আকাশ ও স্বাতী নক্ষত্র // আফরোজা অদিতি (পরের অংশ)

স্বাতীর কথা

স্বাতী জানে, আকাশ ওকে ফিরে যেতে বলবে কারণ এমনই মানুষ আকাশ। তাছাড়া আজ বিকেলে জামাই বাবুকে আসতে দেখেছে ওর কাছে। নিশ্চয় ওর যাওয়া নিয়েই কোন কথা বলতে এসেছে। স্বাতী জানে ওর জামাই বাবু মানে নন্দাই সরাসরি এ কথা বলবে না, খুব চালাক প্রকৃতির মানুষ আর গুছিয়ে কথা বলতে পারে! আর এমনভাবে কথা বলবে আকাশকে যে আকাশ আর না করতে পারবে না! না করার উপাই থাকবে না। কিন্তু আকাশ ওকে ফিরে যেতে বললেও কী ফিরে যেতে পারবে! না এখন ফিরে যাওয়া যায়! নাকি যাওয়া উচিত।

আকাশ তুমি আমার সব। আমার আঁধারে আলো। আমার সুখের বাঁশি। আমার মেঘলা দিনের শেষে ঝলমল রোদেলা প্রকৃতি। আকাশ, আমার প্রিয় আকাশ, তোমাকে ছেড়ে কী করে যাই, কী করে থাকি তুমিই বলো! রাধা তো কখনও ফিরে যেতে পারেনি আয়ান ঘোষের কাছে! আমিও পারবো না, পারবো না। নিজের মনেই একা একা কথা বলে স্বাতী। তারপর ভাবে, আকাশকে একটা চিঠি লেখা প্রয়োজন। আকাশ ওর প্রিয় মানুষ। প্রিয় ব্যক্তিত্ব, প্রিয় আনন্দ। আকাশ ওকে জ্বলে ওঠার জন্য বুক পেতে দিয়েছে। আকাশ ওর স্বাধীনতা, ওর সাহস।

আকাশ ওকে জীবন সম্পর্কে নির্মল জ্ঞান দিয়েছে। জীবনকে মনে রাখার, জীবনের পথ চলার পাথেয় দিয়েছে। একথা কখনও কাউকে বলার নয় এমন কি আকাশকেও না। কি পেয়েছে সে আকাশের কাছ থেকে। আকাশকে শুধু বলবে ও ফিরে যাবে। ফিরে যেতে হবে তাই যাওয়া। আকাশের কাছ থেকে কি নিয়ে যাচ্ছে তা বলার নয়। ও কখনও… শিরোনাম হবে না, হতে চায় না। ভালোবাসা শুধু জীবনের জন্য। সংসারের জন্য ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। ভালোবাসাকে প্রয়োজনের মধ্যে টেনে আনলে ভালোবাসা খাটো হয়ে যায়। আকাশ আমার ভালোবাসা। আমি তোমার অজান্তেই তোমাকে আমার ভেতর ধারণ করে নিয়ে যাচ্ছি। আমি ওর নাম দেবো নক্ষত্র। স্বাতী অদৃশ্য নক্ষত্রের অস্তিত্ব অনুভব করে। তারপর একটা চিঠি লিখতে বসে।

প্রিয়েসু আকাশ,
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, বাঁশী সুন্দরের হাতের বীণা। নজরুলের সুরে সুর মিলিযে আমিও তাই বলছি তুমি আমার বাঁশি, তুমি আমার সুন্দর। আমার মনে আমার সুন্দরের আবাস, আমার বাঁশীর ঘর। বাঁশির বুক নিসৃত সুরের সাগরে অবগাহন করে তার ভালোবাসার স্মৃতিকে বহন করে আমি ফিরে যাবো। আজ ফিরে যাবো এইটুকুই জানি। কিন’ কোথায় থাকবো তা তো জানি না। তুমিও জানতে চেয়ো না। এ মাটির দেহটা নিয়েই তো যত সমাজ, সংস্কার, মনটা নিয়ে তো নয়। এ মন পবিত্র, কখনও কলুষিত নয়। এ দেহটা একদিন পচে যাবে মাটির সঙ্গে কিন্তু মন বেঁচে থাকবে। সেই সঙ্গে বেঁচে থাকবে আমার বাঁশির আবাস।

আকাশ, স্বাতী নক্ষত্র তো তুমি ছাড়া আলো দেবে না, তুমি ভুলে যেতে চাইলেও তো ভুলতে পারবে না। নক্ষত্রের উজ্জ্বল আলো তোমাকে নিয়ে আসবে অতীতে, অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান হতে ভবিষ্যতে। তখন তোমার স্বাতীর কথা মনে পড়বে। তোমার মনে পড়বে একজন মানহারা মানবীর কথা যে একদিন তোমার কাছে ভালোবাসার অঞ্জলি চেয়েছিল, চেয়েছিল এবং পেয়েওছিল। পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিাে। এই গুটিয়ে নেওয়াটা দরকার বই কি। আকাশ আমি ফিরে যাচ্ছি। ক্ষমা চাইবো না। তোমাকে দোষ ও দেবো না। তুমি ভালো থাকো। আর তোমার অজান্তে যা দিয়েছো আমাকে, আমি তা নিয়ে যাচ্ছি। আশির্বাদ করো ত্মোর দেওয়া উপহার যেন সযত্নে রাখতে পারি।

স্বাতী চিঠিটা বার দুই পড়ে। তারপর সন্তুষ্ট চিত্তে খামে আটকে ঠিকানা লেখে। পরদিন পোস্ট করার জন্য টেবিলের ওপর রেখে ওর হ্যান্ডব্যাগটা চাপা দেয় যাতে সকালে ভুলে না যায়। একগ্লাস জল খেয়ে সময় দেখে ঘড়িতে। তারপর বিছানায়। ভবিষ্যৎ চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে কখন যে ঘুমিয়ে যায় নিজেই জানে না স্বাতী। পরদিন সকালে আর পোস্ট করতে ইচ্ছা করেনি চিঠিটা। কেন যেন মনে হলো কী হবে এই চিঠি পোস্ট করে। চিঠি পড়ে শুধু কষ্ট পাবে আকাশ। ওকে কষ্ট দিয়ে কী লাভ হবে! এর চেয়ে ভালো নিজেই হারিয়ে যাবে আকাশের জীবন থেকে। আকাশ সুখে থাক; আকাশের সুখই তো ওর কাম্য।

নক্ষত্রের কথা

বিশ বছর পর।
বাড়িতে অবসর প্রাপ্ত আকাশ বসে আছে। বিকেলে ওর একতালার ছোট বাড়ির বাইবের বারান্দায়। অবসর জীবনের পর বিকেলটা এখানেই কাটে ওর। পড়ন্ত বিকেলের মরা রোদে একমুখি এই জীবনটা নিয়ে ভাবে, ঠিক ভাবে না মনে করে। জীবনের হিসেবনিকেশ নয়, কখনও করেওনি। জীবনের হিসেবনিকেশ ধাতে নেই ওর। অনেকদিন পর ভাবছে স্বাতীর কথা। আজ বারান্দায় এই রকিং চেয়ারটাতে বসে দুটো শালিক দেখতে পেলো। ওরা কোথ থেকে উড়ে এস বসলো গ্রীলে।

শালিক দেখার সঙ্গে সঙ্গে স্বাতীর কথা মনে পড়লো ওর। শালিক দেখলেই গেয়ে উঠতো এক শালিকে সুখ, দুই শালিকে দুখ। স্বাতীর কন্ঠে এই সুর শুনতে এতো ভালো লাগতো যা কখনও কোনদিন আর কারও মুখে শুনে ভালো লাগেনি। স্বাতী কোথায় তুমি আজ। আমার এই অবসর সময়ে আমার পাশে তো তোমারই থাকার কথা অথচ তুমি নেই, আমি একলা একা। স্বাতীর জন্য আকাশের বুকের ভেতরটা উথালপাথাল সমুদ্র হয়ে যায়। চোখ দিয়ে দুফোট জল গড়িয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে স্বাতীকে কিন’ সব কিছু ছাপিয়ে ওর চলে যাওয়াটাই বেশি বাজে বুকের গভীরে! কেন চলে গেলে তুমি! কেন!

প্রীতম বাবর সঙ্গে কথা হওয়ার সময় ভেবেছিল স্বাতীকে ওর স্বামী কাছে ফিরে যেতে বলবে। কিন্তু মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে গিয়েছিল। জীবন থাকতে স্বামীর ঘরে যেতে দিতে পারবে না স্বাতীকে। ওকে নিজের করে রাখবে। আগলে রাখবে জীবন দিয়ে, যেতে দিবে না কোথাও। যদি পারতো ছোটবেলাতে যেমন বইয়ের মধ্যে গোলাপ পাপড়ি রেখে দিতো, সেভাবে রেখে দিতো বুকের গহনগভীরে কিংবা এমন কোন স্থানে লুকিয়ে রাখতো দেখতে পেতো না কেউ। আকাশ কখনও বা ভেবেছে তাবিজ করে গলায় ঝুলিয়ে রাখতে ওকে কিংবা তুষকণার মতো কাঁচের বাক্সে। হাজার লক্ষ বছর ঘুম পাড়িয়ে রাখবে দেখতে পাবে না কেউ। কেউ অপমান করতে পারবে না, কেউ দুঃখ দিতেও পারবে না।

প্রীতম বাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ার দিন সারাটা রাত এমনি আবোলতাবোল ভাবনাতে তন্দ্রার মধ্যে পার করেছিল। ওর মনের অবস্থা নিজে এবং ওর ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানতে পারেনি। দুই হাতে শুধু রাতটাকে সরিয়েছে। কখন সকাল হবে কখন যাবে স্বাতীর কাছে এই ভাবনা ভেবেছে, দুজনের ছবি এঁকেছে সারারাত। সকাল হতেই ছুটে গিয়েছে স্বাতীর সেই আত্মীয়ের বাড়ি। ওখানে নেই শুনে ওর শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে সেখানেও নেই! কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না। অফিসে রিজাইন দিয়েছে। তাহলে… মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে আকাশ। এরপর অনেক জায়গায় খুঁজেছে পায়নি। আসলে কেউ ইচ্ছে করে লুকিয়ে থাকলে কখনও কি তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। যায় না!

স্বাতী কেন চলে গেলে তুমি? কেন? জবাব তো খুঁজে পাই না। যেখানে থাকো ফিরে এসো, ফিরে এসো তুমি। আমি যে আজও তোমার পথ চেয়ে বসে আছি। তোমাকে খুব মনে পড়ছে, ফিরে এসো। ফিরে এসো স্বাতী। স্বাতীর চিন্তায় বিভোর আকাশ গেট খোলার শব্দে চমকে ওঠে।

গেট পেরিয়ে একটা যুবককে ঢুকতে দেখে প্রশ্ন করে,
কে তুমি?
আমি নক্ষত্র।
তুমি নক্ষত্র, তাতো বুঝলাম। কোন নক্ষত্র?
স্বাতী নক্ষত্র।
নক্ষত্র আর কোন কথা না বলে একটা চিঠি এগিয়ে দেয়।
আমার মা, স্বাতী। আজ দুইদিন হলো মারা গেছে। মারা যাওয়ার আগে আমাকে এই চিঠি দিয়ে গেছে।
স্বাতী তোমার মা! তোমার বাবার নাম?
শ্রীযুক্ত আকাশ চন্দ্র রায়।

নক্ষত্র তখন বলে চলেছে।
স্বাতী ওর মা। থাকতো বগুড়ায়। চাকরি করতো। ও আর মা দুইজনের সংসার। মায়ের আয়ে কোনো রকম চলে যেতো। এতোদিন ও জানতে পারেনি ওর বাবা কে। কোথায় থাকে। শুধু জানতো ওর বাবার সাথে সামাজিকভাবে বিয়ে হয় নি ওর মায়ের। কিন্তু ধর্মত বিয়ে হয়েছে কিন্তু সাক্ষী নেই। আর সাক্ষী ছাড়া কেউ তো বিশ্বাস করে না। তাই ওর মা চলে এসেছে আর যায়নি শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। শুধু ওকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই ওর মা এই একাকি জীবন বেছে নিয়েছিল। আকাশের পুরানো সব কথা মনে পড়ে যায় আবার।

নক্ষত্রের বাড়ানো চিঠিটা নিয়ে পড়ে। পড়া শেষ হতে নক্ষত্র বলে,
আমি ঠিক জায়গায় এসেছি তো, বাবা।
হ্যাঁ, বাবা। বলে বুকে টেনে নেয় আকাশ।
স্বাতী তুমি ঠিকই বলেছো, স্বাতী নক্ষত্রের জন্য আকাশ চিরদিন তার বুক পেতে দেবে।

নক্ষত্র লক্ষ্য করে গেটে কোনো নাম নেই কিস্তু বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে যে দরোজা তার উপর জ্বল জ্বল করছে একটি নাম ‘ স্বাতী নক্ষত্র’।

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615