সকালের খাবার, রুটি আর ডিম সঙ্গে অল্প একটু মিষ্টি নিয়ে ডাইনিং-এ বসেছেন মীরা দত্ত। মীরা দত্তের সকালে একটু মিষ্টি না হলে দিনটা কেমন ম্যারাম্যারা লাগে! তাঁর স্বামী না করেন না, বলেন একটু-আধটু মিষ্টি না খেলে ব্রেনের কর্মক্ষমতা কমে যায়। খাবে কিন’ বেশি না। মীরা বেশি মিষ্টি নেয় না, অল্প পরিমানেই নেয়, তবুও নেয়! স্বামী, তাঁর নাস্তার প্লেটটি নিয়ে ড্রইংরূমে বসেছেন; টেলিভিশন দেখতে দেখতে সকালের খাওয়া সেরে নেন তিনি। করোনাভাইরাস শুরুর পর থেকে একটি দিনও একত্রে ডাইনিং-এ বসেননি দুজনে! মীরা দত্ত কিছু বলেন না, বলতে ইচ্ছে করলেও বলেন না! কয়েকদিন ধরেই মন ভালো নেই মীরার! আজ একটা বিশ্রি-খারাপ স্বপ্ন দেখেছেন! স্বপ্ন সত্যি হয় না জানেন তবুও মনের ভেতর ‘কু’ ডাকছে, আনচান করছে ভেতরটা! কেন এমন লাগছে বুঝতে পারছেন না! স্বপ্নের কথা ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন কিন’ পারছেন না! তাছাড়া রান্নাঘরের বারান্দায় বিদঘুটে স্বরে কাক ডাকছে; কাকের ডাকটা অন্যরকম লাগছে! কেমন যেন মনে হচ্ছে ‘খা-খা-খা !’ তিনি কাকের ডাক আর রাতের স্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে রুটি ছিঁড়ে মুখের ভেতর দিয়েছেন; রুটিতে কামড় দিতেই জিভের ওপর শক্ত একটা পাথরের মতো কিছু লাগলো মনে হলো তাঁর! রুটির মধ্যে এত বড়ো পাথর আসার কথা নয়! মুখের খাবার ফেলার আগে মুখের মধ্যে আঙুল দিয়ে পাথরটি বের করে চোখের সামনে ধরলেন ; বুঝতে চেষ্টা করলেন এটি কি সাধারণ পাথর না অন্য কিছু, বুঝতে পারলেন না! সেই ছোটবেলা থেকেই চোখের অসুবিধা; চশমা ছাড়া পরিষ্কার দেখতে পান না তিনি। ডাইনিং-এ বসার পূর্বে চশমা আনতে ভুলে গেছেন; প্রতিদিন হাতে নিয়ে বসেন খবরের কাগজ পড়ার জন্য, আজ ভুলে গেলেন কেন তাই চিন্তা করতে করতে ঘরে এসে চশমা দিয়ে দেখলেন পাথরটি। আশ্চর্য হলেন নিজেই; ওমা এযে তাঁর বাঁধানো পাথরদাঁত! তিনি আশ্চর্য হলেন নিজেই, বাঁধানো দাঁতের কথা ভুলে গেলেন কী করে! দাঁত যে ভেঙে যেতে পারে সেটা তাঁর ধারণার অতীত! বাঁধানো দাঁত ভাঙতেই পারে; কিন’ তিনি কখনও ভাবতেই পারেননি যে ভেঙে যেতে পারে ঐ
পাথরদাঁত! তিনি তাঁর বাঁধানো দাঁত হাতে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলেন।
এবং ভাবলেন, করোনার এই সময়ে দাঁত ভেঙে পড়ে গেল! তিনি দাঁতের সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করলেন, ‘কিরে, তোর কি এখনই খুলে পড়ে যেতে হলো ! তুই কি জানিস, এখন এই করোনাকালে ডাক্তার পাওয়া যেমন ঝামেলা তেমনই ভয়েরও তো ব্যাপার! দাঁত দেখাতে গেলেই তো ওদের চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করতে হবে! কতজন ব্যবহার করেছে কে জানে! আর এই কোভিড-অতিমারির সময়ে তোর এই মতি হলো? কেন রে?’ পাথরদাঁতটি হাতে নিয়ে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখছেন আর কথা বলছেন তিনি। দাঁতের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁর মনে হঠাৎ জেগে উঠল ছোটবেলার একটি সংস্কার! যা সবসময় মা বলতেন; তাঁর মায়ের মতো তাঁরও মনে হলো ‘কোথাও কোন অঘটন ঘটছে না তো! না হলে হঠাৎ কেন খুলে যাবে দাঁত!’ কয়েকদিন থেকে মীরার সদাপ্রফুল্ল মন বিষাদমাখা হয়ে আছে! কেন তা বুঝতে পারছেন না। ঘটন-অঘটন নিয়ে চিন্তিত হলেন তিনি! আর এতোটাই চিন্তিত হলেন যে মুখে তুলতে পারলেন না সকালের খাবার। অথচ তাঁর ডাইবেটিস আছে, ইনসুলিন নিয়েছেন; ঠিকঠাক না খেলে খুবই অসুবিধা হতে পারে।
ড্রইংরূমে মীরার স্বামী, চপল দত্ত চায়ের কাপ হাতে টেলিভিশনে খবর দেখছিলেন; দূর্যোগ- দুঃসময়ে কোথায় কী ঘটছে না দেখলে ভালো লাগে না তাঁর। বর্তমান এই ‘কোভিড-১৯’ সময়ে যদি পারতেন তাহলে সারাক্ষণ টেলিভিশনই দেখতেন তিনি। করোনা শুরুর প্রথম থেকেই খবর দেখছেন তিনি; না দেখলে খুঁতখুঁত করে মন! সেই যখন প্রথম করোনা ছড়িয়েছে চীনে, সেখান থেকেই ছড়িয়েছে অনেক রাষ্ট্রে; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিলসহ প্রায় ২০০ এর অধিক রাষ্ট্র-অঞ্চলে, এগুলো দেখতে দেখতে প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছে তাঁর! তিনি মনে করেন খবর দেখলে বিশ্বের অনেক খবর জানা যায়। গতবছরের শুরুতে বিশ্ব স্বাস’্য সংস’া (হু) অতিমারি ঘোষণা দেওয়ার পর দেশে লকডাউন ঘোষণা হয়েছিল; অনেক দেশ করোনার জন্য লকডাউন ঘোষণা করেছিল; কোথাও উঠিয়েছে কোথাও উঠিয়ে নেয়নি। কেউ মেনেছে, কেউ মানেনি। ক্ষোভ-বিক্ষোভ লেগেই আছে। অতিমারির শুরুতে কয়েকদিন বাসা থেকে অফিস করতে হয়েছিল। তখন খুব ভালো ছিল ধুমসে খবর দেখা যেত মাঝেমধ্যে অফিসের কাজ! যদিও কাজ ফাঁকি দেয়া পছন্দ করেন না তবুও মাঝেসাঝে হয়ে যায়।
বছরের শেষে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসেছে শীতের শুরুতে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে আক্রান্ত ও মৃত্যুসংখ্যা বেড়েছে আরও বাড়বে! শুধু কি সংক্রমণে মৃত্যু তা নয়; করোনাকালে মানুষের সহনশীলতা কমে গেছে মনে হয় চপল দত্তের। খুন-শ্লীলতাহানী, ডাকাতি-রাহাজানি বেড়েছে; বেড়েছে মৃত্যু দূর্ঘটনায়, মৃত্যু কুপিয়ে হত্যায়; নারীকে অসম্মান করে হত্যা! অন্যদিকে সম্ভ্রমহানির লজ্জাতে নারীর আত্মহত্যা! করোনা সংক্রমণের এই বিধিনিষেধের দুঃসময়ে বিশ্বের কোন না কোন স’ানে লেগেই আছে অরাজকতা! যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ; হেরে গিয়েছে ট্রাম্প। ‘ক্যাপিট্যাল হীল’-এ হামলা করেছিল ট্রাম্পের সমর্থকেরা। কিন’ কিছুই করতে পারেনি। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছে জো বাইডেন। বাংলাদেশে পৌর নির্বাচনে এক এলাকার জয়ী প্রার্থীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বত্তরা। খবরে ‘ক্যাপিট্যাল হীল’-এ হামলা দেখে চপল দত্তের মনে হয়েছে মানুষ সব একরকম; সাদা-কালো কোন পার্থক্য নেই!
এরমধ্যে মিয়ানমারে হয়েছে সেনা অভূত্থান। সেখানে আছে মীরার এক ভাই। ভাইয়ের ওখানে ফোন-নেটওয়ার্ক প্রায়বন্ধ বললেই চলে। মাঝেমধ্যে পাওয়া যায় আবার কখনও পাওয়াই যায় না। কী হবে কে জানে ! শুধু মহামারি-অতিমারি বা সাধারণ রোগেই নয় সবসময়েই মানুষের বেঁচে থাকাটাই সৌভাগ্য। এতকিছুর মধ্যেও চপল দত্তের কাছে ইতিবাচক দিক হলো করোনার টিকা আবিষ্কার। টিকা নিলেই এই আতঙ্ক কমে যাবে। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচবে।
সপ্তাহের সবদিন অফিস যেতে হয় না চপল দত্তকে। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে আছেন। আজ অফিসে যাবেন না তাই আয়েস করে খবর দেখছেন; অভ্যেস মতো নানা চ্যানেল ঘুরিয়েফিরিয়ে খবর দেখছেন তিনি। মীরার খবর দেখতে ভালো লাগে না। এত মৃত্যুর খবর; নারী-শিশু নির্যাতন-নিপীড়নের খবর, মাটির নিচে পুঁতে রাখা লাশ, রাস্তায় ফেলে রাখা বস্তাবন্দী লাশের খবর বিষণ্ন করে তাঁকে! ইদানিং খবরের কাগজ পড়াও প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন! শুধু খবরের হেডিং দেখেই ছেড়ে দেন। দীর্ঘদিনের অভ্যেস, খবরের কাগজ পড়াও ছাড়তে পারেন না আবার পড়তেও পারেন না। অদ্ভূত দোটানায় থাকেন তিনি! এই বিষয়সহ নানা বিষয় নিয়ে মাঝেমধ্যেই মিষ্টি তর্ক হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে; ছেলেমেয়ে দুজনের কেউ কাছে থাকে না, খুটখাট তর্কবিতর্ক আর সংসারের সাতসতের নিয়ে ভালো আছেন তাঁরা দুজনে।
চপল দত্ত টেলিভিশনে আল-জজিরা একবার, একবার বিবিসি, একবার সিএনএন এভাবেই ঘুরিয়েফিরিয়ে খবর দেখতে দেখতে চা খেতে গিয়ে দেখলেন চা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে; চপল আর এক কাপ গরম চা নেওয়ার জন্য চায়ের কাপ হাতে ডাইনিং-এ এসে মীরার হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার হাতে ওটা কি?’
‘দাঁত।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় মীরা।
‘দাঁত! কী হয়েছে দাঁতের? দাঁত খুলে গিয়েছে !’
‘হ্যাঁ।’ মীরা দাঁত থেকে চোখ না সরিয়েই এবারেও এক কথাতেই উত্তর দেন। কিছুক্ষণ মীরার দিকে তাকিয়ে চপল ভাবলেন, এই মুহূর্তে মীরাকে চায়ের কথা বলবেন কি বলবেন না। কিন’ চায়ের যে খুব প্রয়োজন। খেতেই হবে। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কি বলবেন তাই ভেবে পাচ্ছেন না। হঠাৎ টেবিলে নজর দিতেই দেখলেন সকালের খাবার রুটি-ডিম প্লেটেই পড়ে আছে। হা-হা করে উঠলেন চপল, ‘তোমার প্লেটে খাবার পড়ে রয়েছে, খাওনি; তোমার সুগার এমনিতেই অ্যাবনর্মাল তার ওপরে যদি এতোক্ষণ না খেয়ে থাক তাহলে অসুবিধা হবে তো রে ভাই!’ মীরার কাঁধে হাত রেখে আবার বললেন চপল দত্ত, ‘এভাবে দাঁতের জন্য কেউ মুষড়ে পড়ে নাকি! যা! তুমি না টিচার।’ মীরা একটি কলেজে আছেন। এখনও স্কুল-কলেজ খুলেনি। তবে অনলাইন ক্লাস হয়। ‘আজ ক্লাস করতে হবে না তোমার?’ স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন চপল। মীরা, সে কথার জবাব না দিয়ে দাঁতের দিকে চুপ করে থাকেন। চপল দত্ত স্ত্রীর পাশে বসলেন। রুটিতে ডিম জড়িয়ে মুখে তুলে দিলেন।
চায়ের কাপ টেবিলে রাখতে রাখতে ভেবেছিলেন, স্ত্রীকে বলবেন এক কাপ চা বানিয়ে দিতে; কিন’ এখন আর স্ত্রীকে চা বানানোর কথা বলতে পারলেন না তিনি। এই মুহূর্তে চা বানাতে ইচ্ছা না করলেও চায়ের কাপ হাতে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। স্বামীকে না করে চা বানানোর জন্য উঠে দাঁড়িয়ে দাঁত ফেলে দিতে গিয়ে কি মনে করে না ফেলে ছোট্ট একটি পিরিচে রেখে দিলেন মীরা। দুই কাপ চা এনে এক কাপ নিজে এবং এক কাপ চপলকে দিয়ে টেবিলে বসলেন তিনি। চপল টেবিলে বসে চা খেতে খেতে মীরার সঙ্গে কথা বলেন, ‘যে ডাক্তার তোমার এই দাঁত লাগিয়েছিল সেই ডাক্তারের ফোন নম্বর আছে?’
মীরার মোবাইলে ডাক্তারের মুঠোফেনের নম্বর সেভ করে রেখেছিলেন। ডাক্তারের নাম সার্চ দিয়ে বের করে বললেন, ‘আছে।’
‘তাহলে একটিবার ফোন করে দেখ, তিনি বসবেন কিনা।’
‘ঠিক আছে।’
মীরা খুব সহজে চেঞ্জ করেন না ডাক্তার। শুধু দাঁতের ডাক্তার নয়, কোন ডাক্তারই চেঞ্জ করার পক্ষপাতি নন তিনি। তাঁর ডায়াবেটিস আছে, বিশ বছরের ডায়াবেটিস; এই বিশ বছর একই ডাক্তারের সেবা নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এই দাঁতের ডাক্তারও চেঞ্জ করার ইচ্ছে নেই। চপল দত্তের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে ঘরে এসে ডাক্তারকে মোবাইল করতে গিয়ে মনে হলো ডাক্তার দেখাতে হলে আগের প্রেসকিপশন দরকার; না হলে তো ডাক্তার দেখতে চাইবেন না। প্রেসকিপশন খুঁজে না পেয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন মীরা। প্রায় চার বছর আগের প্রেসকিপশন এখন কোথায় খুঁজবেন! করোনাসময়ে রোগী দেখতেই চান না ডাক্তার। তারপরে যদি পূর্বের প্রেসকিপশন না থাকে তাহলে কি দেখবেন ডাক্তার?
তবুও মোবাইল করেন মীরা। পাথরদাঁত খুলে গেছে শুনে ডাক্তার বললেন, ‘দাঁত ফেলে দেননি তো।’ মীরা না বলাতে তিনি বললেন, ‘আগামিকাল আসবেন, আসার সময় ‘দাঁত’ সঙ্গে আনবেন। আমি তো এখন পরিচিত আর শিশুদের ছাড়া রোগী দেখি না। তবুও…’ কথা শেষ করলেন না ডাক্তার ম্যাডাম।
‘ঠিক আছে আপা। কিন’ আপা আগের প্রেসকিপশনটা যে কোথায় রেখেছি মনে করতে পারছি না।’ দ্বিধা নিয়েই বলেন মীরা।
‘আপনি চলে আসুন। প্রেসকিপশন লাগবে না।’ মীরা, ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে মোবাইল অফ করে চপলকে বলেন, ‘আগামীকাল সন্ধ্যায় দাঁতের অ্যাপয়েন্টমেন্ট।’
পরদিন ডাক্তারের চেম্বারে মীরা। ডাক্তার দেখলেন না মীরাকে। টেকনেশিয়ান, দাঁতের ড্রিল করা মেশিন দিয়ে অনেকক্ষণ ঘসঘস ঘসঘস করলো ; ডাক্তার বললেন তাঁকে, ‘কী করছো এতক্ষণ!’ ঘসরঘসর থামিয়ে দিয়ে আগের খুলে যাওয়া তিনটি দাঁতে গাম লাগিয়ে লাগাতে এসে বলল, ‘দাঁত তো তিনটা না ছয়টা।’ ছয়টি দাঁতের মূল্য বললেন, ৪২০০০/- হাজার টাকা। এত টাকা দিয়ে দাঁত ঠিক করবেন না; স্বামীর কথায় রাজী হলেন। দাঁতের মাপ নিলো টেকশিয়ান। মনের ভেতর খচখচানি নিয়ে বাসায় এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালেন মীরা। মুখের ভেতরের চেহারা আগের মতো লাগছে না, একটু যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে! সামনের দুটি দাঁত তো ছিল! কিন’ এখন নেই কেন? তাহলে, টেকনিসিয়ান কি ঘসঘস করে ঐ দাঁতদুটিই কেটে দিয়েছে! তিনি বুঝতে পারলেন না। অনেক সময় মীরার মস্তিষ্ক কাজ করে না! মীরার আরও একটি স্বভাব আছে, তিনি কখনও কাউকে কিছু বলতে পারেন না; এবারেও বলতে পারলেন না। শুধু মনে মনে গজরগজর করে টেকনিসিয়ান আর ডাক্তারের পিণ্ডি চটকালেন। কিন’ এখন পিণ্ডি চটকিয়ে কী হবে? প্রয়োজনে কথা বলতে না পারলে ক্ষতি তো হবেই, আগেও হয়েছে। যখনই দাঁতের এই অবস’া দেখলেন তখনই চেম্বারে গিয়ে বলে আসতে হতো নয় তো ফোন করেই বলতে হতো। তাঁর তো যা হবার তা হয়েই গেছে তবুও বলা প্রয়োজন না হলে তো অন্যের ক্ষতি করবে; এই রকম কাজ করা থেকে বিরত থাকবে না ওরা। সেটাও ভাবলেন। কিন’ কিছুই করতে পারলেন না! ঐ যে কথায় আছে ‘স্বভাব যায় না মলে, কালিমা যায় না ধুলে’ ; চুপচাপ মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলেন মীরা।
এখন যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে ; যেমন হয়েছে টাকার শ্রাদ্ধ তেমনি হয়েছে কষ্ট! দিনগত হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাঁতের ব্যথা বাড়ছে মীরার। এখন তো কষ্ট অসহ্য লাগছে। ভুলভাবে লাগালে তো এমনি হবে! কয়েকদিন ধরেই ভাবছেন ডাক্তারকে ফোন করবেন, কিছু বলবেন। কিছু বলতে গেলে তো পূর্বের প্রেসকিপশনটা বের করতে হবে। মীরা কখনও কোন কাগজপত্র ফেলে দেন না কিন’ কোথায় রাখেন তা মনে করতেও পারেন না। অনেক খুঁজতে হয়! মাঝেমধ্যে ধৈর্য হারিয়ে খোঁজাখুঁজি বাদ দিয়ে বসে থাকেন। প্রেসকিপশনটা আছে কোথাও কিন’ কোথায় মনে করতে পারছেন না। কয়েকদিন সম্ভাব্য জায়গায় খুঁজলেন, পেলেন না। এবারে হাল না ছেড়ে খুঁজতেই থাকলেন মীরা। অবশেষে পেলেন। ডাক্তারকে এখন বলতেই পারেন। না বললে তো চলছে না, চলবে না। মুখের মধ্যেকার কথা ! টাকার দরকার কার না থাকে তাই বলে ভালো কিছু নষ্ট করে তার বিনিময়ে টাকা উপার্জন! ছি:, ছি:! তাছাড়া কাজও জানে না টেকনিশিয়ান। কিন’ মীরার ডাক্তারের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে না, কিছু বলতেও ইচ্ছে করছে না! মীরা কিছু বলতে না পারার কষ্টে ম্রিয়মান হয়ে রইলেন! ‘কেন তাঁর কিছু বলতে ইচ্ছা করে না? কেন প্রতিবাদ করতে পারেন না?’- এই চিন্তায় নাজেহাল হলেন তিনি!
ছেলে, মলয় ও মেয়ে সীরা। দুজনেরই সংসার হয়েছে। তাঁদের চাকরি-সংসার নিয়ে ব্যস্ত তাঁরা। ওরা সবসময় ফোন করে না। ছেলে বিয়ের আগে অফিস থেকে ফিরেই হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ভাইবার-এ কথা বলতো। তখনও মেয়ের বিয়ে হয়নি, বিদেশ যায়নি। মেয়ে ছিল ওর কাছে; একজনকে নিয়েই দুইজনের অপত্য স্নেহ মিটাতে চেষ্টা করতেন মীরা। চপল দত্তকে কখনও বুঝতে দেননি ওর মনের কথা। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছেলে ঐ দেশেই বিয়ে করে নিলো, মেয়েও বিয়ের পরে চলে গেল। ননদ তো আগেই ওখানে সেটেল্ড হয়েছিল। নাইমার দুই ছেলে-মেয়ে; দুই জনেরই করোনা হয়েছে বলে জানিয়েছিল নাইমা। ওদের কী অবস’া জানতে পারেনি কয়েকদিন; তিনদিন আগে ফোন করে ওদের খবর জানিয়ে বলেছিল, প্রয়োজনে ওরাই ফোন দিবে। এই কথাতে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন মীরা। ওরা ফোন দিবে? কেন, মীরা কিংবা চপল ফোন দিয়ে খোঁজ নিলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে? মীরার মনের ভেতর রাগ ফেনিয়ে ওঠে। কিন’ ঐ রাগটুকুই সার, কারণ মীরা জানে ফোন আসলে বা ফোন দিলে কিছুই বলতে পারবে না! কারোর ওপর রাগ করা বা কাউকে কিছু বলা ধাতেই নেই যে!
বিশ্রি স্বপ্ন দেখার পর থেকে মা-বাবার কথা, ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে মীরার। বাবা-মাকে অতটা কাছে পায়নি; লেখাপড়ার সুবাদে বেশিরভাগ সময় বাইরে বাইরে কেটেছে ওর। গ্রামে স্কুল না থাকায় খালার বাড়ি থেকে লেখাপড়া করতে হয়েছে। তারপর হোস্টেল। লেখাপড়া শেষ হওয়ার পূর্বেই বিয়ে, বিয়ের পরও লেখাপড়া করেছেন। তারপর চাকরি। চাকরি করলেও কোনদিন অবহেলা করেননি শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তাঁর এই পরিবারকে। শ্বশুর-শাশুড়ি যতদিন বেঁচে ছিলেন তাঁর কাছেই ছিলেন। তাছাড়া যাবেনই বা কোথায়! স্বামীর একটি বোন, নাইমা; সে ওয়াশিংটনে আছে, সেই বোনের কাছাকছিই থাকে ওদের ছেলেমেয়ে দুটি। মীরা চাকরি করেছেন, টিউশনি করেছেন আবার সংসারও দেখেছেন! কিন’ ইদানিংকালের ছেলেমেরো সেটি করছে বা করার সময়টুকু তাঁরা পায় না! তিনি জানেন, বর্তমান সময়ে জীবনের প্রয়োজনে ছেলেমেয়েদের ছেড়ে দিতে হয়; এই সত্য বোধগম্য হলেও মনের মধ্যে কষ্টগুলো পাক খেতে থাকে এবং মীরার মনে হয়, জীবনযাত্রা কঠিন হবে বলেই কী মা-বাবা-স্বজন-পরিজনের কোন খবর নিতে হবে না! মীরা এইসব কথা ভাবতে ভাবতে মনে হয়, ছেলেমেয়েরা ভালো আছে তো? ভালো আছে তো নাইমা, তাঁর স্বামী আর তাঁদের ছেলেমেয়েরা? ভালো আছে তো মলয় আর সীরা? অনেকদিন দেখা হয় না ওদের সঙ্গে; যাওয়ার কথা ছিল কিন’ করোনার জন্য যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। কবে হবে তাও অজানা! ওদের খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। কিন’ কীভাবে হবে? দাঁতের চিন্তার সঙ্গে ছেলেমেয়ের চিন্তায় আরও নাজেহাল হতে লাগলেন তিনি। বয়স কী মানুষকে এভাবেই তার কব্জায় নিয়ে নেয়? ছেলেমেয়েদের ব্যস্ততা আছে বুঝতে পারেন তবু মন মানে না যখন, তখন নিজেই কল দেন, কখনও ধরে কখনও ধরে না! কখনও কথা বলে, কখনও ‘কারণে-অকারণে এভাবে ফোন করো কেন?’ বলে ফোনটা রেখে দেয়। কষ্ট হয় তখন; নোনাজলে ভেসে যায় বুকের জমিন। তারপরেও কল করেন; মা তো!
কয়েকদিন অনিয়মের জন্য শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। স্বমীকে জানতে দেননি; তাঁর জন্য কেউ ব্যাকুল হয়ে উঠুক তা তিনি কখনই চান না তবুও মাঝেমধ্যে ওর শারীরিক অবস’ার গতিবিধি ধরে ফেলেন স্বামী, চপল। একত্রে বসবাস করলে, একে অপরকে গভীরভাবে অনুভব করলে তো জানতেই পারা যায় তবুও লুকাতে চেষ্টা করেন মীরা। আজ তাঁর শরীর খুব খারাপ। রোজকার মতো ডাইনং-এ বসেছেন কিন’ দাঁতের ব্যথা এবং ছেলেমেয়েদের খবর না পাওয়ায় অসি’র হয়ে আছেন তিনি। খাওয়ার রুচি নেই। সকালে ডাইনিং-এ বসার আগে ফোন দিয়েছিলেন তখন ধরেনি ওরা; তিনি আবার কল দেওয়ার কথা ভাবছেন। ননদের খবর নেয়াটা খুব জরুরি মনে হচ্ছে। মীরা, হোয়াটসঅ্যাপ-এ কথা বলবেন ভেবে মোবাইল হাতে নিয়ে ভাবলেন, কিন’ কী করছে ওরা; অফিস থেকে ফিরেছে কি? ঘড়ি দেখলেন, বারোটা প্রায় বাজে। এখন তো আর অফিসে থাকার কথা নয়; ওখানে তো রাত বারোটা। ঘুমিয়েছে না জেগে আছে! ‘এতরাতে ফোন করবেন কি করবেন না’ এই দোটানায় ভুগছেন; হঠাৎ রিং বাজতেই চমকে উঠলেন; ফোন করেছে ছেলে। ছেলের কান্নাভরা কন্ঠ, ‘মা, রিন্টু আর রিনি নেই আর ওরা নেই শুনে পিসেমশাইও… !’ ছেলে আর কোন কথা বলতে পারে না।
‘কি বলছিস?’ মীরা চিৎকার চিরে যায় ঘরের বাতাস।
প্রতিদিনকার মতো চপল দত্ত ড্রইং রূমেই ছিলেন। আজও অফিসে যাননি। স্ত্রীর চিৎকার শুনে ছুটে এলেন ডাইনিং-এ। কয়েকদিন ধরে অনিয়ম এবং দাঁতের ব্যথায় কাতর মীরা এই সংবাদ শুনে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন ! চারদিক থেকে অন্ধকারের একটি বিশাল ঢেউ যেন মীরা দত্তকে ভাসিয়ে নিতে ছুটে আসছে। অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার অবস’াতেও ভাবছেন সংস্কারের কথা! ভাবছেন, তাঁর মা তো আরও একটা কথা বিশ্বাস করতেন একদিক ক্ষতি হলে অন্যদিক শুভ হয়! কিন’ কোথায়! তাঁর তো দাঁতের ক্ষতি হলো, অর্থের ক্ষতি হলো তাহলে শুভ সংবাদের বদলে কেন এল অশুভ সংবাদ। মীরা কথা বলছে না দেখে ওর হাত থেকে মোবাইল নিয়ে ছেলের সঙ্গে কথা বলে সব শুনলেন চপল দত্ত। স্ত্রীর কাঁধে ভালোবাসার স্পর্শ রেখে বললেন, ‘ধৈর্য ধরো। এখন তো ধৈর্যই একমাত্র বাঁচবার উপায়! তিনি স্ত্রীকে এইমাত্র টিভিতে দেখা খবরটি বলবেন কি বলবেন না দোটানায় পড়েও বলেই ফেললেন; তিনি বললেন, ‘খবরে দেখলাম মিয়ানমারের বিক্ষোভকারীদের ওপর বর্ষিত জলকামানের গরমপানিতে অনেকে আহত হয়েছে ; আহতদের একজন শালাবাবু!’ এই সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে চেতনা হারিয়ে ফেলেন মীরা দত্ত। সেই চেতনা আর ফেরাতে পারলেন না চপল দত্ত।
