স্বামীর বুকের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়ে রোহিনী। হঠাৎ মারা গেছে স্বামী। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। এই রকম মৃত্যুকে মানতে কষ্ট হয়, কষ্ট হয় বিশ্বাস করতে যে মানুষটা আর ওদের কাছে ফিরবে না! কথা বলবে না ওদের সঙ্গে, একত্রে বসে হাসিগল্প করবে না আর কখনও। বিশ্বাস করতে, মেনে নিতে কষ্ট হয় এই মানুষটা এই তো ছিল এখন নেই! সে তাঁর আত্মীয়স্বজনের জন্য কোন কাজই করতে পারবে না!
রোহিনীরও সেই রকম বিশ্বাস হয়নি। বিশ্বাস হয়নি ওর হেডমাস্টার স্বামী আর ছাতা হাতে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাবে না, স্কুল থেকে ফিরবেও না। আপদে-বিপদে দিবে না পরামর্শ কিংবা পরামর্শ করবেও না! দাঁড়াবে না পাশে। রোহিনী বিস্মিত! সকালে যে মানুষটা নিজের পায়ে হেঁটে স্কুলে গেল, সেই মানুষটা বাড়ি এলো অন্যের কাঁধে; নিথর, নিস্তব্ধ! হতবাক রোহিনী। কী বলছে ওরা প্রথমে বুঝতেই পারেনি, যখন বুঝতে পারলো তখন কান্নায় ভেঙে পড়লো স্বামীর বুকের ওপর।
ওদের বিয়ের বয়স পাঁচ বছর। সন্তান হয়নি। বয়স পঁচিশ হলে কি হবে ওকে দেখে মনে হয় ষোল বছরের তন্বী। প্রতিমার মতো মুখে টানাটানা চোখ যা দেখলেই দেবীর মুখের আদল মনে করিয়ে দেয়। ওর দাদি সবসময় বলতো প্রতিমামুখী মেয়েরা দুঃখী হয়, সুখী হয়না কখনও। রোহিনী কখনও একথা বিশ্বাস করেনি। নিজের মনে হয়েছে, দাদীকে বলেছে “এ কুসংস্কার দাদী, এ আমি মানি না।” আজ এই কুসংস্কার মানতে তৈরি হয়ে উঠেছে রোহিনী। তাছাড়া আরও মনে হচ্ছে, ওর রোহিনী নামটার মধ্যেই কেমন যেন একটা দুঃখ-দুঃখ ভাব প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে আছে!
রোহিনী বি.এ পাশ। পরিবার-পরিকল্পনার মাঠকর্মী। বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ছাড়াও গর্ভবতীসহ অন্যান্যদের স্বাস্থ্য এবং কালব্যাধি ‘এইডস’ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। এই চাকরির প্রথমাবস্থায় গ্রামের মাতব্বর আর ইমাম সাহেবের রোষানলে পড়েছিল রোহিনী। তখন ইমাম সাহেব ফতোয়া দিয়েছিল ১০১ দোররা। হেডমাস্টার সাহেবই বাঁচিয়েছিলেন; তখনও বিয়ে হয়নি ওদের। এতোদিন স্বামী ছিল পাশে, আজ নেই। একেবারে একা হয়ে গেল। ওর স্বামীই ছিল শক্তি, স্বামীই ছিল সাহস, বল-ভরসা, ওর স্বাধীনতা। এখন কী করবে রোহিনী, বড়ো একা হয়ে গেল। ওর পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই, কেউ রইলো না।
মৃত স্বামীর বুকের ওপর কাঁদছে রোহিনী। একমাথা ঘন চুল খোপা খুলে ছড়িয়ে পড়েছে ওর স্বামীর চোখে মুখে চারপাশে! রোহিনীর কান্নায় সকলের চোখেই জল। গ্রামের সকলেই আসছে যাচ্ছে। এই পৃথিবীতে মানুষ তিনবার মানুষকে দেখতে আসে। জন্ম, মৃত্যু আর বিয়ের সময়। মৃত্যু মানুষের অন্তিম বা শেষ কাজ। এই সময় শত্রু-মিত্র, আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলেই আসে।
গ্রামের মানুষের সঙ্গে মসজিদের ইমাম সাহেব আর মাতব্বরও এসেছে। রোহিনীর ওভাবে কান্না ইমাম সাহেবের ভালো লাগে না। রোহিনীর দেবর, সুমনকে ডেকে বলে ইমাম সাহেব, সুমন ওকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বলো। লাশের ওপর কাঁদতে নেই। তাছাড়া মারা যাওয়ার পর স্বামী বেগানা পুরুষ হয়ে যায়। কথাটা রোহিনীর কানে যেতেই রোহিনী উঠে আস্তে আস্তে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। দোতলায় ওঠার সিড়িতে পা রেখে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করে, ইমাম সাহেব, এতদিন যে মানুষটা একই ঘরে, একই ছাদের তলে নিত্য সঙ্গী ছিল, সে কেন মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বেগানা পুরুষ হয়ে যাবে? রোহিনীর প্রশ্নের জবাব দেয় না ইমাম সাহেব। এবারে রোহিনী বলে, জবাব দিন ইমাম সাহেব।
ইমাম সাহেব এবারে খুব রেগে যায়। পরিবার পরিকল্পনাতে চাকরি করে বলে এমনিতেই রোহিনীর ওপরে তাঁর রাগ; অনেক কিছু করার ইচ্ছা ছিল। তাঁর কাজের সায় ছিল মাতব্বরেও কিন’ গ্রামের লোকজনের জন্য পারেনি; পারেনি এই হেড-মাস্টারের জন্য। তা না হলে মাগীর বাড় শেষ করে দিতো এতোদিনে! গ্রাম ছাড়া করে তবেই বিশ্রাম নিতো। মনে মনে ইমাম সাহেব বলে, আজ মাস্টার তুমি কোথায়? দেখে নেবো একহাত! ইমাম আর মাতব্বর ফিসফিস করে পাশের লাঠিয়ালদের ইশারা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে য়ায়।
জনাদশেক লোক নিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফিরে আসে তাঁরা। ঐ লোকগুলো চিৎকার করে, ঐ মাইয়া মানুষের বিচার না হইলে ওর স্বামীর জানাজা হইবে না! ইমাম আর মাতব্বরের চোখে-মনে প্রতিশাধের আগুন ধিকিধিকি জ্বলে। ওরা ভাবে, এই তো সময়! ওদের চোখে ১০১ টা দোররা মারার দৃশ্য ভেসে ওঠে। আহা কী দারুণ দৃশ্য! এই দৃশ্য দেখার সুযোগ তো হাতছাড়া যায় না! ওদের মনে লোভ ঝিকিয়ে ওঠে আর চোখে ভেসে ওঠে নিপীড়িত নারীর নগ্ন ছবি! মাতব্বর আর ইমাম ফিসফিস করে। দুজনের চোখে-মুখে ক্রুর হাসি। তাঁরা সুমনকে ডাকে। বাবা, সুমন এদিকে এসো।
সুমন একটু ভীতু প্রকৃতির মানুষ। লেখাপড়া কিছুই করেনি। ছোটো একটা মুদিখানার দোকান চালিয়ে বউ মেয়ে নিয়ে কোনরকমে দিনাতিপাত করে। পৈতৃক বাড়ি ওদের। এই বাড়িরই নিচতলাতে থাকে সুমন। মাতব্বর আর ইমামকে ভয় করেই চলে। ইমামের ডাকে বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আসে। কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ইমাম। তারপর বলে, তোমার ভাবীর বিচার না হওয়া পর্যন্ত তোমার ভাইয়ের জানাজা হবে না! আমরা পরহেজগার মানুষ বাবা, বেপথে তো চলতে পারি না। তাই এই বিচার। খালি আমাদের দেশে নয় বাবা, এই রকম বিচার হিল্লি-দিল্লি-কলকাতায়ও হয় শুনেছি। কাগজে পড়োনি! সতীত্ব পরীক্ষা দিতে গরম লোহা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে!
এই সব কথা শুনে বুকের ভেতর শুকিয়ে যায় সুমনের। ভয়ে ভয়ে উচ্চারণ করে, ভাবীর কেন বিচার হবে?
তোমার ভাবী বেপর্দা চলাফেরা করে, বেগানা পুরুষের সাথে কথা কয়! তারপর এই গাঁয়ের মাইয়াগুলানরে খারাপ বানাইতেছে, বি-পথে নিতাছে। আরও শুনবার চাও?
সুমন কথা বলে না। কী বলবে ভেবে পায় না। একদিকে ভাবী অন্যদিকে মৃত ভাইয়ের লঅশ। কোনদিকে যাবে। প্রতিবাদ করবে? কিন’ প্রতিবাদ করে তো এই গ্রামে থাকতে পারবে না। তাছাড়া প্রতিবাদের ভাষাও জানা নেই ওর! জীবনে কখনও কোনো প্রতিবাদ করেনি। ছোটোবেলাতে সঙ্গী-সাথিরা মারলে শুধুই কেঁদেছে, কিছু বলতে পারেনি। কথার পিঠে কথা আসে না ওর। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সুমনকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসে স্কুলের নতুন মাস্টার কাসেম আলী। ইমাম সাহেব আর মাতব্বরের দিকে তাকিয়ে বলে, কতো আর রাজনীতি করবেন এই গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত মানুষদের নিয়ে? ছি: ছি:! মৃত মানুষ নিয়েও আপনাদের রাজনীতি! ছি:!
দেখ মাস্টার, মাতব্বর কথা বলে ওঠে জোর কন্ঠে। মাস্টার কথা বলো না। চাকরির কথা চিন্তা করো।
হেসে ওঠে মাস্টার। চাকরির ভয় দেখাবেন না আমাকে। অন্যায় আমি সহ্য করি না। যা করবেন ভেবেচিন্তে করবেন।
বড়ো বাড় বেড়েছে তোমার মাস্টার! মাতব্বর চোখ রাঙিয়ে বলে ওঠে।
মাতব্বরের কথায় কান না দিয়ে গ্রামের মানুষের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, গাঁয়ের মানুষ রুখে দাঁড়াও। তোমাদের প্রিয় আপা, প্রিয় মাস্টারের কোনো দোষ নেই, আর যদি দোষ না-ই থাকবে তবে কিসের বিচার, কিসের শাস্তি? মাস্টারের কথা শুনেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে গ্রামের মানুষ। এ ওর মুখে, ও তার মুখের দিকে তাকায়। তারপর একবার দেখে ইমাম সাহেবকে, একবার দেখে মাতব্বরকে।
নতুন মাস্টার আবারও বলে, তোমাদের আপা, তোমাদের মাস্টারের কোনো দোষ নাই। আর দোষ নাই তো বিচার কিসের? কিসের বিচার? কিসের? বারবার বলতে থাকে নতুন মাস্টার। এবারে গ্রামের মানুষ হৈ হৈ করে ওঠে। ছুটে যায় ইমাাম সাহেব আর মাতব্বরের দিকে। হাতে তুলে নেয় পাঁজা করে রাখা ইটের সুরকি। অবস্থা বেগতিক দেখে পালিয়ে যায় ইমাম আর মাতব্বর; পেছনে তাঁদের লাঠিয়াল বাহিনী।
নতুন মাস্টার জানাজা পড়ায় লাশের।
#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি
