সখির মনে পড়ে বাঁশীকে খুঁজতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার কথা। কিন’ কথা বলে না। চোখের অশ্রুতে ভিজে যায় বালিশ। হাতে চোখের জল মুছিয়ে বলে বাঁশি, ‘সখি তুই কি এখনও রাগ করে আছিস? কথা বল।’
সখি তবুও কথা বলে না। বাঁশী মিনতি করে।
‘বউ, ডাকলে অমন করে মুখ বুজে থাকতে নেই। স্বামীর কথা শুনতে হয়।’ দু’হাতে জড়িয়ে আলতো আদর করে বাঁশী। বলে, ‘আমি
না-হয় অন্যায় করেছি, তাই বলে কি এই জ্বর গায়ে বাইরে বেরোনো ঠিক হয়েছে তোর? তুই বল।’ এতো কথা বলার পরও সখি কথা বলছে না দেখে ওর মুখ তুলে ধরে বাঁশী। তারপর বলে, ‘তুই কি ঠিক করেছিস কথা বলবিই না। আমায় মাফ কর না সখি। আমি তো আমার মধ্যে ছিলাম না। আমার লক্ষ্মী সোনাবউ, মাফ কর আমায়। কথা বল। কেনো রাস্তায় গিয়েছিলি?’ সখি এবারও কথা বলে না। বাঁশী কণ্ঠে কৃত্রিম রাগ! ‘দেখ এবারও কথা যদি না বলিস আমি চলে যাবো। চলে যাবো ঐ নদীর ভেতর। আর কখনও ফিরবো না।’
সখি তাড়াতাড়ি ওর মুখে হাতচাপা দিয়ে বলে, ‘অমন কথা বলে না! অমন কথা বলো না। আমি গিয়েছিলাম তোমাকে খুঁজতে।’
সখির কথা শুনে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাঁশী কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘তুই একটা আস্ত পাগলি মেয়ে। আমি তোর ওপর রাগ করে চলে গেলাম আর তুই গেলি আমাকে খুঁজতে! কেনো তোর একটুও রাগ হয় না। রাগ হয় না। রাগ হয় না? আমাকে কি তোর বকতে ইচ্ছা করে না?’
‘না। তুমি যে আমার আনন্দ-বেদনার বাঁশী।’ এই কথা বলে চুপ করে যায় সখি। বাঁশীর মনেও আনন্দ-বেদনার মাখামাখি হয়ে চোখ উপচে অশ্রু ঝরে পড়ে সখির মুখের ওপর। সখি চুপ করে স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে থাকে। ওরা আর কথা বলে না। নিরবে দু’জনে দু’জনের স্পর্শে অনুভবে লীন হতে থাকে।
ঐ দিনের পর থেকে সখি আর সুস’ হয় না। দিন দিন শরীর অসুস’তা বাড়তেই থাকে। সখির অসুস’তা বাড়তেই গ্রাম ছেড়ে ওদের শহরে আসার কথা ভাবতে হয়। যে শহর ছেড়ে পাঁচবছর আগে ওরা চলে এসেছিল এই গ্রামে। এটা ঠিক তেমন জনবহুল গ্রাম নয়। এই গ্রামে কয়েক ঘর লোকের বাস। ওরা দু’জন যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তখন ওদের আলাপ। আর এই আলাপই ক্রমশ
অন্তরঙ্গতার পর্যায়ে পৌঁছোয়। তারপর দু’জনের বিয়ে। এ বিয়ে বাঁশীর বাড়ির কেউ মেনে নেয় না। কারণ সখির আগে আর একটি বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর সঙ্গে ওর ছাড়াছাড়ি হয় বিয়ের ছয়মাস পরেই। সখির বিয়ে হয়েছিল দশ বছর বয়সে। দশ বছর যখন ওর বয়স তখন ওর স্বামীর বয়স বিশ বছর। সখির বাবা নেই। ওর মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়ায় জোর করে ওর অভিভাবকত্ব নিয়েছিল ওর চাচারা। চাচারাই ওকে বিয়ে দেয়। ভীষণ ভয় পেতো স্বামীকে। বিশেষ করে রাতের বেলা ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যখন ওকে একঘরে ঢুকিয়ে শেকল তুলে দিতো বাইর থেকে, তখন ভয়ে ঘরের এক কোণে সিটিয়ে থাকতো। ছয়মাস এভাবে যাওয়ার পর ওকে ডির্ভোস দিয়ে দেয় ওর স্বামী। এরপর মায়ের কাছে চলে যায়। ও আবার পড়া শোনা শুরু করে। এবার মা সহায় হয়ে ওর পাশে দাঁড়ায়। আর সহায় হয় ওর মায়ের দ্বিতীয় স্বামী। ওর পালক বাবা। এই বাবাই ওকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। বাঁশীকে পছন্দ করে বলে বিয়েও দিয়েছে। বিয়ে দেয়ার সময় এই বাবা বাঁশীর হাত ধরে বলেছে, আমার মেয়ে বড়ো আহলাদী, বড়ো অভিমানী। খেয়াল রেখো। কিন’ বাঁশীর পরিবার এই বিয়ে মানতে পারে নি। বাঁশী ওদের বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে আর যায় নি, তারপর শহর ছেড়েছে। বাড়ি ছেড়েছে, এসেছে এই গ্রামে।
পাঁচ বছর জীবনের অনেকগুলো দিন। বাঁশীর মনে পড়ে অনেকের কথা। বাবা-মায়ের কথা, সহপাঠী-সহপাঠিনীদের কথা। ভাইদের কথা। ওর শৈশব কৈশোরের কথা। ট্রেন চলছে। বাঁশী তাকিয়ে দেখে ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঘুমঘুম ঢুলছে সখি। ওকে আস্তে ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘তুমি ঢুলছো কেনো, ক্লান্ত লাগছে।’ শহরে পৌঁছোতে তো আরও দশ ঘণ্টা। সখি শুয়ে পড়ে। বাঁশীর ভাবনা শহরে গিয়ে উঠবে কোথায়। এই শহরের কতো পরিবর্তন হয়েছে, কে জানে! ওদের বাড়ি যাবে কিনা ভাবছে বাঁশী। বাড়ি যাওয়ার ভাবনা নিজেই মন থেকে ঝেড়ে ফেল্ে। না, না সেখানে নয়। তবে হোটেলে। হোটেলে ওঠা যায়। কিন’ একা রেখে কোথাও গেলে সখির যদি কিছু হয়ে যায়। না না তা হয় না। তবে কি করবে!
নিজের মনের সাথে নিজেই কথা বলে বাঁশী। নিজের মনেই ভাবে বাঁশী। কিন’ কূল পায় না ওর ভাবনা যেনো আজ কূল কিনারা বিহীন নদী হয়ে গেছে। ভাবনা-চিন্তাগুলো যেনো এক বিশাল দিগন্ত, যাকে ছোঁয়া যাচ্ছে না! ধ্যাৎ আর ভাববোই না। বাঁশী চিন্তা করতে চায় না। কিন’ চাইলেই কি চিন্তা না করে থাকা যায়; যায় না! বন্ধ করা যায় না, ইচ্ছা করলেও অজান্তে চলে আছে চিন্তা! চিন্তা-ভাবনা, না করে থাকা যায় না; সেগুলো আপন নিয়মে কাজ করতে থাকে। বাঁশী জানালায় চোখ দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতি দেখে। ট্রেন থেকে নেমে বেবী নিয়ে ওরা হোটেল আসমানীতে ওঠে। হোটেল রিসেপসনে একটা মেয়েকে দেখে সখির চেনা মনে হয়। তামান্না। তামান্নার সঙ্গে পরিচয় কলেজে। একই কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষা দেয় ওরা। বিএ পরীক্ষা দেয়ার পর সখি ভার্সিটিতে ভর্তি হয় আর তামান্নার বিয়ে হয়ে যায়। তামান্না দেখতে সুন্দরী। মার্জিত রুচি সম্পন্ন একজন নারী। এক নিমেষে দৃষ্টি কাড়ে।
বাঁশী একটা রূম বুক করে। চাবি নিয়ে যাওয়ার সময় সখি মেয়েটিকে বলে, ‘যদি কিছু মনে না করেন আপনার নাম কি তামান্না?’ মেয়েটি এতোক্ষণ মুখ নিচু করেই লিখছিল, কথাও বলছিল মুখ নিচু করেই। সখির কথায় মুখের দিকে তাকায়, ‘আরে সখি তুই? সেই যে উধাও হলি আর কোনো খবর নেই, পাত্তা নেই। এখন কোথায় থেকে? ঢাকায় এলি কিসের জন্য? আর এই হোটেলেই-বা কেনো?’
‘দাঁড়া, দাঁড়া। এতোগুলো প্রশ্নে জবাব একসঙ্গে কেমন করে দেবো তুই বল।’ হাসতে হাসতে ঢলে পড়ে সখি। বাঁশী তাড়াতাড়ি ধরে ফেলে ওকে।
‘কি ব্যাপার ভাইয়া?’ তামান্না বলে। পানি ছিটিয়ে দেয় মুখে। সোফায় শুইয়ে দেয়। ওর কী শরীর খারাপ?’
এতোক্ষণ চুপ করে ছিলো বাঁশী। এবার কথা বলে। এতো কথার জবাবে যদি কথা না বলে তবে অভদ্রতা হয়। বাঁশী বলে, ‘কী অসুখ তা তো জানি না। ওকে দেখাতেই তো ঢাকায় আসা।’
‘দেখুন।’ একটু ইতস্তত করে তামান্না। তারপর বলে, ‘আপনি এখানে উঠবেন কেনো? তাছাড়া ওর অসুখ। আমার বাসায় অনেকগুলো ঘর খালি পড়ে আছে, যতোদিন ইচ্ছা থাকুন না।’ তামান্নার কথা শুনে কিছু না বলে সখির দিকে তাকায় বাঁশী। সখি আপত্তি করে। কিন’ তামান্নার যুক্তির কাছে হার মানে। অসুখ-বিসুখে দেখাশোনার জন্য লোক চাই। ভালো পথ্য চাই ঠিক সময় মতো। হোটেলে তো তা পাবি না।
বেশ কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেলো তামান্নার বাড়িতে আছে। তামান্না অফিসের ফাঁকে ফাঁকে দেখাশোনা করে। ওর কাছে ওদের গ্রামের গল্প, ওর সংসার, ওদের স্বামী-স্ত্রীর কথা শোনে। সখির ভালোবাসার কথা শুনতে শুনতে তামান্নার শূন্য মনে লোভের সঞ্চার হয়। ভালোবাসার আকাঙক্ষা জাগে। সুখের সাগরে ডুবতে সাধ হয়। সখি তা বুঝতে পারে। তামান্না বড়ো অসুখী। বিরাট বড়ো লোকের বউ হওয়া সত্ত্বেও সুখ নেই মনে। তাই বাঁশী ওকে টানে। সখির সুখ ওকে টানে। (চলবে)
