বিকেলের শূন্যতা // আফরোজা অদিতি

ডোর-বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল বিরতির। ঘুম পুরো না হওয়াতে মাথাটা ফাঁকা লাগছে। ঘুম ভাঙার পরে বুঝতে কিছুটা সময় লাগল যে এটা রাতের ঘুম নয় ভাত-ঘুম। দুপুরে ভাত খেয়ে বই পড়ছিল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি। বাসায় কেউ নেই। একা একা বাসায় থাকে। সেই অবসরে যাওয়ার পর থেকেই একা। শূন্য ঘরে হাঁটে একা। নিজের পায়ের শব্দ শোনে, কথাও বলে নিজের সঙ্গে নিজে। প্রশ্ন করে আবার জবাব দেয়। এ এক অদ্ভূত অবস্থা। প্রথম দিকে খারাপ লাগতো না কিন্তু এখন লাগে। এখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না, ভালো লাগে না হাঁটতেও। বিষণ্ন এক শূন্যতা সব সময় ঘিরে থাকে; কিছুই ভালো লাগে না। কান্না পায়। খেতে ভালো লাগে না, পড়তে ভালো লাগে না, ভালো লাগে না লিখতেও। লেখালেখিও লাটে উঠেছে। কলিঙের আওয়াজ আর পেলো না বিরতি। তবুও বিছানা থেকে নেমে দরোজার কাছে যায়।

কে এলো এই অসময়ে। দরোজা খোলে। দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে সবুজ সার্ট আর জিনসের প্যান্ট পরা একটা ছেলে। বয়স ঊনিশ কুড়ি। ছেলেটার সুন্দর মুখে খেলা করছে সারল্য। কিন’ সেই সারল্য আর ওর সার্বিক সুন্দরে মিশে আছে এক বিষণ্ন বিষাদ। ছেলেটাকে দেখেই ওর মনে হলো ও মানুষ নয় ও যেন এক গভীর শূন্যতা। ছেলেটার মুখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নাম জিজ্ঞাসা করার জন্য মুখ খোলার আগেই ছেলেটা বলে, আমার মা এসেছে আপনাদের বাসায়। আমার মাকে ডাকছি কিন’ আসছে না।
তোমার মা ! কোন তলায় ?
এইতো এই বিল্ডিং-এর আট তলায়।
বিরতি জানে কয়েক সপ্তাহ আগে এই বিল্ডিং-এর আট-বি-তে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যাওয়া হয়নি ওর। পরিচয়ও হয়নি। এই কয়েকদিন ঘর থেকে একদম বের হতে ইচ্ছা করেনি। ও চুপ করে আছে দেখে ছেলেটি আবার জিজ্ঞাসা করে, আমার মাকে দেখেছেন ?
না, দেখিনি, আসেনি এখানে। তুমি বাইরে কেন ! ঘরে এসো। বসো।
না, না, বসবো না। মাকে খুঁজছি।
তোমার নাম কি ?
মিহির। বলেন না, আমার মা কোথায় ? সব জায়গায় খুঁজে এখানে এসেছি।
এখানে তো নেই। অন্য কোথাও হয়তো গেছে। ছাদে দেখেছ।
ছাদে ! আমি ছাদে যেতে ভয় পাই। আমার সঙ্গে যাবেন ছাদে। মা একা যেতে বারণ করেছে।ওমা, তুমি তো এখন বড় হয়েছ! বিরতির কথায় ছেলেটা কোন জবাব দেয় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। বিরতির মায়া হয়। বলে, ঠিক আছে চল।

ঘরে চাবি দিয়ে ছাদে ওঠে ওরা। সুন্দর হাওয়া। শিউলি ফুলের গন্ধ আসছে। আশ্বিন চলছে। ছাদের কোণে শিউলি লাগিয়েছে কেয়ার টেকার। শুধু শিউলি না। গোলাপ, রজনীগন্ধ্যা, সন্ধ্যামালতি, আরও নানা জাতের অর্কিড আছে। অ্যাপার্টমেন্টের ম্যানেজমেন্ট কমিটির নির্দেশ। ছাদে সবাইকে গাছ লাগাতে হবে, যত্ন নিতে হবে। সবাই লাগাবে। কিন’ যত্ন অবশ্যই কেয়ার-টেকারকে নিতে হবে। ছাদের টবে শিউলি গাছের নিচে গতরাতের ঝরা শিউলি বিছিয়ে আছে। গাছও ফুলের ভারে নত হয়ে আছে। টবের গাছ। গাছের ডাল মাটি ছুঁইছুঁই করছে। ফুলগুলো ফুটিফুটি করছে। ওই ফুলগুলো থেকেই গন্ধ আসছে।

ছাদে কেউ নেই। ছাদের কিনারে দাঁড়াতেই বিকেলের নীল আকাশ দেখতে পায় বিরতি। আকাশ দেখতে চিরদিনই ভালো লাগে বিরতির। বিকেলের আকাশ সেকেন্ডে সেকেন্ডে মিনিটে মিনিটে রঙ বদলায়। কখনও সাদা কখনও নীল কখনও বা হালকা কালো। সেই বদলানো রঙের মাঝে সূর্য ডোবে, ডুবন্ত সূর্যের নিচে ওড়ে পাখি। দেখতে দেখতে প্রকৃতি সূর্য শূন্য হয়ে আলো শূন্য হয়ে যায়। ঝুপ করে অন্ধকার নামার আগে প্রকৃতিকে মনে হয় শূন্যতার দেবী। আর শূন্যতার সেই দেবীর বুকে সূর্য যেতে যেতে বিছিয়ে দিয়ে যায় এক বিষণ্নতা। সেই বিষণ্ন সুন্দর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এক অথৈ ধুসর বিকেল। বিরতি তন্ময় হয়ে সেই অথৈ বিকেল দেখছিল।
আপা, আপনি কোন তলায় থাকেন ?
চমকে তাকায় বিরতি। বিরতি এতোই মগ্ন ছিল যে মহিলার পায়ের শব্দই পায়নি। আপনি ?
আমি নতুন এসেছি। আটের বি। আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি। আপনি একা দেখে ডাকলাম। আপনি মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখছিলেন বিরক্ত করলাম না তো।
না, না। বিরতি সৌজন্য প্রকাশ করলো।
মহিলার বয়স ৫০ এর কাছাকাছি। পরণে পাতলিপাল্লু শাড়ি। শাড়িতে মহিলাকে বেশ মানিয়েছে। বিরতির আগে মনে হতো এইসব শাড়ি বয়সি মহিলাদের মানায় না। এ শাড়ি অল্প বয়সিদের। কিন’ এই মহিলাকে বেশ মানিয়ে গিয়েছে। মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। সুন্দর মুখে ধুসর বিকেলের আলো এসে পড়েছে। ভালো লাগছে। মহিলার সব সুন্দর। তবে সব সুন্দরের মধ্যে সুন্দর মহিলার চোখ। মনে হচ্ছে চোখের ভেতর জল টলটল করছে। যেন সমুদ্র, এখনই সৈকত ভাসিয়ে দেবে। এই রকম চোখ দেখেই হয়তো কবিরা লিখেছে কবিতা। ওরও মনে এলো দুটি লাইন-
সখি জলে টলটল সরোজ চোখে পড়েছে বিদায়ি আলো/
সখি বলো ওই চোখে চোখ রেখে না বেসে পারি কি ভালো !
বাহ ! নিজেই মুগ্ধ। অনেকদিন পর কবিতা। খাতা নেই সঙ্গে, জানে হারিয়ে যাবে এই লাইন দুটি। এতোক্ষণ ছেলেটার কথা মনেই নেই। আটের বি শুনে মনে পড়ে গেল ছেলেটির কথা। মহিলাকে বলল, ছেলেটা গেল কোথায় ? আপনার ছেলের সঙ্গে এসেছি। মিহির তো ছিল এখানে ! অবাক কন্ঠে বলে আটের-বি, আমার ছেলে !
হ্যাঁ। আপনার ছেলে মিহির। ও এসে বলল, আপনাকে খুঁজছে। ছাদে আসবে। একা ছাদে আসতে আপনি বারণ করেছেন তাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে এলো।

বিরতি লক্ষ্য করলো, মহিলার জলভরা চোখ উপচে নামছে জলের ধারা। আপনি কাঁদছেন! মহিলা চোখ মুছে ভেজা কন্ঠে বলল, মিহির মারা গেছে তিনবছর। এই তিন বছরে যতোবার বাসা পাল্টিয়েছি ততেবার বাসার কোন না কোন তলার কারও না কারও সঙ্গে ওর দেখা হয়েছে। ওর নাম বলেছে। ওকে আমি ছাদে উঠতে না করেছি তা বলেছে।
কী হয়েছিল !
কান্না থামিয়ে বলল আটের বি। সেদিন ছিল ওর জন্মদিন। ওরা চার বন্ধু মিলে ঘুড়ি উড়াতে উঠেছিল ছাদে। অনেক বারণ করেছিলাম শোনেনি। ছাদে রেলিং দেওয়া কেবল শুরু করেছিল বাড়িওয়ালা। দশতলা বাড়ি। ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়। মা, মা বলে অনেক ডেকেছিল। আমি নিচে নেমে যেতে যেতে ও আর ছিল না। মিহিরের মায়ের চোখ ভিজে থাকে, ভিজে থাকে কন্ঠ। সেই ভিজে কন্ঠের ছোঁয়া লাগে বিরতির চোখে মনে। ছোঁয়া লাগে প্রকৃতিতেও। ধুসর বিকেলের এক নিশ্চুপ গভীর শূন্যতার মাঝে বসে থাকে মিহিরের মা আর বিরতি।

#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615