ফেরারী // আফরোজা অদিতি

খুন,রাহাজানি,ধর্ষণ, লুটতরাজ, নারী-শিশু পাচার- এই সব এখন নিত্যকার ব্যাপার। খবরের কাগজ খুললেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত কম করে হলেও ৫/৭টি অপরাধের খবর দেখা যায়। মানুষের নৈতিক অধঃপতন আর মূল্যবোধের ক্রমঅবনতির ফলে সংঘটিত অন্যায়-অপরাধের ফলে সামাজিক অবক্ষয়! আজ এখানে-কাল সেখানে-পরশু ওখানে পড়ে থাকছে গৃহবধু কিংবা স্কুল-কলেজ পড়-য়াদের লাশ কিংবা ধর্ষিতা তরুণীর অর্ধউলঙ্গ শরীর! আজকাল এমন হয়েছে ৪/৫ বছরের ছোটো শিশুও ধর্ষণ থেকে বাদ যায় না। এছাড়াও আছে ড্রেনের মধ্যে কিংবা ডাস্টবিনে সদ্যজাত শিশুর মৃতদেহ। এই সব শিশুদের মা পলাতক, বাবার খবর নেই!

লীনার সাধারণত এইসব খবরের জন্য কাগজ পড়তে ভালো লাগে না। ওর মন ভালো নেই আজ; আজ পহেলা জুলাই, সীমার জন্মদিন। সীমা ওর ঘনিষ্ঠ একমাত্র বান্ধবী। ওর কাগজ পড়তে ভালো না লাগলেও কাগজটি নিয়ে বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে। নিশিথ নেই; সে অবশ্য কোনোদিনই দুপুরে বাসাতে থাকে না। ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘরে। লীনা দুপুরে শুয়েই থাকে কিন’ আজ আর শুতে ভালো লাগছে না ওর। খবরের কাগজ সামনে মেলে ধরতেই চোখ আটকে যায় একটি শিশুর ছবিতে। বড়ো বড়ো হরফে লেখা “সদ্যজাত শিশুকে ফেলে মা পলাতক।” সুন্দর একটি শিশু। একমাথা ঘন কালো চুল। ডাগর ডাগর চোখে চেয়ে আছে। কোনো এক তরুণী তাঁর সদ্যজাত পুত্র সন্তানকে ফেলে চলে গেছে। তিনদিন শিশুটি নার্সদের জিম্মায়। অভিভাবক হয়ে আসেনি কেউ। হেরোইন মদ, গাঁজায় আসক্তির এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই রকম ঘটনা আকছার ঘটে চলেছে। সদ্যজাত এই শিশুটিকে দেখে মায়া হয় লীনার। ছেলেটি তাঁর কেউ নয়; ও জানে হয় তো এই ছেলেটি কোনো এতিমখানায় বা কোনো সন্তানহীন ধনী ব্যক্তির বাড়িতে সন্তানস্নেহে পালিত হবে। কিন’ কোন দোষে, কার দোষে মায়ের আদর, বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে। কী ওর অপরাধ? কে দেবে এর উত্তর। যেমন দেয়নি কেউ সেদিন, আজও তেমনি দিলো না। জবাব পেলো না লীনা।

সেদিনের তারিখটা মনে আছে আজও। তারিখ ছিল ৩০ মে, ১৯৮১ সাল। এই হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ঘটনার আগের কথা অর্থাৎ আরও আগের কথা মনে পড়ে লীনার। লীনার মা, বাবা ছিল না। মামার কাছে মানুষ হয়েছিল। মামা-মামী ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়। ওর স্বামী নিশিথ সৎ, কর্মনিষ্ঠ। সংসারে তাঁরও আপন বলতে কেউ নেই। দুরসম্পর্কের এক চাচা থাকে গ্রামে। নিশিথ তাঁর চাকরি আর ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত দিন কাটায়। লীনা সারাদিন একাই থাকে বাসাতে। এই একা থাকাতে সুুবিধা হয়েছিল, লীনা কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিল। সেখানেই সীমার সঙ্গে পরিচয় ওর। ওরা ইডেন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সীমার গোলগাল ফর্সা মুখটাতে উজ্জ্বল একজোড়া চোখ আর একমাথা ঘন কালোচুল লীনাকে আকৃষ্ট করেছিল সেদিন। প্রথম আলাপেই ভালো লেগেছিল লীনার। কলেজের আর কারও সঙ্গে আলাপ হয়নি তখনও। লীনা কথা বলে কম তাই একা একা একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ সীমা একদল মেয়ের সঙ্গে হৈহৈ করতে করতে গাছের নিচে এসে ওর হাত ধরে টানতে টানতে বলে ‘অ্যাই, অ্যাই, সবসময় এমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক কেন? চল চল কমনরূমে চল, হয় গল্প করবে না হয় ক্যারম খেলবে।’ সীমার এই প্রণবন্ত উচ্ছলতার কাছে লীনার গাম্ভীর্য ভেসে যায়। ও হাসতে থাকে। সেই থেকে ঘনিষ্ঠতা। কলেজের অনেকেই হিংসা করতো ওদের। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলতো তোরা দুজনে বিপরীত হলেই ভালো হতো, প্রেমটা জমতো ভালো। ওদের কথা শুনে দুজনেই হাসতো, কিছুই বলতো না। তারপর একদিন সীমা মারা যায়! যেদিন সীমা মারা যায় সেদিন ওর চারপাশ ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুদিন কোনো কাজে মন দিতে পারেনি, পারেনি ক্লাস করতে।

সীমার বাবা সরকারী চাকরি করতো। খুব অবস’াপন্ন না হলেও খারাপ ছিল না ওদের অবস’া। সীমা আর লিটন দুই ভাইবোন আর বাবা-মা চারজনের সংসারে আনন্দ ছিল সঙ্গে সচ্ছলতা। লীনা প্রায়ই সীমাদের বাসায় যেতো। সীমার মা খুব আদর করতো ওকে। সীমাও মাঝেমধ্যে রাতে এসে থাকতো লীনার কাছে। দিনগুলো আনন্দে মধ্য দিয়েই যাচ্ছিল। ওরা আ.এ.পাশ করে দর্শনে অনার্স নিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই সীমার মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পায় লীনা। কিন’ জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর দেয় না বরঞ্চ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সীমা। সীমা এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে বুঝতে পেরে কোনো কিছু নিয়ে আর চাপাচাপি করে না লীনা। অপেক্ষা করে; ভাবে বলবে একসময়। এখন মাঝেমধ্যে একলা থাকলে ভাবে, ঐ সময়টুকু দেওয়াই ভুল হয়েছিল। মনে পড়ে ১০দিন ছুটি নিয়ে নিশিথের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল লীনা। সিলেট-কক্সবাজার ঘুরে এসে কলেজে গিয়ে জানতে পারে এই ১০ দিন একদিনও কলেজে আসেনি। ওর কথা জানতে সীমাদের বাসাতে যায় লীনা। সীমার মায়ের কাছে জানতে পারে সীমা খুলনা গিয়েছে মামার বাড়ি। সীমাকে দেখতে না পেয়ে খারাপ লাগে ওর। ওর কাছে মনে হয় ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া থম মেরে আছে ঠিক ঝড় আসার পূর্বে প্রকৃতি যেমন থাকে। ওর কেমন যেন ভয় ভয লাগে অথচ ইউনিভার্সিটি খুব শান্ত ধীরস্থির।

আরও পনেরো দিন পর সীমাদের বাসায় গিয়ে দেখে সীমা শুয়ে আছে। ‘কিরে, শুয়ে আছিস কেন?’ ওকে দেখে সরে গিয়ে বসার জন্য জায়গা করে দেয় সীমা। লীনা বসতে বসতে বলে,‘মামা বাড়ি থেকে করে এলি? কলেজে যাসনি কেন?’ এতোগুলো কথা বলে সীমার দিকে তাকায় লীনা। সীমা অন্যমনস্ক। ওর কথা শুনেছে বলেও মনে হলো না লীনার। সীমার বড়ো বড়ো চোখদুটো ভেজা ভেজা। এবার ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দেয় লীনা। ‘এভাবে চুপ করে থাকবি না তো; কী হয়েছে বল।’ সীমা ব্যাগ থেকে একটি চিঠি বের করে লীনার হাতে দেয়। বলে, ‘পড়।’ সোজাসাপ্টা চিঠি। কোন শিরোনাম নেই, নেই ইতি।
“তোমার খবর জানলাম। এটা আর এমন কি? সব পরিষ্কার করে ফেল।” এরপর বিশেষ দ্রষ্ট্রব্য দিয়ে লেখা: “ একটা কথা মনে রেখো ভবিষ্যতে আর কোনদিন আমার পরিচয় নিয়ে এখানে আসবে না। তোমাকে ঘরে তুলবো এটা কীভাবে চিন্তা করলে? ছি:…” চিঠিটা শেষ করে তাকিয়ে দেখে কাঁদছে সীমা। সীমার মাথায় হাত রাখতেই কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে, ‘কি হবে রে লীনা।’ লীনা মুখে কোনো জবাব আসে না। কথা না বলে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে লীনা।

একটু অবাক হয়েছে লীনা! সীমা যে এভাবে এতোদূর জড়িয়েছে কিছুই জানায়নি ওকে আর বুঝতেও পারেনি লীনা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ‘তুই এখন কী করবি? কী করতে চাচ্ছিস?’ লীনার কথায় ওর হাত শক্ত করে ধরে সীমা; যেন ওর যে এখন একটি অবলম্বণ প্রয়োজন সেই অবলম্বণ হলো লীনা। লীনা ওকে আবার বলে, ‘কিরে বললি না তো কী করবি?’ সীমার কোন উত্তর না পেয়ে গুরুজনের মতো বলে, ‘খালাম্মা জানে কিছু!’ বাড়িতে কেউ জানে না বলে আবার কাঁদতে থাকে সীমা। ওর কান্না দেখে লীনারও কান্না পায়। চোখের জল চেপে রেখে বলে, ‘কাঁদিস কেন? কাঁদলে কি সমসার সমাধান করা যায়, না যাবে?’
‘কেন কাঁদছি, তুই তো জানিস লীনা। আমি কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আর আমাদের এই বিয়ের খবর কেউ তো জানে না।’
‘না জানলে কি! বিয়ে তো হয়েছে।’
‘কাবিননামা তো তোলা হয়নি। ও তো বিয়েই স্বীকার করতে চাইছে না!’
‘তখন হয়নি, এখন তোলা হবে। কাবিননামা তোলা হয়নি বলে বিয়ে অস্বীকার করছে! স্বীকার না করলেই হলো।’
‘কাবিননামা তুলবো তারপর দেখি কেমন করে বিয়ে অস্বীকার করে!’ একটু চুপ করে কী একটা ভাবে লীনা তারপর বলে, ‘কেন বিয়েটা স্বীকার করতে চাইছে না বল তো।’
‘বড়ো লোকের মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছে।’
‘তুই চুপ করে থাক। আমি চেষ্টা করি।’
‘নারে কিছুই হবে না। অনেক চেষ্টা করেছি।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলে সীমা। ‘আমি তো মামার বাড়ি যাইনি। ওর ওখানে গিয়েছিলাম। ঘরে ঢুকতে দেয়নি। বেঁধে রেখেছিল। আরও অনেক কথা …. থাক। পরশু ওর বিয়ে। আমি আর ওর কাছে যাবো না রে।’ সীমার চোখ জল পড়ে। লীনা ওর চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘কেন যাবি না।’
‘কি হবে গিয়ে!’ কিছুই হবে না।’
‘না যদি যাস তবে তুই মুখ দেখাবি কী করে? তোর বাবা-মা তো জানে না এই বিয়ের কথা।’

এরপর আর কথা এগোয় না। ওরা চুপচাপ। সীমার মা কাজের মেয়ের হাতে চা আর খাবার পাঠিয়ে দেয়। একটু পরে নিজেও এলো। বলে, ‘মা লীনা, ওকে একটু বোঝাও তো কেবল শুয়ে থাকে, ইউনিভার্সিটি যাচ্ছে না।’
‘আচ্ছা খালাম্মা দেখবো। খালাম্মা একটা কথা বলবো কিছু মনে না করলে, ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাই।’
‘ তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে সে তো ভালো কথা। কিন’ …’ চুপ করে যায় সীমার মা।
‘কি হলো খালাম্মা বলেন।’
‘ওকে তো দেখতে আসবে আগামিকাল। খুব বড়োলোকের ছেলে না হলেও অবস’াপন্ন। ছেলে ভালো চাকরি করে। তোমার খালুজানের পছন্দ।’

আরও কিছুক্ষণ থেকে লীনা চলে আসে বাসায়। পরদিন পর খবর পায় সীমা আত্মহত্যা করেছে।
(২৯.১২.১৯৯৬)

#afrozaaditi.com

আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615