠে তাড়াতাড়ি হাতের পিঠে মুছে ফেলে। শাশুড়ী দেখলেই কেলেংকারী হয়ে যাবে। কিন’ কথায় আছে না, ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত্রি হয়’ রুবিরও তাই হলো। ওর শাশুড়ীর কণ্ঠ-ঝংকার বিদ্ধ করলো ওক। ‘হায় হায় লো, ভর দুপুরে চক্ষের পানি, আমার সংসার উচ্ছন্নে গেল। গেল, গেল, গেল। আ… লো, ও অবাগীর বেটি, এই ভর দুপুরে কাঁদতেছ ক্যান? মিছামিছি কাঁদতেছ, কপালে দুক্কু আছে, দুক্কু।’
রুবি শাশুড়ীর মুখের ওপর কথা বলে না কখনও। মহসিন বিয়ের দিনই ওকে বলেছিল ওর মায়ের মেজাজ একটু রুক্ষ, একটু বকাবকিতে যেন কিছু মনে না করে। আজ পাঁচ বছর স্বামীর কথা শুনে এসেছে রুবি। অন্যায় কথা, অত্যাচার সব সহ্য করেছে কিন’ আজ আর চুপ করে থাকতে পারলো না।
‘আপনি অন্যায় কথা কেন বলেন মা? আমার কান্না আসলে কাঁদতে পারবো না। আর কাঁদলে সংসার উচ্ছন্নে যাবে একথা কে বলেছে আপনাকে?’
‘কি? আমার মুখের ওপর কথা! এত্ত সাহস তোমার বউ। সংসার তোমার চক্ষের পানিতে উচ্ছন্নে তো যাবেই। এ সংসারে শান্তি দেওনের কেউ আছে? কেউ নাই কেউ নাই। তার ওপর আবার কাঁদাকাটি।’
‘চুপ করেন তো আম্মা আমার মন আজ ভাল নেই।’

রুবি আর কোন কথা বলে না। চোখ মুছে ফেলে। কাজ করতে থাকে। ওদিকে ওর শাশুড়ীর কথার খোঁটা চলছেই। বিয়ের ছয়মাস পর থেকেই এই ছেলেপেলে না হওয়ার খোঁটা দেওয়া শুরু হয়েছে, এখন পর্যন্ত চলছেই। ইদানিং শাশুড়ির সঙ্গে পাড়াপড়শিরাও যোগ দিয়েছে। ওরা বুঝে না রুবির নিজেরও ইচ্ছা করে একটা ছোট কচি মুখের; যে মুখটা ধীরে ধীরে বড় হবে ওরই আদরে ওরই সোহাগে ওর কোলে কোলে। ওকে মা বলে ডাকবে। সন্তান আকাঙ্খা কার না থাকে? ইচ্ছা, আকঙ্ক্ষা নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে। রুবিও বেঁচে আছে। এতো অত্যাচার সহ্য করে এখানে আছে শুধু তো ঐ একটি আকাঙ্ক্ষায়। সন্তান। আর এই সন্তান আকাঙ্খায় নিহার খালার কথাগুলি বলেছে মহসিনকে। নিহার খালার বাড়ী সাভারে। ওখানে নাকি একজন তান্ত্রিক সাধু আছে, সে কামরুপ কামাখ্যা থেকে ডাকিনীযোগিনী বিদ্যা শিখে এসেছে। ওর কাছে গেলে মন্ত্রপড়া তাবিজ দেয়। সেটা দিলেই নাকি সন্তান হবে। অনেকের হয়েছে। ইস্‌, কথাগুলি কেন যে বলতে গেল। আবার কান্না পায় রুবির। মহসিন আজ দুপুরে আসেনি, সকালেও খেয়ে যায়নি। ওরও খাওয়া হয়নি। মহসিন হাজার বার হাজার দিন বলেছে এভাবে না খেয়ে শরীর নষ্ট না করতে। কিন’ ওর ভালো লাগে না। তাছাড়া দাদীকে দেখেছে, দেখেছে মাকে তারা কখনও বাবা-দাদার আগে খায়নি। ওর দাদী বলতেন, ‘স্বামীর পাতে খেলে মহব্বত বাড়ে, বাড়ে স্বামীর আয়ু। আরও বাড়ে ছোওয়াব।’ আর বাঙালী মেয়ে মাত্রই চায় তাঁর স্বামীর দীর্ঘায়ু হোক। রুবিও চায় দীর্ঘজীবী হোক মহব্বত। তাছাড়া বাড়তি ছোওয়াব যদি পাওয়া যায় মন্দ কি! কিন’ ওর স্বামী একথা মানে না। প্রায় প্রতিদিনই এই খাওয়া নিয়ে একবার-দুইবার বাকবিতন্ডা হয় দুজনের। মহসিন বলে, ‘তুমি খেয়ে নিবে। আমার জন্য কখনও বসে থাকবে না। ওসব আয়ু, ছোওয়াব সব বাজে কথা। এটা পুরুষের ভালো কিছু খাওয়া আর আগে খাওয়ার ফন্দি ফিকিরের কথা।’
‘কে বলেছে তোমাকে?’ অবাক চোখে তাকায় রুবি।
‘আমি বলছি, আর কে বলবে।’ ওর স্বামী হাসতে হাসতে ওকে বলেছে। মহসিনের কথা শোনার পরেও রুবি বলেছে, ‘আমি তা মানি না। তুমি এলেই আমি খাব।’
রুবির অবশ্য এই একসঙ্গে খাওয়ার পেছনে এরও একটি কারণ আছে। আগে আগে খেলে শাশুড়ি বকাবকি করবে। শাশুড়ির কথা, বাড়ির বউরা কখনও আগে খায় না। এতে সংসারে অলক্ষী লাগে। আজ স্বামী দুপুরে আসেনি। রুবিরও খাওয়া হয়নি। রান্না ঘরে কাজ করছিল রুবি। রান্নাঘরের পাশেই শাশুড়ীর ঘর। নিহার খালার সঙ্গে কথা বলছে শাশুড়ী। শাশুড়ি বলে,‘ঐ রকম বউয়ের মুখ দেখাও পাপ। আমি আবার মহসিনের বিয়ে দিবো।’ শাশুড়ীর কথায় খালাশাশুড়ী বলে, ‘তুমি আপা এখনও সেকেলেই রয়ে গেছ। এখন কত্ত কি চিকিৎসা বের হয়েছে। মহসিনকে বল বউকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে।’
‘ডাক্তারের কাছে………. ’ অবাক বিস্মিত শাশুড়ীর মুখে কথা আটকিয়ে যায়। শাশুড়ীর ঐ অবস’া দেখে নিহার খালা আবার বলে, ‘বেশ ডাক্তার না দেখাতে চাও কত পীর-দরবেশ আছে। তুকতাক কিছু করেছে কিনা কেউ দেখ।’
‘হ্যাঁ। তাই যাব। কিন’ মহসিন তো চায় না।’
মহসিন কেন চায় না ভালো করেই জানে রুবি। ডাক্তারের কাছে যাওয়া পছন্দ করে না ওর শাশুড়ী। কিন’ পীরবাবার কাছে নিতে আপত্তি নেই। ডাক্তারের চেয়ে খরচ বেশী তবুও ডাক্তার না পীরবাবা। আগে প্রায়-পীর-দরবেশের কাছে নিয়ে যেত ওর শাশুড়ী। একদিন পীরবাবার বাড়ী থেকে ফেরার পর পীবাবার আচরণ ভালো না লাগার কথা বলতেই রাগে ফেটে পড়ে শাশুড়ী যাচ্ছে তাই বলে গালাগাল ওকে।
‘নবাবের বেটী, ডাক্তার দেখাইবেন। পীরবাবার ওখানে যাইবেন না।’
‘না মা ও কথা বলিনি। আমি……… ’ ওকে কথা্‌ শেষ করতে না দিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে শাশুড়ী। ‘কী, আমার পীরবাবা ভালো না!
এত বড়ো আস্পর্ধা তোমার বউ। আমার পীরবাবাকে নিয়ে কথা কও। জিভ খইসা যাইবে, ঘা হইবে।’
‘আপনি এসব কি বলছেন?’.
‘চোপ। একদম চোপ। ফের একটা কথা বলবি তো, তোর একদিন কি আমার-ই একদিন।’
‘মা, আমি কি কোন খারাপ কথা বলছি।’
‘না বলিসনি, পীর সাহেবকে নিয়ে কথা, এজন্যই তো ছেলেপুলে হয় না। কি কুক্ষণে যে এমন বউ ঘরে আনছিলাম।’ শাশুড়ী বুক চাপড়িয়ে কাঁদতে থাকে। মহসনি এলে হাজারটা কথা বানিয়ে বানিয়ে বললেও কিছুই বলতে পারল না রুবি, কি বলবে।
অবশ্য ওর বলার প্রয়োজনও হয়নি। সব শুনে স্বামীই রাগ করেছিল মায়ের ওপর। বলেছিল, ‘তোমাকে তো বলেছি মা, আমার ছেলেপুলের দরকার নেই।’
‘তোর না থাকতে পারে আমার আছে। আমার ছেলের বংশে বাতি দেওনের কেউ থাকবে না এইটা তো হইতে পারে না।’
এরপর মা ছেলের কাছে উঠে এসেছিল। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘তোরে আবার বিয়া করামু।’
‘কি করাইবা?’
‘কি আবার বিয়া।’
‘বিয়া।’ অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মহসিন। ওর চোখের সামনে মা হাত নাড়ে।
‘কিরে কি হইছে। আমি কি মন্দ কথা কইছি? তুই অমত করিস না বাপ। আমি মাইয়া পছন্দ কইরা রাখছি।’
‘দেখ মা, বিয়ে করলেই যে ছেলেপুলে হবে সেকথা কে বলছে তোমাকে? আমারও তো দোষ থাকতে পারে।’
‘তোর দোষ।’ অবাক মা। ‘পুরুষ মাইনষের আবার দোষ।’
‘অসুখ মা, ছেলেমেয়ে বুঝে হয় না।’

এ ঘটনা মাস ছয়েক আগের।
মহসিন লেখাপড়া জানা ছেলে। মহসিন মনে করে ছেলে মেয়ে না হলে জীবন অচল হয়ে পড়ে না। এই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সন্তানের প্রয়োজন ঠিকই, তাই বলে যে সন্তানের জন্য বুক ফেটে মরতে হবে এমন মনে করে না সে। মহসিন জানে এ জীবনকে ঠিকঠাক মতো চালাতে পারলে সন্তান ছাড়াও সবকিছু আনন্দময় হয়ে ওঠে। রুবিকেও কথাগুলি বলেছে। তবুও মাঝে মাঝে মনটা খারাপ হয়ে হয়ে যায় রুবির, স্বামীর কথাগুলি ভুলে সন্তান আকাঙ্খায় ব্যাকুল হয়। এই ব্যাকুলতার ঘোরেই আজ সকালে স্বামীকে কথাগুলো বলে ফেলেছে। রুবির কাজ শেষ হয়েছে। রুবি ঘরে এসে বসে। শাশুড়ীরা দুই বোন কথা বলছে। হাসছে। রুবির, ওর বাড়ীর কথা বিশেষ করে ছবির কথা মনে পড়ে। ছবি রাজশাহীতে। ওর স্বামী আবার বিয়ে করেছে ছেলের আশায়। এই বউ-এরও ছেলে হয়নি। তিন বছর আগের ছবির সঙ্গে দেখা হলে প্রশ্ন করেছিল রুবি। স্বামীর বিয়েতে বাধা দেয়নি কেন ছবি? ওর কথা শুনে ম্লান হেসেছিল। ভেজা গলায় বলেছিল, কি করব বল, আমারতো শুধুই মেয়ে। ছেলে দিতে পারলাম না যে।
‘ছেলে না হওয়ার দোষ কি তোর?’ উত্তেজিত গলায় রুবি বলেছিল।
‘তো আর কার?’
‘তোর স্বামীর।’ জোরদিয়ে বলেছিল রুবি।
ছবি ওর কথায় আঁতকে উঠে বলেছিল, ‘চুপ চুপ। স্বামীর দোষ ধরতে নেই।’
‘কে বলেছে তোমাকে? মহসিনের কাছে আমি শুনেছি ছেলে বা মেয়ে হওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণ স্বামীর, স্ত্রীর নয়। এটা ডাক্তারের কথা, বিজ্ঞানের কথা।’
‘আর বলিস না। স্বামীর পায়ের তলায় বেহেস্ত।’
‘কে বলেছে তোমাকে আপা? বেহেস্ত যদি হয় তবে তা মায়ের পায়ের তলায়-স্বামীর না। আরও একটা কথা শোন, এই সংসারে স্বামী বা স্ত্রী কেউ বড়ো বা কেউ ছোটো নয়। দুজন সমান।’
ওর কথা অবাক হয়ে শুনেছিল ছবি। কথা বলতে পারেনি। তোতলাতে তোতলাতে বলেছিল, ‘তো………. তো……….র দোজখেও জা……. জায়গা হবে না। হবে না।’
ছবির এই কথা মনে পড়তেই মহসিনের কথা মনে পড়লো। তান্ত্রিকের কথায় মহসিন এতটা রাগ করবে তা বুঝতে পারলে কখনই বলত না। রুবির ঘরে বসে থাকতে আর ভাল লাগে না। আস্তে আস্তে ঘর থেকে বের হয়। শাশুড়ীর কাছে বসে একটু কথা বলতে ইচ্ছা করছে এখন। কিন্তু শাশুড়ীর ঘরে ঢোকা আর হয় না। বারান্দায় উঠতেই শাশুড়ীর কথাগুলি এসে বুকে বেঁধে।
‘ওর মুখ দেখাও পাপ! বাঁজা মেয়ে মানুষ। আপদ বিদায় হলেই বাঁচি। আমি আবার মহসিনরে বিয়া করামু।’

রুবি বারান্দা থেকে নেমে উঠানে দাঁড়ায়। আকাশে সুন্দর চাঁদ। পূর্ণিমা কাছাকাছি এসে গেছে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলো টুকরা টুকরা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে উঠানে। বাতাসের দোলায় টুকরাগুলি এদিক থেকে ওদিকে দোল খাচ্ছে। আনমনে রুবি সেদিকে চেয়ে থাকে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল রুবি জানে না। হঠাৎ চমকে উঠে কাঁধে হাতের স্পর্শে। পাশ ফিরে তাকায়। তাকিয়েই থাকে।
‘কি ব্যাপার, আমাকে চিনতে পারছ না? হ্যাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে আছ?’ কথাগুলি বলতে বলতে রুবিকে বাহু বেষ্টনে বাঁধে মহসিন। মহসিনের বুকে মুখ রাখে রুবি। ফিসফিস করে বলে, ‘জান আগামীকাল পূর্ণিমা।’

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615