১ মে শ্রমিক দিবস। সরকারি ছুটি। ১৮৮৬ সালে হে মার্কেটে শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিক-মৃত্যু, শ্রমিক নেতার ফাঁসি এনে দিয়েছে এই দিনটির প্রাপ্তি। মে ডে, মে দিবস বা শ্রমিক দিবস নানা নামে অভিহিত করা এই দিনটি পেতে অনেক সংগ্রাম অনেক রক্ত ঝরাতে হয়েছে। শ্রমিক দিবসের এই দিনে স্মরণ করা হয় ১৮৮৬ সালের মে মাসে ঘটে যাওয়া বর্বরতার এক করুণ কাহিনী। এই দিনে হে মার্কেটে শুরু হয় বক্তৃতা আর শ্লোগান। অষ্টাদশ শতাব্দির শুরুতে ইংল্যাণ্ডের সমাজবিজ্ঞানী ও সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েন প্রথম শ্রমিকদের আটঘন্টা শ্রম, আটঘণ্টা মনোরঞ্জন, আটঘন্টা বিশ্রামের তত্ত্ব নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সে সময় শ্রমিকদের ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা এমনকি তারও বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করা হতো। এই সময় শ্রমিক সংগঠন ও প্রতিবাদী শ্রমিকেরা আটঘন্টা শ্রমের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ১৮৮৪ সালের অক্টেবরে আমেরিকার ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস অ্যাণ্ড লেবার ইউনিয়ন সময় বেঁধে দিয়েছিল ১ মে ১৮৮৬ তারিখের মধ্যে আটঘণ্টা শ্রম বিবেচনায় এনে কার্যকরের পদক্ষেপ নেওয়ার। কিন’ মালিকরা রাজী না থাকার প্রেক্ষিতে শুরু হয় হরতাল বিক্ষোভ। মিটিং- মিছিল-বিক্ষোভে উত্তাল হয় শিল্প সমৃদ্ধ আমেরিকার শিকাগো শহর।
ঐ দিন উত্তাল হে মার্কেটে শেষ বক্তার বক্তৃতার পরেই বিস্ফোরিত হয় বোমা। এবং বোমা বিস্ফোরণের পর উভয় পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয় বলে পুলিশ দাবী করে। কিন’ ঐতিহাসিকদের মতে ঐ দিন পুলিশই শ্রমিকদের ওপর গুলি ছোঁড়ে এবং নিজেরাই নিজেদের গুলিতে মারা যায়। যাহোক গুলি চলার ঐ মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে যায় শিকাগো শহরের হে মার্কেট চত্বর। রক্তস্নাত রাস্তায় রক্তের মধ্যে পড়ে থাকে আহত শ্রমিক আর নিহত শ্রমিকের লাশ। প্রকৃত সত্য আড়াল করে বলা হয় ঐ দিন ৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং আহত হয় ৬০ জন শ্রমিক। শতাধিক শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়। বিচার শুরু হয়। বিচারক সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক জনকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। উচ্চ আদালত এই রায় বহাল রাখলেও আমেরিকার অঙ্গরাজ্য ইলিনয়ের গভর্নর রিচার্ড জেমস ১৮৮৭ সালের ১০ নভেম্বর আরও দুইজনের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে। এই দুইজন হলেন শ্রমিক নেতা স্যামুয়েল ফিলডেন ও স্ত্রোয়ার। এরপর শুরু হয় বাঁকি পাঁচ জনের মৃত্যুর প্রহর গোনা। কিন’ ঐ দিনই অন্য এক সাজাপ্রাপ্ত বিপ্লবী লিঞ্জ চুরুটের মতো বোমা (ব্লাস্টিং ক্যাপ) সংগ্রহ করে তা মুখে পুরে বিস্ফোরণ ঘটান। মুখের বিরাট অংশ খসে পড়ার পরেও ছয় ঘন্টা বেঁচে ছিলেন লিঞ্জ। এই ঘটনার পরে ১১ নভেম্বর ১৮৮৭ সালে ফাঁসি দেওয়া হয় চার বিপ্লবী শ্রমিককে। এই বিপ্লবী হলেন এঞ্জেল, ফিসার, পারসন্স ও স্পাইস। ফাঁসিতে ঝোলার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে স্পাইস বলে, ‘এমন একদিন আসবে যেদিন আমাদের নিরবতা (মৃত্যু) তোমরা যে কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চাও তার চেয়েও শক্তিশালী হবে। বৃথা যায়নি সে কণ্ঠস্বর, বৃথা যায়নি বিপ্লবীর রক্ত। এখন বিশ্বে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা দাবী প্রতিষ্ঠিত।
বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১ মে-তে সরকারী ছুটি থাকে। কিছু কিছু দেশে এই দিনে ছুটি না থাকলেও যে কোন একটি মাসের একটি দিন তারা শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করে। অধিকাংশ দেশের সরকার এই দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেছে। এই দিনে শ্রমিক সংগঠনগুলো শ্রমজীবিদের নিয়ে শোভাযাত্রা, র্যালীসহ সাংস্কতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। চীনে মে মাসের প্রথম দিন সাধারণ ছুটি। ২০০৮ সালের আগে এই ছুটি ছিল ৩ দিন। কিন’ এখন আর নেই। তবে চীনের বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী ২৯ এপ্রিল সাধারণ ছুটি গ্রহন করে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান ১ মে ছুটি ঘোষণা না করলেও তারা শ্রমিক দিবসের ছুটি অন্য সময়ে ভোগ করে। কানাডাতে শ্রমিক দিবস পালন করে সেপ্টেম্বর মাসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেপ্টেম্বরের ১ম সোমবার শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে মে মাসের ১ম দিন সরকারি ছুটির দিন। বাংলাদেশেও মে মাসের ১ম দিন সরকারি ছুটির হিসেবে পালিত হয়। আলজেরিয়াতে এই দিনে কাজ না করেও বেতন পান শ্রমজীবিরা। কেনিয়াতে এই দিনটি সাধারণ ছুটির দিন। আমাদের বাংলাদেশেও ১ মে ছুটির দিন।
শুধু ১ মে ছুটির দিনই নয়, শ্রমিকদের স্বার্থ-অধিকার রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য এগিয়ে এসেছে অনেক সংগঠন।
১. ডব্লিউ আর সি (ডজঈ) ওয়াকার্স রাইট কনসোর্টিয়াম
২. ফেয়ার ওয়্যার ফাউণ্ডেশন (ঋডঋ) এটি একটি স্বাধীন অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। নেদারল্যাণ্ড ভিত্তিক পোশাক-শ্রমিকদের উন্নত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, স্বার্থরক্ষা ও কল্যাণের জন্য কাজ করে এই সংগঠন। এই সংগঠন শ্রমিকদের উন্নতির জন্য যেমন কাজ করে তেমনি স্বেচ্ছায় চাকরিতে যোগদান, বৈষম্যহীন চাকরি, শিশুশ্রম বন্ধ, সংগঠন করার অধিকার, ন্যায্য মুজুরি, অতিরিক্ত পরিশ্যম রোধ, নিরাপদ ও স্বাস’্য সম্মত কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি এবং আইনসম্মতভাবে শ্রমিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে।
৩.আই এল ও (ওখঙ) ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৯ সালে ভার্সাইল চুক্তি অনুসারে। এটির সদর দফতর সুইজাল্যাণ্ডের জেনেভায় অবসি’ত। সরকার, মালিক শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি দ্বারা আইএল ও পরিচালিত। বর্তমানে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। এই কাজগুলির মধ্যে আছে-
ক. দৈনিক ও সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ কাজের সময় নির্ধারণ
খ. ন্যায্য মুজুরি নিশ্চিত করা
গ. শ্রমিকদের বিপদ থেকে রক্ষা করা এবং বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো
ঘ. শিশু-কিশোর ও নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা
ঙ. প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা
চ. মুজুরির সমতা বিধান
ছ. শ্রমিক অধিকার
৪. আই এল আর এফ (ওখজঋ) ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইট ফোরাম। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের প্রতি ন্যায় বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলাদেশেও মে মাসের প্রথম দিন ছুটি থাকে। মিটিং মিছিল শ্লোগান বক্তৃতার মাধ্যমে আড়ম্বর সহকারে দিনটি পালন করা হয়। তাছাড়া এই দেশে শ্রমিকদের কাজের সময়সীমা বাঁধা থাকলেও খুব একটা মানা হয় না। শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও এখনও আছে শিশুশ্রম। এখানে প্রায় ১৭ লক্ষাধিক শিশু বিভিন্ন পেশায় বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। পথে বের হলে দেখা যায় গাড়িতে হেলপারের কাজ করছে শিশু; বাজারে মিন্তির কাজ করছে কোন একজন শিশু; কেউ বা কাজ করছে ওয়েলডিং কারখানাতে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় এবং বাড়ির বসয়স্ক এবং শিশুকে দেখাশুনা এবং বাসার কাজের প্রয়োজনে গৃহশ্রমিকের প্রয়োজন হয়; অনেক বাড়িতে শিশু ও নারী গৃহশ্রমিক রাখা হয়। নারী গৃহশ্রমিকের বেতন দিলেও অনেক শিশু গৃহশ্রমিকের বেতন দেওয়াও হয় না। শুধু ভাত-কাপড় (পেটে ভাতে) দিয়ে রাখা হয় এবং আট ঘন্টার বেশি কাজ করানো হয়। নিপীড়ন করা হয়, পুষ্টিকর খাবার খেতে দেয়া হয় না। অনেক সময় মেরেও ফেলা হয়। এ ছাড়াও আছে পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের মধ্যে বেতন বৈষম্য। অর্থনীতিবিদদের মতে শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের বৈষম্য বেশি। যেমন আছে অংশ গ্রহন-বৈষম্য তেমনি আছে বেতন-বৈষম্য। শিশু ও নারীকে দিয়ে কাজ করানোর সুবিধা এই জন্য যে তাদের খুব কম মুজুরিতে অনেক বেশি কাজ করানো যায়। যেমন পোশাক শ্রমিক, চা শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, চামড়া কারখানাতে পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিককে নিয়োগ করা হয় বেশি কারণ নারীর মুজুরি পুরুষের তুলনায় কম। আর এই সমাজ-ব্যবস’ায় তো একটি পরিবারে একজন নারী অবৈতনিক শ্রমিক; অনেকেই বলতে পারেন ওটা তার নিজের বাড়ি নিজের পরিবার নিজের সংসার কিন’ বর্তমানে ঐ পরিবারের নারীটি বাইরেও কাজ করছে; এবং সেই কাজের মজুরিও তাকে নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে দেওয়া হয় না! তাহলে কী হলো? নারী, পরিবারের ভেতরে-বাইরে একজন অবৈতনিক কর্মচারি বা শ্রমিক। বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাস আক্রমণে কর্মহীন হয়েছে নারী এবং এমনিতেই কম মুজুরি দেয়া হয় নারীকে করোনাকালে মুজুরি কমার ফলে পুরুষের তুলনায় আরও কম মুজুরি পাচ্ছে নারী। আমাদের দেশে নারীকে বেশি নিয়োগ দেয়া হয় তৈরি পোশাক কারখানায়, চা বাগানে অর্থাৎ চা-শিল্পে এবং নির্মাণ কাজে অর্থাৎ ইট ভাঙা, মাটি কাটা, দালান-রাস্তা নির্মাণে বালু-সিমেন্ট মাথায় নিয়ে যাওয়া এবং গৃহশ্রমিকের কাজ। আমরা চাই বেতন বৈষম্য ও শিশুশ্রম বন্ধ হোক। এবং মেহনতি জনতার জয় হোক।
তথ্যসূত্র : বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও অন্তর্জাল
