কুসংস্কারের কথা // আফরোজা অদিতি

ঘরের দরোজা বন্ধ। বন্ধ ঘরে বসে আছে আয়েশা। ওর মা কিছুতেই বাইরে বের করে আনতে পারছে না ওকে। অনেক ডাকাডাকিতে যখন ক্লান্ত মা ঠিক তখনই এলেন পাশের বাড়ির জরিনা ভাবী। মাকে জিজ্ঞেস করেন, “ব্যাপার কি আপা, এতে ক্লান্ত বিমর্ষ কেন?” জবাব দিলেন মা, “আর বলেন কেন ভাই, পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হয়নি বলে ঘরে দরোজা দিয়েছে মেয়ে।”
“ কেন আপা লেখাপড়ায় কি ভালো নয়।”
“ লেখাপড়া এবারে ভালোভাবে করতে পারেনি, অসুস’ ছিল, তাই ওর বাবা ‘কলম’ ফুঁ দিয়ে এনে দিয়েছিল শা-সাহেবের কাছ থেকে। একটা তাবিজও দিয়েছিলাম।” মায়ের কথা শুনে অবাক জরিনা ভাবী। তিনি বলেন,“ কলম? তাবিজ? এসব দিয়ে তী পরীক্সায় পাশ হবে, যদি পাঠ্য বই পড়া না থাকে।” তিনি আরও বলেন, “আজকাল এইসব বিশ্বাস করে নাকি কেউ!”

আজকাল এইসব তাবিজ-কবচে অনেকের বিশ্বাস নেই, অনেকের আবার আছেও! শুধু শুধু কলম ফুঁ দিয়ে পরীক্ষা দেওয়াই নয়, আমাদের দেশের অনেক গ্রামে এখনও ‘পানি পড়া’ দিয়ে রোগের চিকিৎসা করা হয়। এই পড়া পানিতে যে রোগ না সেরে বৃদ্ধি পায় রোগ এবং কলম ফুঁ-ফাঁ দিয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় না যদি ভালো লেখাপড়া না থাকে। আর এইসব কথা এই দেশের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। শুধু পরীক্ষা পাশের জন্য নয়, সন্তান হওয়ার জন্য, সন্তানের মঙ্গলের জন্য পড়া পানি খায়, মাদুলী ধারণ করছে অনেক নারী। অসুখ-বিসুখ এবং বিভিন্ন রকম মনোবাসনা পুরনের জন্য দরগায় মানত করে অনেকেই। এছাড়াও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মহব্বত যাতে দৃঢ় হয় বা দৃঢ় থাকে, তালাক যাতে না হয় সেই জন্য চিনি পড়া, মিছরি পড়া, গোলাপ ফুল পড়া দিয়েও বশ করার কথা শোনা যায়। এসব কথা শুধু নারী নয়, অনেক পুরুষও বিশ্বাস করে। অনেকে আবার বিশ্বাস করে যে, চিনি, মিশরি, ফুল ফুঁ দিয়ে যাকে বশ করা হয় (পুরুষ বা নারী) সে যদি নদী পার হয় তাহলে বশীকরণ মন্ত্রের গুণ বা জোর কমে যায়। এই জন্য যাকে বশীকরণ করা হয়ে থাকে তাঁকে নদী পার হতে দেওয়া হয় না।

আরও আছে ‘বাতাস’ লাগা নামে কুসংস্কারের বিষয়। এটি সাধারণত মনে করা হয়, কোনো নবজাতক যদি মায়ের বুকের দুধ না খায় এবং গর্ভবতী নারীর অ্যাকলেমশিয়া রোগ হলে। এই রোগ হলে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে ঝাড়ফুঁক করার জন্য গ্রামের ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন অবশ্য ‘সূর্যের হাসি’র মতো ক্লিনিক হওয়াতে গর্ভবতী মা ও শিশু অনেক ক্ষেত্রে রক্ষা পাচ্ছে। এই বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠছে গ্রামের নরনারী। শুধু তাই নয়, আমাদের জীবনের খাঁজেখাঁজে পরতে- পরতে কুসংস্কার জড়িয়ে আছে নানাভাবে। যেমন বন্ধুকে রুমাল উপহার দিলে বিচ্ছেদ অর্থাৎ বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটে। স্বামী বা বন্ধুর দেওয়া কাঁচের চুড়িতেও বিয়ে বা বন্ধুত্ব ভেঙে যায়। ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে ডিম দেখলে ডিম খেয়ে যেতে হয় না হলে বড়ো শূন্য ওঠে খাতায়! আবার পরীক্ষার সময় কলা দেখা বা খাওয়া মোটেই উচিত নয়! তাহলেও পরীক্ষা ভালো হয় না!

আমাদের দেশের অধিকাংশ অশিক্ষিত, দরিদ্র, ধর্মভীরু জনগোষ্ঠীর মধ্যে খুব সহজেই প্রতারণার জাল বিছিয়ে প্রতারণা করতে পারে ধর্মব্যবসায়ীরা। কিছু সংখ্যক অসৎ লোক এই ধর্মব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এই সব প্রতারণা করে আসছে দীর্ঘ সময় ধরে। সাধারণত ভাগ্যবিড়ম্বিত নর-নারীই বিশ্বাস করে কুসংস্কারে। এরা বিশ্বাস করে হাত দেখা, কোষ্ঠি বিচার, আর রাশি ফলে। বর্তমানে স্টার প্লাসে একটি সিরিয়াল হচ্ছে নাম ‘কুণ্ডলি’। দুই বোনের কাহিনী। কুণ্ডলী বিচার করে বিয়ে হয় দুই বোনের একই পরিবারে। কিন’ দুর্ভাগ্য হলো ছোটো বোন হলো বড়ো এবং বড়ো বোন হলো ছোটো দেবরানি। অর্থাৎ সম্পর্কে বড়ো হলো ছোটো আর ছোটো হলো বড়ো। আর পরিবারের নিয়মানুসারে পরিবারের কর্তৃত্ব থাকে ছোটোবোনের হাতে। দুই বোনের খুব মিল যা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পছন্দ নয়, তাঁদের মধ্যে গুঞ্জন দুই বোনের সম্পর্ক ভাঙতে হবে। বয়স্ক এক সদস্যের চালে দুই বোনের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু। যদি কোষ্ঠি বিচারকে আমল দেওয়া না হতো তাহলে দুই বোনের টানাপোড়েন চলতো না, সম্পর্ক নষ্ট হতো না।

এই সব কুসংস্কারের চর্চা করা, প্রতিষ্ঠা করার পেছনে ধর্মভীরু মানুষ আর ধর্মব্যবসায়ীর হাত তো আছেই আরও আছে লেখক, বিজ্ঞানীদের হাত। এই সব লেখা বা গল্প পড়তে ভালো লাগে, ভালো লাগে অলৌকিক গল্প পড়তে। শুধু পড়া নয় অলৌকিক গল্পগুলোর পেছনে পড়-য়াদের আছে অদম্য এক আকর্ষণ। বলতে অবশ্য দ্বিধা নেই আমারও প্রচণ্ড আকর্ষণ এই সব গল্পের প্রতি। ‘বিপরীত পৃথিবী’ নামে আত্মা এবং অলৌকিক বিষয়ে লেখা একটি গল্প সংকলন আছে। যদিও আমি লিখেছি তবুও আমার মনে হয় মানুষের অলৌকিক, আধিভৌতিক কাহিনীর ওপর আছে অদম্য আকর্ষণ এবং ভবিষ্যৎ জানার আকাঙ্ক্ষা থেকেই কুসংস্কারগুলো আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কুসংস্কারের অলৌকিক বিষয় নিয়ে লিখেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দোপধ্যায় প্রমুখ। সত্যজিত রায়ও অত্যন্ত আধুনিক ও বাস্তবমুখী লেখক হয়েও সোনার কেল্লা নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন যার মূল বিষয় জাতিস্মর।

যা হোক, গল্পে অবশ্য কিছু যায আসে না যদি মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয় অর্থাৎ বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞান দিয়ে যদি সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে এবং বিশ্বাস করে তাহলে কুসংস্কার পালাবেই। মানুষের বিশ্বাসই হলো সবচেয়ে বড়ো। এবং এই বিশ্বাস এমন কিছুর ওপর করতে হবে যা মঙ্গলজনক। তবেই হবে মানুষের নিজের মঙ্গল সেই সঙ্গে মঙ্গল হবে পরিবার ও সমাজ ও রাষ্ট্রের।

(এই লেখাটি অনেক আগের লেখা; যখন কলাম লিখতাম)

#afrozaaditi.com

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615