কথা হলো কার সঙ্গে// আফরোজা অদিতি

সেই সকাল আটটা থেকে অবিরাম ঝরছে বৃষ্টি। একটানা ঝাপুর ঝুপুর, ঘাপুর ঘুপুর ঝরে ঝরে ক্লান্ত হয়ে টিপির টিপ টুপ টুপ ইলশেগুড়ি ঝরছে। এখন তিনটা। দুপুরে বাড়ির সকলের শখের জন্য ইলিশ ভাজা আর খিঁচুড়ি খেতে হয়েছে। খেয়েদেয়ে যে যার মতো ঘুমিয়ে, আমার ঘুম আসছে না। প্রকৃতি বিষন্ন হলে আমার মনও বিষন্ন হয়। আমার বন্ধু সুস্মিতা বলে, ‘চন্দ্রের জাতিকাদের এমনই হয়।’

আমার মন বিষন্ন। ভালো লাগছে না কিছুই। ঘরের ভেতর হাঁটছি। এটা ওটা নাড়ানাড়ি করছি। সিডি ছাড়লাম। রামী-চন্ডিদাস! ভালো লাগলো না। রাধার মানভঞ্জন! নাহ, ভালো লাগছে না। কবিতার সিডি দিলাম। কবিতাও আমার মন ছুঁতে পারছে না তবুও সিডি বন্ধ না করে জানালায় এসে দাঁড়ালাম। রাস্তার ওপারে ছোট্ট একটুকরা রেলিং ঘেরা জায়গা। পার্ক। হাজারিবাগ পার্ক। সেখানে বৃষ্টিতে একহাঁটু জল জমেছে। সেই জলে গোটা ছয়েক ছেলে-মেয়ে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি করছে। ওদের আনন্দ-খুশি দেখে আমার ছোটোবেলার কথা মনে পড়লো।

মনে পড়লো বাঁশির কথা। বাঁশি, আমার ভাই,বন্ধু, আত্নার আত্নীয়। আমার ভাবনায় চলে বাঁশির নিঃশব্দ চলাফেরা। আমি আরও আনমনা আরও বিষন্ন হয়ে যাই।
ভাবী। সোহাগীর ডাকে চমকে উঠি। আমি এতোই আনমনা ছিলাম যে ও কখন এসেছে জানতে পারিনি।
কি, কিছু বলবে?
চলেন না ভাবী, বেড়াতে যাই।
এই বৃষ্টির মধ্যে! অবাক হয়ে প্রশ্ন করি।
চলেন না। ঘরে থাকতে ভালো লাগছে না।

ওর কন্ঠে এবং কথার সুরে কী যে ছিল তা ব্যাখ্যা করা যাবে না। বেড়াতে যেতে রাজী হলাম।
বললাম, কোথায় যাবে?
ও বললো, আগার গাঁও।
সে তো অনেকটা পথ।
হোক না ভাবী, চলেন।

আগারগাঁও আমার মামার বাসা। বাইরে তখনও টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছে। তবুও বললাম, যাও কাপড় পরো।
সোহাগী চলে গেলো কাপড় পরতে। আমিও কাপড় বের করার জন্য আলমিরা খুলতে যাবো হঠাৎ পেছন থেকে ‘যাস নে’ শব্দ শুনে একটা হার্টবিট মিস্‌ হয়ে যায় আমার। অদৃশ্য সেই কন্ঠ। যে সুগন্ধের আড়ালে মাস দুয়েক হলো আগলে রাখছে আমাকে।
অদৃশ্য কন্ঠকে বললাম, যাবো না যে, আমি তো কথা দিলাম ওকে। তাছাড়া নিজের মনটাও বে-চায়েন, উচাটন।
হোক উচাটন, তবুও যাস নে। তোর বিপদ হবে! সোহাগি তোকে বিপদে ফেলবে।
ধ্যুৎ, তাই কখনও হয়! মনকে চোখ ঠেরে হেসে উঠলাম। অদৃশ্য কন্ঠের কথা না মেনে পথে বের হলাম দুজনে।

আকাশে রোদ উঠেছে। টিপটিপ বৃষ্টির সঙ্গে চলছে রোদ্দুরের সখ্যতা। রংধনু উঠেছে। বৃষ্টিভেজা মাটি থেকে উঠছে সোঁদা গন্ধ। বৃষ্টিজলে ধোয়া গাছের পাতাগুলো দেখাচ্ছে প্রচন্ড রকমের সবুজ। সবকিছু মিলিয়ে চোখ, মন জুড়িয়ে গেল। মনে হলো রাস্তায় বের না হলে তো প্রকৃতির এই রূপ দেখতেই পেতাম না। মনের বিষন্নতা দূর হয়ে গেলো। গুনগুন করে উঠলাম। ‘ও মন হারিয়ে যারে হারিয়ে যাওয়া বনে।’ মনটা প্রকৃতির রসে এমন ডুবে ছিল যে খেয়াল করিনি , আমাদের রিকশা ফরফর করে একরকম উড়ে চলছিল, সেই রিকশা এখন চলছে ঢিমেতালে। টানতে পারছে না রিকশাওয়ালা।
এই তুমি টানতে পারছো না কেন?
রিকশাওয়ালার জবাব দেওয়ার আগেই পেছন থেকে উত্তর এলো, পেছনে আমি। ভারী তো হবেই।
চমকে উঠলাম। এ কন্ঠস্বর কার? এ কন্ঠস্বর তো আমার জানা অদৃশ্য কন্ঠের নয়! তবে কার? পেছনে তাকালাম, কেউ নেই। রিকশাওয়ালাকে তাড়াতাড়ি চালাতে বললাম। আমার বুকের ভেতর ভয় ঢুকে গেছে। সোহাগীর দিকে তাকালাম, ওর কোন ভাবান্তর নেই। রিকশাওয়ালাও টানতে পারছে না। আমার পেছনে নিঃশ্বাসের শব্দ আর গরম স্পর্শ পলাম।
কি, আস্তে চালাচ্ছো, তাড়াতাড়ি চালাও। রিকশাওয়ালা প্রাণপণ চেষ্টা করেও জোরে টানতে পারছে না।

ঢিকিস ঢিকিস করে রিকশা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটে ফার্মগেইট পৌঁছে, খেজুরবাগানের রাস্তায় ঢুকবে ঠিক সে সময়, বাঁশির কন্ঠ কানে এলো। তাকিয়ে দেখি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে বাঁশি। রিকশা ঘুরিয়ে ওর কাছে গিয়ে বললাম, এখানে কী করছো।
ও বললো, তোমাদের জন্যই তো দাঁড়িয়ে আছি।
বললাম, আমরা তো তোমাদের বাসায়ই যাচ্ছি।
বাঁশি অদ্ভুত হেসে বললো, ও বাসায় তো পৌঁছাতে পারবে না।
কেন? ওমা, তাকিয়ে দোখ বাঁশি নেই। আশ্চর্য হলাম। ও তো এরকম লা-পরোয়া ছেলেই নয়। তাহলে! ভয়টা আরও জেঁকে বসলো। রিকশা ঘুরাতে বললাম। রিকশা ঘুরাতে যাবে, তাকিয়ে দেখি কোথা থেকে আজদাহা এক ট্রাক গাঁক গাঁক করে আমাদের দিকেই আসছে। রিকশা জলদি। রিকশা কোনরকমে একটু পাশ কাটাতে না কাটাতেই ট্রাক চলে গেল। ট্রাকের লেজের ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম আমি। তাকিয়ে দেখি মিটিমিটি হাসছে সোহাগী। ভাবলাম চোখের ভুল। আবার চলা শুরু হলো। ভাবলাম এতোদূরের রাস্তা রিকশায় আসা ঠিক হয় নি।

রিকশাওয়ালা গজগজ করতে করতে আবার চালাতে শুরু করে। পথ আর বেশী নেই। রেডিও অফিস ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গেলেই মামার বাসা। রিকশা পঙ্গু হাসপতাল ছাড়িয়ে রেডিও অফিসের কাছে আসতেই মনে হলো কেউ যেন পেছন থেকে ধাক্কা দিলো রিকশাটাকে। উল্টে গেলো রিকশা। আমরাও প্রপাত ধরণীতল। কাদায় মাখামাখি পৌঁছালাম মামার বাসায়।

দরোজা খুলে আমাকে দেখেই মামি রাগে অগ্নিশর্মা। বৃষ্টির মধ্যে এতোদূরের রাস্তায় বিনাকাজে কেউ আসে। এসেছিস তাও আবার পরের বউ সঙ্গে করে। ওর যদি কিছু হয়ে যেতো। তোর যে বুদ্ধিসুদ্ধি কবে হবে!
কার বুদ্ধির কথা বলছো মা। বলতে বলতে ঘুমঘুম চোখে এসে দাঁড়ায় বাঁশি।
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, তুমি? তুমি কি বাসাতেই!
আমার কথা শুনে হেসে কুটিকুটি বাঁশি। বলে, এই বৃষ্টির দিনে পাগল না হলে কেউ ঘর থেকে বের হয় না।
তাতো ঠিক। কিন্তু কী করে সম্ভব? আনমনে বলি। তুমি বের হওনি তো রাস্তায় কথা হলো কার সঙ্গে।
মামি বললো, ও রাস্তায় যাবে কি? ওর পাঁচদিন পর কাল জ্বর ছেড়েছে।
আমি বললাম, অসম্ভব, এ হতে পারে না।
কি অসম্ভব? বাঁশির পীড়াপীড়িতে সব কথা খুলে বললাম। মামিও শুনলেন। মামি, আমাদের একা ছাড়লেন না। বাঁশি পৌঁছে দিলো। আমার মনের মধ্যে একটা কাঁটা বিঁধেই রইলো। বাঁশি, যদি ঘরেই ছিল, তাহলে কার সঙ্গে কথা বললাম? আমি, আমার এতোদিনের পরিচিত বাঁশিকে চিন্তে পারলাম না? আশ্চর্য! এই কথাটা আজও গেঁথে আছে মনে!

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615