রাত বারোটা। বনানী বারোতে ঘুরছে একটা টয়োটা। টয়োটার রঙ সাদা। গাড়ীর ড্রাইভার নেই্। ড্রাইভ করছে মালিক নিজেই। গাড়ির গতি মন্থর। এ রাস্তা থেকে ও রাস্তা এ মোড় থেকে সে মোড় ঘুরছে ঘুরছে আর ঘুরছে। অনেকক্ষণ ঘুরবে। যদি কোন মেয়ে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আাসে তাকে নিয়ে ঘুরবে যতক্ষণ ইচ্ছে, তার পর ফিরবে বাড়ি। না মেয়েদের শরীরের প্রতি আগ্রহ নেই নাফিজ চৌধুরীর। ওদের নিয়ে আসে বাড়ীতে কিন্তু ওদের দিকে ফিরেও তাকায় না। নাফিজের বয়স চল্লিশ। নিজের ব্যবসা। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। ঝি-চাকর আছে তিনজন। একেক জনের এক এক রকম কাজ। একজন রান্নাসহ ঘরদোর দেখাশোনা করে, একজন বাজার সরকার আর একজন ড্রাইভার। বাড়ির কোন কিছুই এখন নাফিজ দেখে না। দেখতে ইচ্ছা করে না।
নিনা চলে যাওয়ার পর থেকে ঘর-সংসারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে নাফিজ। এখন ওকে খুঁজে পেতেই হবে। কিন্তু খুঁজবে কোথায়? নিনার সাথে পরিচয় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। ব্যবসার কাজে কক্সবাজার গেলেও প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সমুদ্র দর্শনে না গেলে ওর মনে হতো কি যেন কাজ করা হয়নি। কি যেন বাকী রয়ে গেছে। এমনি এক ভোরে সমুদ্র সৈকতে নিনার সঙ্গে দেখা।
নিনা সেদিন কি সাজে সেজেছিল আজ এক বছর দুই মাস তিনদিন পরেও ঠিক ঠিক মনে আছে। নিনার পরনের কাপড়ের রঙ, চুলের স্টাইল, চোখ-নাক-ঠোঁটের প্রসাধন সব মনে আছে ওর। চোখে ছিল টাটকা নয় বাসি কাজলের আভা, নাকে হীরার নাকফুল। পরনে কাঁঠালী চাঁপা রঙ সিফন। চুলের লম্বা বেণী পিঠের পরে পড়েছিল। নাফিজের কাঁঠালী চাঁপা রঙ যেমন পছন্দ তেমনি ফুল। তার পছন্দের রঙে নিনাকে সেদিন ভোরের নরম আলোতে অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি মনে হয়েছিল নাফিজের। একাকী বসেছিল বেশ খানিকটা দূরে। নাফিজ পায়ে পায়ে পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি কবিতা আবৃত্তি করছিল। রবীন্দ্রনাথের সমুদ্রের প্রতি।
‘‘আমি পৃথিবীর শিশু বসে আছি তব উপকূলে শুনিতেছি ধ্বনি তব। ভাবিতেছি, বুঝা যায় যেন কিছু মর্ম তার- বোবার ইঙ্গিত ভাষা হেন আত্মীয়ের কাছে।……… ’’ নিনার কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ নাফিজ কথা বলতে পারছিল না। বেশ কিছুক্ষণ কণ্ঠের রেশ ভেসে বেড়াচ্ছিল ওর মনের ভেতর। নাফিজের তখন মনে হয়েছিল ওর কবিতা শুনে যেন সমুদ্র ভীষণ খুশী হয়ে বারবার ওর পা-ছোঁয়ার জন্য অল্প অল্প করে এগিয়ে আসছে।
বাহ্! আপনি তো সুন্দর আবৃত্তি করেন।
কে আপনি? চমকে জিজ্ঞাসা করেছিল নিনা।
আমি কেউ নই। সামান্য একজন মানুষ। এসেছি সমুদ্র সৈকতে। এর পর প্রতিদিন দেখা হতো ওদের। এক কথায় দুই কথায় আলাপ গড়িয়ে যায় ভালোবাসায়, তারপর বিয়ে।
নিনার বাবা নেই। মা আছে। নাফিজের মা-বাবা কেউ নেই। নিনার মা সমর্পণ করে মেয়ে। মা মেয়ের বিয়ের সময় ছেলেকে বাবা-মা, তার ঘর-বাড়ী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল। নাফিজ বাবার নাম ছাড়া কিছুই বলতে পারেনি। দেশের বাড়ী কোনদিন যায়নি। মা-ও কিছুই বলেনি ওকে। তাছাড়া ওর বাবা খুব ছোট বেলায় মারা যায় বলে শুনেছিল মায়ের কাছে। দাদার বাড়ী থেকে কখনও কেউ আসেনি। তাছাড়া নাফিজের নিজেরও আগ্রহ ছিল না দাদার বাড়ী আর বাবা সম্পর্কে। ওর মা স্কুলে মাষ্টারী করে আর অবসর সময়ে সেলাই করে বড়ো (মানুষ) করেছে ওকে। মা কোথাও যেতো না। নাফিজই ছিল পৃথিবী। দুজন দুজনকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না। সেই মা ওর বি.এ পাশ করার পরই চলে গেলো। তার পর থেকে একা নাফিজ। মা ছিল ওর ভালবাসা, আদর্শ। মা মারা যাওয়ার পর ভীষণ একলা হয়ে পড়ে। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করে। ব্যবসায় উন্নতি করেছে। বাড়ি গাড়ি করেছে। মায়ের জিনিসপত্র, মায়ের ছবি দিয়ে একটা ঘর সাজিয়েছে। সব সময় ও ঘর তালাবব্ধ থাকে। শুধুমাত্র মায়ের মৃত্যু দিবসে এ ঘর খোলা হয়। মিলাদ পড়ান হয়। সারারাত থাকে ওই ঘরে। ওই ঘরে বাবা-মায়ের একটা যুগল ছবি আছে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে মা তাকে ছবিটা দিয়ে বলেছিল,এই তোমার বাবা নবিবুল ইসলাম। নাফিজ প্রথমে ছবিটা দেখেনি, দেখতে চায়নি। পরে মায়ের অনুরোধে ছবিটা নিয়ে বড় করে বাঁধিয়ে রেখেছে।
নিনা বিয়ের পর তালাবদ্ধ ঘরের কথা জানতে পেরে কখনও খোলার কথা বলেনি। বিয়ের নয় মাস পনেরো দিন পর এই ঘর খোলা হয়। আর ঘরে ঢুকেই ছবিটা দেখে থমকে দাঁড়ায় নিনা। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, কে?
বাবা-মায়ের ছবি?
তোমার বাবা ছোটো বেলায় মারা গেছে ঠিক জানো।
হ্যাঁ। তবে আশ্চর্যজনক প্রশ্ন। আশ্চর্য হয়েছিল নাফিজ! কিছুক্ষণ চুপ করে নিনার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, আমার শোনা যদি ভুল না হয় তবে আমার বাবা ছোটো বেলায় মারা গেছে।
তোমার বাবার কোন যমজ ভাই ছিল?
না। যতদূর জানি বাবা একাই। তাছাড়া কেউ কখনও আসেনি। কিন্তু কেন?
প্রশ্নটা না করে পারেনি নাফিজ।
নিনা ওর প্রশ্নের উত্তর দেয়নি এবং ভীষণ গম্ভীর হয়ে কাজের অছিলায় ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তা লক্ষ্য করেছিল নাফিজ। কিন’ মৃত্যুদিবসের কাজে ব্যস্ত থাকায় তখন কিছু বলেনি। পরে জিজ্ঞাসা করবে ভেবেছিল। আর ওখানেই নাফিজের ভুল হয়েছিল পরদিন নিনাকে আর খুঁজে পায়নি নাফিজ। সেই থেকে খুঁজছে। অনেক জায়গায় ঘুরেছে। কিন’ নিনার দেখা নেই। ও যেন পৃথিবীর বাতাসে মিশে বাতাস হয়ে গেছে। নিনাকে পাচ্ছে না খুঁজে কিন’ খোঁজারও বিরাম নেই। বিরামহীন খুঁজতে খুঁজতেই এখানে আসা। গত মাসে ওর বন্ধু শামীম দেখেছে নিনাকে এই বনানী বারোতে, ফুটপাতে বসে থাকতে। শামীমকে দেখেই উঠে চলে গিয়েছিল!
শামীমের কাছে সেই কথা শোনার পর থেকে প্রতিদিন আসে। আজও এসেছে নাফিজ। নাফিজ আজও ঘুরতে ঘুরতে বিফল হয়ে ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ দূরে ফুটপাতে একটি মেয়েকে দেখতে পায়। পরনে কাঁঠালী চাপা রং শাড়ী, পিঠে লম্বা বেণী। মাথা নিচু করে বসে আছে সে।
গাড়ীটা বসে থাকা মেয়েটার সামনে থামতেই চমকে তাকিয়ে থাকে এক পলক। তার পর দৌড় দেয় সামনে। নাফিজ ওকে ডাকে না। ওকে চলে যেতে দেয় কিছুটা পথ। তারপর অনুসরণ করে।
নিনাকে বাড়ীর ভেতর ঢুকতে দিয়ে আধঘন্টা অপেক্ষা করে। তার পর দরোজায় ধাক্কা দেয়। দরোজা খুলে দেয় কাজের মেয়ে। ওকে বসিয়ে রেখে ভেতরে যায়। সময় যায়। ভেতর থেকে কেউ আসে না। নাফিজ ঘুরে ঘুরে ঘরের চারপাশ দেখছিল। দেয়ালে অনেক পেইন্টিং-এর মাঝে বিরাট করে বাঁধানো একটা ছবি। পায়ে পায়ে ছবিটার কাছে দাঁড়ায়। কার ছবি। সেই মুখ, সেই চোখ, সেই চুল, সেই নাক, নাকের পরে সেই কালো তিল সবই হুবুহু মিলে যাচ্ছে। এ ছবি এখানে কেন? তাহলে?
মনের অজান্তে অজানা আশংকা উঁকি দেয় নাফিজের মনে। নিনার সাথে স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন সম্পর্ক? না, নাফিজ ভাবতে চায় না এসব। কিন্তু ভাবতে হয়। ভাবনা আপনা-আপনিই চলে আসে।
নিনা কেন পালিয়ে এলো? নিনার মা জানালো না কেন? ওর মা কেনই বা বলেছে ওর বাবা মৃত?
নানান চিন্তায় ওর বুকের ভেতরের নিঃশ্বাস আটকে থাকে। আনমনা তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। কতক্ষণ তাকিয়ে ছিল জানে না। আনমনা ভাব ভেঙ্গে যায় নিনার কথায়।
আমি ঐ লোকের ঔরসজাত সন্তান।
চমকে ওঠে নাফিজ।
দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
দুজনের দৃষ্টিতেই অসীম শূন্যতা।
