ভদ্রলোকের কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না। ওখানে একটা বাংলো আছে। বাংলো দেখাশোনার জন্য একজন কেয়ারটেকার আছে। বাঁশীর সাথে পরিচয় আছে। সেই সুবাদে মাসে একবার দুইবার ওখানে যায় ওরা আজও যাচ্ছে। যেতে যেতে পথের পাশে একটা নাম না জানা ফুলের গাছ থেকে ফুল পেড়ে বাঁশী সখির এলোচুলের ক্লীপে পরিয়ে দিলো। অবাক বিস্মিত দুটি চোখে পথের মাঝেই দাঁড় করিয়ে সখিকে বলে ‘বাহ্! কি সুন্দর তুই! তুই যে আমার প্রকৃতি সখি।’ সকাল গড়িয়ে দুপুর। ওরা পৌঁছোলো সেই বাগানে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলো। গাছের ফল পেড়ে দু’জনে খেলো। গাছের পাতার গান শুনলো। ছোটাছুটি করে সময় কাটিয়ে সখিকে নতুন ফুলের গহনায় সাজিয়ে ফিরতি পথ ধরলো ওরা। পথে আসতে আসতে গান ধরলো,
পথ বেঁধে দিল দু’জনের মাঝে
বন্ধনহীন গ্রন্থী আমরা
দু’জন চলতি হাওয়ার পনি’।
বাড়ি ফিরে রাতের রান্নার আয়োজন করে সখি। খেয়েদেয়ে আবার বায়না। বুকে রাখো। কবিতা শোনাও।
বাঁশী কথা বলে না। ধাক্কা দেয় সখি। কি হলো কবিতা শোনাও।
‘আবার কবিতা? তুই কি রে বউ? এতো কবিতা আমি কোথায় পাবো? কেমন করে শোনাবো?’
‘আমি জানি না যাও। শুনবো বলছি শুনবো। আর কিছু জানি না।’
‘এইতো। তোর দোষ সখি।’ স্বামীর কথা শুনে রাগ করে উঠে বসে সখি। সখিকে কোলের কাছে টেনে নেয়। বলে, ‘অমনি অমনি রাগ করিস কেন বলতো। লক্ষ্মী বউ রাগ করে না। শোন।’ বাঁশীর আবৃত্তির কন্ঠ ভালো। আবৃত্তি করে বাঁশী।
কি শোনাবো সখি তুমিই বলো
তুমিই আমার কবিতা, আমার জীবনখাতার
অলিখিত শব্দাবলী, তুমি জীবন নিশীথের
আনন্দ শিশির।
বাঁশী চুপ করতেই সখি বলে, ‘কবিতা শেষ বাঁশী।’
বাঁশী এমনি। সখি যেনো ওর খেলার পুতুল। জীবন্ত পুতুলকে বাঁশী সাজায় গোছায়, ঘুম পাড়ায়, গোসল করায়, খাওয়ায় দাওয়ায় কবিতা শোনায় গান শোনায়। ওর আদরের বহর দেখে মাঝে মাঝে সখি অনুযোগ করে। ‘এতো আদর করছো কেন?’
বাঁশী বলে, ‘আদর করবো না? বলো কি! দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র বউ। যদি পারতাম তাবিজ করে গলায় পরতাম না হয় রাখতাম বুক পকেটে লকেটে পুরে।’
এভাবে দিন ভালোই কাটছিল ওদের। এরপর ঘটলো বিপত্তি। বাঁশী মাঠে গেছে। সখি রান্না করতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। রান্না করা আর হয় না। স্বামীর ভাত দেয়া হয় না দুপুরের। দুপুরে খাওয়া হয় নি। বাড়িতে এসে সখিকে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে হঠাৎ রাগ হয়ে যায় বাঁশীর।
‘শুয়ে আছিস কেনো? ভাত দিস নি কেনো?’
‘আমার শরীর খারাপ। রাঁধতে পারি নি।’
‘শরীর খারাপ না আহ্লাদ করা। তোর আহ্লাদীপনা দিন দিন সীমা ছাড়াচ্ছে।’
‘না, না সত্যি শরীর খারাপ।’
‘এইটুকু শরীর খারাপে রান্না করা যায় না?’
বাঁশী ঘর থেকে চলে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল হয়ে যায় সখি। এ কি হলো! বাঁশী তো এমন কখনও করে না। সখি অনেকক্ষণ কাঁদলো। কেঁদে কেঁদে মনটা একটু হালকা হলে এদিক ওদিক খুঁজলো বাঁশীকে। কিন্তু মাথাটা আবার ঘুরে যাওয়াতে বেশি দূর যেতে পারে না। ঘরে এসে শুয়ে পড়ে। ভাবে, ও কি তবে আর নতুনত্ব অভিনবত্ব বজায় রাখতে পারছে না। ওদের সম্পর্ক কি পুরোনো হয়ে গেছে। ওর মধ্যে কি আর কোনো আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে না বাঁশী?
এতো তাড়াতাড়ি কেনো পুরোনো হয় সব। মাত্র তো পাঁচ বছর। বাব-মায়ের অমতে বিয়ে বলেই আজ ওরা ঢাকা ছেড়ে শহর ছেড়ে, এই অজপাড়াগাঁয়ে আবাস গেড়েছে। পাঁচ বছর আগের কথা ওর মনে পড়ে। বাসররাতের কথা। সুন্দর করে এই ঘর সাজানো হয়েছিল। সব কিছু হয়েছিল বাঁশীর ইচ্ছায়। ধুপের গন্ধে ভরা ছিল ঘরের বাতাস। বিছানায় শাদা ধবধবে চাদর। সেই চাদরে ছড়ানো সজনে ফুলের সাথে আর নাম না জানা ফুল। বেলিফুলের গহনায় সেজেছিল সখি। গলায় ছিলো বেলিফুলের মালায় লকেটের মতো রক্তজবা। শাদা জরির সাথে রজনীগন্ধা মিলিয়ে সাজিয়েছিল খাট। কী যে সুখ ছিল সেদিন থেকে একটু আগে পর্যন্ত।
কিন’ হঠাৎ কী হলো? এমন কেনো হলো। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। আজ বাঁশীর হলো কী। এ কি ওর বাঁশী? বাঁশী তো ওরই তবে কেনো বুঝতে পারছে না বাঁশীকে। আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে সখি। কাঁদতে কাঁদতেই গেলো রান্নাঘরে। রান্নাঘর গোছাতে পারে নি। রান্নাঘরটা গুছিয়ে আবার পথে নামে। এই পথে ওরা কতোবার গিয়েছে। অনেকদিনের অনেক কথা, অনেক দিনের কথা মন পড়ে! মনে পড়ে জীবনের অনেক টুকরো টুকরো স্মৃতি এই পথে ছড়ানো। এই তো গতকাল কতো আনন্দই না পেয়েছে। গান গেয়েছিল বাঁশী, ‘সুখে আছি সুখে আছি, সখি আপনমনে।’ কতো কবিতা বলেছে বাঁশী। ওর মনে পড়ে যায়। বাঁশী সব সময়ই বলতো তুই আমার কবি। তুইই আমার কবিতা।
অনেকটা পথ হাঁটার পর আর হাঁটতে পারে না সখি, বসে পড়ে পথের ওপর। এই পথে লোক যাতায়াত করে না। এই পথে শুধু ওদের যাওয়া-আসা। কতোক্ষণ বসে ছিল মনে পড়ে না সখির। হঠাৎ গাছের একটা পাতা গায়ে পড়তেই চমকে ওঠে। ও তাহলে এতোক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছিল! সখির মনটা খারাপ হয়ে যায়। আকাশের দিকে তাকায়। সন্ধ্যা নামছে ধীরে; পাখিরা ঘরে ফিরছে। ফুলগুলো নিরব। কোনো ভ্রমর নেই, নেই কোনো প্রজাপতি। সখি ঘরের দিকে ফিরে চলে। ঘরের কাছাকাছি আসতেই মাথাটা ঘুরে পড়ে যায়!
বাঁশী রাগ করে চলে যায় দূর পথ বেয়ে। নদীর ধারে বসে থাকে চুপচাপ। নদীর তীরে ঘাসে শুয়ে পড়ে। ভাবতে থাকে হঠাৎ ওর এরকম রাগ হয়। আজও হয়েছে। রাগ করে সে চলে এসেছে। অথচ সখির শরীরটা খারাপ হতেও পারে। এতোদিনের মধ্যে কোনোদিনই তো সখির কাজকর্মের নড়চড় হয় নি। সবসময় সে নিজেই সখির ওপর তাঁর মেজাজ মর্জি খাটিয়েছে। সখিও মুখ বুজে সহ্য করেছে। বাঁশী শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন দেখে এক গভীর অরণ্য। দু’জন ঘুরছে ঘুরছে। কখনও গান গাইছে কখনও কবিতা পড়ছে। সখিকে রেখে ও ফল পাড়তে একটু দূরে গাছে উঠেছে। হঠাৎ চিৎকার। সখির চিৎকার। বাঁচাও, বাঁচাও। বাঁশীর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে ওর অবস্থা বুঝতে কিছুটা সময় চলে যায়। ওর মাথাটা যেনো ভোঁ-ভোঁ হয়ে আছে। কেমন বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। উঠে দাঁড়ায়। সন্ধ্যার অন্ধকার ছেয়ে আছে নদীর কিনারে। নদীর পানি সি’র। আকাশের তারা উজ্জ্বল হয়ে ছায়া ফেলেছে নদীর বুকে। বাঁশী কিছুক্ষণ নদীতে তারার ছায়া দেখে তারপর বাড়ির দিকে দৌড়োতে থাকে। সখির কিছু হয় নি তো! দৌড়োতে দৌড়োতে ঘরের কাছাকাছি হোঁচট খেয়ে তাকায় নিচের দিকে। আবছা আলোয় সখির দেহটা দেখতে পায়।
‘সখি, সখি।’ সখি চেতনা হারিয়েছে। বাঁশীর ডাকে সাড়া দেওয়ার অবস্থায় নেই সখি সাড়া দেয় না। চোখ মেলে না। কোলে তুলে নেয় বাঁশী ওকে। বাড়ি নিয়ে আসে। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে মুখের উপর ঝুঁকে থাকে। ওর চোখে সখির মুখ সি’র হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পর বাঁশী পাগলের মতো ডাকছে শুধু। ‘বউ ও-বউ কথা ক। কথা ক বউ।’
সখির জ্ঞান ফেরে বেশ কিছুক্ষণ পর। চোখ মেলে তাকায়। বাঁশীকে মুখের উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে একটু হেসে দুর্বল হাতে ওর মুখ স্পর্শ করে।
‘তুমি কোথায় গিয়েছিলে?’
‘বউ তুই রাগ করিস না। আমার যে কি হয় মাঝে মাঝে, কিছু বলতে পারি না। তা তুই ওখানে কেনো গিয়েছিলি? গা ভরা এই জ্বর নিয়ে কেনো বেরিয়ে ছিলি তুই?’ (চলবে)
