কোথায় যাবে?
উত্তরের অপেক্ষায় সরব হয় মিলা। অথচ উত্তর না দিয়ে শুধু চেয়ে থাকে এককালের বিপ্লবী তরুণ সায়েম। মিলা দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরী তরুণী। ত্রিশ ছাড়িয়ে চল্লিশের কোঠায় হাঁটি হাঁটি পা পা করছে। খুব হাসিখুশি। প্রাণবন্ত। এই হাসিখুশি প্রাণবন্তের জন্যে সায়েমের ওকে পছন্দ। সায়েম ওর নাম দিয়েছে আনন্দময়ী। সায়েমের সঙ্গে মিলার পরিচয় সেই ছোটোবেলা থেকে। সেই পরিচয় গাঢ় হতে গাঢ়তর হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে। সেই সঙ্গে হয় প্রেমে হাতেখড়ি।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুদ্ধ করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলির ভাঙাভাঙির জন্য ও রাজনীতি ছেড়ে এখন লেখালেখিতে হাত দিয়েছে। সায়েম একটা বেসরকারি ফার্মে চাকরি করে। সংসারে মা ছাড়া কেউ নেই। একটি বোন তারও বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা মারা গেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মিলিটারিদের হাতে। মিলা মতিঝিলে জনতা ব্যাংকে চাকরি করে। মিলার বাবা প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ। এক ভাই এক বোন আর মা। মিলার বাবা রাজনীতি করতেন । যুদ্ধের সময় জেলও খেটেছেন । বছর দুই হলো গতায়ু।
মিলা আর সায়েম।
সায়েম আর মিলা।
অফিস ছুটির পর দু’জন দু’জনকে দেখতে চায় আর ওরা প্রতিদিন বিকেলে বেড়াতে বেরোয়। ওরা এই স্বাধীনতাকে ভালোবাসে। স্বাধীনতা ওদের পরিচিতি দিয়েছে। ওদের বুকের গভীরে দিয়েছে ভালোবাসা। তবুও যখন দেখে রাহাজানি, ধর্ষণ, খুনের ছড়াছড়ি মূল্যবোধের অবক্ষয়, যৌতুকের জন্য গৃহবধূ খুন, রাস্তায় বাক্সভরা লাশ আর নারী পাচার ছিনতাই তখন ওরা নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে-এই কি স্বাধীনতা? এই কি স্বাধীনতার স্বরূপ! এর জন্যই কি এতো রক্তক্ষয়, প্রাণ বিসর্জন!
মিলা চাকরি করে। চাকরি ক্ষেত্রে দেখে বৈষম্য, দেখে হ্যাংলার মতোন চেয়ে থাকা সহকর্মীদের আর পেছনে নানা রকম কটু মন্তব্য করে তখন ঘৃণায় লজ্জায় ওর চাকরি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করে বাবার এই প্রগতিশীল রাজনীতির। জোর গলায় বলতে ইচ্ছে করে-বাবা, এই রাজনীতি তোমাদের কি দিয়েছে? কি পেলাম আমরা? কিন’ প্রতিবাদ করেও কোন ফল পায়নি। কিছু পুরুষ ওর পাশে থাকলেও বেশীরভাগ নারী তাঁদের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে পিছু হঠেছে । মিলা ভাবে আসলেই নারীর নিরাপত্তা নেই। ‘কি হলো কথা বলছো না যে। আস্তে একটা ধাক্কা দেয় সায়েমকে। কোথায় যাবে আজকে বললে না?’ প্রতিদিনকার মতো রিকশার জন্য প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েছে ওরা।
‘কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না মিলা। যেখানে যাই সেখানেই শুধু দেখি প্রসারিত হাত। কিছু দাও খাইনি দুইদিন। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা খাওয়ার জন্য ফুল বিক্রি করছে কেউ বা কাগজ কুড়াচ্ছে। মানুষের ভীড় সর্বত্র। একজনের গায়ের ওপর আর একজন। আমরা কি এই স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি?’ ‘এসব মনে এনো না। ভুলে যাও।’ মিলা কন্ঠে ভালোবসার সুর। ‘ ভুলে যাবো! ভুলেই যদি যাবো তবে কিসের জন্য লোকক্ষয়, সম্মান ক্ষয়। যদি অবস’া তথৈবচ হবে তবে কেনো করছি এসব ?’
‘সায়েম, তুমি একেবারে ছেলেমানুষ। আমরা যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। আর এক একটা বড়ো রকমের যুদ্ধের পর এরকম অবক্ষয় স্বাভাবিক। কিন’ নেতা অর্থাৎ দেশের শাসককে কঠোর হস্তে তা দমন করতে হয়। কিন’ আমাদের দুর্ভাগ্য তা হয়নি।’ সায়েম মুখ তোলে মিলার কথা শুনে। মিলা একটু লজ্জা পায়। বলে, ‘থাক এসব রাজনীতি। এখন চল তো আজকে আর উদ্যানে যাবো না। অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।’
সায়েমের কিছুক্ষণ আগের বিষাদভাব কেটে যায়। বলে, ‘বাব্বা! এ যে কবিতা! তোমার ভেতরে তো বেশ প্রতিভা আছে। আগে লিখতে এখনও আবার শুরু করো। চল, আমরা উদ্যোগ নিই কিছু একটা করার। এই সমাজ এই দেশকে কিছু একটা দিয়ে যাই যার অনুসরণে আমাদের উত্তরসূরিরা ভালোভাবে বাঁচার একটা পথ খুঁজে পায়।’ ওরা হাঁটতে থাকে এখন আর রিকশা পাওয়া যায় না। যা দু’একটা পাওয়া যায় ডবল ভাড়া চায়। কিছু বললে বলছে, ‘স্যার, বেবাকতের দাম বাইড়া গেছে, কি করুম কন’। একটাও রিকশা নেই। আজকে আর বেশি সময় নেই। দূরে কোথাও যাওয়া যাবে না।
মিলার ঐ একটাই দোষ। অসি’রতা। সব কিছু্ই সাত-তাড়াতাড়ি আর কোনো কিছুতে লেগে থাকার ধৈর্য মূলত কম, শুধু দু’এক টা ব্যাপার ছাড়া। অন্যদিকে সায়েম ভীষণ ধৈর্যশীল এবং সি’র। সায়েম আর মিলা দু’জন দু’মেরুর প্রাণী হয়েও দীর্ঘ বছর ধরে একসঙ্গে।ওরা হাঁটতে হাঁটতে শহীদ মিনারের সামনে এসে পড়ে। ‘এসো, এখানেই বসি।’ সায়েম কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মিলার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘাসের কার্পেটে বসে পড়ে। ‘কথা বলো না। শুধু চুপচাপ বসে শহীদ আত্মার চেতনাকে সর্বাঙ্গে মাখবো। ওদের অশরীরী স্পর্শের স্পর্শ নেবো। শহীদ মিনারটা আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছে, দেখেছ।’ মিলা বলে। ‘দেখ মিলা, এই শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত ১৯৫২-এর বাংলা ভাষার আন্দোলনে নিহত শহীদের আত্মার স্মৃতির উদ্দেশ্যে। ভাষা আন্দেলনের মূল লক্ষ্য ছিল আগে বাংলাভাষা, তারপর অন্যকিছু। এখন তো আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আর সেই স্বাধীন দেশের নাম বাংলাদেশ। অথচ কোথায় বাংলা? বল কোথায় বাংলা?’
‘এই, তুমি সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়েছো!’
‘জানো, আমার ভীষণ দুঃখ হয় যখন দেখি আমাদের দেশের ছেলেরা পড়ছে ইংলিশ মিডিযামে। অনুকরণ করছে ইংরেজদের। অনুকরণ করে বিদেশী ছবির। আমার দুঃখ হয় ব্রিটিশ গিয়ে কী হলো বলো।’ মিলা ওর হাতটা আলতো স্পর্শ করে বলে, ‘মিথ্যে কষ্ট পাও। আমি তুমি এই সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে কতোটা করতে পারি? দু’জনে শুধু মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার অবক্ষয় দেখে যাচ্ছি; রোধ করতে তো পারছি না, কি বলো পারছি? যতোটুকু পারি ততোটুকু করবো। এসো আজ এই মুহূর্তে দু’জন এই শহীদী আত্মার স্মৃতির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করি যেমনভাবে যেটুকু পারি সমাজকে সচেতন করতে বাঙালির চিরায়ত মূল্যবোধ ফেরাতে সচেষ্ট হবো। নৈতিকতা ফিরিয়ে আনবো। মানুষের জন্য কিছু করবো। সবাইকে ডাকবো। কেউ আসলে ভালো না আসলেও ক্ষতি নেই। লড়াই করেই যাবো। এই হলো আমাদের দৃঢ় শপথ।’ মিলা ওর হাতটা শক্তভাবে ধরে রাখে। শহীদ মিনারের লালসূর্যটা বিদায়ী সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
#afrozaaditi.com , # আফরোজা অদিতি
