ফতোয়া এবং নারী // আফরোজা অদিতি

তৃতীয় বিশ্বের এ উন্নয়নশীল স্বাধীন বাংলাদেশে আজও পুরুষের তুলনায় নারী অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত। নিরক্ষরও বেশি। কারণ পুুরুষ-শাসিত সমাজব্যবসস্থায় অভিভাবকরা কন্যা সন্তানের চেয়ে পুত্র সন্তানের লেখাপড়ায় জোর দেয় বেশি। কেননা বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতাকে পুত্রের আশ্রয়েই থাকতে হয়। মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে চাকরি দিলেও বিয়ের পর তাকে অন্যগৃহে যেতে হয় এবং স্বামীর প্রভুত্বের কারণে সে আর পিতা-মাতাকে সাহায্য করতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস’ায় লৈঙ্গিক বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও চলিষ্ণু জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে আসার সাথে সাথে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক পরিবারের পুরুষ ব্যক্তিটির তিরোধানের জন্যে নারীকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে প্রয়োজনের তাগিদে। কিন’ দুঃখের বিষয় নারী যতই ঘরের বাইরে আসছে ততই তাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে যেখানে নারীশিক্ষা, নারী অধিকার সংরক্ষণের জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে সেখানে আমাদের দেশে ধর্মের নামে ফতোয়া দিয়ে নারীদের ওপর চলছে অবিচার। নারীকে অন্দরে বন্দি আর বোরকার অন্তরালে রাখার প্রয়াস চালানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সহজ সরল তার ওপর অশিক্ষিত এবং ধর্মপ্রাণ। অশিক্ষিত মানুষকে ধর্মীয় অনুশাসনে খুব তাড়াতাড়ি বাঁধা যায়। এই ধর্মপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করেই ফতোয়াবাজদের চরম দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। আর এই দৌরাত্ম্যের শিকার আমাদের অশিক্ষিত নারী-সমাজ। সিলেটে নূরজাহান মামলার রায়ে ফতোয়াবাজ মওলানাদের শাস্তি হয়েছে সত্যি কিন্তু ফতোয়াবাজদের শিকার হয়েছে সাতক্ষীরার ফিরোজা, কদবানু, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দুলারী, ফেনীর ফরহাদ নগরের রোকেয়া, মিনারা, নূরুন্নাহার, নারায়নগঞ্জের মাহিনাসহ আরো অনেকে। বগুড়ার আনিছা ‘ব্র্যাক’-এ কাজ করে বলে তার মৃত ছেলের জানাজা পড়ানো হয়নি। এই স্বাধীন দেশে নারী সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নতি বন্ধের লক্ষ্যে এক শ্রেণির পুরুষের লাম্পট্য এবং তাদেরই ছত্রছায়ায় বসবাসরত মুফতি নামধারী দুর্বৃত্তের দেয়া শাস্তিতে প্রাণ হারাতে হচ্ছে এবং চরম অবমাননার অন্ধকারে ডুবে যেতে হচ্ছে নারীকে। অথচ নারীই জীবনের প্রবহমান ধারাকে বজায় রেখে তাকে পরিমার্জিত করতে সাহায্য করে। ইসলামে নারীকে কখনোই হেয় করে দেখানো হয়নি বরঞ্চ সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে এই নারী সমাজকে। ধর্মের ভাষায় বলা যায়, সমস্ত মানবজাতির অর্থাৎ পুরুষকুলের সমস্ত সৎকার্য, সৎচিন্তা নারীর পায়ের তলায় নিবেদিত অথচ কিছু দুর্বৃত্ত ‘মাওলানা’ নামধারী মানুষ বিভিন্ন প্রকার বানোয়াট ফতোয়া দিচ্ছে, নারীকে অত্যাচার নিপীড়ন, নির্যাতন করছে। অথচ ধর্মের বিধান মোতাবেক কোনো ‘মুফতি’ সমাজে কোনো জটিলতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এমন ফতোয়া দিতে পারে না অথচ তাদের দেয়া ফতোয়ার কারণে নারী নির্যাতনের অভিনব কৌশল প্রতিদিন দেখতে হচ্ছে কাগজের পাতায়, যা জনপ্রিয় লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাসের হুরমতির উপর করা অত্যাচারকেও হার মানায়। উপন্যাসের নায়িকা হুরমতি যেমন শত অত্যাচারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল তেমনি আমাদের নারী সমাজকেও আজ অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, আত্মসচেতন হতে হবে তাঁদের। সমাজ সম্পর্কে ভাবতে হবে, বুঝতে হবে কোন্‌ কাজের কী প্রতিক্রিয়া তা কাজ করার আগেই ভাবতে হবে। আমাদের নারীরা সহজ সরল বলে অতি সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত এবং ‘ব্যবহৃত’ হয়। এই ‘ব্যবহৃত’ যাতে না হতে হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্যে যথোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এই শিক্ষা শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষা হলেই চলবে না-এ হবে সেই শিক্ষা যা একজন নারী তার জীবন এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থায় প্রয়োগ করতে পারে। নারী সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নতি এবং পূর্ণ অধিকার সংরক্ষণের জন্যে নারীর পাশাপাশি পুরুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, সর্বোপরি প্রয়োজন দেশের সরকারের, তা না হলে দেশ জনগণের একথা মিথ্যা হবে। অবিলম্বে এ মিথ্যাচার বন্ধ হওয়া উচিত। কারণ নারীও দেশের জনগণের অংশ।
৪ মে ৯৪

#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615