একটি ছুটির দিন। দুপুরের কাজ-কর্ম ; খাওয়া-দাওয়া, টেবিল গুছিয়ে এঁটো থালাবাসন কাজের বুয়ার জন্য সিংকে নামিয়ে রেখে ঘরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে বই পড়ছিলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হঠাৎ নারীর জন্য’ কবিতার বই। পাশে ছেলে ঘুমিয়ে। আমার ছেলে বাবু। ওর তিন চলছে। আজ চারপাশটা খুবই নিঃশব্দ; নিঃশব্দ দুপুরে আমার কবিতা পড়তে খুব ভালো লাগে। সময় সুযোগ পেলেই এই কাজটি করে থাকি। কখনও-সখনও জোরে জোরে পাঠ বা আবৃত্তি করি কখনও বা নিঃশব্দে কবিতায় ডুবে যাই। আজ নিঃশব্দে কবিতার মাঝে ডুবে আছি তাই বাবুর নড়াচড়া দেখে ভয় পাচ্ছি। ওর নড়চড়া দেখে মনে হচ্ছে উঠে যাবে! উঠে গেলেই আমার কবিতা পড়ার মুড চলে যাবে। তাই পড়ছি আর ওর পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। এভাবে বইয়ের সবগুলো কবিতা পড়ে শেষ করে ভাবলাম একটু গড়িয়ে নেই। বাবুর বাবা বাড়ি নেই। বাড়ি থাকলে বই পড়া আর দুপুরে নিরিবিলি শোয়ার সুযোগ হয়ে ওঠে না। মেয়েদের দিনের বেলা শোয়া দেখতে পারে না বাবুদের পরিবার! বাবুর বাবাও পছন্দ করে না। শেয়ার অভ্যেসে না গিয়ে বই একপাশে সরিয়ে রেখে জানালার বাইরে দাঁড়ানো সজিনা গাছে নিঃসঙ্গ দুপুরে একাকী একটা কাককে দেখতে দেখতে অভ্যেস মতো আমার চুলগুলো বালিশের ওপরে দিয়ে কপালে হাত রাখতেই আমার হাতে সুন্দর গন্ধ লেগে আছে টের পেলাম ; এই গন্ধ না আতর না কোনো পরিচিত সেন্টের! আর বাবুকে কোনো সেন্ট দেইনি! বাবুকে সেন্ট দেই না কখনও। আমার সেন্ট পছন্দ নয় আতর তো নয়ই। আমি এবার কপাল থেকে হাত নামিয়ে নাকের কাছে নিয়ে এলাম। একবার দুইবার তিনবার গন্ধটা শুকলাম। তারপর মোহগ্রস্তের মত বারবার শুকতে থাকলাম হঠাৎ আমার জা, নিরুপা এলো দৌড়াতে দৌড়াতে আমার ঘরে। ওকে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করি ‘কি হয়েছে নীরুপা ? এমন তড়িঘড়ি হাফাচ্ছ কেন?’ নিরুপা কথা বলে না।
আবার জিজ্ঞেস করি, তবুও কথা বললো না। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি রাগে ওর মুখ লাল টকটকে হয়ে আছে। কাছে গেলাম কিন্তু কাছে যেতেই নিরুপা বাইরে চলে গেল। যাওয়ার সময় দরোজার কাছ থেকে মুখ ঘুরিয়ে বলে গেল ‘আমার গন্ধ কেন নিলেন?’ আমি বলি, ‘তোমার গন্ধ? এ আবার কেমন কথা!’ কথা শুনলো বলে মনে হলো না! আমি অবাক হয়ে ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছি। হতবাক হয়ে ভাবছি, কিসের গন্ধ আর কেমন করে তা নিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে কথা শুনে চমকে উঠলাম। ‘আমাকে নিবি?’ কথা শুনে আশেপাশে তাকিয়ে বলি, ‘আপনি কে? কোথায়?’ পাশ থেকে জবাব এলো, ‘আমি তোর পাশেই আছি। দেখতে পাবি না। যদি আমাকে নিতে চাস, তবেই দেখতে পাবি।’ এই কথারও কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছি। আরও কথা শোনার অপেক্ষায় আমার বুকের ভেতর কেমন উথাল-পাথাল করছিল তো বলে বোঝাবার নয়, কিন’ আর কথা শুনতে পেলাম না। তার বদলে আমার হাতে লেগে থাকা গন্ধের মত সুবাসে সমস্ত ঘর ভরে গেল।
এ ঘটনার দুই মাস পর। রোজার দিন। সেহরীর পর আমি নামাজ পড়ে শুয়ে আছি। তন্দ্রা ভাব। মনে হলো খাটটা অল্প দুলে উঠল আর আমার মাথার কাছে কেউ এসে দাঁড়াল। চোখ খুললাম। দেখি বিরাটাকায় এক লোক দাঁড়িয়ে। তার আলকাতরার মত গায়ের রঙ, দাঁত খিচিয়ে আছে। সেকি দাঁত! ঐ দাঁত মানুষের দাঁত নয়, হতেই পারে না। পশুরও নয়। ঐ দাঁত নাক এবং গলার দিকে আড়াআড়ি। আমি তাকাতেই বিরাট লম্বা হাতের তীক্ষ্ণ নখ আমাকে খামচে দেয়ার জন্য এগিয়ে এল। ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। বাবুর বাবার ঘুম ভেঙে গেল। তাঁর কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে কোনো অপরাধ করেছিলাম কি না জানি না। সে আমাকে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞেস করা দূরে থাক দাঁত মুখ ভেঙচিয়ে বলল ‘সারাক্ষণ কি চিল্লাচিল্লি করো? তোমার যন্ত্রনায় আমি শান্তিতে ঘুমাতেও পারবো না। তাঁর ওরকম ব্যবহারে নিজেকে বড় অসহায় লাগলো আমার। আমি এ বিষয়ে আর কিছু না বলে ভীত সন্ত্রস্ত গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলাম। অদৃশ্য কন্ঠের আর আলকাতরার মতো গায়ের রঙের ঐ দাঁতালটার ভয় কমাতে চেষ্টা করলাম কিন’ সময়ের সাথে সাথে ভয় তো কমলোই না বরং বেড়েই চললো। দেখতে দেখতে রোজা গেল। ঈদের ছুটিতে নীরুপার বর মানে আমার দেবর কর্মস’ল থেকে বাড়ি এলো। সে খুশিতেই মনে হয় অনেক দিন পর নীরুপা এলো আমার ঘরে। সেই গন্ধ পাওয়ার ঘটনার পর থেকে এ পযন্ত নিরুপা প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কথা বলেনি, আমার ঘরেও আসেনি। ওকে আসতে দেখে বললাম, ‘বসো’। নিরুপা বসলো, মিনিট পাঁচেক চুপ থেকে বলল, ‘ ভাবী, ওনাদের কি আপানি দেখবেন। যদি দেখতে চান আমি ব্যবস’া করে দিতে পারি।’ ওর কথা বিশ্বাস না হলেও আমার কৌতূহল হলো। বললাম, ‘হ্যাঁ, দেখবো।’ নিরুপা বলল, ‘আগামীকাল ভোরে গোসল করে পরিষ্কার কাপড় পরবেন’, আরও বলল, ‘অফিসে যাওয়ার আগে আসবেন একটা জিনিস দেব, ওটা হাতে বাঁধবেন আর একটা মন্ত্র দেবো পড়বেন। আট দিন পড়তে হবে এবং পড়তে হবে দিন রাত বারোটায়।’
আমি একটি অফিসে চাকরি করি। পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগ মূহুর্তে ও আমার হাতে বেঁধে দিলো ফিরোজা রঙের ভেজা পাকানো সুতো আর এক টুকরা কাগজ তাতে চারটে লাইন লেখা। আরবীর বাংলা উচ্চারণে লেখা ছিল সেই কাগজটিতে। পড়ার জন্য কাগজের ভাঁজ খুলে একটি লাইন পড়তে না পড়তে ছিনিয়ে নিলো কাগজ। আমাকে পড়তে দিলো না। বলল,‘এখন নয়।’ কি মন্ত্র জানি না; মন্ত্রটার একটি লাইন ঐ একবারই পড়েছি। তার প্রথম শব্দ ‘ইমিমং’ ছাড়া আজ আর কিছুই মনে পড়ে না। যথারীতি অফিসে গেলাম। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ভেজা সুতা থেকে গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। কেমন একটা নেশা ধরানোর মত গন্ধ। ঐ গন্ধ আমার রাগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, বেসামাল করে দিচ্ছে আমাকে। অফিস কলিগদের সাথে রাগ করলাম। যা কখনও করি না। আমার উল্টাপাল্টা ব্যবহার দেখে ওরা সকলে অবাক। আমার মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা, মনে হচ্ছে প্রচন্ড শব্দে কাছেপিঠে কেউ বা কারা ড্রাম পিটাচ্ছে। মাথা দু’হাতে চেপে চেয়ারে বসে আছি। অদৃশ্য কণ্ঠ শুনতে পেলাম, ‘হাতে বাঁধা সুতাটা খুলে ফেল্। নিরুপা দিয়েছে না। তোকে মেরে ফেলতে চায়। আজ ওকে মজা দেখাব। ওর এত হিংসা। তোকে ভালো থাকতে দিবে না। তুই চাকরি করিস তা সহ্য করতে পারে না নিরুপা।’ অদৃশ্য কণ্ঠের কথাতে হাতে বাঁধা সুতা খুলে ফেললাম। আস্তে আস্তে আমার বেসামাল অবস্থা কেটে যেতে লাগল। বিকেলের দিকে পুরোপুরি কেটে গেলেও মাথাটা কেমন যেনো অবশ আর ভারী হয়ে রইল। যাহোক, যথারীতি অফিস শেষ করলাম। বাসায় ফিরে দেখি নিরুপা বাথরুমে পিছলে পড়ে এক ঠ্যাং ভেঙ্গে শুয়ে আছে। ওকে দেখতে গেলাম। মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কথা বলল না। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ঘরে এসে মন্ত্র লেখা কাগজটি খুঁজলাম, কিন্তু পেলাম না। আমার যতদূর মনে পড়ে ওটা ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতরের পকেটে রেখেছিলাম। শুধু ঐ পকেট না ব্যাগের সব কিছু উল্টা-পাল্টা করে খুঁজলাম কিন্তু আর পেলাম না। কাগজটি তো পেলামই না পাশাপাশি খুুঁজে পেলাম না এ কয়দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার রহস্যের সমাধান।
#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি
