মুসলিম ধর্মের প্রধান এবং পবিত্র উৎসব হলো ঈদ। বছর ঘুরে ঘুরে আসে দুটি ঈদ উৎসব; রোজার ঈদ আর কোরবানীর ঈদ। রোজার ঈদের আগে পুরো একটি মাস রোজা; ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের জীবনের অঙ্গ বা অংশ এই পবিত্র রোজা। রোজার দুটি অংশের একটি সেহরি অন্যটি ইফতার। সেহরি অর্থাৎ শেষ রাতে খেয়ে সারাদিন উপোস করে সন্ধ্যায় ইফতার করে রোজা পালন করে ধর্মপ্রাণ মুসলমান। এক চাঁদ দেখে রোজা শুরু হয় একমাস পর আর এক চাঁদ দেখে রোজার মাস শেষ হয়। শেষ রোজার দিনে যে চাঁদ ওঠে ঐ চাঁদ দেখেই ঈদ-উৎসব শুরু। কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান ছোটবেলাতে শুনেছি এখনও শুনি, “রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ..” ঐ গান শুনতে শুনতে ছোটবেলাতে চলে যাই। ছোটবেলাতে খুব রোজা রাখতে চাইতাম; কিন’ আমার পেটে ব্যথা হওয়ার জন্য রোজা রাখতে দিতেন না বাবা-মা। রোজা না রাখলেও দাদির সঙ্গে সেহরি আর ইফতার খেতাম; ছোটবেলার রোজা আর ঈদের আনন্দ সুখ অন্যরকম।
শেষ রোজার দিন সকলের সঙ্গে সড়কে যেতাম ঈদের চাঁদ দেখতে। ঈদের চাঁদ দেখার ভীড় জমতো সড়কে। ঐ সড়ক ছিল মাটির। পাশে ছিল নদী। যাতে গ্রাম বন্যার হলে তলিয়ে না যায় সেজন্য আমার বাবা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন শ্রমিকদের সঙ্গে ঐ সড়ক বানানোর জন্য মাটি কেটেছিলেন। তখন বড়দের মুখে শুনেছি যেমন রোজার আগে চাঁদ না দেখলে রোজা হয় না তেমনি ঈদের চাঁদ না দেখলে ঈদ হবে না। এখনকার মতো তখন তো চাঁদ দেখার কমিটি ছিল না। তাই চাঁদ দেখার জন্য ছোটবড় সকলেই সেই রাস্তায় ভীড় জমাতো। মনে আছে পাকিস্তান আমলে একবার দুইদিন ঈদের জামাত হয়েছিল। ছোটবেলাতে ঈদগাহ্ মাঠে যাওয়ার জন্য খুব বায়না করেছি, গিয়েছিও। শেষবার যখন গিয়েছি সেবারের কথাই মনে আছে; দেখেছি নামাজ শেষে কাতারের মাঝখানে যে ফাঁকটুকু থাকে (এখন থাকে কিনা জানি না) সেই ফাঁকটুকু দিয়ে দুইজনে লালসালু কাপড়ে ফিতরা তুলতো তারপর সেই ফিতরার অর্থ মসজিদে কিংবা সমাজের অসহায় মানুষের মধ্যে দেওয়া হতো। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষের কর্তব্য, মানুষের ধর্ম। মানুষের কাজ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো; অসহায় মানুষের পাশে যে মানুষ দাঁড়ায় না তা বলবো না তবুও কতো দামি শাড়ি গহনাতে সাজতে-সাজাতে মানুষের পছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোজা শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, নিজেকে নিয়ে মেতে থাকা নয়; রোজা হলো ইবাদতের মাস, কর্মের মাস, দান করার মাস; কর্মও আল্লাহ্-এর ইবাদত। দান করা আল্লাহ্র ইবাদত কিন' প্রতিযোগিতামূলক দান করা আল্লাহ্ পছন্দ করেন না। অমুকে বেশি করলে তমুকেরও যে বেশি করতে হবে তা নয়; সামর্থ অনুযায়ী দান করতে হবে।
তখনকার দিন আর এখনকার দিনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য; খাওয়া-দাওয়া পোশাক পরিচ্ছদে! আমার দাদা-দাদিকে এতো নানা পদের ইফতার সাজিয়ে কখনও খেতে দেখিনি। দাদা ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং মসজিদের ইমাম; সমাজের মাথাও ছিলেন তিনি। আমার বাবা ছিলেন রাজনীতিবিদ; মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারী। বাবার মুখে শুনেছি মওলানা সাহেবের ইফতার-আয়োজন খুব সামান্যই ছিল। বাবা-মা বলতেন আনন্দ উৎসব সবার জন্য; একজন আনন্দ করবে আর একজন আনন্দে অংশ নিতে পারবে না তা কখনও হয় না। ঈদের দিন খিচুড়ি আর ক্ষীর রান্না হতো বাড়িতে, গ্রামের সবাই আসতো এবং আমার মা তাদের খেতে দিতেন। আমার বাবা ছাত্র জীবন শেষ করার পর স্কুলের হেডমাস্টার হয়েছিলেন; আইয়ুব খানের আমলে রাজনীতি করার দায়ে সে চাকরি চলে যায়, তারপর ইলেকশনে জয়ী হয়ে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট (চেয়ারম্যান) হয়েছিলেন। কিন্তু দেশের মেহনতি মানুষের জন্য কাজ করতেন; তাঁর এই কাজ বন্ধ করার জন্য তদানিন্তন সরকার ‘রাষ্ট্রদূত’ হওয়ার অফার দিয়েছিল কিন’ তিনি রাজী হননি ফলে কৃষকদের জন্য কাজ করার জন্য প্রেসিডেন্ট পদটিও থাকেনি। তিনি সর্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হয়ে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন; বাবা-মা উভয়েই রাজনীতি করতেন এবং তাদের লক্ষ্য ছিল কোন অপচয় না করে সাধ্য মতো মানুষকে দেওয়া! তাঁদের সাধ্য মতো করেছেন। ছোটবেলায় বাবা-মাকে দেখেছি শুধু ঈদ-উৎসবে নয় সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষের কর্তব্য; এখনও সাধ্যমতো বাবা-মায়ের আদর্শ মেনে চলার চেষ্টা করি।
এবারের ঈদ এসেছে চোখের জলে ভাসিয়ে; প্রকৃতি এসেছে যমজ সন্তান নিয়ে; কয়েকমাসের ব্যবধানে ছোবল দিয়েছে মহামারী আর ঘূর্ণিঝড়; কোভিড-১৯ মহমারী ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে এবং ঘূর্ণিঝড় আম্পান করেছে তচনছ, দিয়েছে মৃত্যু। সাধ্যমতো সকলেই একে-অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে! ছেলেবেলা থেকেই ঈদে নতুন কাপড় কখনো পরা হয়নি; ছেলেমেয়েরা বড়ো হওয়ার পর থেকে নতুন কাপড় দেয় কিন্তু পরা হয় না। এবারে ঈদের পোশাক ক্রয়ের কোন প্রশ্নই আসে না! এবারের ঈদে পোশাক নয় শুধু প্রার্থনা বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের মানুষ ভালো থাকুক, করোনামুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক হোক বিশ্ব; বন্ধ হোক হানাহানি যুদ্ধ; মানুষ অপরাধভুলে সুন্দর মনের অধিকারী হোক; মানুষ মানবিক হোক এই প্রার্থনায় সবার সিয়াম সাধনা উপভোগ্য হয়ে উঠুক ঈদ-আনন্দে! ঈদ আনন্দ শুধু একটি সম্প্রদায়ের নয় ঈদ আনন্দ এই মানব সম্প্রদায়ের।
২০২০
