সকাল আটটা থেকে অবিরাম বৃষ্টি। একটানা ঝাপুর ঝুপুর, ঘাপুর ঘুপুর ঝরে ক্লান্ত হয়ে টিপির টিপ, টুপুর টুপ ইলশেগুড়ি ঝরছে। এখন তিনটা। খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করে না তবুও দুপুরে সকলের শখের জন্য ইলিশ ভাজা-খিঁচুড়ি খেতে হয়েছে! খেয়েদেয়ে যে যার মতো ঘুমিয়ে, আমার ঘুম আসছে না। প্রকৃতি বিষণ্ন হলে মনও বিষণ্ন থাকে; মন বিষন্ন হলে ঘুম আসে না। সুস্মিতা বলে, ‘ চন্দ্রের জাতিকাদের এমনই হয়।’
মন বিষণ্ন; ভালো লাগছে না কিছুই; সিডি ছাড়লাম। রামী-চন্ডিদাস! ভালো লাগলো না। রাধার মানভঞ্জন! নাহ, ভালো লাগছে না। কবিতার সিডি দিলাম। কবিতাও ছুঁতে পারছে না মন! সিডি বন্ধ না করে জানালায় এসে দাঁড়ালাম। রাস্তার ওপারে ছোট্ট একটুকরা রেলিং ঘেরা জায়গা। পার্ক। সেখানে বৃষ্টিতে একহাঁটু জলে গোটা ছয়েক ছেলে-মেয়ে লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি করছে। ওদের ফুর্তি দেখে ছোটবেলাকে মনে পড়লো। বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালো লাগে। ছোটবেলায় ইচ্ছের বাঁধন ছিল না। এখন ইচ্ছের বাঁধন দিতে হয়। যখন-তখন যা খুশি করা যায় না। করতে পারি না।
মনে পড়লো শ্যামকানাইয়ের; সে আমার ভাই,বন্ধু, আত্নার আত্নীয়। আমার ভাবনায় চলে তাঁর নিঃশব্দ চলাফেরা। শ্যামের কথা মনে হতেই আরও আনমনা আরও বিষণ্ন হয়ে যাই। শ্যাম আর বাঁশি বাজায় না, তাঁর সুরের ধারায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে সে নিরব। তাঁর বাঁশি না বাজলেও এখনও শ্যামের জন্য কবিতা লিখি, শ্বাস নেই। ভাবনার ভেলায় ভাসছি!
‘ভাবী।’ সোহাগীর ডাকে চমকে উঠি।
‘কিছু বলবে?’
‘চলেন ভাবী, বেড়াতে।’
‘এই বৃষ্টিত্যে!’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করি।
‘চলেন না। ঘরে থাকতে ভালো লাগছে না।’ ওর কন্ঠে এবং কথার সুরে কী যে ছিল তা ব্যাখ্যা করা যাবে না। বেড়াতে যেতে রাজী হলাম।
‘কোথায় যাবে?’
‘ আগার গাঁও।’
‘অনেকটা পথ।’
‘হোক না ভাবী, চলেন। প্লিজ।’ আগারগাঁও মামার বাসা। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছে। ওকে কাপড় পরতে বললাম।
সোহাগী চলে গেলো কাপড় পরতে। আমিও কাপড় বের করার জন্য আলমিরা খুলতে যাবো হঠাৎ পেছন থেকে ‘যাস নে’ শব্দ শুনে একটা হার্টবিট মিস্ হয়ে যায় আমার। অদৃশ্য সেই কন্ঠ; যে অদৃশ্য কন্ঠ সুগন্ধের আড়ালে মাস দুয়েক হলো আগলে রাখছে আমাকে। অদৃশ্য কন্ঠকে বললাম, ‘যাবো না!ওকে কথা দিলাম। তাছাড়া নিজের মনটাও বে-চায়েন, উচাটন।’
‘হোক উচাটন, যাস নে। বিপদ হবে! সোহাগি তোকে বিপদে ফেলবে।’
‘ধ্যুৎ, তাই কখনও হয়!’ হেসে উঠলাম। অদৃশ্য কন্ঠের কথা না মেনে পথে বের হলাম।
আকাশে রোদ উঠেছে; বৃষ্টির সঙ্গে চলছে রোদ্দুরের সখ্য। রংধনু উঠেছে। বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। বৃষ্টিধোয়া গাছের পাতাগুলো সবুজ। সবকিছু মিলিয়ে চোখ, মন জুড়িয়ে গেলো। মনে ভাবলাম রাস্তায় বের না হলে প্রকৃতির এই রূপ দেখতেই পেতাম না। মনের বিষণ্নতা দূর হয়ে গেলো। গুনগুনিয়ে উঠলাম। ‘ও মন হারিয়ে যারে হারিয়ে যাওয়া বনে।’ মনটা প্রকৃতির রসে এমন ডুবে ছিল, খেয়াল করিনি ফরফর করে একরকম উড়ে চলছিল যে রিকশা সেই রিকশা চলছে ঢিমেতালে। রিকশা টানতে পারছে না রিকশাওয়ালা।
এই তুমি জোরে টানো। টানছো না কেন?
রিকশাওয়ালার জবাব দেওয়ার আগেই পেছন থেকে উত্তর এলো, পেছনে আমি। ভারী তো হবেই।
চমকে উঠলাম। এ কন্ঠস্বর কার?এ কন্ঠস্বর তো আমার জানা অদৃশ্য কন্ঠের নয়!তবে কার? পেছনে তাকালাম, কেউ নেই। রিকশাওয়ালাকে তাড়াতাড়ি চালাতে বললাম। আমার বুকের ভেতর ভয় ঢুকে গেছে। সোহাগীর কোন ভাবান্তর নেই! রিকশাওয়ালাও টানতে পারছে না। পেছনে নিঃশ্বাসের শব্দ; নিঃশ্বাসের গরম স্পর্শ পেলাম খোলা কাঁধে। ভয় বেড়েই চলেছে। ঘরে শোনা অদৃশ্য কন্ঠের কথা মনে পড়লো। ধমক দিলাম রিকশাওয়ালাকে।
‘কি, আস্তে চালাচ্ছো, তাড়াতাড়ি চালাও।’ রিকশাওয়ালা প্রাণপণ চেষ্টা করেও জোরে টানতে পারছে না।
ঢিকিস ঢিকিস করে রিকশা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটে ফার্মগেইট পৌঁছে, খেজুরবাগানের রাস্তায় ঢুকবে ঠিক সে সময়, বাঁশির কন্ঠ কানে এলো। তাকিয়ে দেখি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে বাঁশি। রিকশা ঘুরিয়ে ওর কাছে গিয়ে বললাম, ‘এখানে কী করছো।’ ও বললো, ‘তোমাদের জন্যই তো দাঁড়িয়ে আছি।’
বললাম, ‘আমরা যে তোমাদের বাসায় যাচ্ছি, একথা জানলে কী ভাবে।’ বাঁশি অদ্ভুত হেসে বললো, ‘জেনেছি। আর জেনেছি বলেই তো দাঁড়িয়ে আছি। ও বাসায় তো পৌঁছাতে পারবে না তোমরা।’
‘কেন?’ প্রশ্ন করে তাকাতেই দেখি বাঁশি নেই। আশ্চর্য হলাম। ও তো এরকম লা-পরোয়া ছেলেই নয়। তাহলে! ভয়টা আরও জেঁকে বসলো। রিকশা ঘুরাতে বললাম। রিকশা ঘুরাতে যাবে, তাকিয়ে দেখি কোথা থেকে আজদাহা এক ট্রাক গাঁক গাঁক করে আমাদের দিকেই আসছে। রিকশা জলদি। রিকশা কোনরকমে একটু পাশ কাটাতে না কাটাতেই ট্রাক চলে গেলো। ট্রাকের লেজের ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম আমি। তাকিয়ে দেখি মিটিমিটি হাসছে সোহাগী। ভাবলাম চোখের ভুল। আবার চলা শুরু হলো। ভাবলাম এতোদূরের রাস্তা, রিকশায় আসা ঠিক হয়নি।
রিকশাওয়ালা গজগজ করতে করতে আবার চালাতে শুরু করে। পথ আর বেশী নেই। রেডিও অফিস ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গেলেই মামার বাসা। রিকশা পঙ্গু হাসপতাল ছাড়িয়ে রেডিও অফিসের কাছে আসতেই মনে হলো কেউ যেন পেছন থেকে ধাক্কা দিলো রিকশাটাকে। উল্টে গেলো রিকশা। আমরাও প্রপাত ধরণীতল। কাদায় মাখামাখি পৌঁছালাম মামার বাসায়।
দরোজা খুলে আমাকে দেখেই রাগে অগ্নিশর্মা মামী। বললেন, ‘বৃষ্টির মধ্যে এতোদূরের রাস্তায় বিনা কাজে কেউ আসে। এসেছিস তাও আবার পরের বউ সঙ্গে করে। ওর যদি কিছু হয়ে যেতো। তোর যে বুদ্ধিসুদ্ধি কবে হবে!’
‘কার বুদ্ধির কথা বলছো মা।’ বলতে বলতে ঘুমঘুম চোখে এসে দাঁড়ায় বাঁশি।
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, ‘তুমি? তুমি কি বাসাতেই!’আমার কথা শুনে হেসে কুটিকুটি বাঁশি। বলে, ‘এই বৃষ্টির দিনে পাগল না হলে কেউ ঘর থেকে বের হয় না।’ ‘তাতো ঠিক। কিন’ কী করে সম্ভব?’ আনমনে বলি। ‘তুমি বের হও নি তো রাস্তায় কার সঙ্গে কথা হলো।’
মামি বললেন, ‘ও রাস্তায় যাবে কি? ওর পাঁচদিন পর কাল জ্বর ছেড়েছে।’
আমি বললাম, ‘অসম্ভব, এ হতে পারে না।’
‘কী অসম্ভব?’ বাঁশির পীড়াপীড়িতে সব কথা খুলে বললাম। মামিও শুনলেন। মামি, আমাদের একা ছাড়লেন না। বাঁশি পৌঁছে দিলো। আমার মনের মধ্যে একটা কাঁটা বিঁধেই রইলো। বাঁশি, যদি ঘরেই ছিল, তাহলে কার সঙ্গে কথা বললাম? আমি, আমার এতোদিনের পরিচিত বাঁশিকে চিন্তে পারলাম না? আশ্চর্য! এরপর থেকে সোহাগিকেও কেমন অপরিচিত মনে হলো।
#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি
