আজ বিয়ে বার্ষিকী। তিন বছর আগের এই দিনটিতে লাল বেনারসী কঙ্কন কেয়ুরে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল ওকে। বান্ধবীরা বারবার বলেছিল তা। সাজসজ্জা শেষে প্রমাণ সাইজ আয়নার সম্মুখে এনে দাঁড় করিয়েছিল বান্ধবীরা। ও দেখছিল নিজেকে নিজে। দেখার সাধ ফুরচ্ছিল না যেন ওর। দেখতে দেখতে নিজেই নিজের প্রেমে পড়ছিল সেদিন লোপা।
আর সুহৃদ! সুহৃদের কথা মনে হতেই বুকের ভিতরে একটা কান্না ঠেলে গলার কাছে উঠে আসে। চোখে অশ্রুর ভেতর ঘৃণার আগুন দপ করে জ্বলে ওঠে। সুহৃদ ওর ভালোবাসা, ওর ঘৃণা। আজকের দিন সুখের দিন। আজকের দিনে ওর জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার দিনগুলি ভাবতে চায় না। ভাবতে না চাইলেও তো মানুষের ভাবনা আসে। লোপারও এলো। বাসর রাতে ফুলে ফুলে সাজানো বিছানা। ফুলের গন্ধের সঙ্গে কসমেটিক্সের গন্ধের অদ্ভুত মিশেল ওকে বিবশ করে তুলছিল বারবার। বিহ্বল বিবশ অপ্সরী লোপা বসেছিল প্রিয় মুহুর্তের জন্য। সুহৃদ এল খাটের পাশে, এসেই দাঁড়িয়ে গেল। পলকহীন ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে দেখে লোপা লাজনম্রভাবে বলেছিল। ‘কী হলো, বসবেন না।’ ‘ হ্যাঁ বসছি।’ চমকে ওঠে সুহৃদ।
বিয়ের আগের ওদের কোন পরিচয় ছিল না। লোপার অন্য কারো সাথে মন দেয়া-নেয়ার সম্পর্কও ছিল না। চিরদিন লেখা পড়ায় ব্যস্ত। পড়াশোনাই ওর ধ্যান জ্ঞান। ওর এম.এ পরীক্ষার পর বিয়ে ঠিক হয়। রেজাল্ট বের না হওয়া পর্যন্ত ও বিয়েতে রাজি ছিল না। শ্বশুড় বাড়ী থেকে পড়ানোর আশ্বাস পেয়েই লোপা বিয়েতে রাজি হয়ে ছিল। লোপার রেজাল্ট খারাপ হয়নি। কখনও। এম.এ তে ফাস্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। লোপা ভাবে সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েও জীবন পরীক্ষায় কেন ফেল করলো। এর উত্তর আজও পায়নি।
ওদের সেপারেশন আজ এক বছর। ছেলেমেয়ে হয়নি। ছেলেমেয়ে না হওয়াতে ওর একধরনের স্বস্তি আছে। ছেলেমেয়ে থাকলে ছেলেমেয়ের দাবি নিয়ে হয় লড়াই করতে হতো না হয় আপোষ। এতে ছুটতে হতো ঢের, করতে হতো আইন আদালত কতো কি? তার চেয়ে এই ভালো। দেশের আইন তো পুরুষের পক্ষে। কাগজে কলমে পাস হয়ে আছে নারীর জন্য অনেক আইন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে খুবই কম কার্যকর হচ্ছে তা।
ছেলেমেয়ের জন্য দুঃখ একটু সুক্ষ্ম কাঁটার মত বিঁধে থাকলেও একটা স্বস্তি আছে। বেশ তো চলে যাচ্ছে শিক্ষকতা করে। পুটির মাকে নিয়ে ওরা সংসারে দুইজন মানুষ কতো আর প্রয়োজন। তবুও মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গ বোধ করে লোপা। যদি একটা সন্তান থাকতো। ওর অবসর মুহূর্তগুলো ভরিয়ে দিতো ছোট ছোট দুষ্টুমিতে। ওকে আধা আধো কণ্ঠে ডাকতো। ছোটো ছোটো হাতে ওর মুখে চোখে হাত বোলাত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোপা। ভাবে, যা ভাবছে তা তো কখনও হবার নয়। ‘ আম্মা।’ পুটির মার ডাকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। কথা বলে না। পুটির মা জানে লোপার এখন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। তাই বলে, ‘একটা লোক দেখা করতে চায় আম্মা।’ ‘ বল, দেখা হবে না।’ ‘ আইচ্ছা।’ একটু পর পুটির মা ঘুরে এসে বলে, ‘ লোকটা যায় না আম্মা, খুব নাকি দরকার।’ ‘ যা বসতে দে।’
আজ লোপা স্কুলে যায়নি। বুকের ব্যাথাটা বেড়েছে। সারাদিন শুয়ে ছিল। কুচকে যাওয়া কাপড় ছাড়তে ইচ্ছে করে না। কোন রকমে টেনেটুনে বসার ঘরের দিকে যায়। ঘরের দরোজায় পা দিয়ে চমকে ওঠে লোপা, অজান্তেই কন্ঠস্বর তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। ‘কে?’ ‘ আমি, চিনতে পারছ না?’ চিনতে না পারার কথা তো নয় সুহৃদ। তিন অক্ষরের একটা যন্ত্রণার নাম।‘ হ্যাঁ, চিনতে পারবো না কেন?’ নিজেকে সামলে নেয় লোপা। ‘ কি মনে করে এলে?’ ‘কিছু না এমনি। কেমন আছ তাই দেখতে।’ কন্ঠস্বরে সুহৃদের ব্যঙ্গ ঝরে। ‘ ভালো আছি, ভালো।’ লোপা স্বর তীক্ষ্ণ করে। ‘ আহা রাগ করছ কেন। আজ বিয়ের দিন তাই দেখতে এলাম।’ ‘বিয়ের দিন। তোমার মনে পড়ে।’ কষ্টে মলিন হাসে লোপা। তারপর বলে, ‘কি লাভ বলো। আর তোমার মনে করাতে আমার কি-ই বা আসে যায়।’ ‘লোপা আমাকে ভুল বুঝো না।’ ‘দেখ সুহৃদ ভুল বোঝাবুঝির পালা তো সেই কবেই শেষ। সেই বিয়ের দিন থেকে বলে আসছো ঐ একই কথা। ঐ একটানা এক ঘেয়ে ভাঙ্গা রেকর্ড কতো আর ভালো লাগে।’ আলোয় আলোয় ভরা, ফুলের গন্ধে মৌ মৌ বাসর ঘরের কথা মনে পড়ে লোপার।
অপরূপার রূপে মদির চাহনির কথা মনে পড়ে। সেই রাতের প্রথম ক্ষণে সুহৃদের ভালবাসায় নিজেকে সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়েছিল। তার তখন রানী এলিজাবেথের থেকে বড়ো রানী মনে হয়ে ছিল নিজেকে। কিন্তু তারপর। তাঁর ভালবাসা সুখপাখির বাসার মতো ভেঙে পড়ছিল প্রচন্ড ঝড়ে। সুখের আবেশে বিহ্বল লোপা। উথাল পাথাল সমুদ্রের সৌন্দর্যের ছোঁয়ায় বিবশ হৃদয় তখনও আনন্দে ভরপুর প্রথম বৃষ্টির ছোঁয়ায় সজীব গাছের মত। ঠিক সেই সময় প্রচন্ড আঘাত। ও চমকে ওঠে। কি হয়েছে, বুঝতে সময় লাগে। সুহৃদ ওকে চড় মেরেছে। বিস্ময়ে হতবাক লোপা কাঁদতেও ভুলে যায়। ওদের ভিতর আর কথা হয় না। পরদিন সকালে সুহৃদ বলে, ‘আমাকে মাফ করে দাও। আমি বোধ করি অসুস্থ।’
প্রথম দিকে লোপাও ভেবেছিল অসুস্থ। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে কিন্তু কোন ফল হয়নি। দিন দিন অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। বিয়ের ছয় মাস পর শুনেছে সুহৃদের আর একটা বিয়ে হয়েছিল। ভালবাসার বিয়ে। কিন্তু সে বউ দুই মাস পর বাপের বাড়ী চলে যায় আর ফিরে আসেনি। সুহৃদকে জিজ্ঞাসা করেছিল লোপা। একথাটা গোপন করার কারণ কি? সুহৃদের জবাব শুনে লোপা হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায়নি। ওর মতে ছেলেদের, ওরকম বিয়ে হয়েই থাকে। একটা বউ চলে গেছে বলে কি আর একটা বিয়ে করতে পারবে না। লোপা আর ভাবতে পারে না। ‘ তুমি চলে যাও সুহৃদ। প্লিজ। আমি খুব অসুস্থ।’‘অসুস্থ না কারো আসার কথা।’ সুহৃদের কথা শুনে লোপা বিস্ময়ে অবাক হয়ে তাকায় ওর দিকে। এই এক বছরেও কোন পরিবর্তন হয়নি ওর। সেই রকম নোংরাই রয়ে গেছে। ওর বুকের ব্যাথা বাড়ে। চিৎকার করে ওঠে ও। ‘ চলে যাও। চলে যাও।’ ওর চিৎকারে পুটির মা ছুটে আসে ওষুধ দেয়। সাতদিন বিছানায় কাটে। স্কুলে ছুটির দরখাস্ত পাঠায় ডাক্তারের নির্দেশে। বিকালে চা খেয়ে গান শুনছে। কিরণ চন্দ্রের গান। “তোমার পীরিতি ভাবিতে ভাবিতে বিভোরও হইয়াছি। সুন্দরী আমারে কহিছ কি?” ওর খুব প্রিয় গান। তাছাড়া খুব দরদ দিয়ে কিরণ চন্দ্র গেয়েছেন।
‘আম্মা, সেদিনের সেই ভদ্রলোক।’ ‘বল, আমি অসুস্থ, দেখা করতে পারব না।’ ‘তোমাকে দেখা করতে হবে না আমি নিজেই এসেছি।’ ‘কেন এসেছ।’ চিৎকার করে লোপা।
‘আম্মা, রাগ কইরেন না। আফনের শরীরডা আবার খারাপ হইয়া যাইব।’ এরপর সুহৃদের দিকে ফিরে বলে, ‘আমার আম্মার শরীর ভাল না। আপনে যান ছেন ।’ ‘ কি কস্। যতো বড়ো মুখ না ততো বড়ো কথা। চুপ কর, হারামজাদী, মাগী।’ পুটির মার মুখের কাছে এসে পিস্তল দেখায় বলে, ‘দেখছিস এটা কি?’ পুটির মা নাক টিপে ধরে। ভয়ে সরে যায় দূরে। ‘তুমি মদ খাও।’ লোপা বলে। ‘ হ্যাঁ খাই। তোর পয়সায় খাই না।’ ‘দেখ আমার পয়সায় খাও বা না খাও, মদ তো খাও। মদ খাওয়া অন্যায়।’ ‘জ্ঞান দিস তা শয়তানী।’ ‘দেখ এটা ফ্ল্যাট বাড়ী। এতো অসভ্যের মত কথা বলো না, আর চেঁচিয়ো না।’ ‘ কি আমি অসভ্য। তবে রে…………’ পিস্তলের গুলি ছুঁড়ে লোপাকে লক্ষ্য করে। লোপা সরে যায়। গুলি দেয়ালে লাগে। সুহৃদ সরে আসতে চায় কিন্তু টেবিলের পায়ের সঙ্গে লেগে পড়ে যায়। পিস্তল ধরা হাতটা বেকায়দায় পড়ে বুকের নীচে। গুলীর শব্দ হয়। কিন্তু গুলি বের হতে দেখে না লোপা। হতভম্ব লোপা। কি করবে ভেবে পায় না পুটির মা এতক্ষণ সব দেখছিল। ভয়ে কথা বলেনি। এতক্ষণে কথা বলে।‘এখন কী হইব আম্মা।’ ‘ আমি কিছু জানি না। থানায় ফোন করব। তারপর যা হয় পুলিশ এসে করবে। আম্মাগো, আমাগো যে বাইন্দা লইয়া যাইব। লোকজনও তো আইসা পড়বো।’ ‘লোকজন এলে আসবে। তবে এক কাজ কর। পুলিশ আসার আগেই তুই চলে যা। পুলিশ এলে তো তোকেই নিয়ে যাবে।’ ‘ না আম্মা। চলেন এখান থাইক্কা দূরে কোথাও চইলা যাই।’
পুটির মায়ের কথা শুনছে না লোপা। ওর বুকের ব্যাথা বাড়তে শুরু করেছে। পুটির মার কাছে ওষুধ চায়। কিন্তু ওষুধ দিতে দিতেই অজ্ঞান হয়ে যায় লোপা। এবারে পুটির মা ভাবে লোপার জ্ঞান ফিরলেই তো থানায় ফোন করবে। লোপাকে ধরে নিয়ে যাবে। লোপাকে নিয়ে যাবে তা কিছুতেই হবে না। কিন্তু কি করবে ভেবে পায় না। তারপর যেন হঠাৎ মনে হয় লোপাকে হাসপাতালে নিতে হবে। টাকা-পয়সা, গহনা আর প্রয়োজনীয় কিছু কাপড় নিয়ে একটা বেবী টেক্সিতে করে হাসপাতালে চলে যায়। লোকজন আসার আগেই ওরা বাসা থেকে বের হয়। তারপর লোপার জ্ঞান ফিরলে লোপাকে না জানিয়ে চট্টগ্রামের ট্রেনে উঠে পড়ে। লোপার তখন কথা বলার শক্তি নেই। ওকে কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারে না। ওর হাতেই নিজেকে ছেড়ে দিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
চট্টগ্রামের ট্রেনে আসতে রহিমুদ্দিন নামে এক লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়। ওর একটা চার বছরের মেয়ে আছে। নাম বিবি। বিবির মা নেই। ট্রেনে আবার জ্ঞান হারানোর পর রহিমুদ্দিন লোপাকে নিজের বাসায় নিয়ে এসেছিল তারপর আর কোথাও যাওয়া হয়নি লোপার। রহিমুদ্দিন ব্যবসা করেন। এলাকার নামী মানুষ। ওর কথায় ওখানকার স্কুলে একটা চাকরি জুটে গেছে। লোপা খায়-দায় চাকুরী করে কিন্তু মনের ভেতরের কাঁটাটা তুলতে পারে না। ওর বাসায় একট লাশ পড়েছিল। পুলিশকে খরব দেয়া একটা দায়িত্বছিল ওর।
প্রায় বছর কেটে গেছে। শরীর খারাপ থাকায় স্কুল থেকে একটু আগেই ফিরছিল। বিবির হাত ধরে স্কুল থেকে আসতে আসতে একটা দোকানে চোখ আটকে যায়। সুহৃদ! কিন্তু ওতো মারা গেছে। ভাল করে লক্ষ্য করে। ঐ মানুষটা যে সুহৃদ, তাতে কোন ভুল নেই। সুহৃদ তবে কি মারা যায়নি সেদিন। তাছাড়া এখানে এতদিন পর কি করছে? কেন এসছে সুহৃদ। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসে। টের পায় না সুহৃদ অনুসরণ করছে ওকে। ভীষণ ভয় পেয়েছে আজ। লোপা ভেতরে ঢুকে। কাপড়-চোপড় না ছেড়ে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে। অতীতের প্রায় মুছে যাওয়া স্মৃতিটা আবার নতুন চরের মত জেগে ওঠে। ‘কি হইছে আম্মা।’ পুটির মা জিজ্ঞেস করে। ‘ সুহৃদকে দেখলাম।’ ‘ তা তো হইতে পারে না আম্মা!’ বিশ্বাস করে না পুটির মা। ‘ সে তো মইরা গ্যাছে।’ ‘ নারে পুটির মা না। আমার ভুল হয়নি। তুই যা তো এখন। বিবিকে খাবার দে।’ পুটির মা চলে যায়। ‘ইস এখন যদি রহিমুদ্দিন থাকতো। রহিমুদ্দিন অশিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু মনটা আকাশের মত উদার। লোপার মেয়েলি বোধ বুদ্ধিতে বোঝে রহিমুদ্দিন ওকে ভালোবাসে আবার লেখাপড়া জানে দেখে শ্রদ্ধাও করে। বলে,‘ আপনের কথা ভিন্ন ,শিক্ষিত মানুষ আপনে বুদ্ধিমতি আর আমি অশিক্ষিত মূর্খ।’ লোপা সেদিন রহিমুদ্দিনের কথায় হেসে বলেছিল, ‘ কি যে বলেন। আপনি খুব ভালো মানুষ।’
লোপা অনেকক্ষণ বসে আছে। আবোল-তাবোল ভাবনায় সময়কে খেয়ে চলেছে লোপা। পুটির মা দুই তিনবার ডেকেছে কিন্তু জবাব পায়নি। লোপা যেন অবশ হয়ে আছে। দরোজায় অসহিষ্ণু হাতের টোকা। এতদিন পর হলেও লোপা বোঝে ওটা কার হাতের। দরোজায় টোকা পড়তেই থাকে। লোপা ওঠে না। ‘ আম্মা, আম্মা গো, ঐ সাহেব আইছে।’ হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলে পুটির মা বলে, ‘ব্যালকনি বারান্দা থাইকা দেখছি।’ পুঁটির মার ব্যালকনির বারান্দা শুনে আজ আর হাসতে পারে না লোপা। অন্যদিন হলে এই কথায় খুব জোরে হেসে উঠত। যদি কখনও না হাসত তাহলে পুঁটির মা ধরে নিতো ওর মন খারাপ। প্রশ্নের পর প্রশ্নের জবাব দিতে হতো। দরোজায় এবার টোকার বদলে ধাক্কা শুরু হয়।
‘ কেডা কেডা’ বলতে বলতে এগিযে যায় পুঁটির মা। ‘ ও তুমিও আছ দেখছি।’ ঘরে না ঢুকেই সুহৃদ বলে। পুটির মা কথা বলার আগেই লোপা বলে, ‘কেন এসেছ?’ ‘তোমাকে দেখতে। কেমন সুখে আছো। বাহ্, বেশতো বাড়ি।’ বলে ঘরে ঢুকতে যায়। ‘ ওখানে যাবে না ।’ ‘কেন ওটা বুঝি বেড রুম। তা মেয়েটাতো বেশ।’ ‘ তুমি চলে যাও। আমার মেয়ে ভয় পাবে।’ ‘পাবেই তো। আহা হা কচি মেয়ে।’ ‘ তুমি চলে যাও।’ এবারে রাগ করে লোপা। ‘রাগ করছো কেন? কেন যাব? তুমি আমার বিয়ে করা বউ না!’ ‘ না, আমি, তোমার বউ না।’‘ আমি তো ছাড়িনি।’ ‘তুমি ছাড়নি, আমিও না। ওটা এমনি এমনি ছেড়ে চলে গেছে। তুমি এক্ষুণি এখান থেকে চলে যাও।’ এতো কথাতেও সুহৃদ গা করে না। সোফায় বসে পড়ে। যাবার ইচ্ছা নেই। যেন নিজের বাড়ি। একটু চা-টা কর। ‘একটু সেবা টেবা। আহা গো, পতি সেবা। পতির পায়ের তলায় স্ত্রীর বেহেস্ত জান না।’ খিক খিক করে হাসে সুহৃদ। লোপার গা ঘিন ঘিন করে ওঠে সেই হাসিতে। দেখ অসৎ পতির পায়ের তলায় কখনও কোন স্ত্রীর বেহেস্ত হতে পারে না। ও হো, তাই তো, তুমি তো আবার সৎ পতি ধরেছ।’ বের হয়ে যাও। যাও বলছি।’ যাচ্ছি এখন। তবে দেখে নেব।’ সোফায় বসে থাকে লোপা। ওর এতো কেন কষ্ট, ছোট বেলায় বাব-মা অ্যাকসিডেন্টে মারা যায় তারপর মামার কাছে মানুষ। মামা ওর জন্য বিয়ে করেনি আজীবন। সেই মামা ওর কেমন আছে সেই খবরটাও জানে না। ওর আজ মামার বুকে মুখ গুঁজে খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে। সোফায় মাথা হেলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিবির ডাকে চমকে ওঠে?‘ খালামনি। কি হয়েছে তোমার। ঘর অন্ধকার কেন খালামনি?’ এমনি মা মনি। তুমি ঘুমাওনি কেন মা।’ খিদে লেগেছে। তাছাড়া তুমি এখানে……………. ’ আর কথা বলে না বিবি। ওকে তাড়াতাড়ি বুুকে টেনে নেয়। তারপর খাওয়ার ঘরে যায়। পুটির মা বসে আছে। খাবার দেয়। ওর মনে নেই বিবি ওকে ছাড়া খায় না। বিবিকে খাইয়ে দেয়। বিবির কথায় নিজেও কিছু মুখে দেয়। পুটির মাকে খেয়ে শুতে বলে। ঘরে এসে বিবি বলে, ‘খালামনি, তুমি শুয়ে পড়, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই।’
ওর কথায় হেসে ফেলে লোপা। ওর মাথায় চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। কি আমার পাক্কা বুড়িরে। তুমি ঘুমাও। সারারাত না ঘুমিয়ে ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। পুটির মার ডাকে ঘুম ভাঙে। ‘ পুলিশ আইছে আম্মা।’ ‘ পুলিশ।’ অবাক হয় লোপা। পোশাক ঠিক ঠাক করে গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বাইরের ঘরে আসে। ‘ আপনারা।’ ‘আপনার নাম ললনা সিকদার।’ মাথা নাড়ে লোপা। ‘ আপনার নামে ওয়ারেন্ট আছে। ঢাকায় একজনকে খুন করে এখানে এই রাঙামাটি শহরে লুকিয়ে আছেন।’ ‘ মিথ্যে কথা। প্রমাণ কোথায়। আর কাকে খুন করেছি।’ ‘ খুন করেছেন আপনার স্বামীকে।’ ‘ আমি খুন করিনি।’ উত্তেজিত হয় লোপা। বলে, ‘ আমার স্বামী জীবিতই আছে।’ ‘ হ্যাঁ, স্বামী আপনার জীবিতই থাকবে। স্বামী তো একটা নয়।’ ‘ ভদ্র ভাষায় কথা বলুন ইন্সপেক্টর।’ ‘ আপনি থানায় চলুন। তাহলে আমাকে আর অভদ্র হতে হবে না। আর আপনি খুন করেছেন কি করেননি তার বিচার তো করবে কোর্ট। আমরা নই।’
পুলিশ ইন্সপেক্টরের কথায় লোপা এবার একটু অনুনয়ের সুরে বলে, ‘আমি স্কুলে চাকরি করি। এখন আমি থানায় যাব। তারপর জানি আপনারাও ছেড়ে দেবেন। কারণ প্রমাণ নেই। কিন্তু আমার সম্মান কোথায় থাকবে বলুন তো? আমি কি চাকরী ফিরে পাবো, ফিরে পাব সম্মান।’ আবেগে কন্ঠ রুদ্ধ লোপার। আবেগ রুদ্ধ কন্ঠে বলে, ‘আমার মেয়েটার কথাও চিন্তা করুন।’ দেখুন, আমরা হুকুমে চাকর। আমাদের হাত পা বাঁধা।’
লোপা কখনও ভেঙ্গে পড়ার মেয়ে নয়। সুহৃদ এত ক্ষমতা রাখে জানা ছিল না। ও ভেবেছিল এখান থেকে চলে যাবে। কিন্তু বিবির জন্য সম্ভব হয়নি। রহিমুদ্দিন বাড়ি নেই। তার চেয়েও বড় কথা একটু গড়িমসি ছিল। ও ভেবেছিল সুহৃদ দুইএকদিন বিরক্ত করে চলে যাবে। সুহৃদকে under estimate করেছিল। ওকে under estimate করা ঠিক হয়নি। ‘ তা আপনার ঝি টাকে দেখছি না যে’ এদিক ওদিক চেয়ে ইন্সপেক্টর বলে। লোপা নিচে নামার আগেই পুটির মাকে পেছনের দরোজা দিয়ে পাশের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। বিবিকে দেখার জন্য ওর থাকা প্রয়োজন। ‘ আমার কোন ঝি নেই।’ ‘ তা আপনার মেয়ে।’ ‘ পড়ছে।’ ‘ চলুন।’ ‘ দেখুন আমার মেয়ে বাড়িতে একা থাকবে। ওকে দেখার জন্য কেউ নেই। ওর বাবা ব্যবসার কাজে বাইরে গেছে।’ ইন্সপেক্টর একটু ইতস্তত করে। ‘ দেখুন আমরা আইনের লোক। আপনাকে রেখেও যেতে পারছি না, আবার মানবিক কারণে আপনাকে নিতেও পারছি না। তবে আপনার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে চলুন।’ ‘ না, না।’ অনুগ্রহ করে যদি সময় দেন ওর বাবা দশটায় পৌঁছাবে। ততক্ষণ আপনারা চা নাস্তা খান।
লোপা ওঠে দাঁড়ায়। এমন সময় বিবিকে ডাকতে ডাকতে রহিমুদ্দিন ঘরে ঢোকে। পুলিশ দেখে থমকে যায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে লোপার দিকে তাকায়। ‘ উনি আর কি বলবেন। আমিই বলি।’ ইন্সপেক্টর বলে। ‘আপনি একজন গন্যমান্য ব্যক্তি। কি করে বলি। আপনার স্ত্রী, তার আগের স্বামীকে খুন করে পালিয়ে এসেছে।’ ‘ তাই বুঝি।’ রহিমুদ্দিন আদ্যোপান্ত ঘটনা জানে। ‘ও খুন করেনি।’ পুলিশকে বলে। ‘করেছে কি করেনি সেটা আমাদের বিবেচ্য নয়। আমাদের নিয়ে যেতে বলা হয়েছে নিয়ে যাব।’ ‘বেশ তো।’ লোপাকে ভেতরের ঘরে কাপড়-চোপড় পাল্টাতে পাঠিয়ে রহিমুদ্দন কিছুক্ষণ পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ভেতরে যায়। রহিমুদ্দিন ওকে আশ্বাস দেয়। ওর দুই কাঁধে হাত রাখে। ‘ ভয় নেই। আমি সব তথ্য প্রমাণ জোগাড় করে এনেছি দরকার হলে আরও আনব।’
‘ আগেই কি করে জানলেন। তুমি না জানলেও তোমার স্বামী লোকটাকে আমি এদিকে বেশ কয়েকদিন ঘোরা ফেরা করতে দেখেছিলাম। তোমাকে বলে তোমার ভয় বাড়াতে চাইনি। আর তার চরিত্র জানি বলেই……….’ লোপার এই চলে যাওয়ার মুহূর্তে রহিমুদ্দিনকে বড়ো আপন মনে হয়। রহিমুদ্দিনের এই আশ্বাসটুকু ওর খুব ভাল লাগে। ওর চোখে বিষাদ নিয়ে বুকের ভেতরে নতুন আশ্বাসের জন্ম হয়। একটু হেসে ফেলে লোপা। ‘ তাড়াতাড়ি করুন।’ পুলিশ তাড়া দেয়। লোপা নিচু হয়ে রহিমুদ্দিনকে সালাম করে। ওর মাথায় হাত রেখে রহিমুদ্দিন বলে, ‘ তুমি সব ভয় জয় করে ফিরে আসবে। ফিরে আসবেই।’ লোপা বেরিয়ে যায়। রহিমুদ্দিন চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি
