ওর আয়ু // আফরোজা অদিতি

বৃহস্পতিবার। রাত নয়টা। নীলাকাশে পূর্ণিমার গোল চাঁদ। মায়াবী জোছনায় ঝলমল করছে পৃথিবী। রান্না করছিলাম। জোছনা রাতে রান্না করতে বা কাজ করছে ইচ্ছে করে না আমার। ইচ্ছে করে জোছনায় গা ডুবিয়ে আকাশ দেখি, দেখি চাঁদ, শুনি গান। কবিতায় ভাসিয়ে দেই মন। কিন’ সংসারের সাত-সতেরোতে তা হয় না কখনও।

রান্না করছিলাম। পাশে দেবরের বউ, সোহাগী। যেখানে আমি সেখানেই থাকবে ও। বারণ করলেও শোনে না। বলে, ভাবী, তোমাকে ভালো লাগে, তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। ওর সাহচর্য, ওর কথা শুনতে ভালো লাগে আমারও। ওর কথা শুনতে শুনতে সময় কোথা দিয়ে চলে যেতো টেরই পাই না আমি। সেদিনও কথা বলছিলাম দুজনে।

ভাত ফুটছিল। ফুটন্ত ভাতের একটা গন্ধ আছে। জোছনা মাখা মায়াবি বাতাসে সেই গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিলো। সোহাগীর কথাও ওই ফুটন্ত ভাতের মতোই ছড়িয়ে পড়ছিল বাতাসে। আমি,কাজ করছি ওর কথাও শুনছি। হঠাৎ সোহাগী বললো, ভাবী, তোমার পেছনে একটা লম্বা হাত। ওপরের তাক থেকে লবণের কৌটা নামাচ্ছিলাম, আচমকা ওর কথায় চমকে উঠে চুলার ওপর পড়ে যাওয়া থেকে কোনরকমে বাঁচাই নিজেকে। ভয় পেয়ে বলি, এভাবে কী ভয় দেখাতে হয়? হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে ও। হেসো না, ধমক দেই। ভয় পেয়েছো ভাবী! কথার জবাব দেই না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে আবারও হাসতে থাকে সোহাগী। ওর হাসিতে বিরক্ত হই, বলি, এখান থেকে যাও তো সোহাগী। সোহাগী হাসি আরও বাড়ে। হেসে গড়িয়ে পড়ে আমার গায়ে। ওর হাসিতে হার্টবিট বাড়ে, ধমক দিয়ে বসিয়ে দেই ওকে। কিন’ সোহাগীর হাসি থামে না।

ভয় পাওয়া বুকেই কাজ করছি, হঠাৎ অচেনা এক মনমাতাল করা গন্ধ ছড়িয়ে গেলো রান্নাঘরের বাতাসে। ওই গন্ধ টেনে নিতেই সব কাজ ভুলে গেলাম। আমার মনে তখন শুধু গন্ধ, আর গন্ধ। ওই মাতাল করা গন্ধের সঙ্গে সোহাগীর হাসি আর ভালো লাগছে না আমার। আমার শুধুই গন্ধ চাই, আর কিছু না। গন্ধের সঙ্গে আর কিছু যুক্ত হোক তা আমার মন চাইছে না। ওর হাসিতে খুব বিরক্ত লাগছে আমার। ওকে খুব আদর করি, রাগ করতেও পারছি না। চড়ের শব্দ সঙ্গে সোহাগীর চিৎকার, ও মাগো! অদৃশ্য এক কন্ঠ শুনতে পেলাম, আমার মাকে আর ভয় দেখাবি, ক্যান ভয় দেখালি, বল। আবার থাপ্পড়ের শব্দ। সোহাগী কাঁদতে থাকে। আমি বিস্মিত, দেখি, চোখ বড়ো হয়ে, জিহ্বা বেরিয়ে আসছে সোহাগীর। কী করবো, কিছু বুঝে উঠতে না পেরে জোড়হাত করে বললাম, আপনি কে, ওকে ছেড়ে দিন।

অদৃশ্য কন্ঠ বলে, না ছাড়বো না ওকে। তুই জানিস না, কিন্ত তোকে আমার মেয়ের মতো জানি, তোকে ভয় দেখালো! তুই ওকে এতো ভালোবাসিস, আর তোর সঙ্গে বেলেল্লাপনা, না মেরেই ফেলবো ওকে। ঝট করে বুদ্ধি খেলে গেলো মাথায়, বললাম, বাবা, মাফ করে দিন, ও আমার ছোট বোন। ঠাট্টা করেছে। কাজে ব্যস্ত থাকায় ভয় পেয়েছি। অদৃশ্য কন্ঠ এবার সোহাগীকে বললো, যা আমার মেয়ের কথায় মাফ করলাম তোরে। ওই মন মাতাল করা গন্ধ মিলিয়ে গেল বাতাসে। বাতাস শান্ত। সোহাগীর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওর ফর্সা গালে, গলায় কালশিটে দাগ। ওকে আদর করি।

ছয় মাস পর। আমি আর সোহাগী বাদে সবাই সিনেমায়। সোহাগী ওর ঘরে। আমি কৃষ্ণ-বিচ্ছেদি শুনছি। ‘ওলো তোরা রাই মিলায়ে দে।’ অন্তর দিয়ে শুনছিলাম। বিরক্ত হই মোবাইলে। সোহাগীর মোবাইল। ওর ঘরে গেলাম। সেই মনকাড়া গন্ধ। নিরবে জোড়হাত নমস্কার করলাম। এই ছয় মাসে সব সময় গন্ধটা না পেলেও মাঝেসাঝেই এই গন্ধ আমার চারপাশের বাতাসকে মোহিত করেছে, কথাও বলেছে। তাকে বাবা ডেকেছি। বসলাম ওর পাশে। ওর পাশে বসতেই, অদৃশ্য কন্ঠ বললো, আমিই ডেকেছি। কথা বলি না আমি। অদৃশ্য কন্ঠ বলে, ও মরে যাবে। এ কী কথা বাবা, শুনতে পাবে। পাবে না, জেগে থাকলেও কিছুই বুঝতে পারবে না। অবিশ্বাসী কন্ঠে বলি, এ কখনও হতে পারে না! পারে। তুই ওকে ভালোবাসিস বলেই, তোকে বলছি। ওর আয়ু মাত্র আড়াই মাস।

বিস্মিত শুনছিলাম অদৃশ্য কন্ঠের কথা, একটা মানুষের জন্য একটা গাছ আছে পৃথিবীর ওপারের জগতে। যার যতো মাস আয়ু ঠিক ততোটাই পাতা থাকে ওই গাছে। মাস পুরো না হলে একটা পাতা হালকাভাবে থাকে। সোহাগী নামের গাছটাতে এখন দুইটা পাতা পুরোপুরি আর একটা পাতার অর্ধেক লাগানো আছে।

কথায় এতোই বিহ্বল ছিলাম, ঐ গন্ধ কখন চলে গেছে টের পাইনি আমি। সোহাগীর ডাকে চমকে উঠি। অবচেতনে ক্যালেন্ডারে ওই তারিখটিতে লাল দাগ দেই। হঠাৎই কোনো অসুখবিসুখ ছাড়াই মারা গেল সোহাগী। লাল দাগ দেওয়া তারিখ থেকে হিসেব করে দেখি ঠিক আড়াইমাস। অদৃশ্য কন্ঠ ঠিকই বলেছিল, কিন্তু কেন বলেছিল তা আজও অজানা। একথা শুধু আমাকে বলেছিল না, আরও কাউকে বলে বা বলেছিল সেকথাও অজানা।

(আতিপ্রাকৃত গল্প) #afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615