গল্প যেমন, অণুগল্পও তেমন কথা সাহিত্যেরই অন্তর্ভুক্ত। আর কথাসহিত্য মানেই আমরা জানি যে অসংখ্য বাক্যেপুষ্প দিয়ে সাজানো ডালা ; যার মাধ্যমে হৃদয় উন্মুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয় এবং একই সঙ্গে প্রাণবন্ত ও স্মার্ট আবহ ফুটিয়ে তুলে পাঠককে মোহিত করে ফেলে। পাঠককে মোহিত করাই একজন কথাসিহিত্যিকের প্রধান লক্ষ্য। একটি গল্পকে যথাযথ কিংবা পূর্ণ অবয়বে ফুটিয়ে তোলার জন্য গল্পকারকে বেশ অনেকখানি স্থান বা স্পেস ব্যবহার করতে হয়। বইয়ের পৃষ্ঠাতে তা চার-পাঁচ-ছয় কিংবা বিশ-পঁচিশ পৃষ্ঠাও হতে পারে। এ ব্যাপারে ধরাবাঁধা কোন নিয়ম নেই। গল্পকার তাঁর ইচ্ছা বা প্রয়োজন মতো বড়ো-ছোটো করে একটি গল্পের অবয়ব গড়ে তোলেন।
এ তো গেল বড়ো বা ছোটো গল্পের কথা এর পাশাপাশি চলছে অণুগল্প; আমরা অণুগল্প বলতে বুঝি গল্পকেই। তবে তা একবারেই ছোটো আকৃতি সম্পন্ন! অর্থাৎ গল্প যেখানে কয়েক পৃষ্ঠার শব্দাবলী নিয়ে গঠিত হয় অণুগল্প সেখানে একপৃষ্ঠা, অর্ধপৃষ্ঠা বা তারও কম মাত্র কয়েক লাইনেও নিজেকে প্রস্ফুটিত করতে পারে। এতো অল্প জায়গাতে গল্পের পূর্বাপর কাঠামো বা অস্তীত্বকে প্রকাশ করা স্বভাবতই কঠিন। সেই কঠিন কর্মটি যখন সফলতার সঙ্গে নিষ্পন্ন করা হয় তখন আমরা একটি সুন্দরতম সৃষ্টিকে পাই, এ কথা বলাই বাহুল্য। একটি অণুগল্প তার ক্ষুদ্র আয়তনে অনেক কথা বলতে পারে, বিন্দুতে সিন্ধু ধরার মতো গভীরতর জীবনবোধের দরোজার কড়া নাড়তে পারে, এবং নাড়েও। অণুগল্পের সঙ্গে আধুনিক কবিতার তুলনা করা গেলেও অণুগল্প কবিতা নয়! তবে কবিতার মতো স্বল্প আয়তনের মধ্যে অনেক অনেক ভাবনাকে ধারণ করতে পারে। তবে আঙ্গিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্টের দিক দিয়ে এই দুটি মাধ্যম একেবারেই আলাদা এবং আলাদা হওয়ার কারণে অণুগল্পের কাছে পাঠকের প্রত্যাশা থাকে ভিন্ন। অর্থাৎ কবিতার পাঠক যেমন কবিতাকে পড়তে চায়, অণুগল্পের পাঠকও তেমনি গল্পই পড়তে চায়। ফলে অণুগল্পের বুনন ও ভিত্তি অবশ্যই থাকতে হয় কারণ এই বুনন ও ভিত্তির ওপর ভর করেই তৈরি হয় বিচিত্র ধরণের সব অণুগল্প। ছোটোগল্পে যেমন, অণুগল্পেও তেমনই লেখক নিজের মনকে আড়ালে রাখেন না! বস’ত লেখকমনের বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর গড়নই প্রতিবিম্বিত হয় অণুগল্পে; অণুগল্পের এই সকল বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা মাথায় রেখে আফরোজা অদিতি অণুগল্পের বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। আফরোজা অদিতি মূলত কবি। কবিতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি উপন্যাস এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছোটোগল্প লিখেছেন। কবিতা-উপন্যাস-ছোটোগল্পের মতো অণুগল্পের সংখ্যাও কম নয়! হয়তো খুব তাড়াতাড়িই বের হবে একটি অণুগল্পের বই। আফরোজা অদিতির কয়েকটি অণুগল্প নিয়ে একটু কথা বলা যাক।
১. খেজুরগাছ ২. তোমাকেই খুঁজছি ৩.শঙ্খমালা ও লেবুফুল ৪.দেহচর্চা ৫. সে ও আমি ৬. হঠাৎ ৭. ষাটে পা দিলো যেই ৮. মানুষ কেন অমন হয় না ৯. পাখি ও পিঞ্জিরার কথা ১০. বকুলগাছ ও মেয়েটি
এই যে ১০টি অণুগল্পের শিরোনাম লেখা হয়েছে এগুলো খুবই নিকটতম শব্দ দিয়ে তৈরি। এইসব অণুগল্পগুলো তৈরির মাল-মসল্লার যোগান পেতে দূর বহুদূর বা ভিন্নদেশ ভিন্ন সংস্কৃতিতে যেতে হয়নি তাঁকে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই নয়। গল্পগুলোর সবকিছুই তাঁর চারপাশ থেকে নেওয়া। মনের ভেতরের আবেগের ঝরনাকে যখন একএকটি পদ্মপুকুর করে সাজিয়ে রাখা যায় তখন গড়ে উঠতে পারে এই ধরনের স্বকীয় ও সহজাত নিজস্ব দেশীয় শিল্পসম্ভার। একটি খেজুরগাছ বেশিকিছু নয় তবুও একটি খেজুরগাছই হয়ে উঠতে পারে একটি গল্প। সেই অণুগল্পের কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করা হলো :
“ খেজুরের রস খায় নীলটুনি, শালিক, চড়ুই, পাপিয়া, কাঠবেড়ালি। ফল হয় খায় পাখি, মানুষ। খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধে গাছি। রোজ নিজেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে গাছে ওঠে। তারপর ধারালো কাস্তে দিয়ে চেঁছে একটা বাঁশের নল গাছের গায়ে ঠুকে ঠুকে লাগিয়ে দেয়। একটা হাঁড়ি বেধে রাখে যার মুখ থাকে নলের আগায়। গাছের ছাল-চামড়া উঠে যায়। বড্ড ব্যথা লাগে গায়ে” – একজন গল্পকারের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাই হলো তাঁর লেখার মূল শক্তি। আর এই পর্যবেক্ষণ ঋদ্ধ হয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।আফরোজা অদিতির পর্যবেক্ষণের গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে এই ছোট্ট লেখাটিতেও। খেজুর গাছ থেকে রস পা্ওয়া যায় তা আমরা জানি, কিন্তু সেই রস যে নীলটুনি, শালিক, চড়ুই, পাপিয়া সব পাখি, এমন কি কাঠবেড়ালিও যে খায় সেটা আমরা ক’জন সেভাবে খেয়াল করেছি। গ্রাম বাংলার প্রকৃতিতে জীবনের যে বিচিত্র আয়োজন, আমাদের শহুরে চোখ দিয়ে তা দেখার অবসর কোথায়!
‘তোমাকে খুঁজছি’ শিরোনামের অণুগল্পটি তাঁর সত্ত্বার স্বগত সংলাপেরন মতো! এখানে ঘটনার যে ইঙ্গিত তিনি রেখেছেন তা থেকে বিস্তৃত অনেক দৃশ্য প্রস্ফুটিত হয়েছে; যা থেকে পাঠক বুঝে নিতে পারবে ১৯৭১ এর যুদ্ধময় দিনগুলিতে একজন মানুষের অনেককিছু হারানোর বেদনাকে। এই বেকদনার মধ্যেই তো উত্থিত হয়েছে আমাদের স্বাধীন দেশ; বাংলাদেশ। অণুগল্পটির শেষের লাইনটিতে লেখক হাজার অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনেছেন এমন মনে হবে ; সেটি উদ্ধৃত করছি : “আজ আমার সকল প্রতীক্ষার অবসান। মনে মনে বললাম, কেউ জানবে না কেউ বুঝবে না তোমারই জন্য সারাটি সকাল বসে বসে গেঁথেছি সাধের ফ’লমালাটি। এই মালা হলে তুমি; মনেপ্রাণে চেয়েছি, এখনও চাই ১৯৭১ এর তোমাকে যে জ্বলে উঠতে জানে।”
‘শঙ্খমালা ও লেবুফুল’ গল্পটি অনেকটা প্রতীকায়নের গল্প। একটি প্রজাপতি আর একটি লেবুগাছ- সময় তাদের নিয়ে তৈরি করে মিষ্টি সম্পর্কের দৃশ্য। সেই দৃশ্যই প্রতিবিম্বিত হয় মানব-সত্ত্বায়। ‘দেহচর্চা’ অণুগল্পটি জীবনের বাস্বতার সরাসরি প্রকাশ। মানুষের দেহমন যে অদ্ভূত রসায়নে তৈরি তাই জানান দেয় এই ছোট্ট অণুগল্পটি। বয়স যখন ষাটের কোঠায় তখন একজন নারী তাঁর শরীর ও মনের অতৃপ্তি ও শীতলতা অনুভব করে। আবার কোন একদিন সেই নারীই তাঁর স্বামীর একটিমাত্র বাক্যে ফিরে যায় যৌবনের দিনগুলোতে। সেই বাক্যটি হলো- “আজও তোমাকে ভালোবাসি সেই আগের মতো।” ভালোবাসার হাত ধরে সেই নারীর বয়সী জীবনটাও বসন্ত হাওয়ায় দোলায়িত হতে থাকে।
আফরোজা অদিতির বেশিরভাগ অণুগল্পের প্রধান উপলক্ষ্য প্রেম। মিষ্টি প্রেমের সুর খেলা করে এসব গল্পে। প্রেমময়তার সঙ্গে সঙ্গে এসব গল্পে পাওয়া যায় কবিতার ছোঁয়াও। কবির লেখা গল্প বলেই হয়তো, হঠাৎ হঠাৎ কবিতার পংক্তি চলে আসে। কবিতার মতো কিছু লাই উদ্ধৃত করা হলো :
“এক ঝলক বৃষ্টি। তারপর ঝলমলে রোদ। প্রকৃতি ভরে গেছে কনেদেখা আলোয়।”
“ চোখের ভেতর তাঁর সাদা বলাকার সারি। বলাকারা উড়ছে। ক্রমশ আলো ঢেকে যাচ্ছে তাদের ডানা।”
“মনের ভেতর দুটো লাইন। এক লাইনে মানুষ অন্য লাইনে কাক। তিনি শূন্যে ছুঁড়ে দিলেন তাঁর ভাবনা – মানুষ কেন হয় না কাকের মতো।”
“কখনও হতে পারবেন না রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দ তবুও কবি কলম তুলে নেন হাতে।”- প্রেম হোক কিংবা প্রকৃতি বা আর যে কোন বিষয়ই হোক, অণুগল্পগুলিতে জীবনেরই ছবি এঁকেছেন আফরোজা অদিতি। এক একটি অণুগল্প যেন জীবন নামক উপন্যাসের এক একটি খণ্ডিত অংশ বা পৃষ্ঠা ! পরিমিতি বোধ, বাক্যের শৈল্পিক সজ্জা, বাস্তবকতা বা ঘটনার প্রতি বিশ্বস্ততার আবহ – এই সবকিছুই তাঁর অণুগল্পগুলোকে স্বার্থকতার পথে হাঁটিয়েছে। জীবনের রসায়ন জেগে আছে একটি একটিচ খণ্ডিত আলেখ্যে। এই আলোচনাটি যখন লিখেছিলাম তখনও অণুগল্পের বইটি বের হয়নি। আফরোজা অদিতির “কমরেড ও তাঁর সঙ্গীরা” নামে অণুগল্পের বইটি বের হয়েছে। **অণুগল্পের রসায়ন : আলোচনায় ইয়াসির আজিজ**
