একদিন হঠাৎ // আফরোজা অদিতি

বাথরূম থেকে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে দেখে অফিস ফাঁকা। যে দুই একজন ছিল তারাও চলে গেছে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। এতো তাড়াতাড়ি সবাই চলে গেল ভাবছে শিশির। যাক। শিশির টেবিল ড্রয়ার টেনে পরীক্ষা করে দেখে ঠিকমতো লেগেছে কিনা। আলমারি তালা দেওয়া হয়েছে কিনা তাও পরীক্ষা করলো। তারপর বাইরে বেরোবার জন্য গেটের কাছে যেতেই তো বিপদ টের পেলো। গেটে তালা। দারোয়ান কোথায়? প্রথমে ভাবলো শিশির, দারোয়ান আশেপাশেই আছে। কিন’ এক দুই তিন মিনিট এভাবে পনেরো মিনিট গত হয়। দারোয়ানের দেখা নেই।
স্ট্রংরূম তালা বন্ধ। এ পাশের গেটে চলে আসে শিশির। ওটা তো বেলা একটায় বন্ধ হয়। ব্যাংকের লেন-দেনের সময় পর্যন্ত খোলা থাকে।

শিশির ব্যাংকের একজন প্রিন্সিপাল অফিসার। লম্বা ফর্সা দেখতে সুপুরুষ। একভাই একবোন ওরা। বাবা চাকরি করে। এখনও বিয়ে করেনি শিশির। ভীষণ কাজ পাগল মানুষ, সহকর্মীদের প্রিয়পাত্র। প্রতিদিনই একটু দেরিতেই বের হয়। কাজ করে। কাজ করতে করতে প্রায়ই এমন বাথরুম কিংবা কোন না কোন কাজে যায়। কিন্তু কখনও এমন অঘটন
ঘটেনি। গেলো কোথায় সবাই? অফিসের দুইজন গার্ড। একজন না থাকলে তো অন্যজন থাকবে। কেউ নেই। হঠাৎ মনে পড়ে একজন তো গতকাল ছুটিতে বাড়ি গেছে বউয়ের অসুখ। তাহলে! এতক্ষণে বুকের ভেতর শঙ্কা জাগে। ভীষণ একা একা লাগে। ওর মনে হয় বিশ্বসংসার থেকে বিচ্ছিন্ন ও। একা একটি দ্বীপে বাস করছে! চারপাশে কিছু নেই কেউ নেই । সুমসান পিতপতন নিস্তব্ধতা ।

ঘড়ি দেখে বার বার। কিন্তু সময় তো ওর মতোই যাবে। কারও হিসেবের ধার তো সে ধারে না কখনও। সময় যাচ্ছে সময়ের নিয়মে। ওর মনে হচ্ছে সময় একই জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে। নট নড়ন-চড়ন। কি করবে । কবিতা পড়বে। পকেটে হাত চলে যায়। কবিতা বের করে পড়তে থাকে। ভালোবাসার কবিতা। নাহ ভালো লাগছে না। বইমেলায় যাওয়ার কথা। ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা আসবে। গেটটুগেদার। চেয়ার থেকে উঠে পায়চারি করতে থাকে শিশির। হাঁটতে হাঁটতে ম্যানেজারের রূমের কাছে চলে আসে। ম্যানেজার তো ছুটিতে। ম্যানেজার নেই, তাই স্বরাজ। আসুক ব্যাটা আগামী কাল। সবাই না যেতে তালা বন্ধ করার মজা দেখাবো। খুব রাগ হচ্ছে ওর। রাগে যেনো শরীর ফুটছে তেতে যাওয়া ফুটকড়াইয়ের মতো। নিজের হাতে নিজেই ঘুষি মারে। উঃ কি যন্ত্রণা।

ম্যানেজারের রূমের ভেতর মেয়েলি কন্ঠ! অবাক বিস্ময়। ও কি স্বপ্ন দেখছে। না স্বপ্ন নয়। সত্যি। দরোজার হাতলে চাপ দেয় আস্তে। হায় আল্লাহ! এখন উপায়! সাগর এখানে কি করছে এতো বেলা পর্যন্ত! এতোক্ষণ তো ছিল ভালো, কিন’ এই মুহূর্তে এক ভয় তীব্র শীতের মতো ওকে আঁকড়ে ধরলো ওকে। ওর মনে হলো কোথাও একটা বড়েসড়ো ভূমিকম্প হচ্ছে। যার জন্য ভীষণ ঝাঁকুনি খাচ্ছে এই ব্যাংক ভবন। যে কোনো মুহূর্তে ব্যাংক ভবনটি ভেঙে পড়বে, কিংবা তলিয়ে যাবে মাটির গহ্বরে। ও কি পড়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি দেওয়াল ধরে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। সেই শব্দে সাগর ফিরে তাকায়।
‘হায় শিশির! যাও নি এখনও?’ টেলিফোন রাখতে বলে সাগর। ‘রাজশাহীতে ফোন করলাম। বিকেলের দিকে একটু তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়। খুব জরুরি। বিকেলে করলাম তবুও লাইনটা পাচ্ছিলাম না। তা আমার জন্য এতো সময় কষ্ট করেছো। চলো যাই।’
‘তুমি এখনও যাওনি কেনো?’
‘ আমি তো এর উত্তর আগেই দিলাম। আবার প্রশ্ন করছো কেন ?’
‘কেন আছো? কেন যাওনি?’ কথা বলতে বলতে সাগর এসে ওর পাশে বসে। বলে, ‘ কি হয়েছে শিশির?’ ওর কথার জবাব দেয় না শিশির। আপন মনে বিড় বিড় করে, ‘আমি এখন কি করি, কি করি।’
‘কি বলছো?’ কণ্ঠে উদ্বেগ সাগরের। ‘ওরা যদি একঘণ্টা, দুইঘণ্টা, তিনঘণ্টা না আসে? না আসে সারারাত কি হবে?’
‘কি আবোল তাবোল বকছো? তোমার কি হলো? চলো চলো, বাসায় চলো। অনেক দেরি হয়েছে।’ সাগর ওর একটা হাত হাতে তুলে নেয়। ‘অফিসে বোধ হয় কেউ নেই। সাড়া শব্দ পাচ্ছি না। চলো চলো, ওঠো।’

শিশির নড়ে না, ওঠে না। অবাক সাগর। ভাবছে কি হলো শিশিরের। কোনোদিন তো এমন দেখেনি। আজ এক বছর এক সঙ্গে কাজ করছে ওরা । কর্মঠ উচ্ছল প্রাণচাতুর্যে ভরা এক উজ্জ্বল তরুণ। প্রথম দেখাতে ভালো লেগেছে। সৎ, উদ্যোগী, পরিশ্রমী ভালো ছেলে। কিন’ কি হলো হঠাৎ ওর! ওরা তো একসঙ্গে অফিস ছুটির পর প্রায়ই বেরোয়। অফিস ছুটির পরও ওরা থেকেছে। কিন’ কখনও অন্যরকম আচরণ দেখেনি। কি হলো তবে?
‘ওঠো, চলো যাই।’
‘যাবো।’ শিশিরের নিরাশ ভাঙা ভাঙা কন্ঠস্বর । শিশিরের গলার স্বরে আরও অবাক সাগর। বলে, ‘ চলো শিশির। তোমাকে একটা ডাক্তার দেখিয়ে আনি।’ তারপর ঠাট্টার ছলে বলে, ‘তোমাকে পাবনা পাঠাতে হবে মনে হয়।’ শিশিরের মধ্যে তবুও ওঠার কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না দেখে হাত ধরে আকর্ষণ করে।
‘ উঠছি, হাত ছাড়ো।’ উঠে দাঁড়ায়। বলে, ‘যাওয়ার জন্য তো উঠে দাঁড়ালাম। কিন’ যাব কিভাবে? তুমি সাগর ভাবছো আমি পাগল হয়ে গেছি। না, পাগল হইনি। তবে শিগ্‌গির হয়ে যাবো। কয়টা বাজে?’
‘ছয়টা। বাইরে ছায়া অন্ধকার। ক্রমশ ঘন হবে। চলো, চলো।’
‘যাবোই তো। কিন’ গেট তালা বন্ধ। এখনও গার্ড সাহেবের পাত্তা নেই। এখনও ফেরেনি। যদি সারারাত না ফেরে তখন বোঝো ব্যাপারটা। তুমি আমি দোহা দুহু মিলে শুধু জলকেলী-’ রসিকতার সুরে কথাগুলো বললেও কণ্ঠের কাঁপুনি লক্ষ্য করে সাগর।
‘কি বলছো? গেট বন্ধ। তাহলে কি হবে? এসো, জানালা দিয়ে লোক ডাকি।’
‘লোক ডাকবো? তারপর তালা ভেঙে ওরা আমাদের বের করবে। তারপর… ব্যাংকের কর্মচারী হয়ে ব্যাংক অরক্ষিত রেখে যাবো। বাহ্‌! বাহ্‌!’ শিশিরের কণ্ঠে শ্লেষের বদলে দুঃখের ছোঁয়া। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শিশির আবার বলে, ‘যাওয়া যেতো সাগর, কিন’ ডাকাতি কেসে আসামি হবে। তারপরও একটা কথা আছে। লোকজন ডাকলে যদি খারাপ লোক এসে পড়ে। যদি মেরে ফেলে। যদি ব্যাংক লুট করে? ভোল্টে আজ অনেক টাকা।’
‘তাহলে কি হবে?’
‘কি হবে। আমার বুকে এসো। পৃথিবী ভুলে যাই। ভুলে যাই আমরা বন্দি। এসো বুকে এসো। জগৎসংসার হোক বিলীন।’
নিজেই কথা বলে নিজেই হেসে ফেলে শিশির।
‘আগামীকাল কি হবে?’
‘কোনো ভাবনা নেই। আমার মাথা শূন্য।’

তিনঘণ্টা হয়ে গেলো। কেউ আসছে না। চুপচাপ বসে থাকে ওরা পাশাপাশি। কাছাকাছি।
‘তোমার বাড়ি থেকে ফোন আসছে না যে।’
‘আমি তো বাবার বাড়ি যাবো বলে এসেছি। আজকে বাড়ি যাবো না। যাবো বাবার বাসায়। আগামীকাল তো বন্ধ।’
‘কি বললে?’ প্রায় চিৎকার করে ওঠে শিশির।
এতোক্ষণ খেয়াল ছিল না ওর। আগামীকাল বন্ধ। টেলিফোন করবে। কাকে করবে। কারা আসবে। আর ওরা এসেই কি করবে। ওরা তো এখন চিড়িয়াখানার চিড়িয়ার মতো। পুলিশে ফোন করবে। কিন’ পরক্ষণেই বাতিল করে।
‘তাহলে?’ এই একটা প্রশ্ন আর এই প্রশ্নেই মাথা গরম হয়ে উঠছে। অসহ্য লাগছে। ও যদি একা থাকতো ভালো থাকতো। একা থাকা তাও ছিল ভালো। কিন’ সাগর ঐ পবিত্র পুষ্পিত মুখ। ওর সম্মানটাও তো দেখতে হবে।

আমাদের বাঙালির ওই একটা দোষ। এই এতোক্ষণ একসঙ্গে কিছুই না তবুও আগামীকাল থেকে গল্পগাথা ছড়াতে ছড়াতে বিশাল মহীরুহের আকার ধারণ করবে ও জানে। সাগরের একটা সংসার আছে। আছে স্বামী শ্বশুর শাশুড়ি দেবর ননদ। বাচ্চা কাচ্চা হয়নি আজও। তাই দেখতে আজও খুব সুন্দর। বয়স ১৫ কি ২৫ বোঝার উপায় নেই। চুপচাপ বসে আছে দুইজন। সাগরের জন্যই সাবধানতা। হঠাৎ বাইরে হইচই। জানালা খুলে রাস্তায় চোখ রাখে। রাস্তায় জটলা। টুকরা টাকরা কথায় মনে হয় এ্যাক্সসিডেন্ট। কেউ একজন ট্রাকের নিচে চাপা পড়েছে। ট্রাকগুলো যে হালে যে গতিতে চালায় যেনো ওরা ছাড়া রাস্তায় আর কারো চলার কোনো অধিকার নেই। জানালার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আবার সোফায় বসে। এভাবে আর কতোক্ষণ বসে থাকা যায়।
‘কি করবো?’ সাগরের প্রশ্ন।
‘ওরা যদি সারারাত না আসে, তখন কি হবে?’
‘যা হবার তাই হবে।’
‘তুমি কি ভেবেছো তোমার কথা? লোকজন তো ছেড়ে কথা বলবে না।’
‘আরে ছাড়ো তো ওসব কথা। মন পবিত্র তো সব পবিত্র। আমি ডরাই না কাউকে। আমাদের এই মধ্যবিত্ত সমাজের একটাই বড়ো দোষ। পরচর্চার কপচানি। ও নিয়ে এখন ভাবলে তো চলবে না।’
‘সাগর।’ একটা নিশ্বাস ফেলে বলে শিশির। ‘তুমি বলছো এই কথা এখন কিন’ তখন ওসব কথা শুনতে শুনতে তোমার গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছা হবে। তোমার স্বামী তোমাকে ত্যাগ করতে পারে। সংসারের লোকজন তোমাকে খারাপ চোখে দেখবে। কী করবে তখন তুমি?’
‘কি করবো। তোমার কাছে চলে আসবো। তুমি কাণ্ডারি হয়ে তরাইও এ ভব নদী।’
‘তোমার সংসার?’
‘যা বাবা! একেবারে ভবিষ্যৎ নিয়ে পড়লে দেখছি। না হয় হে বন্ধু নিরাশ্রিতে আশ্রয় দিয়ো।’ ওর বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলে শিশির। ‘ইস, এতোক্ষণে যাহোক ‘পেপস জেল’ হাসি দেখা গেলো।’

হঠাৎ কি হলো শিশিরের। হাত ধরে টান দিয়ে সাগরকে বুকে টেনে নিয়ে দুইহাতে মুখ তুলে ঠোঁটে, কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। ভয়ভীতির শঙ্কার ভেতরেও রাতের মাদকতার ছোঁয়া লাগে ওদের। ঘড়িতে রাত বারোটা। গার্ড সাহেব ফেরেনি। জানালা দিয়ে একজনকে দিয়ে কিছু খাবার কিনে খেয়েছে। বসে আছে এখন চুপচাপ। উত্তেজনায় স্নায়ু কেমন যেনো অবশ ক্লান্ত ঝিমিয়ে আসে। তন্দ্রার ঘোর। হঠাৎ তালা খোলার শব্দে সাগর লাফিয়ে ওঠে। ‘শিশির, রমিজ এলো বুঝি। চলো ওঠো।’ ওরা দুইজনে চেম্বারের বাইরে আসে। ও তো ব্যাংকের গার্ড নয়। ওর মুখে কালো মুখোশ। ওর পেছনে আরো পাঁচজন। সকলের মুখে মুখোশ।

তারপর দিন ছুটি। ছুটির পর দিন। সকলে এসে দেখে ব্যাংকের গেট খোলা। ভোল্ট লুট। গার্ড উধাও। শিশির আর সাগর মৃত। দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিকের বড় হরফের লাল হেডলাইন : “সুরভী ব্যাংক লিমিটেড-এর লালমাটিয়া শাখায় ভোল্ট লুট। গার্ড উধাও। ব্যাংকের দুইজন অফিসার মৃত। ওরা এখানে কেন ছিল তা অদ্যাবধি জানা যায়নি। আর এই ব্যাংক লুটের সঙ্গে কারা জড়িত তাও জানা যায়নি। জোর তদন্ত চলছে।”

#afrozaaditi.com , # আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615