প্রতীক্ষা // আফরোজা অদিতি

চিঠিটা হাতে নিয়ে অনুপম অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে বেখেয়ালে। মনের ভেতর অজস্র চিন্তা। প্রায় দু’বছর। এতোদিন পর চিঠি। চিঠিটা না খুলে অনুপম বুঝতে পারে কার চিঠি। এই লেখা কি কখনও ভোলার? যে লেখার জন্য দুইটি বছর উৎকণ্ঠা আর প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। সেই চিঠি এলো কিনা দুই বছর পর তাও আবার অফিসের ঠিকানায়। ওদের তো কথা ছিলো প্রতিদিন একটা করে চিঠি দেওয়া এবং পাওয়ার।

ওর চিঠির আসার কথা বাড়ির ঠিকানায় এবং চিঠি দেয়ার কথাও বাড়ির ঠিকানায়। অনুপম মনে মনে হিসাব করে এই দুই বছরে মোট ৭৩০ টি চিঠি পাওয়ার কথা কিন’ ৭৩০-এর বদলে ৭টি চিঠিও আসেনি। যদি পেতো অনুপমের জীবনটা অন্যরকম হতো। ওর জীবনটা এমনভাবে একটা জায়গায় থমকে থাকতো না। জীবনের সমস্ত আকাঙক্ষা আগ্রহ নষ্ট হয়ে যেতো না। তিল তিল করে ওর জীবনীশক্তি ক্ষয়ে যেতো না।

অনুপম নিজে কি এখন মানুষ আছে? না, নেই! ও নিজে এখন মানুষ নামে একটা যন্ত্র হয়ে আছে। ওর ভালোবাসা, যাকে সে বুকের ভেতর সযত্নে লালন করছে, আজও করে। যার হাসিতে ও বিশ্ব ভুলতে পারতো। যার কথাতে কখনই কোনো বিরক্তি আসেনি। যার স্পর্শের জন্য প্রতিটি সময় প্রতীক্ষায় থেকেছে সেই মানসপ্রতিমা তাঁর কথা রাখেনি। অথচ অনুপম নিজে এই দীর্ঘ দুই বছর চিঠি লিখেছে, চিঠির উত্তর না পাওয়া সত্ত্বেও। আজও একটা চিঠি লিখেছে মনের আবেগ মিশিয়ে ভালোবাসার আরতি দিয়ে। চিঠির উত্তর না পেয়ে মাঝে মাঝে অনুপমের মনে হয়েছে ওরা বাসা বদল করেছে কিংবা ভীষণ সহজ হয়ে মধুলেখা তাঁর মৌখিক বাক্যকে ভুলে গেছে। ভুলে গেছে তাঁর ভালোবাসার অনুকে। অনুপম বহুরাত জেগে চিঠি না পাওয়ার যে কারণ খুঁজেও পায়নি তা আজ চিঠি হাতে করে খুঁজে পায়। মধুলেখা আজও তাকে মনে রেখেছে ভোলেনি।
ভোলেনি কিন’ চিঠি দেয়নি কেন? অভিমান করে দেয়নি। আর অনুপমও যায়নি! আসলে তাছাড়া যাওয়ার কথা তো ছিল
না।

অনুপম আর মধুলেখা। দুজনের মন এক প্রাণ এক হলেও একে অপরকে ছেড়ে থাকতে না পারলেও সমাজ সংস্কার ওদের মিলন ঘটতে দেয়নি। ভারতির সঙ্গে বাগদান হয়েছিল বলেই মধুলেখাকে বিয়ে করতে পারেনি। শত চেষ্টা সত্ত্বেও ভুলতে পারেনি। অনুপম হাতের চিঠিটার দিকে তাকায়। এই চিঠি পাওয়া মাত্র একটা হার্টবিট ও মিস করেছে। চিঠিটা এখনও খোলা হয়নি। সেই চারটার সময় দিয়ে গেছে পিয়ন। এখন ৪-৩০টা। এই আধঘণ্টা চিঠি হাতে নিয়ে বসে আছে। সকলে বাসায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। ফাইলপত্র গোছগাছ করছে। পাশের টেবিলের সহকর্মী অনুপমকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, ‘কি দাদা, কখন থেকে দেখছি চিঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। কোন ভাবের সমুদ্রে পাড়ি দিচ্ছেন ভাই?
সহকর্মীর কথায় একটু হাসে। কোনো জবাব দেয় না।
‘সবাই তো চলে যাচ্ছে আপনি যাবেন না?’ একজন সহকর্মী বলেন।
‘আপনি যান। আমি একটু পরে যাবো।’

অফিসে কেউ নেই। অনুপমের একটু নিরিবিলিই প্রয়োজন। নির্জন একাকী হয়ে চিঠিটি খোলে। খোলার আগে খামের ওপরের লেখায় হাত বুলায়। মধুলেখা তুমি!-তুমি, তোমার এতোদিনে সময় হলো? আমাকে এতোদিনে মনে পড়লো। আমি কি এতোই অপাঙ্‌ত্ত্‌েকয়! অথচ এমন একটা দিন ছিল না যেদিন আমাকে না দেখলে তোমার চোখ শুকনো থাকতো।
অনুপমের দু’চোখ জলে ভরে যায়। দুফোঁটা জল চিঠির ওপর পড়ে। যত্ন করে সময় নিয়ে চিঠি পড়তে শুরু করে।
অনুপম হৃদয়ের বাঁশী,
ভুলেছো কি ভোলো নি আমি জানি না। ভালোবাসা জানালাম না তাই। যদিও মন বলে তুমি আজও মনের ভেতর রেখেছো আমাকে। তবুু বাস্তবে তার ঠিকানা মেলেনি, বাস্তব বড়ো কঠিন অনু। প্রতিদিন আমাদের একটি করে চিঠি লেখার কথা ছিল। কিন’ কই একটা চিঠিও তো পাইনি। জানি না কি করে তোমার মধুলেখাকে চিঠি না লিখে আছো। ভুলে আছো তোমার সুখের আকাশকে। হয়তো তুমি ভুলেছো আমাকে। ভুলেছো তোমার সুখের মধুলেখাকে। অথচ অতীতে পথ চাওয়া স্মৃতিকে নিয়ে আমি আজও বেঁচে আছি। বেঁচে আছি শুধু তোমাকে একটিবার দেখার আশায়।
আমি কেন যে তোমাকে ভুলতে পারি না। ভুলতে পারি না অনুকে, আমার সুরের বাঁশীকে। এ যেনো সেই কবিতা-‘যতই ভুলিবার চাই, ততই মনে নেয় গো ঠাঁই’।

যাকগে, ওসব কথা। তুমি ভালো আছো তো। আমি কখনই তোমাকে অসুখি দেখতে চাইনি। সব সময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি তুমি ভালো থাকো সুখে থাকো তোমার কর্মে, তোমার সংসারে। গত দুই বছর, সেই যে সিলেট চলে গেলে তুমি তারপর থেকে প্রতিদিন প্রতীক্ষায় থেকেছি তোমার চিঠির। কিন' চিঠি না পেয়ে ভেবেছি আর কখনও লিখবো না। কিন' পরক্ষণেই আবার চিঠি লিখেছি, লিখেছি কথার খেলাপ করতে চাইনি বলে। থাকগে এসব প্যাঁচাল। তুমি চলে যাওয়ার পর থেকেই আমি অসুস'। অল্প অল্প জ্বর। ডাক্তার বলেছে ক্যানসার। বাড়ি-হাসপাতাল, হাসপাতাল-বাড়ি করতে আর ভালো লাগে না। জানি আমার সময় শেষ। এখন শুধু চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকি। তোমার লাগানো কামিনীগাছে এই বর্ষায় অজস্র ফুল ফুটেছে। রাতে বাতাসে ভেসে আসে সুগন্ধ; আমি ফুলের গন্ধে তোমাকে কাছে পাই। এই চিঠিটা নিয়ে তোমাকে মোট ৭৩০টি চিঠি লিখছি। আর এইট্‌িই বোধহয় শেষ চিঠি। তোমাকে বড্ড দেখতে ইচ্ছা করছে। যদি চিঠিটা হাতে পাও আর যদি আমার প্রতি হৃদয়ের কোনো কোণে একটু ভালোবাসা ভুলেও পড়ে থাকে তবে এসো। তোমাকে দেখার সাধ পূরণ না হলে আমি মরেও শান্তি পাবো না।

তোমাকে বড়ো দেখতে সাধ
দেখতে সাধ নয়নে মনে আমার নীরব অহংকারে
– তোমার মধুলেখা

পুনশ্চ ঃ এবার চিঠিটা বাড়ির ঠিকানায় না দিয়ে অফিসের ঠিকানায় দিলাম।

অনুপম আগাগোড়া চিঠিটা পড়লো। একবার, দুইবার, তিনবার। মধুলেখা ওর নামের আগে তোমার শব্দটা লিখে আবার কেটে দিয়েছে। অনুপমের ভীষণ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করলো মধুলেখা তুমি আমার আর আমিও তোমার। আমিও তোমাকে ৭৩০টি চিঠি লিখেছি, আজ বুঝলাম চিঠি পাও নি। কিন’ জানি না পাওনি কেনো?
অনুপম ঘড়ি দেখলো। না এখনও হাতে ঘণ্টা দেড়েক সময় আছে। স্টেশনে গিয়ে প্রথমে টিকিট কাটলো, তারপর বাসায়। কিন’ ঘরে ঢুকেই দেখে আজ সকালে যে চিঠিটা ডাকবাক্সে দিয়ে গেছে সেই চিঠির ছেঁড়া টুকরো। ওদের ডাকবাক্স থেকে পিওন চিঠি নিয়ে যায় আবার দিয়েও যায়। এতোদিন চিঠি পায়নি সেজন্য ঘুণাক্ষরেও ভারতীকে সন্দেহ করেনি। বিয়ের পর ভারতীকে সব কিছু খুলে বলেছে। ওদের চিঠি লেখার কথাও বাদ দেয়নি। ছেঁড়া চিঠির টুকরা দেখে অনুপম বলে, ‘তুমি আমার চিঠি ছিঁড়েছো?’
‘হ্যাঁ, ছিঁড়েছি।’
‘এতোদিন সব চিঠি তুমি এভাবে ছিঁড়ে ফেলেছো?’
‘ফেলেছি। কি করবে তুমি আমাকে? মারবে?’ ভারতীর কথা শুনে অনুপম আর একটা কথাও বলে না। ব্যাগ গোছাতে থাকে। ওর ব্যাগ গোছাতে দেখে ভারতী রেগে যায়। রাগ করে বলে, ‘যাচ্ছো কোথায়?’
‘ঢাকায়।’
‘তুমি যেতে পারবে না।’ ভারতী প্রথমে রাগ, তারপর কাঁদতে থাকে।কিন্তু কোনো কিছুই আজ অনুপমকে আটকাতে পারে না। ও জানে না আছে কি নেই মধুলেখা, ওর বাঁশী। সমস্ত কিছুর বিনিময়ে আজ ওকে পৌঁছোতেই হবে ঢাকা।

ট্রেনটা ছুটে চলেছে। অনুপমের মনে হচ্ছে পারবে তো বাঁশীকে শেষ দেখা দেখতে। অনুপম চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে ওর বিশ্বাস যদি সত্যি হয় তবে মধুলেখাকে যেন শেষ দেখা দেখতে পায়। ঈশ্বর, কেন এমন জীবন, এমন ভালোবাসা মানুষকে দাও? অনুপমের কথা ঈশ্বর শুনতে পেয়েছে কিনা জানে না অনুপম। শুধু ট্রেনের একটানা ঘটাং ঘটাং ঘটাং ঘটাং শব্দ বাতাস চিরে যেতে থাকে।

#afrozaaditi.com , # আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615