পরীবউ// আফরোজা অদিতি (১ম অংশ)

বউ,শশী যেদিন বাপের বাড়ি গেলো সেদিনই ঘটলো ঘটনাটা। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এসেছে নীরু। বৃষ্টিতে ভেজার মজাই আলাদা। বৃষ্টিতে ভিজলে মাথাটা পাগলাটে হয়ে যায় নীরুর। অফিস ফেরত ভেজা কাপড়েই চায়ের জল চাপিয়ে একদৌড়ে বাথরূমে। শাওয়ার নিয়ে চা। শাওয়ার নিতে নিতে গান গাইছিলো। কন্ঠ ভালো। ওস্তাদের কাছে কিছুদিন শিখে ছেড়ে দিয়েছিল। গান শেখার কথা চিন্তা করছে আবার। শাওয়ার শেষে টেবিলে এসে গরম চা দেখে অবাক।দরোজা খোলা ছিলো? কিছু হারালো? নাহ! দরোজা বন্ধ। পেছনে নূপুরের ঝুনঝুন আর চুড়ির রিনঝিন আওয়াজ কানে এলো। ঘরে মিষ্টি গন্ধ। কে? পেছনে তাকালো। কেউ নেই !

শহরে আসার আগে গ্রামের বাড়িতে দু’বছর ওর ঘরে প্রায়ই মিষ্টি গন্ধের সঙ্গে নূপুরের আওয়াজ পেতো। নূপুরের উৎস খুঁজেছে। পায় নি। ষড়ঋতুর সবভোরেই দেখেছে শিয়রে শিউলি। কখনও দেখছে নূপুরের তালেতালে দুলছে কদম গাছে বাঁধা ওদের দোলনাটা। তখন ভয় ছিল না। আজ ভয় করছে। শশী ছাড়া এই শূন্য বাড়িতে নূপুর আর চুড়ির শব্দ। শশী কি ভাববে? নতুন বউ। বিয়ের বয়স ১০দিন। বাবা-মায়ের পছন্দ। সেভাবে জানাজানিই হয় নি দু’জনের।

আবার নূপুরের সঙ্গে চুড়ির আওয়াজ।
একি আপদ! এতোদিন এ শব্দ কোথায় ছিলো? এখন ত্রিশ চলছে। ব্যাংকে চাকুরি, বউ, সংসার নিয়ে সুখী একজন মানুষ হতে চায় ও। এই ঝামেলায় বিরক্ত হয় নীরু ।

চুড়ির রিনঝিন,নূপুরের ঝুনঝুন আওয়াজ ওঠে। আওয়াজ লক্ষ্য করে এদিক-ওদিক দেখতে থাকে, খুঁজতে থাকে।
খুঁজো না আমাকে, পাবে না। আমি দেখা না দিলে কখনও খুঁজে পাবে না আমাকে। ওর পেছনেই সুরেলা কন্ঠ।
চমকে পেছনে তাকায়। কে তুমি? কী করছো এখানে?
এখানেই তো থাকি। সম্মোহিত করার মতো মিষ্টি কন্ঠস্বর।
এখানে কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না কেন? নীরুর কন্ঠস্বরে চাপা রাগ।
সময় হয় নি এখনও।
কিসের সময়, সামনে এসো ।
আসবো। এতো অধৈর্য কেন? সময় হলে নিজেই আসবো। নূপুরের আওয়াজ দূরে সরে যাচ্ছে।
সামনে না এসে যেতে পারো না তুমি! এই বাড়িতে কোথায় থাকো তুমি! নীরুর কন্ঠে বিস্মিত উত্তেজনা।
উত্তেজিত কেন? আমি তো সেই কিশোর বয়স থেকে তোমার সঙ্গে। ভালোবাসি,খুব ভালোবাসি তোমাকে।
আমার ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য সব করবো আমি।
আমি তোমাকে ভালোবাসি না। যাকে কখনও দেখি নি তাকে ভালোবাসার প্রশ্নই ওঠে না! আমার স্ত্রী ছাড়া তোমাকে ভালোবাসবো কেন? কন্ঠে উষ্মা ঝরে।
রাগ করো না নীরু। কষ্টে ভেজা কন্ঠ। আমাকে দেখলেই তো বিয়ে করতে হবে আর বিয়ে না করলে অন্ধ হবে তুমি। অন্ধ স্বামী নিয়ে কী ঘর করবে শশী! ভেবে দেখো ।
তোমাকে দেখবো না আমি। আমি বিবাহিত। অন্য মেয়েকে দেখা আমার নীতিবিরুদ্ধ।
তা ঠিক। তবে তুমি বিবাহিত বলেই তো আমার সুবিধা। এতোদিন ছায়ার মতো থাকতে হয়েছে এখন তা হবে না। বিয়ে না করলে দেখা দেওয়ার নিয়ম নেই তাই…। এখন দেখা দিলেই কাছে আসবে, ভালোবাসবে, বিয়ে করবে। মিষ্টি হাসি কাঁচভাঙা শব্দে ছড়িয়ে পড়ে ঘরের ভেতর।
মোহিত নীরু ভাঙাকন্ঠে বলে, আমি তোমাকে ভালোবাসবো না বিয়েও করবো না। শশীকে ভালোবাসবো।
না,তুমি ভালোবাসবে না ওকে। কন্ঠে দৃঢ়তা। তুমি ভালোবাসবে শুধুই আমাকে। এই আমাকে।
না। আমি…
কথা শেষ হয় না। নূপুর আর চুড়ির শব্দ ক্রমশঃ চলে যায় দূরে। ঘরে মিষ্টি গন্ধ । গন্ধে সে উদাস বাউল। নেচে নেচে গাইলো -ও সুন্দরী প্রিয়তমা , তুমি এলে জ্বলে আলো
না এলে থাকে অমা …

রাতে স্বপ্ন দেখলো নীরু। দিগন্তরেখায় এক তরুণীর সাদাটে আবছায়া অবয়ব। অপূর্ব মনভুলানো হাসিতে বললো, আমি ভালোবাসি তোমাকে, জীবনপথের সঙ্গী ,বন্ধু আমার।
তুমি তো শশী নও।
শশী নই, লিপাঞ্জিনা।
লিপাঞ্জিনা! স্বপ্নের রেশ নিয়ে ঘুম ভাঙে। রোজ সকালে ওঠে। ব্যায়াম করে। কখনও রাস্তায় হেঁটে আসে। আজ ওঠে না। সাড়ে নয়টায় উঠে তড়িঘড়ি ফ্রেস হয়ে অফিসে রওয়ানা হয়।
পেছনে নূপুরের শব্দ। কান্না মেশানো কন্ঠ।
খেয়ে যাও। না খেয়ে যাবে, আমার এতো বছরের প্রেম বৃথা হবে! কখনও না। তোমার জন্য সব ছেড়েছি। খেয়ে যাও।
নীরু কথাও বললো না, খেলোও না।

শশী ফিরেছে। ঘর-দোর পরিপাটি। মনে মনে স্বামীর প্রশংসা করে ঘরে গিয়ে বিস্মিত! খাটের পাশে দাঁড়িয়ে একটা সাজুগুজু করা কনেবউ!
এই কে তুমি? বিস্মিত শশীর প্রশ্ন ।
আমি! আমি, লিপাঞ্জিনা।
আমার বেডরুমে কী করছো? কী চাও!
কিছু চাই না। এখানেই থাকি, আমার ভালোবাসার কাছে। আমার ঘরে।
তোমার ঘর ? তোমার ভালোবাসা? এটা কিছুতেই হতে পারে না। এটা আমার, আমাদের ঘর। না, তোমার ঘর নয় । এ ঘর আমার, আমাদের। লিপাঞ্জিনার কন্ঠে হসির ঝমক।
শশীর রাগে গা জ্বলে। চলে যাও, গেটলস্ট।
যাবে তুমি। আমি নই। ও আমার, শুধুই আমার। হাসে লিপাঞ্জিনা।
নীরুকে ফোনে চলে আসতে বলে শশী।
লাভ নেই শশীকণা। ও বিকেলের আগে আসবে না। পনেরো বছর একসঙ্গে…। মনদগ্ধ করা হাসি হাসে লিপাঞ্জিনা।
মিথ্যে বলো না। কপালের শিরা দপদপ করে শশীর।
মিথ্যে নয়। চিন্তা করো বিয়ের পর কখনও একসঙ্গে থেকেছো? থাকো নি। থাকতে দেই নি। দেবোও না কখনও।

সত্যিইতো! বিয়ের পর একরাতও একসঙ্গে থাকা হয় নি। একরূমের ছোটবাসা। বিয়ের দিন থেকে প্রতিদিনই মেহমান। সারাদিন অফিস, রাতে মেহমান। কাছাকাছি হতেই পারে নি ওরা।
তুমি জানলে কি করে? শশীর চোখে আগুন।
বললাম না একসঙ্গে থাকি । (চলবে)

#afrozaaditi.com , #আফরোজা অদিতি

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615