কোভিড-১৯ এর বুকে নববর্ষ ১৪২৭// আফরোজা অদিতি (প্রবন্ধ)

বাংলা নববর্ষের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষদিন থেকে বৈশাখ-উৎসব শুরু হয়। চৈত্রমাসের শেষদিন হয় চড়কপূজা! ছোটবেলাতে চড়কপূজা উপলক্ষ্যে শক্ত লম্বা বাঁশের সঙ্গে দড়িতে বড়শি লাগিয়ে সেই বড়শি পিঠে গেঁথে লোককে ঘুরতে ঘুরতে রক্ত ঝরাতে দেখেছি। ইংরেজ শাসনামলে গালে-পিঠে-জিহবাতে গরম লোহার শলাকা-বেত বিদ্ধকরে চড়কপূজা নিষিদ্ধের পরেও কোথাও কোথাও চড়কপূজায় পিঠে বড়শি গেঁথে শক্ত বাঁশ লম্বা করে পুঁতে সেই বাঁশের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে ‘দে পাক দে পাক’ বলে পাক খাওয়ানো হতো। কোথাও হতো ঢোপের খেলা; একটি কাঠের টুকরা দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে ঘুরানো হতো আর অন্য এক পক্ষ বাঁশের লাঠি দিয়ে সেটাকে আঘাত করতো, এভাবেই পুরানোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করা হতো।

বাঙালির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আসে বাংলা নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপিত হয় খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। বঙ্গাব্দের প্রথম মাস বৈশাখ। হালখাতা অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ; ‘হাল’ আরবি শব্দ অর্থ বর্তমান এবং ‘খাতা’ শব্দটি ফারসি থেকে এসেছে। দুটি শব্দ মিলে হালখাতা বাঙালি উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। ব্যবসায়ীরা পুরানো খাতা বন্ধ করে লাল রঙের কাপড়ে বাঁধানো লম্বা একটি নতুন খাতায় হিসাব খোলে; এটিকে ‘খেরো খাতা’ বলে; ব্যবসায়ীদের জন্য এটি অত্যাবশ্যকীয়! এইদিন ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে মিষ্টি বিতরণ করে, মিষ্টিমুখ করায়, করে। হালখাতার একটি কারণ অবশ্যই আছে সেটি হলো বকেয়া মিটিয়ে নেওয়া; বকেয়া মিটিয়ে নতুন খেরোখাতা খোলা হয়। কালের বিবর্তনে হালখাতা হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে খেরোখাতা; হারিয়ে গেলেও কোথাও কোথাও এখনো হালখাতা টিকিয়ে রেখেছে ছোটো ছোটো ব্যবসায়ীরা। তারা হালখাতা-কার্ড বিতরণ করেন, মিষ্টিমুখ করিয়ে নতুন হিসাবখাতার উদ্বোধন করেন। এ ছাড়াও নববর্ষ উপলক্ষ্যে একে অপরকে কার্ড-বই উপহার দেওয়ার প্রচলন হয়েছে।

বাংলা সৌরসন বঙ্গাব্দ নামেই পরিচিত। বঙ্গাব্দের প্রথমমাস হলো বৈশাখ। আর বৈশাখমাসের প্রথমদিনেই হয় নববর্ষ উদ্‌যাপন। বঙ্গাব্দের সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অপূর্ব সমন্বয় সাধন হয়েছে বলেই নববর্ষ উদ্‌যাপন বাঙালির একটি সর্বজনীন লোক-উৎসবে পরিণত হয়েছে। এইদিন অফিস আদালত সব বন্ধ থাকে। পহেলা বৈশাখ ছায়ানট আয়োজিত “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” গানের মাধ্যমে রমনার বটমুলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। উদীচী, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠিসহ আরো অনেক শিল্পীসাংস্কৃতিকগোষ্ঠী গানে গানে বাংলানববর্ষকে বরণ করে। জেলা-উপজেলাসহ গ্রামেগঞ্জেও গানে গানে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। নববর্ষের মেলা বসে। নববর্ষ উপলক্ষে মুড়ি-মুড়কি-তিল্লি-বাতাসা-কদমা, পিঠাপুলিসহ নানান ধরণের খাবার জিনিস, নানা রকম ফল, মিষ্টি, শখের হাঁড়ি, চুড়ি-ফিতা, রঙিন হাড়ি-কুড়িসহ মেলা বসে; কেনাবেচা হয়। মেলার দর্শনার্থিদের জন্য বিনোদনের আয়োজন থাকে। বহুরূপী সেজে আনন্দ দেয়, নাচ-গান-নাগরদোলা থাকে শিশুদের খেলাধূলা করার জন্য। কোথাও কোথাও শিব-পার্বতি সেজে নাচ দেখায়; থাকে লাঠিখেলা, কুস্তি,হাডুডু, দাড়িয়াবান্দা, বউছি, গোল্লাছুট। ছোটবেলায় যাত্রা দেখেছি মেলাতে। চট্টগ্রামে ‘বলি খেলা’ নববর্ষের ঐতিহ্য বহন করে; চট্টগ্রামের এই ‘বলি খেলা’ ‘জব্বরের বলি খেলা’ নামেও পরিচিত। রাজশাহীর ‘গম্ভীরা’ গান এখনও প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। পুরান ঢাকায় ঘুড়ি উড়ানো উৎসব হয়। পরিবারসহ সকলে নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে মেলা ঘুরতে-কিনতে-আনন্দ করতে আসে।

১৯৬৭ সালে প্রথম জাঁকজমকপূর্ণভাবে রমনার বটমূলে “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” গানের মাধ্যমে নববর্ষের উৎসবের শুরু এখন পর্যন্ত মহা-আড়ম্বরে বৈশাখবন্দনা হয়। এবং ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের আয়োজনে প্রথমবারের মতো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের হয়। এই শোভাযাত্রা দেখার মতো বর্ণাঢ্য; এই শোভাযাত্রা দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে লোকসমাগম ঘটে। এবং এই সুন্দর নয়নাভিরাম শোভাযাত্রার জন্য ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত হয়। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে তিন পার্বত্যজেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব পালিত হয়। যেমন : ত্রিপুরা-বৈসুক, মারমারা-সাংগ্রাই এবং চাকমা-বিজু নামে পরিচিত এই উৎসব। এই উৎসবকে তিন পার্বত্যজেলায় তিন নামে আখ্যা দিলেও সম্পূর্ণ পার্বত্যএলাকায় ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত। এই উৎসবে দিন সকলের জন্য সকলের দরোজা খোলা থাকে। এই বছর রমনার বটমুলের বৈশাখের আবাহন, চারুকলার ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’সহ তিন পার্বত্য অঞ্চলের বৈশাখি আবাহন ‘বৈসাবি’ অনুষ্ঠান স’গিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ ইলিশ মাছ ও সবজি দিয়ে পান্তাভাত অথবা চিড়া-গুড় ও দই খাওয়ার মাধ্যমে এই দিনটি শুরু হয়। যদিও ইলিশ ধরা বারণ থাকে তাই বাঙালি এই বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার জন্য পূর্বেই তা সংরক্ষণ করে। নতুন পোশাক পরে। নারী-পুরুষ-শিশুদের জন্য ফ্যাসন-ডিজাইনাররা নতুন নতুন পোশাক তৈরি করে; বাজারজাত করে। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে যার যার সামর্থ অনুযায়ী নতুন পোশাক পরে বেড়ায় আনন্দ করে; নতুন নতুন পদ রান্না করে অতিথি অপ্যায়ন করে। শুধু বাংলা দেশেই নয় বঙ্গাব্দের সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সম্মিলন ঘটায় বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে এই নববর্ষ পালিত হয়ে থাকে। ইয়াঙ্গুন (বার্মা) এ তিন দিনব্যাপী নববর্ষের উৎসব পালিত হয়। এই উৎসবের নাম ‘মহা দিজ্ঞান’; ‘দিজ্ঞান’ অর্থ পরিবর্তন। মহা দিজ্ঞান হলো বৃহৎ পরিবর্তন। এই ১৩ এপ্রিল শুরু হয়ে ১৬ এপ্রিল শেষ হয়। এইসময়ে ইয়াঙ্গুনের জনগণ ঘরবাড়ি ও মঠ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে। প্রার্থনা, উপবাস করে। তারপর একে অপরের গায়ে ‘দিজ্ঞান জল’ ছিটিয়ে বর্ষা মওসুমের আগমন কামনা করে। তাঁরা মনে করে জল আত্মাকে পরিষ্কার করে। এই অনুষ্ঠান স্বল্প পরিসরে হলে তাকে ‘কুলা দিজ্ঞান’ বলে। থাইল্যাণ্ড-এ নববর্ষ পালিত হয় ‘সংক্রান’ নামে, তিব্বতে ‘লোসার’, চীনে ‘ইউয়ান তান’ নামে নববর্ষের অনুষ্ঠান আনন্দ-উৎসবের সঙ্গে পালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে পুরো বৈশাখ মাস জুড়েই থাকে অনুষ্ঠান। মন্দিরে পূজা আর প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে বৈশাখি অনুষ্ঠান শুরু হয়। তারপর পুরোমাস ধরে চলতে থাকে। বৈশাখ মাসকে তারা শুভমাস বলে মনে করে। পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে বিবাহ উৎসব পালিত হয়। নতুন কাপড় কেনার ধুম পরে সর্বত্র।

কিন’ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নভেল করোনা বা কোভিড-১৯ কাল চলছে; চলছে ‘সামাজিক দুরত্ব’ দিনযাপন। বাংলাদেশে নববর্ষের সকল অনুষ্ঠান স’গিত ঘোষণা করা হয়েছে। নববর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমিতেও কোনো মেলা বসছে না। চারুকলা অনুষদ থেকে বের হচ্ছে না নয়নাভিরাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়নি; আর নভেল করোনা বা কোভিড – ১৯ এর জন্য এই বছর নববর্ষের সব অনুষ্ঠান স’গিত করা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয় এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই নববর্ষের অনুষ্ঠান স’গিত ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে শুধু মৃত্যু; লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুসংখ্যা! বর্তমানে বিশ্বে মানবস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন এই অবস্থাতে কোনরকম আনন্দ করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়! এখন শুধু প্রার্থনাকাল, ভালোবাসা এবং ভালোথাকা, ভালোরাখার সময়; তাই কোনো কর্মসূচি না থাক, না হোক কোনো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, নাটক-যাত্রাপালা, বটতলাতে গানে গানে বর্ষবরণ না হোক, কোথাও যাওয়া হোক না হোক আসবে নতুন বছর আসবে বৈশাখ। তাই নতুন বছরের প্রার্থনা হবে ঘরে বসেই; প্রার্থনা হবে এই পরিসি’তি উত্তোরণের। ঘরে বসেই গীত হবে “এসো হে বৈশাখ”। আমাদের প্রার্থনা হবে এসো বৈশাখ এসো, রোগ-শোকতাপ মুছে এসো ভালোবেসে এসো, নতুন দিনের নতুন ভরসা নিয়ে এসো।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন পত্রপত্রিকা

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615