আকাশের কথা
কি এমন কথা থাকতে পারে যে ছুটির পর দেখা করতে হবে বলে গেলো স্বাতীর জামাইবাবু। স্বাতীর জামাইবাবু নিজের জামাইবাবু নয় শ্বশুর পক্ষের। লম্বায় ৬ফুট ৮ইঞ্চি, ফর্সা। মাথায় কোঁকড়া চুল। সুন্দর চোখ যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখ বসিয়ে দিয়েছেন ঈশ্বর। কথা বলে সুন্দর। কথা যখন বলে তখন যেন মুখের সঙ্গে চোখ শরীর সব অঙ্গই একই সঙ্গে কথা বলে চলে। এই সুন্দর কথার জন্যই ওকে খুব পছন্দ আকাশের। জামাইবাবুর নাম প্রীতম সেন।
স্বাতী আর আকাশ। একই অফিসে একই ডিপার্টমেন্টে আছে। স্বাতী ও আকাশ পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসে। স্বাতী বিবাহিতা। স্বাতীর স্বামী একটি বেসরকারি ফার্মে চাকুরি করে। দুইদিন স্বামীর সঙ্গে রাগারাগি করে নিকট আত্মীয়ের বাসায় উঠেছে স্বাতী। সেই জন্য কি প্রীতমবাবু ওর সঙ্গে কথা বলতে চায়। স্বাতীকে কি নিয়ে যেতে এসেছে। স্বাতী যদি না যেতে চায় তবে বুঝিয়ে বলতে বলবে ওকে। স্বাতী চলে যাবে? ভাবতেই আকাশের বুকের ভেতর দুঃখকষ্ট বেদনা সব পাহাড়ি ঢলের মতো নামতে থাকে। আকাশের ভাবনা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য পাগলা জেদী ঘোড়ার মতো দৌঁড়াতে থাকে। ভাবনার কোনো কূলকিনারা পায় না আকাশ। সিগারেট শেষ করে একটার পর একটা।
স্বাতী বড়ো সহজ সরল। কথা বলে অনর্গল সেভেন আপের উপচানো ফেনার মতো । ও যখন কথা বলে আকাশের মনে হয় একটা প্রজাপতি যেন তার পাখা একবার খুলছে আর বন্ধ করছে। তখন স্বাতীর ঠোঁট দুটি স্পর্শ করতে খুব ইচ্ছা করে ওর। ওর হাসির ভাঁজ যখন সারা মুখে ছড়ায় তখন আকাশের ইচ্ছা করে ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ওর মুখের সবটুকু ওর ঠোঁটে স্পর্শ করে আনন্দ পেতে ইচ্ছা করে। ওর জন্য কতো নির্ঘুম রাত আনন্দহীন, আনমনা কেটে যায় সে শুধু আকাশ নিজে জানে। স্বাতী তো আহামরি সুন্দরী নয়। তবুও ঈশ্বরের আশীর্বাদ যেন ঘিরে রেখেছে ওকে। ওর মুখের আদলে অদৃশ্য এক শক্তি যেন লেপটে থাকে সবসময় যার জন্য অনেকের ভেতর ওকে আলাদা করে চেনা যায়। সাধারণ হলেও অসাধারণ মনে হয় ওকে।
ঘড়ি দেখে আকাশ। ছুটি হতে এখনও ঘণ্টা তিনেক বাকি। সময় আজ আলসে হয়েছে, যাচ্ছে না, যেতে চাইছে না! আসলে জটিল সময়ের সময় দ্্রুত যেতে চায় না। মনের ওপর চেপে বসে স্নায়ু অবশ করে। টেবিলে অনেক কাজ জমে আছে। প্রীতম বাবু আসবে শোনার পর থেকেই কাজে মন দিতে পারছে না আকাশ। কারও সঙ্গে কথাও বলছে না। এমন কি স্বাতীর সঙ্গেও না। একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে চলেছে। যেন সিগারেট খাওয়া ছাড়া আকাশের আর কিছু করার নেই। স্বাতী কয়েক দফা প্রশ্ন করেছে কিন’ উত্তর পায়নি। উত্তর পাবে না জেনেও আর একবার প্রশ্ন করে, কি হয়েছে আকাশ, আমাকে বলো।
আকাশ চোখে চোখ রাখে । বলে, কিছু না। আকাশ অতীত ভাবনায় ডুবে যায়।
গত এপ্রিলে স্বাতী এলো। প্রথম পরিচয় খুব সাদামাটা। তখন কি আকাশ জানতো ওই পরিচয় ওকে এতোটা দুঃখ দেবে, এতোটা কাঁদাবে। স্বাতীর জন্য মন কেমন করা সুখের সঙ্গে নীল কষ্টের লোনা জল ওর বুকের মধ্যে ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে খেলা করবে! তেত্রিশ বছরের এই জীবনে আকাশের গত একটি বছরের প্রতিটি রাত শুধু না পাওয়া আর চোখের জলের। কিন্তু কেন এমন হলো?
কাকে জিজ্ঞেস করবে আর কে দেবে এর উত্তর। কে শুনবে ওর কথা? এ সমাজ ওর কথা শুনবে না, বিশ্বাস করবে না। ওদের সম্পর্ক মানবে না। গত এপ্রিল থেকে এই এপ্রিল, সেই পরিচয়টুকু পার হয়ে এসেছে ওরা। স্বাতীকে আর দূরের ভাবতে পারে না আকাশ। অন্যের ভাবতে পারে না। স্বাতী অন্যের বিছানায় অন্যের বাহুতে ভাবতেও রাগে কাঁপতে থাকে ওর শরীর-মন। আকাশ জানে স্বাতীর স্বামী আছে তবুও রাগে বুকের ভেতর তপ্ত লাভা ছড়িয়ে যায়, ঐ তপ্ত লাভাতে পুড়ে যায় বুকের জমিন। কেবলই মনে হয় কেন স্বাতী যাবে ওখানে, কেন থাকবে ওই লোকটার কাছে! কেন? কেন?
আকাশকে ভালোবেসেছে স্বাতী। স্বাতীর সংসার, স্বাতীর স্বামী আর দায়িত্ব কর্তব্যের মধ্যে ওর স্থান কোথায় অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে আকাশ।
স্বাতী তোর তো সব আছে, তবে আমাকে ভালোবাসলি ক্যান?
আমার সব আছে কিন্তু তুই নেই।
স্বাতী, তুই যে ক্যান এমন করে বাঁধলি। এখন যে দিন কাটে না, রাত যায় না।
আকাশ জানে স্বাতীর জীবনে জায়গা নেই ওর। পরকীয়া প্রেম বলে আখ্যায়িত করবে ওদের সম্পর্ককে এই সমাজ। আকাশ অনেক বার সরে আসতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। যত সরতে চেয়েছে, সরাতে চেয়েছে তত আরও কাছে যেতে ইচ্ছা করেছে, তত কাছে নিতে ইচ্ছা করেছে ওর। প্রতিরাতে ভেবেছে স্বাতীর সঙ্গে কথা বলবে না কিন’ প্রতিদিন সকালে যখন সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে কেমন আছো তখন আকাশের মনে হয় ওর পৃথিবী হাজার সূর্যের রশ্মিতে এক মায়াময় আলোর শিখা স্বাতীর রূপ নিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণ মরা রোদ ছিল ওর চারপাশে, এখন আলো ঝলমল হয়ে উঠেছে। যে মন ছিলো নিস্তব্ধ নির্বিকার সেই মনের হাজার লক্ষ কোটি মুখ এক সঙ্গে বলে ওঠে, স্বাতী অন্যের স্ত্রী নয়, স্বাতী শুধু আমার, আমার ,আমার । আর কারও নয়।
ঘড়িতে পাঁচটার কাছাকাছি। সিঁড়িতে প্রীতম বাবুকে দেখা গেল। ভাবনার তন’জাল ছিঁড়ে গেল ওর।
বসুন দাদা।
বসবো। তবে…
চলুন অন্য কোথাও বসি।
কোথায় যাবেন?
চলুন কাছাকাছি কোনো রেস্তোরায়।
দুই কাপ চা আর দুটো কেকের অর্ডার দিয়ে মুখোমুখি দুইজন। বিকেলের অফিসপাড়া রেস্তোরায় ভীড় নেই বললেই চলে। আকাশ সিগারেট খাচ্ছে। বিচারালয়ে দাঁড়ানো আসামির মতো মনে হচ্ছে নিজেকে আর বিচারকর্তা সম্মুখে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করার অপেক্ষায়। আকাশ সাবধান হয়! তাঁকে প্রশ্নবান নিক্ষেপ করা হলে সুচিন্তিত পন’ায় ফেরত দিতে হবে যেন স্বাতীর কোন ক্ষতি না হয়। কোন অসুবিধা না হয়। সম্ভাব্য প্রশ্ন কী হতে পারে মনে মনে সেটার একটা তালিকা করে তার জবাব গুছিয়ে রাখছে ও।
প্রীতম বাবু ভাবছে কিভাবে কথাটা শুরু করবে। ইতিমধ্যে চা এলো আকাশ চা নিয়ে কেকের প্লেট এগিয়ে বলে,
নিন। কেন ডাকলেন আমাকে বলুন।
আমি স্বাতীর কথা বলবো। স্বাতী চলে এসেছে রাগ করে জানেন তো। আমি শুনলাম আপনি নাকি যেতে দিচ্ছেন না।
ওর যাওয়া না যাওয়া আমার ইচ্ছার ওপর এমন কথা তো জানি না, শুনিওনি কখনও! আপনাদের এমন কথা মনে হওয়ার কারণ? কণ্ঠে একটু উষ্মা ঝরে আকাশের। উষ্মা ঝরাতেই হবে না হলে ওকে কব্জা করে ফেলবে প্রতিপক্ষ তা ভালো করেই জানে আকাশ।
আপনি রাগ করবেন না। জানেন তো আমি তৃতীয় পক্ষ। যদি রাগ না করে ঘটনাটা খুলে বলেন তবে ভালো হয়।
আকাশ পরিচয়ের সূচনা থেকে আজ অবধি ঘটনাগুলো খুলে বলে। স্বাতী আর ওকে জড়িয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে আর ওকে মারধর করেছে ওর স্বামী । অনেক কথা বলে আকাশ। অনেক কথা বলেও যখন আকাশ প্রীতমবাবুকে বোঝাতে পারে না ঠিকমতো
তখন বলে, দেখেন একটা মেয়ে যে চাকুরি করে সে অন্য মানুষের সঙ্গে কথা বলবেই। আর স্ত্রীকে সন্দেহ করলে এক ছাদের নিচে বসবাস করা যায় না। যদি স্বামীর মনে হয় স্ত্রী অসতী তবে তাকে সরাসরি ত্যাগ করাই শ্রেয়। এতো মারামারি করা ঠিক নয়।
দেখুন সব বুঝি। কিছু মনে করবেন না। হাজার হলেও একটা সংসার ভেঙে যাক তা নিশ্চয় চাইবেন না। প্রীতমবাবু চলে যাবার পর অনেক্ষণ বসে থাকে আকাশ। চায়ের অর্ডার দেয়।
স্বাতী। ওর স্বপ্নের মানবী। মানস প্রতিমা। ওকে যেতে দিতে হবে ভাবতেও বুকের ভেতর ভাঙচুর শুরু হয়। বন্ধ হয়ে যায় রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া। স্বাতী অন্যের। অন্যের সংসারে নিত্য কর্ম করবে ভাবতেও ভালো লাগে না ওর। তবুও ভাবতেই হয়। মাঝে মধ্যে মনে হয় ঈশ্বর কেন এতো নিষ্ঠুর, ওকে কেন পাথর করে দিচ্ছে না।
কেন এমন হয়। কতো মানুষ এলো কতো মানুষ গেল। কেউ তো ওকে কাঁদাতে পারেনি। অথচ ওকে না দেখলে দিনটা অচল হয়ে যায়। নিশ্বাস আটকে থাকে। কেন এমন হয়। আকাশ ভাবে,একদিন রাতে ও ঘুমাবে আর কোনোদিন উঠবে না। কিংবা হঠাৎ করে এই অফিসে থাকতে থাকতে স্বাতী একটা ফুল হয়ে গেল, তখন ফুলটা নিয়ে বুকপকেটে রেখে দিবে। আপন মনেই হেসে ওঠে ওর উদ্ভট কল্পনায়। আজ আর ওর ফেরার কোনো পথ নেই। যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে আর ফেরা যায় না।
প্রথম পরিচয়ের সেই সাদামাটা মেয়েটির জন্য বুকের মধ্যে এমন করবে কে জানতো। একটু ছোঁয়ার জন্য, একটু কথা বলার জন্য ও এমন উন্মুখ হবে তা কি নিজেই জানতো। জানতো না!
এসব কথা তো কাউকেও বলার নয়। কাকেই-বা বলবে। কেই-বা শুনবে। এ ভালোবাসার কথা কেউ তো বিশ্বাস করে না, করবে না। এই সমাজে সামাজিক পরিচয়ের মূল্য বেশি। মূল্য একটা কাগজের। আত্মার সম্পর্কের কোন দাম নেই, আত্মার সম্পর্ক নষ্ট হয় বিধিবদ্ধ কাগজ ছাড়া।
আকাশ কি সরে যাবে? না। সরে যাওয়ার জন্যই কি এতোটা পথ হাঁটা। এতো অপমান এতো কষ্টের মধ্যে বসবাস ওর কি তবে ফিরে যাওয়ার জন্য। এতো কষ্ট এতো অপমানের মধ্যে ওর ভালো লাগে স্বাতীর দেখা পেলে, স্বাতীকে দেখলে সচল হয় দিন। স্বাতীর দুইচোখে চিকচিকে আনন্দের ঝিলিক দেখলে ওর হৃদয়ে উথাল পাথাল সমুদ্র তার সফেন ফেনা ছড়িয়ে উচ্ছল হয়। কিন্তু ওইটুকু সম্বল নিয়ে কি বেঁচে থাকা যায় ! যায় না তবুও আকাশ বেঁচে থাকবে। ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে ওঠে আকাশের মুখে। এখন যে ওর এক মুহূর্ত স্বাতীকে ছাড়া চলে না। যেতে তো দিতে ইচ্ছে করে না, তবুও যেতে দিতে হবে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ওকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে। ইচ্ছে করে যেখানে মানুষ মানুষে এমন নোংরা আবর্ত নেই। অসম্মান নেই। হিংসা বিদ্বেষ নেই সেখানে চলে যেতে ; কিন্তু কেমন করে? ভাবনা ডুবে আছে আকাশ।
স্যার, যাবেন না? বেয়ারার ডাকে সম্বিত ফিরে পায়। রেস্তোরা প্রায় খালি। সন্ধ্যা তার ফিকে রঙের তুলির গাঢ় আঁচড় দিতে শুরু করেছে পৃথিবীর বুকে। প্রীতম বাবু চলে গেছে অনেকক্ষণ। রাস্তায় বেরিয়ে আসে আকাশ। অফিসপাড়া ঝিম মেরে আসছে। লোক যাতায়াত কমতে শুরু করেছে। আগামীকাল সকালে আবার দেখা হবে স্বাতীর সাথে। একটা রাত্রির অপেক্ষা। জীবনটাই তো অপেক্ষার, সংগ্রামের। আকাশ হাতে ধরা সিগারেটটাতে শেষ টান দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। দৃঢ় পায়ে হাঁটতে থাকে অন্ধকার চিরে। হাঁটতে হাঁটতে স্থির করে, স্বাতীকে ফিরে যেতেই বলবে। (চলবে)
