সালঙ্কারা // আফরোজা অদিতি

শহরের কেন্দ্রস্থলে বিশাল বাড়ি; বনেদি পরিবারের বাস। বর্তমানে যারা বাস করছেন তাদের বাবা ছিলেন জমিদারের নায়েব। তিনি ওই জমিদারের কাছ থেকে কিনেছিলেন বাড়িটি। এটা ছিল জমিদারের নাচমহল।চারদিকে ঘর। মাঝখানে বড় উঠান। বাড়িটি গোছানো ছিল বলেই বসবাসের জন্য নামমাত্র সংস্কার করেছিলেন তিনি। বাড়িতে ঢোকার লোহার দরোজা। দরোজার ডানদিকে একটা নিমগাছ। মধ্যরাতে ওই গাছ থেকে ‘নিম’ ‘নিম’ পাখির ডাক বাড়ির আবহাওয়াকে ভারী করে তোলে। উঠানের একপাশে চারটি নারকেল গাছ। গাছগুলোতে প্রচুর নারকেল ধরে। ধুপধাপ নারকেল পড়ে কখনও কখনও। বাড়ির পশ্চিমদিকটায় আছে একটা কদমগাছ। বর্ষাকালে কদম ফোটে। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ওই কদমফুল দিয়ে মিছিমিছি সেমাই রান্না করে। পুতুল বিয়ের মেহমানদারি করে। কদমগাছের ডালে ঝুলনা বেঁধে দোল খায় বাচ্চারা। ওই কদম গাছের নিচে একটা ঘরের তিনধাপ সিড়ি। কদমগাছের ঝিরিঝিরি বাতাসে ওখানে বসতে বাসিন্দাদের অনেকেই পছন্দ করে। এগুলো যেমন ছিল তেমনই আছে;কিছু সংস্কার করা হয়েছে মাত্র । একান্নবর্তী পরিবার। বাড়ির তিনছেলে। বড় ও মেঝ ছেলে তাদের পরিবার নিয়ে এই বাড়িতেই থাকে। ছোট জন থাকে চাকরিস’লে।

বাড়িতে অনেক আত্মীয়-অনাত্মীয় বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে জায়গীর থেকে লেখাপড়া করে। হুমায়ূন ছিল তাদের একজন। হুমায়ূনের গায়ের রং ছিল ধবধবে ফর্সা। মানুষের মুখ আর গায়ের রঙের থেকে পায়ের রঙের ভিন্নতা থাকে। কিন’ হুমায়ূনের মুখের থেকে পা একই রকমের ফর্সা। বাড়ির বড় বউ বলতেন,‘ হুমায়ূন সাবধানে থাকিস। এরকম যাদের গায়ের রং তাদের ওপর ‘ওনাদের’ নজর থাকে। ঠিক দুপুর আর কালি সন্ধ্যায় কখনও বাইরে থাকবি না।’ কিন’ হুমায়ূন সে কথা হেসেই উড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘কী যে বলেন, চাচিআম্মা ! ভূত, প্রেত কিছু আছে নাকি ! ‘ওনারা’ বা ‘ ‘তেনারা’ মানে তো ভূতের কথা বলতেছেন, আমি বিশ্বাস করি না।’ হা হা হা করে হেসে ওঠে হুমায়ূন। বলে, ‘ঠিক দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঠ্যালা।’ আবার হা হা হেসে ওঠে হুমায়ূন। ‘ চুপ কর ! চুপ। তোর ‘তেনারা’ শুনতে পেলে তোতে তুলে নিয়ে যাবে।’ আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন চাচি। হুমায়ূন আরও জোরে হাসে হা হা হা। তারপর বলে, ‘চাচি আম্মা ভয পাইয়েন নাতো। ভূত বা পেত্নী দেখলেই বলব, ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি রাম লক্ষণ বুকে আছে করবি আমার কী ?’ চাচি বলেন, ‘আবারও ওই কথা। আর রাম-লক্ষণ কিরে ক’ আল্লাহ-মুহম্মদ বুকে আছে করবি আমার কী ?’ এ কথা শুনে হুমায়ূন হাসতে হাসতে চলে যায়।

বাড়িটি অনেক গোছানো হলেও বেশ কিছু পুরানো জিনিস ছিল যা সরানো হয়নি। জায়গার অভাব হয়নি বলেই হয়তো সরানো হয়নি।এইসব জিনিসের মধ্যে পুরানো চাপকল ছিল একটি;কাজ চলছিল বলে উঠানের এককোনে ওটার জায়গা হয়েছিল। আর ছিল একটা ইঁদারা; এই দুটোই কাজের ছিল তাই ওই চাপকল সরিয়ে নতুন একটা বসানো হয়নি। কিন’ একদিন হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেল ওটা। চাপকল নষ্ট হওয়ার পরে ওটা সরিয়ে ফেলার কাজ শুরু হলো। হুমায়ূন চাপকল তোলার কাজে হাত লাগালো। ওর সঙ্গে বাড়ির ছেলেরা-তুহিন, শিহাবও কাজে লেগে গেল। ওরা শাবল, কোদাল নিয়ে খুঁড়ছে। খুঁড়তে খুঁড়তে পাওয়া গেল মাথার খুলি, হাত পায়ের আঙুলের হাড়। এরপর পুরো কঙ্কাল। সকলে ভয়ে পেয়ে গেল। এখন পুলিশ আসবে হেনস্থা হতে হবে সকলকে। যদিও কঙ্কাল পরীক্ষা করলে ওদের দোষ পাবে না তবুও ভোগান্তির ভয়ে কঙ্কাল মাটিচাপা দিয়ে রাখলো। বাড়ির এমাথা থেকে ওমাথার কথা যেমন শোনা যায় না তেমন একথাও বাড়ির বাইরে গেল না। কিন্তু ঘটলো অন্য ঘটনা। যেদিন পাওয়া গেল কঙ্কাল সেদিনই রাতে দেখা গেল এক সাজুগুজু করা অপূর্ব সুন্দরী তণ্বী নেচে নেচে যাচ্ছে এঘর থেকে ওঘরে। কখনও উঠানময় নেচে নেচে হাঁটছে। কখনও ঘরের বারান্দায়। সবাই খুব ভয় পেল। কিন্তু ওই নারী কারোর কোন ক্ষতি করছে না বলে আস্তে আস্তে কমে যেতে লাগলো ওদের ভয়।

মাস খানের পরের ঘটনা। এক সন্ধ্যায় দেখা গেল কদম গাছের ডালে ঘুমিয়ে আছে হুমায়ূন; ডেকে ডেকেও জাগানো যাচ্ছে না তাকে। অনেক কষ্টে গাছ থেকে নামিয়ে আনা হলো। গাছ থেকে নামানো হয়েছে, ঘুমও ভেঙেছে কিন্তু বদলে গেছেহুমায়ূন। কথা বলে না, হাসে না। বড় বউ খুবই চিন্তিত। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একই রকম রং-এটাই তার চিন্তার কারণ। ওই নারীর নজর পড়েনি তো ! তুহিনের সঙ্গে খুব ভাব হুমায়ূনের, ওকে জিজ্ঞাসা করে। তুহিন এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ে। জানে না কিছু। তুহিন বলল, ‘বড়ো মা, ও মাঝরাতে সিড়িতে বসে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। মাঝেমধ্যেই সারারাত সিড়িতে বসে থাকে। ডাকলেও জবাব দেয় না। মনে হয় ধ্যানের মধ্যে আছে।’ বড়ো বউ আরও চিন্তায় পড়লেন। তাবিজ এনে দিলেন একটা। কিন্তু কয়েকদিন পরই সেটা হারিয়ে ফেলল হুমায়ূন। আবার এনে দিলেন; আবার হারালো তাবিজ। এভাবে বারবার এনে দিলেও তা হারিয়ে ফেলছে হুমায়ূন।

এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল বড় বউয়ের। কেন ঘুম ভেঙেছে বুঝতে না পেরে জানালায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁর ঘরটা কদম গাছের পাশেই। অবাক হয়ে বড় বউ চেয়ে দেখলেন সুন্দরী পৃথিবীকে। পৃথিবীর এমন সুন্দর রূপ কখনও দেখেননি তিনি। সেদিন পূর্ণিমা। আকাশে শুল্কপক্ষের গোল চাঁদ। চারদিক ঝকঝক করছে জোছনা। কদম গাছের পাতায় পাতায় পিছলে যাওয়া আলোর বন্যা। নারকেল গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ। অবাক বড় বউ জানালা ধরে দাঁড়িয়ে দেখছেন; প্রাণ ভরে চোখ ভরে দেখছেন, মন ভরে উপভোগ করছেন। হঠাৎ বেজে উঠল নূপুর। শব্দ উঠল রিনিঝিনি চুড়ির। মিষ্টি একটা সুরে ভরে গেল চারদিক।

পাশের ঘরের দরোজা খোলার শব্দ হলো। ধ্যান ভাঙলো তাঁর। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন বড় বউ। তিনি দেখলেন ঘর থেকে বের হলো হুমায়ূন। বসলো সিড়িতে। অবাক হলেন আরও। সেই সাজুগুজু করা তরুণী। হুমায়ূনের সামনে অনুনয়ে মোমের মতো গলে গলে পড়ছে যেন; তরুণী বলছে,‘আয়, আমার কাছে আয়, তুই আমার কাছে আয়। তোকে সুখ দেবো, দেবো সমৃদ্ধি। ভালোবাসা দেবো। সব সব দেবো শুধু তুই এ নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি দে আমাকে।’ মন্ত্রমুগ্ধ নিশি ডাকা মানুষের মতো কথা শুনছে হুমায়ূন। ‘আয় আয়’ বলে হাত বাড়ায় ওই নারী। মেয়েটির হাত ধরে হুমায়ূন। হাত ধরে পাশাপাশি চলতে শুরু করে দুজনে। চেতনা হারানোর অবস্থা তখন বড় বউয়ের। কখন ঘর থেকে কেমন করে বের হয়েছেন কিছুই বলতে পারবেন না। শুধু হুমায়ূনকে জাপটে ধরে বলছেন,‘ না, না, ওকে ছেড়ে দাও, ওকে যেতে দিতে পারি না। যেতে দিতে পারি না।’

করুণ মিনতি করে তরুণী। ‘মা, ছেড়ে দে। ছেড়ে ওকে। তোর ভালো হবে। ওরও…।’ কিন্তু বড়ো বউয়ের একগুয়ে জেদী কন্ঠ। ‘না, যেতে দেবো না। না, না, না।’ এরপর রেগে যায় তরুণী। ‘তুই যেতে দিবি না। তুই না দিলেও তো ওকে রাখতে পারবি না। ওকে ছুঁয়েছি আমি। ও এখন শুধুই আমার। কিন্তু আফসোস, তুই ওকে ছুঁয়ে দিলি। এখন আর ওকে পাবি না। দিবো না ওকে। তুই না ছুঁলে দিতাম ওকে। শুধু ওকে না ওর সঙ্গে অনেক কিছু দিতাম। এখন আর তা হয় না। এখন ও হবে বদ্ধ উন্মাদ। বদ্ধ উন্মাদ।’ চলে যায় তরুণী। অজ্ঞান হয়ে যায় বড়ো বউ। পরদিন হুমায়ূনকে কোথাও পাওয়া যায় না। অনেক খোঁজাখুজি কোথাও নাই। তিনদিন পরে কদমগাছের তলে সিড়িতে পাওয়া যায় হুমায়ূনকে। ঘুমিয়ে আছে। ওকে ধরাধরি করে শোয়ানো হলো বিছানায়। ডাকা হলো ডাক্তার। না ভাঙল না ঘুম। ঘুম ভাঙলো তিনদিন পরে। বদ্ধ উন্মাদ। হুমায়ূন এখন মানসিক হাসপাতালে। সালাঙ্কারাও আর আসেনি এ বাড়িতে।

 #afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615