কবিতাকে সঙ্গী করে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন আফরোজা অদিতি। দশকের বিচারে আশির দশকের কবি। গত তিন যুগের মতো সময়ে দুহাতে লিখে চলেছেন তিনি। নানান আঙ্গিকের কবিতায় ভরে আছে তার লেখালেখির গোলাঘর। অতি সম্প্রতি, অর্থাৎ অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৮ তে প্রকাশিত হয়েছে আফরোজা অদিতির নির্বাচিত কবিতা। তার লেখা প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কয়েক হাজার কবিতা থেকে বাছাই করে প্রিয় কবিতাগুলো দিয়ে সাজানো হয়েছে এই ‘নির্বাচিত কবিতা’ শীর্ষক এই বইটি। মোট ৬৯টি কবিতা স্থান পেয়েছে ৮০ পৃষ্ঠার এই বইটিতে।
আফরোজা অদিতি বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনেএকজন সুপরিচিত মুখ। কবিতার সঙ্গে নিবিড় বন্ধনের জীবনযাপন তার। ইতিমধ্যে পাঠক তার স্বকীয় কাব্যভাষার পরিচয় পেয়েছে। শিল্প এবং মানবিক আবেগ, এই দুইয়ের মিশ্রণ হয়ে ওঠে তার কবিতাগুলো। তার কবিতায় আমরা প্রেমকেই দেখতে পাই। পাশাপাশি পাই স্বদেশ, প্রকৃতি, প্রতিবাদ ও সংগ্রাম। আফরোজা অদিতির এই ‘নির্বাচিত কবিতা’ বইটির কবিতাগুলোর কাব্যগুণ সম্পর্কে বলার আগে একটু ভূমিকা উপস্থাপিত করতে চাই কারণ পাঠকের সামনে এই ভূমিকা উপস্থাপন করা প্রয়োজন। একজন কবি শুধু কবিতা লিখেই তার দায়িত্ব-কর্তব্য শেষ করেন না, তিনি তার কবিতাগুলোকে পাঠকের সামনে হাজিরও করেন। তাছাড়া কবি নিজেও একজন পাঠক। নিজের কবিতা প্রথমেই পাঠক করেন কবি নিজে। এরপর তিনি প্রতীক্ষা করেন পাঠকের; পাঠকের ভালোবাসায় শিক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত মেঘ-বৃষ্টি-রৌদ্র-ছায়া মাখা একটি পরিচ্ছন্ন উঠোনের। একজন মানুষের ভেতর কবিসত্ত্বা হঠাৎ করেই জন্ম নিতে পারে। কবিসত্ত্বার জন্ম নিলেই তো হয় না, সেই সত্ত্বার বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বা পরিমণ্ডল থাকা একান্ত প্রয়োজন। কিন’ আমরা বেশিরভাগ সময়ই দেখতে পাই আমাদেও কবিদেও কাব্যচর্চা করতে হয় অনেকটাই বৈরী পরিবেশে। কবিতায় দুর্বোধ্যতা ও কবিদেও গোষ্ঠীবদাধতা একটা মাফিয়াচক্রের মতো আমাদের কবিতাকে কেবলই পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। স্রোতের এই প্রতিকূলে সাঁতার কাটার দৃঢ় মানসিকতা সম্পন্ন কবি খুব স্বল্পসংখ্যকই দেখতে পাওয়া যায়। যে কোন বিবেচনাতেই হোক না কেন, আফরোজা অদিতি এই স্বল্পসংখ্যক দৃঢ়চেতা কবিদের একজন। সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে আবিষ্ট নন তিনি, কিংবা মিডিয়াকে খুশি করে যেসব ‘কাটপিস জাতীয় কবিতা’, সে ধরণের কবিতা লেখার পক্ষপাতি নন তিনি। তিনি তার মতো করেই লিখে চলেছেন। তার হাসি-কান্না, মান-অভিমান, নারী হৃদয়ের সংবেদনশীলতা ও প্রেমের অনুভব- এসবই আমরা প্রধান উপাদান হিসেবে পাই তার কবিতায়।
একজন কবির নির্বাচিত কবিতাগুলো পাঠ করা যেমন আনন্দের, তার সমালোচনা করা ততোটা আনন্দের কাজ নয়। কবির হৃদয়ের উত্তাপ কবিতার মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, কিন’ সমালোচনার আলো সকল সময়ে ঠিক জায়গাটিতে পৌঁছাতে পারে না। ধোঁয়া আর ছাইয়ে ঢাকা মন্তব্যগুলো কতোটা কী ভালো কাজ করে আমার জানা নেই। তবুও কখনো কখনো প্রয়োজন হয় কিছু কবিতার শরীরে বিভিন্ন কোন থেকে আলো ফেলে দেখবার। যা হতে পারে কিছু কবিতাসুন্দরীকে’ মঞ্চে উঠিয়ে তাদের অভিনয় সৌন্দর্য দেখবার মতো কোন ঘটনা। কিংবা হতে পারে কবিতাগুলোকে পাঠ করে আনন্দ পাওয়ারই স্বীকারোক্তি মাত্র। আফরোজা অদিতির এই নির্বাচিত কবিতায় আনন্দ পাওয়ার কবিতা, ভালোলাগার কবিতাই সর্বাধিক। ভাষার জটিল বুনন নয়, আবেগের পরিশীলিত উচ্ছ্বাসই কবিতার প্রধান মন্ত্র তার। তার একটি কবিতা থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করা যাক –
‘আমি আসছি মা, তোমার জন্য মা, আমি কু-ঝিক-ঝিক রেলের কামরায় ভরাট খুশিতে একটু একটু এগিয়ে যাচ্ছি তোমার দিকে’ – মায়ের কাছে যাবো কবিতায় এই যে সরল সহজ সবুজ প্রকাশ হৃদয়ের চাওয়ার – এসবই আমাদের হৃদয়ে বেশি দাগ কাটে। আবার এই সহজতার মধ্যেই আমরা দেখতে পাই চমৎকার চিত্রকল্প ও উৎপেক্ষাও। এইএকই কবিতার আরো কয়েকটি পঙক্তি –
‘মা আমার সময়ের পাটি বুনছে
অপেক্ষার সুই-সুতোয়
যেতেই হবে আমাকে, না গেলে
মেঘের ওপারে সারস তার চোখের নিম-জল
চারু ঠোঁটে ছিটিয়ে
খেয়ে যাবে ভালোবাসার সুক্ষ্নাতিসুক্ষ্ণ শস্যদানা’ – এই যে অলঙ্কারের ব্যবহার, এই সব অলঙ্কার মোটেই আরোপিত নয়, এগুলো একদম স্বাভাবিক ঢঙে এসেছে তাঁর কবিতায়। ঠিক এইরকম স্বত:স্ফুর্তভাবে তৈরি হওয়া একটি উৎপ্রেক্ষা নিচের পঙক্তি দুটিতে দেখা যায়- ‘তবুও সাদা কাগজ আকাশের তারার মতো কালো অক্ষরে
দিন দিন উজ্জ্বলতার বাসনা জানায়’ – (পেন্সিল)
ঠিক একই বৈশিষ্ট্যের আরো দুটি পঙক্তি উদ্ধৃত করা যাক –
‘অথচ তুমি নেই
ভেঙে গেছে চাঁদের আলোর মতো স্বচ্ছ আমার ঈগলের ডানা।’
( তোমার জন্য বসন্ত)… উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প- এসব কিছুই হচ্ছে কবিতার প্রকৃত সম্পদ। এই সম্পদ আমরা যথেষ্টই দেখতে পাই আফরোজা অদিতির নির্বাচিত কবিতায়। এর বাইরে তার অনেক কবিতাতেই দেখতে পাই গল্পের ছোঁয়া। ব্যক্ত ও অব্যক্ত দুভাবেই গল্প উঁকি দেয় তাঁর কবিতার শরীর থেকে। আর একটি কবিতার শেষ কয়টি পঙক্তি উদ্ধৃত করা যাক –
‘হাত পেতে থাকা অন্ধ বালিকার মতো
কাঙাল ভিখেরি হৃদয়
প্রেম তাঁর জোড়া তালি দেওয়া শতছিন্ন বস্ত্রাবরণ
নুড়ি যেতে চায় নদীর কাছে, পারে না।’
(নুড়িটা ছিল নদীর) – এক পৃষ্ঠার চেয়েও কম আয়তনের এই কবিতাটিতে যে গল্প আছে, তা প্রায় এক জীবনের সমান। নুড়ি ও নদী এখানে রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রেম ও প্রকৃতির ছবিই শুধু নয়, এই বইয়ের কবিতায় আমরা সমাজ ও দেশ কাল রাজনীতি ভালোই দেখতে পাই। অনেক সময়েই সমকালীন ঘটনায় মগ্ন হয়ে তাঁর কাব্যভাষাও খানিকটা ভিন্নতর হয়ে ওঠে-
‘এত কিছুর পরে
এরার উপর খাঁড়ার ঘা
রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি-
বিদ্যুৎ প্রোজেক্ট গেল তো
ওয়াটার প্রোজেক্ট এলো, এলো
টেলিফোন প্রোজেক্ট।’
(আসুন এগিয়ে যাই) —ভিন্নতর ব্যঞ্জনাতেই রচিত তার নিচের পঙক্তিগুলো –
‘আসুন আসুন
গাজর খাই, এগিয়ে যাই’
(আসুন এগিয়ে যাই)
সৌন্দর্য ও শক্তিমত্তা হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে তাঁর কবিতায়। বিষয়বস্তু ও প্রকরণের যথেষ্ট বৈচিত্রের পরও, নির্বাচিত কবিতার সিংহভাগ কবিতাই প্রেমের – এই প্রেমের অনুরণনই তাকে পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। তাঁর কবিতায় তিনি যথার্থই বলেছেন-
‘সে ইচ্ছেমাফিক
আবাদ করে ফসল ফলায়
হাসায় কাঁদায় আমাকে।’
(তবুও ভালোবাসা) — নির্বাচিত কবিতা বইটি প্রকাশ করেছে আলোকপাত প্রকাশন। আলোচনায় ইয়াসির আজিজ
