সংসারে প্রবীণ নারী // আফরোজা অদিতি

প্রকৃতির সন্তান নারী ও পুরুষ। নারী ও পুরুষ উভয়েই মানুষ। জন্মের পর থেকেই মানুষ হিসেবে তাদের বৃদ্ধির শুরু। এই বৃদ্ধি শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্য, তারুণ্য পেরিয়ে পৌঢ়, পৌঢ়ত্ব পেরিয়ে মানুষ পৌঁছে যায় বার্ধক্যে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হয় বুদ্ধিবৃত্তির,সংগৃহীত হয় অভিজ্ঞতা এবং পরিবর্তিত হতে থাকে দেহের খোল-নলচে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই নিহিত থাকে প্রবীণ-অস্তিত্ব আর প্রবীণের অস্তিত্ব থেকেই সৃষ্টি হয় নবীনের জগত। একবার জন্ম নিয়ে বেঁচে থাকলে প্রবীণ হতেই হবে তাকে। প্রবীণ হওয়ার হাত থেকে কারও রেহাই নেই। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন হয়তো কেউ একটু দেরীতে, কেউ বা তাড়াতাড়ি; বেঁচে থাকলে কেউই তার বার্ধক্যে পৌঁছানোর পথ আটকাতে পারে না। জীবন স্বাভাবিকভাবে চললে প্রবীণ অবস্থায় পৌঁছানোর পরেই তার মৃত্যু হবে। তবে প্রবীণ কে বা কাকে বলে ? এখানে বলা যায় বেশি বয়স যার সেই প্রবীণ। তবে বয়স দ্বারা প্রবীণকে চিহ্নিত করা হলেও আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন দেশে বার্ধক্যের বয়স কাঠামো ভিন্নতর। উন্নত দেশগুলোতে ৬৫ বছর বয়সীকে প্রবীণ হিসেবে ধরা হলেও ৬০ বছর বয়সকে প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ।

কিন’ বাংলাদেশে দারিদ্র, ক্রয়ক্ষমতার অভাব, অপুষ্টি, ক্ষুধা, অসুস’তা, সেবা পরিচর্যা ও নিরাপত্তার অভাবে বাংলাদেশে ৬০ বছরের আগেই জীবনে বার্ধক্য নেমে আসে। অর্থাৎ চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্মক্ষমতাও কমে যায়। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ মানুষ প্রবীণ। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ নারী হলেও প্রবীণ নারীর কোন পৃথক পরিসংখ্যান নেই। বাংলাদেশে প্রবীণদের মধ্যে অধিকাংশই বিধবা। তাছাড়াও প্রবীণ নারীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। কারণ মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে এবং পুরুষের চেয়ে নারী দীর্ঘজীবী। প্রবীণ অবস্থায় পুরুষ নারী উভয়ে পৌঁছে তবে বাঙালি সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের চেয়ে বার্ধক্যে নারীর যণ্ত্রনা বেশি। কারণ যতোদিন স্বামী বেঁচে থাকে ততোদিন নারীর অবস্থান থাকে একরকম আর স্বামীর অবর্তমানে সেই অবস্থানের পরিবর্তন হয়। বাঙালি সমাজে বিধবাদের কষ্ট আদিকাল থেকেই আছে।

প্রতিটি সমাজের কিছু নিয়মরীতি থাকে। এগুলো ইচ্ছা-অনিচ্ছায় মেনে চলতে হয়। চলতে গেলে কখনও বাধার সম্মুখীণ হতে হয় কখনও নয়। তবে বেশিরভাগ সময় বাধার সম্মুখীণ হতে হয় এবং তা ডিঙিয়ে যাওয়ার জন্য লড়াইও করতে হয়। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রবীণ মানুষকে সম্মান করা। কিন’ অণু পরিবারের প্রসার, জীবন ধারণের বহুমুখীতা এবং সুস্থ্য ও সঠিক সংস্কৃতি চর্চা না থাকার কারণে ক্রমশ তা ভেঙে পড়ছে। সমাজে প্রবীণ পুরুষ ও প্রবীণ নারী উভয়েই বাস করে। তবে প্রবীণ পুরুষের থেকে প্রবীণ নারীর কষ্ট হয় বেশি। নারীর কষ্ট বেশি হওয়ার কারণ সমাজ ব্যবস্থা। আদিম যুগ থেকেই সমাজে অবহেলা, বঞ্চনা, না-পাওয়াসহ নানাবিধ শাসন-শোষণের শিকার নারী। নারী এমন এক মানুষ যে শাসক ও শাসিত উভয়ের দ্বারাই শাসিত-শোষিত হয়। এমন কি নারী দ্বারাও শাসন- শোষণের শিকার হয় নারী। এমতাবস্থায় প্রবীণ নারীর ভাগ্যে কষ্ট ছাড়া অন্যকিছু থাকে না, থাকতে পারে না।

নারী পারিবারিক ও সামাজিভাবে অত্যাচার-অবদমন-পীড়নের শিকার। নারী অবশ্য নিজে এর প্রতিকার চাইলেও করতে পারে না আবার অনেক সময় নিজে থেকে করতে চায়ও না। বর্তমান সময়ে নারী ঘরে-বাইরে কাজ করছে। কাজ করলেও উপার্জনের অর্থ
তার নিজের কাছে রাখতে পারে না। আর নারী যদি সংসারের প্রধান হয় তবে স্বামী তাকে সংসার চালানোর জন্য তার উপার্জনের অর্থ কখনও অল্পকিছু দেয় কখনও বা দেয়ই না। অন্যদিকে সংসারের প্রধান স্বামী হয় তাহলে স্ত্রীর সব অর্থ নিজের কাছে নিয়ে তাকে তার মুখাপেক্ষি করে রাখে। নারী যদি তার যুবা-বয়সে কিছু করতে চায়- অর্থাৎ সে উপার্জন করতে চায় বা তার উপার্জনের অর্থ আলাদা করে রাখতে চায় তাহলে সংসারে অশান্তি শুরু হতে পারে কখনও বা হয়ও। আর এই অশান্তিতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। মৃত্যু না হলেও সংসার-সন্তান ছেড়ে চলে যেতে হয় তাকে। সংসার ছেড়ে না গেলেও সন্তানকে জীবনের সিংহভাগ সময় দেওয়ার কারণে তার কাছে চাহিদাও একটু বেশি পরিমানে থাকে বলেই কষ্টটা আরও বেশি হয়। বয়োবৃদ্ধ হওয়ায় সংসার অন্যের হাতে চলে যাওয়ায় তাদের অবহেলা এবং নিজের মানিয়ে নিতে না পারাও নারীর কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শৈশব, কৈশর, তারুণ্যে কষ্ট পেলেও তা সহ্য করে নেয় নারী কারণ সহ্য করার ক্ষমতা থাকে, থাকে কর্মক্ষমতাও। কিন’ বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পরে সে কষ্ট আর সহ্য করতে পারে না নারী। তখন অর্থ সংকটে থাকেন অধিকাংশ প্রবীণ নারী কারণ তাদের উপার্জনের অর্থ তার নিজের থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রায় অক্ষম হয়ে যাওয়ার ফলে সংসারের কর্তৃত্ব চলে যায় অন্যের হাতে। অর্থ না থাকার কারণে ছেলে-মেয়ে-ছেলেবউয়ের মুখাপেক্ষি হতে হয়। প্রবীণ নারী যখন রিটায়ার করে তখন তার পেনশনলব্ধ অর্থের ব্যবহারও নিজে করতে পারে না। ছলেবলে কৌশলে ছেলে-মেয়েরা নিয়ে নেয় কিংবা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের কারণে নিজেই দিতে বাধ্য হয়। তরুণ বয়সে একদিন যাদের সুখের জন্য প্রাণপাত করেছে সেই তারাই বলে, ‘কিছু হলে দেখভালের অভাব হবে না। বয়স হয়েছে টাকা টাকা না করে আল্লা-খোদার নাম নাও।’ পুরুষের চেয়ে বেশিদিন বাঁচে নারী। আর পুরুষ নির্ভর সমাজে নারী এক নির্ভরশীল গৃহপালিত প্রাণী। এখনও নারী আটকে আছে সংস্কার-কুসংস্কারের বেড়াজালে। নারী-স্বাধীনতা আন্দোলনের এতোগুলো বছর পার হলেও এই অন্ধ,বধির প্রতিবন্ধী সমাজে নারী এখনও সেই পিতা, স্বামী, পুত্রের অভিভাবকত্বে বাস করে। এখনও তাকে অনেকটাই কষ্ট স্বীকার করে পথে-ঘাটে চলাফেরা করতে হয়। সমাজে খুব কম পুরুষ আছে যারা নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বা নারীর কথা ভাবে।

সমাজ পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে মানুষকে মানিয়ে চলতে হয়। এই মানিয়ে চলতে পারলে বার্ধক্য যখন তার দুয়ারে উপস্থিত হয় তখন তার কোন অসুবিধা হয় না। যে মানুষ এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না সেই প্রবীণ বয়সে মানসিক কষ্ট ভোগ করে এবং অসহায়ত্বের শিকার হয়। প্রবীণ মানুষ একটু রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন হয়। তা তরুণ প্রজন্মকে মানিয়ে নিতে হবে। এছাড়াও তরুণ বয়সেই বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিতে হবে। নারী যেহেতু পুরুষের ওপর নির্ভরশীল এজন্য পুরুষকে(স্বামী) তার অবর্তমানে নারী (স্ত্রীকে) যেন অন্যের মুখাপেক্ষি হতে না হয় সে ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। মানুষ প্রবীণ হয়। তবে এই প্রবীণতা মানুষের একদিনে আসে না বা হঠাৎ করে আসে না। জীবনের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবনের এই ক্ষণ আসে। জীবনের এই সময়টা যে আসবে না তা মানুষ কখনই বলতে পারে না। সে বেঁচে থাকলে এই পথ বেয়েই তাকে চলতে হবে। তাই সময়কালেই তাকে এই জীবন নিয়ে ভাবতে হবে। তাকে প্ল্যান করতে হবে। এই সোস্যাল প্ল্যানিং জীবনের জন্য খুব প্রয়োজন। ছেলে-মেয়েকে বড় করার সময় শুধু ছেলেমেয়ের কথা ভাবলেই হবে না সেই সঙ্গে নিজের কথাও ভাবতে হবে। ছেলেমেয়ে একসময় বড় হবে, তাদের নিজ নিজ জীবনের ক্ষেত্রে তাদের বিচরণ করতে হবে। তখন তারা (স্বামী-স্ত্রী) কী করবেন ?

এই বিষয়টা ভাববার বিষয়। এবং তরুণ বয়স থেকেই এটা ভাবতে হবে। যদিও প্রবীণ-নারীর কষ্ট সংসারে বেশি তবুও পুরুষ-প্রবীণের কষ্টও খুব একটা কম নয়; তাই এ ভাবনা উভয়ের।

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615