ভালোবাসা থাক প্রতিদিন // আফরোজা অদিতি

ভালোবাসা এক দুরন্ত কিশোর যে সরিষা ক্ষেতে ফড়িঙের পেছনে ছুটে চলে। কুয়াশা মোড়া আবছায়া ভোরে সমুদ্র সৈকতে পা ভিজিয়ে চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ায় যে সেই তো ভালোবাসা। ভালোবাসা, থৈথৈ রোদ্দুরে হেঁটে যাওয়া কখনও ঝুম বৃষ্টিতে ভেজা। ভালোবাসা, মনের দ্বারে ঠকঠকাঠক কাঠঠোকরা যে অনবরত নতুন শব্দ খুঁজে ফেরা। ভালোবাসা, নতুন সূর্যের অদেখা আকাশের জোছনা চোয়ানো ভোর। ভালোবাসা, ‘নিপা ভাইরাস’ এর কথা জানার পরেও খেজুরের রস খাওয়া। ভালোবাসা হলো ‘করোনাভাইরাস’ সংক্রামক জেনেও সাহয্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। ভালোবাসা ছোঁয়া-না ছোঁয়ার বাধা অতিক্রম করে ঈশ্বর প্রেমে মগ্ন হওয়া। ভালোবাসা, স্পর্শিত ভাষার স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া নতুন শব্দতরণী। ভালোবাসা, জীবনগাঙের বেহুলাভেলা। ভালোবাসা, সূর্যমুখীর হাসি আবার শিউলির কান্না। ভালোবাসা কলাবউয়ের প্রেমে উদ্বেল নীল অপরাজিতা। ভালোবাসা, কবিতা চয়নের মুহূর্তে কবি হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। ভালোবাসা, কখনো কপালের তিলক কখনো লাল টিপ। ভালোবাসা, শূন্য প্ল্যাটফর্মে একা থাকা। ভালোবাসা, মাঝ সমুদ্রে একবার ডোবা আর একবার ভেসে ওঠা। ভালোবাসা, একলা দুপুরে হঠাৎ বেজে ওঠা ছন্দ-তালের নূপুর। ভালোবাসা ছাড়া ছন্দহীন জীবন যার কোন অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। ভালোবাসা হলো জীবন-কন্দরে বাস করা সৃষ্টির উৎস। ‘ভালোবাসা’ শব্দটির অর্থ যে কথাই বুঝা যাক না কেন ভালোবাসা শুধু সংকীর্ণ শব্দের ডোরে বাঁধা কোন শব্দ নয়, হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়! ভালোবাসা ভোগ-বিলাসের নয়, ভালোবাসা শুধু ‘আমার-তোমার’ জোড়ে বাকবাকুম করা নয়; ভালোবাসা হলো অপরের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ‘আমি-তুমি’র ঊর্ধ্বে স্বার্থহীন বেঁচে থাকা।

বাংলাদেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে দিবসটি পালিত হয়; বাংলাদেশে প্রথম ‘যায় যায় দিন’ সম্পাদক, শফিক রেহমান দিবসটির সূচনা করেন। কিন’ এই দিবসটি হলো ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’। ২৬৯ সালে রোমান সাম্রাজ্যে সেন্ট ভ্যালেটাইন্টস নামে একজন পাদ্রী-চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের সঙ্গে চিকিৎসা করতেন তিনি। সে সময় রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ থাকায় ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন সম্রাট দ্বিতীয় ক্রডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। তিনি বন্দী অবস’াতেও চিকিৎসা করে সুনাম ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সম্রাট তাঁর সুনাম, তাঁর জনপ্রিয়তা সহ্য করতে না পেরে তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেন। সেই তারিখটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। পরবর্তীতে ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ১৪ ফের্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবস ঘোষণা করেন। কিন’ বিভিন্ন রাষ্ট্রে এই দিবসটিতে মানুষ ভোগ-বিলাসে মত্ত হওয়ায় ভ্যালেন্টাইন দিবসের ভাবমূর্তি প্রত্যাক্ষাত বা নষ্ট হয়। ভ্যালেন্টাইন দিবসের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার এই দিবসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও দিবসটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নিষিদ্ধ করা হয় অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরী, জার্মানিতে। সম্প্রতি ২০১৭ সালে পাকিস্তানের আদালত ভ্যালেন্টাইন দিবস নিষিদ্ধ করেছে। তবুও অনেক দেশ এটি পালন করে। বর্তমানে ‘সেন্ট’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ নামে উদ্‌যাপিত হয়। যদিও ছুটির দিন কখনও থাকে কখনও থাকে না তবুও দিবসটি আনন্দ-উল্লাসে পালিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু ‘ভালোবাসা দিবস’টিকে সংকীর্ণ অর্থে অর্থাৎ ‘আমি-তুমি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় যা ঠিক নয়।

খ্রিস্টান-জগতে পাদ্রী ও সাধুসন্তদের স্মরণ করার জন্য অনেক দিবস পালিত হয়। যেমন ১৭ মার্চ – সেন্ট প্যাট্রিক ডে, ২৩ এপ্রিল – সেন্ট জর্জ ডে, ২৪ আগস্ট – বার্থেলোমিজম ডে, ১১ নভেম্বর – সেন্ট মার্টিন ডে, ১৯ নভেম্বর – আল সেইন্টম ডে, ৩০ নভেম্বর – সেন্ট এন্ডরু ডে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভিন্ন নামের উৎসব পালিত হয় তেমনি বাংলাদেশেও পালিত হয়। বাংলাদেশে ১ ফাল্গুন, বসন্ত উৎসব, ১ বৈশাখ, বৈশাখি উৎসব, সাকরাইন অর্থাৎ পৌষ-সংক্রান্তি পালিত হয়, ঘুড়ি উৎসব হয়। শিশুদিবস, কন্যাদিবস, নারীদিবস পরিবেশ দিবস, নদী দিবসসহ নানান দিবস পালিত হয় সেই সঙ্গে ভালোবাসা দিবসও পালিত হয়ে আসছে। দিবস পালিত হতে পারে, আনন্দ উৎসবও হতেই পারে কিন’ দিবস বা আনন্দ-উৎসব যাই হোক না কেন তা সংকীর্ণ অর্থে পালিত হোক এবং ভোগ-বিলাসের সাগরে নিমজ্জিত হোক এমন কখনও কাম্য হতে পারে না। বর্তমান এই ঘোড়দৌড়ের জীবনে আনন্দ-সময় খুব কম; জীবনের আয়ুষ্কালও নির্দিষ্ট; এর মাঝে যদি একদিন নির্মল আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় তবে মন্দ কি? কিন’ তা হয় না! অন্যরকম দেখা যায়! যেমন ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের মাসব্যাপী ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ চলে। ঐ দিন সবসময় ছুটির দিন থাকে না তবুও দেখা যায় ঐদিন মেলার মাঠে তিলধারণের জায়গা নেই। কিন’ যত ভীড় তত বই পাঠকের হাতে দেখা যায় না; অথচ বই মনের খোরাক জোগায়, বই জীবনকে ভালোবাসতে শেখায়। অনেকের মতে ‘ভালোবাসা দিবসটি’ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলে আসছে। কার্ড বিক্রি হয়, ফুল বিক্রি হয়; ব্যবসায় উন্নতি এক হিসেবে ভালো ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’! কিন্তু ভালোবাসা যদি কুক্ষিগত থাকে তবে তো বিড়ম্বনা! মানুষ পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন নিয়ে বাস করে। সংসার বা পরিবার স্বামী-স্ত্রীর; ভালোবাসা না থাকলে সংসার চলে না। ভেঙে যায়। কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে ভালোবাসা সেই ভালোবাসার আয়ুষ্কাল মাত্র তিনবছর (নিজস্ব মত)। এরপর যা থাকে সেটা ভালোবাসার অভ্যাস। বছর তিনেক পরে মনে হয় সবকথা বলা হয়ে গেছে, কিংবা মনে হয় কথা না বললেও চলে অথবা মনে হয় হলেও চলে আবার না হলেও কিছু আসে-যায় না কারণ সে তো আমারই! আর ‘আর সে তো আমারই’ এই ভাবনায় ভালোবাসা মরে যেতে থাকে। ভালোবাসা মরে গেলে সংসার টিকিয়ে রাখা যায় না। কিন’ সন্তানের প্রয়োজনে সংসার টিকিয়ে রাখতে সমঝোতার অন্তরালে ভালোবাসার প্রয়োজন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা না থাকলে সন্তানকে ভালোবেসে বড়ো করে তোলা সম্ভব হয় না কারণ সন্তানের কাছে বাবা-মা উভয়ের প্রয়োজন। ছোট্ট যে সন্তানটি পরিবারের মধ্যে বেড়ে ওঠে সে হলো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। তাঁকে সুযোগ্য করে তুলতে পরিবারের মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন খুব জরুরি। পরিবার থেকেই প্রাথমিক শিক্ষার শুরু সেখানে ভালোবাসা-সহমর্মিতা যদি না থাকে তবে সেও ভালোবাসাহীন বড়ো হয়ে উঠবে। ভালোবাসার মাঝে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন। কেউ একজন দিবসটি পালনের সূচনা করতেই পারে তাই বলে যে সেই জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিবসটির অমর্যাদা করতে হবে তা নয়; অন্তর্নিহিত ভাবধারায় নিজেকে স্নাত করতে হবে। আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে-আমাদের সন্তানদের জন্য ভোগ-বিলাসহীন ভালোবাসার খুব প্রয়োজন। তাই ভালোবাসা একটি দিনের ভোগ-বিলাসের দিবস নয় ভালোবাসা দিবস হোক প্রতিদিনের।

#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615