‘হারামজাদী মাগী বাইর হ ঘর থাইক্কা’ -কথাটা বলেই বড় বউ ঘাড় ধরে স্বামীর বিয়ে করা নতুন বউকে উঠানে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। বড় বউয়ের বুকের ভেতর যন্ত্রণা। এত বছর পর অন্য এক মেয়ে মানুষ এনেছে স্বামী। সে তাঁর চোখের সামনে এঘর-ওঘর বেড়ায়। উঠানময় হাঁটহাটি করে। তাঁরই সামনে তাঁরই স্বামীর সাথে ঘরে কপাট দেয়। বড় বউয়ের আরও যন্ত্রণা মেয়েটা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত উঠতি বয়স। ভরা গাঙের মতো টইটম্বুর থৈথৈ। কিন’ একদিন ওরও তো ছিল এই বয়স। ওর মন ছিল, ছিল ভালোবাসা, রূপ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড় বউ।
‘ইস পিরিতি করা শখ।’ গজর গজর করতে থাকে বড় বউ। ‘চক্ষে দেহস নাই লো আবাগীর বেটী, লোকডার বউ-পোলামাইয়া আছে। ছেনালী করার আর জায়গা পাসনি। মা মাগী কেমন মাইয়া পেটে ঘরছিল গো। ……’ বড় বউ চিৎকার করে কাঁদতে থাকে আর কপালে চাপড়াতে থাকে। মায়ের কান্না দেখে বড় মেয়ে আসগরী বেগম আসোয়াস্তিতে ভুগতে থাকে। ঘরে স্বামী। একমাস পর এসেছে আজ। ওকে নিয়ে যেতে এসেছে। আসগরি বেগমের শ্বশুর বাড়ি সদানন্দীপুর।
বেলাবেলির পথ। কিন’ যাওয়া হয় নাই। মোহর মুনশী, আসগরীর বাবা বাড়ি নেই। যাওয়া হয়নি। স্বামীর সঙ্গে ঘরেই ছিল আসগরী। স্বামী ওকে ছাড়ছিল না। মায়ের কান্না শুনে বাধ্য হয়ে আসগরী বেগম বাইরে আসে। ‘চুপ করো তো মা, কি শুরু করলা’ ফিসফিসিয়ে মাকে ধমক দেয় মেয়ে।
‘শুরু করছি কি সাধে।’ কান্না থামিয়ে বলে মা। ‘বুড়াকালে ভিমরতি। ঐ হারামিরে নিকা করছে।’
‘আস্তে কওন যায় না মা। ঘরে জামাই আছে সে খেয়াল রাখো। বাবা কি শখ কইরা বিয়া করছে, পঞ্চায়েত জোর করছে না।’
‘থাউক। আর সাফাই গাইতে হইব না। তর বাপের লটর-পটর আমি বুঝি না।’
‘থাম তো মা। তুমি কি চাও আমি চইলা যাই। তোমার জামাই কি মনে করব কও তো।’
ঘরের ভেতর থেকে ধাক্কা খেয়ে নতুন বউ উঠানে পড়ে থাকে। ওঠে না। কেউ তাকে উঠায়ও না। ছয়দিন তাঁর বিয়ের বয়স। আজ তিনদিন স্বামী বাড়ি নেই। এই তিনদিন তাঁকে খেতে দেয়নি কেউ। না খাওয়া শরীরে এই মারের ধাক্কা সহ্য হয় না। অজ্ঞান হয়ে যায় সে। ছোটোবউয়ের নাম শরীফা। বাবা আমেদ আলী, বর্গাচাষী। নিজের বলতে কোন জমাজমি নেই শুধু একটা শনের ঘরের ভিটে ছাড়া। আমেদ আলী মোহর মুনশীর বাড়িতে কামলা খাটতো। শরীফা দেখতে-শুনতে মন্দ না। ফর্সা গায়ের রঙ। যে বয়সে প্রত্যেক মানুষকেই সুন্দর লাগে। সেই বয়স শরীফার। উঠতি বয়সের শরীরটা ছেঁড়া শাড়ীতে যত্ন করে ঢেকে রাখতো তবুও ওর দিকে চোখ পড়ে মোহর মুনশীর। বর্গাচাষীর সুবাদে মাঝে-মধ্যেই শরীফদের বাড়ি আসতে থাকে মোহর মুনশী আর এটা-ওটা দিতে থাকে শরীফাকে।
শরীফার বাবা কিছু বলতে পারে না, যদি জমিটা হাতছাড়া হয়ে যায় তবে সারাবছর ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। আর উঠতি বয়সের মেয়ে শরীফা না খেতে পাওয়া , না খাওয়া ঘরের মেয়ে এটা ওটা পেয়ে খুশি হয়, সহজ হয়। এভাবে দিন গেলে ভালই থাকতো শরীফা। কিন’ একদিন আমেদ আলী কাজ করতে যেতে পারেনি। গায়ে প্রচন্ড জ্বর। খাবার নেই ঘরে। বাবার কথায় শরীফা মোহর মুনশীর কাছে চললো টাকা আনতে। মুখ নিচু করে পথ চলছিল। পেছন থেকে ওর নাম শুনে চমকে উঠে থমকে দাঁড়ায়।
‘এই কোথায় যাস।’
‘ও আপনে। আপনার কাছেই যাইতেছিলাম। বাবার জ্বর। আইজ কাম করতে পারব না। কিছু টাকা দিতে কইছে বাবা।’
‘চল টাকা দিমু।’
একপাশে ধানজমি। অন্য পাশে পাটক্ষেত। মাঝ দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ। ওরা হাঁটছে। মাথার উপর দিয়ে একটা কাক কর্কস স্বরে কা-কা শব্দে উড়ে গেল। শরীফার হঠাৎ বুকের ভেতর ভয় জন্মে। ও বুঝতে পারে না কেন। মুখ নিচু করে ভয়ে ভয়েই মোহর মুনশীর পিছে পিছে চলছিল। হঠাৎ হাতে টান পড়ে। মুখ তোলার আগেই বুঝতে পারে মোহর মুনশী ওকে পাটক্ষেতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শরীফা চিৎকার করে গালি দেয়। খামচি দেয়। কিন’ মোহর মুনশীর সঙ্গে পেরে ওঠে না। হাতের মুঠোর ভেতর টাকা আর অর্ধ উলঙ্গ পড়ে থাকে কিছুক্ষণ পাটক্ষেতের ভেতর তারপর আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। এই ব্যাপারটা যে ঠিক নয় তা বুঝতে পারে শরীফা এবং চেপে রাখতে চায় কিন’ দুঃসংবাদ বাতাসের আগে যায়। পাটক্ষেত থেকে বের হতেই কুটনি বুড়ির সাথে দেখা। ও কোন কথা না বলে পাশ কাটিয়ে হাঁটা দেয়। শরীফা জানে না মোহর মুনশীকে পাটক্ষেত থেকে বেরোতে দেখেই ঐ বুড়ি ওখানে দাঁড়িয়েছিল। পঞ্চায়েতের বিচারে ওর শাস্তি হয়। ওকে পুড়িয়ে মারার আগে ১০১টা দোররা মারা হবে। বিচারে শাস্তি হবার পর ওর মন থেকে ভয় চলে গেল। দড়ি দিয়ে ওকে যখন মোটা আম গাছটার সঙ্গে বাঁধা হলো তখন চিৎকার করে বলে, ‘আমার শাস্তি হবে ক্যান? আমি তো এই কাম করি নাই। আমার উপর অত্যাচার করছে যে লোক তার শাস্তি ক্যান হইব না ক্যান।’ তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মোহর মুনশীর দিকে আঙুল তুলে দেখায়। ‘ওকেও এই শাস্তি দ্যান।’
এর পর কি হত জানে না শরীফা। পুলিশ আসাতে ও বেঁচে যায়। মোহর মুনশীর সাথে ঐ পঞ্চায়েতেই বিয়ে পড়ানো হয় ওর। শরীফা এ বিয়ে করতে চায়নি। এই বিয়ের থেকে ওর মৃত্যুই কাম্য ছিল। কিন’ আত্মহত্যা করে পাপ করতে চায়নি।
মোহর মুনশীকে যখন পঞ্চায়েত বিযে করতে বলেন, তখন সে খুশিই হলো। কারণ নিজে থেকে বিয়ে করতে পারছিল না। রাত-দিন বড় বউয়ের খ্যাঁচখ্যাঁচ, মুখ ঝামটা ওর ভালো লাগছিল না। তাছাড়া বয়স হয়েছে বড় বউয়ের। ওই বয়সি শরীরটাতে আর মন রাখতে পারছিল না মোহর মুনশী।
হাট থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে মোহর মুনশী। ছয়দিনের জায়গায় তিন দিন পর বাড়ি ফিরে উঠানে ছোটোবউকে পড়ে থাকতে দেখে দৌড়ে শরীফার কাছে আসে। কদম আলীকে ডাকে। ‘কদম আলী, কদম আলী, এই বেটা কোথায় তুই? কোথায় থাকে যে এ বাড়ির লোকজন। একটা লোক উঠানে পড়ে আছে তা দেখার কেউ নাই।’ ওকে কোলে তুলে ঘরে আনে মুনশী। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পানির ঝাপটা দেয়। মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। মুখের ভেতর বুনো ঘোড়ার দাপাদাপি টের পায়। সুন্দর মুখের ঢলঢলে সৌন্দর্য তাঁকে বিবশ করে, বিবশ করে শরীফার বুকের ওঠানামা। মোহর মুনশীর অজান্তেই ওর হাত শরীফার বুকের চড়াউ-উৎরাই খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শরীফা চোখ মেলে। মোহর মুনশীকে দেখে ভীত হয়ে পড়ে সে।
‘এই যে আমার ময়না পাখি, চোখ খুলছে। কি হইছে সোনা?’ ওর ভয় ভাঙাতে ব্যস্ত হয় মোহর মুনশী।
‘কিছু না। আমি পানি খাব।’ ভীত গলায় বলে শরীফা। এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখে আর কেউ আসে কিনা।
‘কি খোঁজ? কাকে খোঁজ সোনা বউ?’
‘না কাউকে না। পানি খাব?’
মোহর মুনশী নিজের হাতে পানি খাওয়ায় ওকে। পানি খাওয়াতে খাওয়াতে মুনশীর ভেতরে শরীরী ক্ষুধা বাড়াবাড়ি রকম জেগে ওঠে। মাতাল হয় মোহর মুনশী। আর পানি খাওয়ার সাথে সাথে শরীফার পেটের ভেতর তিনদিনের না খাওয়া যন্ত্রণা কিলবিল করে বেড়ে উঠতে উঠতে ওকে আচ্ছন করে দেয়। ওদের দুজনকে ঘিরে দুই রকমের ক্ষুধা বেড়ে ওঠে এবং আষ্টেপৃষ্টে তাতে বাঁধা পড়ে ওরা।
