তিনি সৃজক! সৃজক অর্থ স্রষ্টা, যিনি জন্ম দেন। আমার সৃজক যিনি, তিনি চেয়েছিলেন সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে কিন্তু হয়নি! তাঁর সকল চেষ্ট ব্যর্থ হয়েছে; কেন? তাই তো বলার জন্য চেষ্টা করতে করতে এতদূর এসেছি আমি! আমি বাঁক নিয়েছি, অন্যদিকে! কেন? কারণ মাঝপথে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন আমাকে; এই আমি, যে হারিয়ে গেছে সে নই, আমি অন্য ধাঁচে গড়ে উঠেছি! এখন আমাকে অন্য ধাঁচে এনেছেন তিনি; আমিও এসেছি! তাঁর জন্য আমার খুব মায়া হয়েছে, মায়া হয়েছে কারণ একটু বেশিমাত্রায় বেখেয়ালে থাকেন তিনি! বেখেয়ালেই হারিয়ে ফেলেছেন আমাকে! হারিয়ে ফেলে অবশ্য অর্বাচীনের মতো আমাকে খুঁজেছেন; এখানে-ওখানে-সেখানে! আমাকে পাওয়ার জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখেননি তিনি কিন’ সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তাঁর! আমি বুঝতে পেরেছি তাঁর নয়ন ভরা জল টুপটুপ করছে, পলক ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বুকের আঁচলে ঝরেও গেছে সেই জল! তবু খুঁজেছেন; বারবার ব্যর্থ হয়েও খুঁজেছেন! অনেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন কিন’ কারও সান্ত্বনা নিতে পারেননি কারণ সান্ত্বনা দেওয়া বা নেওয়া পছন্দ নয় তাঁর, কোনকালেই পছন্দ করেননি তিনি। তাঁর সব সময় মনে হয় কোন কিছু সৃষ্টি করতে হলে এমন কষ্ট হয়ই! তিনি মনে করন, বুকের ভেতর হারিয়ে ফেলার কষ্ট, না-থাকার দুঃখকে লালন করতে না পারলে পরে আর কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন না তিনি! না-পাওয়ার ব্যথা, হারিয়ে ফেলার বেদনা, হারিয়ে না-পাওয়ার দুঃখ, খুঁজে খুঁজে না-পাওয়ার কষ্ট সবই বুকের ভেতর লালন করতে হয় বলেই তাঁর বিশ্বাস! ব্যথা-বেদনা-দুঃখ-কষ্ট যত্নে লালন না করতে পারলে কোন কিছু সৃষ্টি করা যায় না বা সৃষ্টি হয় না! এ কথা আমি জানলাম কী করে, কারণ আমি তাঁর ভেতরে ঢুকতে পারি, তাঁর মনের কথা বুঝতে পারি! তিনি যখন আমাকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন তখন তো তাঁর মনের মধ্যেই ছিল আমার উপসি’তি! তখনই বুঝেছি কতটা ভালোবেসে কতখানি মনযোগে আমাকে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তিনি!
আমি কে? আমি কে তা এখনও বলার সময় আসেনি বলবো সব বলবো, আমি কে? কি আমার পরিচয়? না, না, আমি “পূণ্য পীযূষ স্তন্যবাহিনী” নই, অনন্ত প্রবাসী বা অনন্ত প্রবাহিনীও নই! তবে নৃ-মনে অনন্ত প্রবাহিনী হতে পারতাম কোন এক সময়ে! তিনি আমাকে সেরকমই তৈরি করতে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলেন। তিনি আমাকে এমনভাবে তৈরি করতে চেয়েছিলেন যে আমাকে যিনি পাবেন শুধু তিনি নন, অনেকেই যেন আমাতে মনোসংযোগ করতে পারেন অর্থাৎ আমি যেন সকলের মনযোগ আকৃষ্ট করতে পারি, কোনভাবেই ব্যর্থ না হই। প্রকারন্তরে আরও চেয়েছিলেন, আমি যেন কারও আলস্যের কারণ না হই। কারণ মনীষীগণ বলেছেন “আলস্য সকল দোষের আকর।” অলসতার কারণে মানুষ সফলতা অর্জন করতে পারে না। অলসতা নৃ-চরিত্রের বড়ো দোষ। অলসতা লক্ষ্যহীন করে তোলে মানুষকে। আমার সৃজক একটু বেখেয়ালি তবে অলস নন! তিনি সবসময় আলস্য পরিহার করে চলেন। তিনি কাজের মধ্যে থাকতে ভালোবাসেন; যেনতেন কাজ নয় এমন কিছু কাজ যে কাজের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে মানুষ; মানুষ সেটি নিয়ে কিছুটা সময় চিন্তা বা আনন্দের খোরাক যেন পায়! তিনি অলসতা এক্কেবারেই পছন্দ করেন না।
তিনি প্রায়শ: কাছের মানুষদের একটি ইংরেজী প্রবাদের কথা বলেন যার বাংলা করলে দাঁড়ায় “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” তিনি বলেন, মানুষের পরিচয় তাঁর কর্মের মধ্যে। মানুষ তাঁর কর্মফলেই এই পৃথিবীতে মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে। যেমন বেঁচে আছেন বিজ্ঞানী, বেঁচে আছেন কবি-সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক, বেঁচে আছেন খেলোয়াড়, বেঁচে আছেন সমাজসেবী এবং সৎ রাজনীতিবিদগণ। এই ধরণীতে মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকার জন্য জীবনের একটি লক্ষ্য সি’র করতে হয়। এবং সেই লক্ষ্য হতে হবে শুভ অর্থাৎ মানবকর্মের একটি শুভ দিক থাকতে হবে। না, নাহ্! বিস্ময়ের কিছু নেই, এটিই সত্য! মানুষ তাঁর ভালো কাজের মধ্যেই মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে অলস হলে চলবে না! আমি জানি, তিনিও মাঝেমধ্যে অলস হয়ে পড়েন; এই যেমন পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যান, প্রয়োজনীয় বিষয় চ্যাট করছেন, করতে করতে বিষয়টি বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম ভাঙার পরে অবশ্য আফশোস করেন। কিন’ কাজ ভন্ডুলের পরে আফশোস করলে তো কারও কিছুই যায়-আসে না, যা হওয়ার বা যা ঘটবার তা ঘটে যায় কারণ চলে যাওয়া সময় কখনও ফিরে আসে না। সময় কখনও অপেক্ষাও করে না। অপেক্ষার কথা বলতেই মনে হলো, অপেক্ষা আমার ধাতে সয় না! তবে সব কাজ বা সৃষ্টিতে এক-আধটু অপেক্ষা করা ভালো। তবে একেবারে শেকড় গজিয়ে অপেক্ষা করা ভালো নয়। কারণ এক মুহূর্ত কালও এই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়। এই এক ‘মুহূর্ত কাল’ই সৃজকের সৃষ্টিতে তাঁর নামের স্বাক্ষর রেখে যেতে পারে পৃথিবীর বুকে যুগান্তরের ইতিহাসের পাতায়!
ঈশ্বর যখন এক একজন মানুষকে এই পৃথিবীতে পাঠান তখন নির্ধারিত কর্ম এবং কর্মফল নির্ধারণ করেই পাঠান! মানুষকে সেই কাজ সমাধা করে যেতে হয়! ঈশ্বরের কাছে দায়বদ্ধ প্রতিটি মানুষ! এই মানবজীবন সংক্ষিপ্ত। এই পৃথিবীর চলার পথ তাঁর জন্য খুব যে দীর্ঘ বলা যাবে না। এক হিসেবে বলা যায়, যতটুকু সময় একজন মানুষের হাতে আছে বা থাকে সেটুকু সময়ের সদ্ব্যবহার করা নৃ-ধর্ম। না-না, আমি সময় নই! তবে আমার মধ্যে সময়কে ধরে রাখার ব্যবস’া বা কৌশল আছে; যে কেউ ইচ্ছে করলেই পারবে না বা পারে না তাঁকে সচেষ্ট থাকতে হয়! নির্ধারিত সময়কে ধরে রাখার জন্য এবং নিজেকে মৃত্যুর পরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাকে ব্যবহার করেতে পারে! একটু অনুশীলনে একটু যত্নে আমাকে সৃষ্টি করলে আমি ঋদ্ধ হবো আর কালের গর্ভে বীলিন না হয়ে মানবের বুকে বিরাজ করে সময়কে ধরে রাখতে পারবো আর সেই সুবাদে সৃজককে ধরে রাখতে পারবে সময়!
আমি কে? কে আমি? এখনই বলছি না, বলবো একটু বাদে, না বলে তো যাবো না, যেতে পারবো না! আমি বৃক্ষ নই! আমি পীচঢালা পথ নই, খোয়া বিছানো রাস্তা নই, মাটি ফেলা সড়কও নই! আমি নই আকাশপথ বা আকাশযান! কোন নৌযান নই যে মাঝি ভাটিয়ালি গেয়ে বাইবে সেই যান! আমি ছায়া দিতে পারি না, ফুল-ফল দিতে পারি না, পাতাও ঝরাতে পারি না তবে পাতার পর পাতা ভরাতে পারি! আমি পথ-সড়ক-মহাসড়ক নই; কোন গাড়ি চলে না আমার বুকের ওপরে, কারও পদচিহ্ন নেই এই বুকে, কারও পদচিহ্ন নিতে পারি না আমি!
নাহ্! স্বদেশ নই আমি! স্বদেশ ভালোবেসে কেউ যদি কিছু দেয় তবে সযত্নে বুকে রাখি। সবসময় ভাবি স্বদেশ নিয়ে কারণ এখানেই তো থাকি, থাকতে হয়। কখনও বা কেউ আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে চায়, পারেও। অনেকে ভালোবেসে কাছে টানতে পারে আমাকে; নিয়ে যেতে পারে তাঁদের কাছে। আমার যেতে ইচ্ছা না করলেও যেতে হয়; কেউ যদি ভালোবেসে দেয় নিতে হয়! তবে নিতে ইচ্ছা করে না। ষড়ঋতুর বৈচিত্রময় এই স্বদেশের আলো হাওয়ায় বড্ড বাঁচতে ইচ্ছা করে আমার। কিন্তু হয় না! এই যে কথা বলছি আগেকার আমি, এই আমারও তো বেঁচে থাকা হলো না! হলো নারে হলো না!
আমি কে? আবারও প্রশ্ন! বলছি তো বলবো, বলবো সময় হলেই বলবো! এখন শুধু বলি, তিনি আমার সৃষ্টির মধ্য নিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, কাজই প্রধান, কাজই ধর্ম। কর্মহীন জীবন কখনও মনুষ্যজীবন হতে পারে না। কর্মই মানুষকে একটি সুন্দর সার্থক জীবন দিতে পারে। একজন মানুষ তাঁর জীবিত অবস’ায় যে কর্ম করে তাঁর সেই কর্ম অনুসারেই তাঁর জীবনচরিত রচিত হয়ে থাকে। তাই তো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, “মোর লাগি করিও না শোক/ আমার রয়েছে কর্ম আমার রয়েছে বিশ্বলোক…।” মানুষ চলে গেলে সকলেই শোক করে কিন’ সেই শোক সীমিত সময়ের জন্য! কথায় আছে, আজ মরলে কাল দুইদিন, বরাতজোর হলে তিনিদিন। এই তিনদিন পরে মনে রাখে না কেউ। এমন কিছু কাজ করা প্রয়োজন যাতে এই পৃথিবীর বাতাসে নিজের নাম ধ্বনিত হয়! যেমন হয়েছে যুগ যুগ ধরে; এই পৃথিবীর মানুষ এখনও স্মরণ করে, খনা, রামী, রাণী রাসমনী, চন্ডিদাস, মুকুন্দদাস, আশালতা, বেগম সুফিয়া কামাল, বেগম নূরজাহান, প্রীতিলতা কমলা, এমনই সকল মনীষীদের। শুধু সুকর্ম করেই যে মানুষ স্মরণীয় হয় তা নয়, কু-কর্মেও মানুষ স্মরণীয় হয়ে আছে কেউ কেউ এই পৃথিবীতে।
না, আমি কর্ম নই তবে কর্মের স্বক্ষর বহন করতে পারি! না, নাহ্! মৃত্যু নই আমি! আমার যে মৃতু হয় না তা নয়! অন্যের ভুলে আমার মৃত্যু হতে পারে, হয়ে যায় কখনও! আমি মৃত্যুকে নিজে ডেকে আনি না, আনতে চাই না কখনও! যে কোন সৃজকের বেখেয়ালে মৃত্যু হতে পারে আমার। আমি আমার সৃজকের কথা জানি, জানি তাঁর চিন্তা-ভাবনার কথা; আমার সৃজক যিনি, তিনি মানেন এই পৃথিবীতে মানবজীবন একবারই আসে; আর সেই জীবনের পরিসর খুবই ছোট! পুনর্জন্মের কথা শোনা গেলেও বা পুনর্জন্ম হলেও মানুষ তাঁর আগের জীবন ফিরে পায় না কখনও। ঈশ্বরের কাছ থেকে হোক আর বিজ্ঞানমতে হোক মানুষ যখন এই পৃথিবীতে আসে তখন সে একটি নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল এবং নির্দিষ্ট কর্মঘন্ট নিয়ে আসে। মানুষের এই কর্মঘণ্টকাল শেষ হয় যখন তখনই মানুষের যাওয়ার সময় হয়, মানুষ চলে যায়! বিশ্বাস হোক বা না হোক একজন মানুষের যতদিন এই পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় থাকার সময় নির্ধারিত থাকে ততদিন তাঁকে পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় থাকতেই হয়, খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। কিন’ নির্ধারিত খাদ্যগ্রহণকালে মানুষের আয়ু থাকলেও মানুষ খাদ্য গ্রহণ করতে অপারগ হয়! একজন মানুষ কখনও জানতে পারে না কোন ঘরে, কী অবস’ায় সে জন্ম নেবে; তাঁর আগামি কোথায় কীভাবে কী নিয়ে অপেক্ষা করছে। আল্লা-ঈশ্বর-ভগবান-বিজ্ঞান যাই বলা যাক না কেন বা যেভাবেই ভাবনা-চিন্তা করা হোক না কেন ঐ এক জায়গায় গিয়ে থেমে যেতেই হয়, যার নাম নিয়তি! ঐ নিয়তির হাতে মানুষ সমর্পণ করে নিজেকে, করতেই হয়;
না করে উপায় থাকে না মানুষের; কেউ যদি বলে সে নিয়তি মানে না, মানবে না তাহলে ভুল হবে তা নয়; এটা হলো যার যার বিশ্বাস! কেউ মানতে পারে আবার নাও পারে।
মৃত্যু নই আগেই বলেছি তবে নিহন্তাও নই, আত্মহননকারীও নই! আমি মানুষও নই! আমার জন্ম হয় তবে মানুষের মতো নয়! মানুষ জন্মের পর একটু একটু করে বেড়ে উঠতে থাকে; পরিবারের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের সাহচর্যে বড়ো হয়; আর এই বড়ো হওয়ার মুহূর্ত থেকেই তাঁর জীবনের লক্ষ্য স্থির করে কিংবা তাঁর অভিভাবক লক্ষ্য স্থির করিয়ে দেয়। লক্ষ্য স্থির হয় ঠিক কিন্তু কয়জন তাঁর লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারে বা স্থিরকৃত গোলপোস্টে তাঁর বলটি ঢুকিয়ে দিতে পারে? কেউ যে পারে না তা নয়, অনেকে পারে আবার অনেকে পারে না। তবে লক্ষ্যে পৌঁছানোর নিমিত্ত হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে বা কসরত করে সকলেই! লক্ষ্যে পৌঁছানোর নিমিত্ত হাঁটতে হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে দৌড়াতে বা কসরত করতে করতে যখন পৌঁছাতে পারে না তখনই মানুষ বিষণ্ন ও হতাশ হয়ে পড়তে পারে! এবং বিষণ্ন ও হতাশাক্রান্তের কোন এক মুহূর্তে আত্মহত্যার মতো একটি কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে! বিষণ্ন ও হতাশাগ্রস’ সব মানুষই যে আত্মহত্যা করে তা নয়, অনেকেই এই আত্মহত্যা না করার মানসিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারে! মানুষ আত্মহত্যা করে কেন? এবং কারণ কী শুধু এই একটাই; না তা নয়! আত্মহত্যার যথেষ্ট কারণ আছে তবে সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো নিজেকে ভালো না বাসা! একজন মানুষ যদি নিজেকে ভালো না বাসে তা হলে তবে নিজের পরিবার, মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, আশেপাশের মানুষ কাউকে সে ভালোবাসতে পারে না, পারবে না! নিজের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে তাঁর বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। আরও কারণ হিসেবে ধরা যায় মানুষ যখন কাজ করতে করতে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে তখন তাঁর মনে কোনভাবে যদি ধারণা জন্মে এত করার পরেও কিছু হলো না! জীবনে ‘কিছু হলো না’ এই কথা মনে আসলেই নিজেকে বাঁচানোর ইচ্ছা শেষ হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। তাই সব সময় মনে রাখা যায় ‘একবার নয় বারবার’ তাহলে জীবন কখন তার গতি হারাবে না। মনে রাখা প্রয়োজন যা করা হয়েছে বা যে পথে এগিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই পথে এই কাজ করলে লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না তখন অন্য পথ এগুতে হবে; নতুন উদ্যেমে কাজে লাগতে হবে।
মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? আত্মহত্যা বিষয়ে মনোবিজ্ঞানীদের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, মানসিক স্বাসে’্যর বিষণ্নতার কারণে মানুষ তাঁর জীবন বিসর্জন দেয় অর্থাৎ আত্মহত্যা করে। ‘হু’ এর জরিপে উঠে এসেছে, বিশ্বে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকে (সময়ের আলো ১০.০৯.২০২০)। আত্মহত্যার মুহূর্তে মানুষ থাকে না নিজের মধ্যে কখনও কখনও তাঁকে পেয়ে বসে নস্টালজিয়ায় তখন অজানা অস্তিত্বে তলিয়ে যায় স্মৃতির অতলে জীবন; সেই অস্তিত্বে কোন এক দুর্বল মুহূর্তে মৃত্যু এসে জবরদখল করে এবং প্ররোচিত করে। আত্মহত্যা করার পরমুহূর্তে কখনও কখনও মানুষের বাঁচার ইচ্ছা জাগে এই মানবিক পৃথিবীতে! কিন’ তা কখনও সম্ভব হয় কখনও হয় না। মানুষ আত্মহত্যা করে? মনোবিজ্ঞনীদের কথাই সকলে বলবে যে, যখন মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ থাকে, বিষণ্ন থাকে তখন কোন এক দুর্বল মুহূর্তে নিজের জীবন বিসর্জন দেয় মানুষ। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, দিচ্ছেন; এই কাতারে আছেন কবি-সাহিত্যিক-অভিনেতা-মন্ত্রী-নারী-কন্যাশিশু-তরুণ-তরুণী। এদের মধ্যে কেউ বা নিপীড়িত, কেউ অত্যাচারিত, অপমানিত, কেউ বা কিছু করতে না পারার কষ্টে ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে নিজের প্রাণটাই দিয়ে দিয়েছেন! এমন ভাবেই জীবন দিয়েছিলেন ভার্জিনিয়া উলফ, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ইয়ানুনারি কাওয়া, ইয়োকো মিশিম, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়… এত নাম বলতে বলতে দল ভারি হয়ে যাবে আরও।
সম্প্রতি করোনাকালে ঘটে যাওয়া আত্মহত্যার কথা সবাই জানে। করোনা হয়েছে বলে আত্মহত্যা করেছে ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্র। করোনাভাইরাস চলাকালে রাষ্ট্রের কী হবে ভেবে আত্মহত্যা করেছেন মন্ত্রী। রাস্তায় যাওয়া-আসার সময়ে অশিষ্ট-অশীল-অশালীন উক্তি, অভব্য ব্যবহারে আত্মহত্যা করে স্কুল-কলেজ পড়-য়া ছাত্রী। গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা গিয়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা দরিদ্র দেশগুলোতে বেশি কারণ দারিদ্রতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল করে দেয়। তাছাড়া কাজ না থাকায় ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। চোখের সামনে পরিবারের অসহায়ত্ব পীড়া দেয় তখন জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় অনেকে; ফলে এই পথ বেছে নিয়ে পরিবারকে শেষ করে নিজের শেষ হয় কিংবা পরিবারকে পথে বসিয়ে এই পথ বেছে নেয়! করোনাকালে নারী-শিশু নির্যাতন বেড়েছে! শুধু করোনাকালে নয় নারী নির্যাতন সবসময়ই ছিল, আছেও! দেশের পত্রিকাগুলো খুললে নারী নিয়ে নানারকম ঘটনা উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। ঐ সব খবরের সঙ্গে আত্মহত্যার খবরও পাওয়া যায়! এবং দৈনিকসহ অন্যান্য পত্রিকায় দেয় তথ্যের ভিত্তিতে মহিলা পরিষদ বলছে, শুধু ২০১৯ সালে ২০৮ জন নারী ও কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে, ১২ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা পেয়েছে ৫৬ জন।
তবে আত্মহত্যা যাতে না হয় সে জন্য ১০ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা দিবস হিসেবে পালন করা। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও আত্মহত্যা দিবস পালন করা হয়। এবারের আত্মহত্যা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো “ওয়ার্কিং টুগেদার টু প্রিভেন্ট সুইসাইড” অর্থাৎ “আত্মহত্যা প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করা।” যিনি আত্মহত্যা করেন দায় যেমন তাঁর তেমন-ই দায় পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের! পরিবার থেকে আত্মহত্যা রোধে সচেষ্ট হতে হতাশার ভেতর দিয়ে যিনি যাচ্ছেন তাঁকে সঙ্গ দেওয়া, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা জরুরি। পরিবার, সমাজ সর্বোপরি রাষ্ট্রের এমন কোন আচরণ করা ঠিক নয় যাতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। মানুষ যদি মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে, একত্রে কাজ করে, একসঙ্গে চলে তাহলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে যাবে। সমাজের অন্যায় বিচার-আচারের বিরুদ্ধে এবং যারা কুপথে গিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যদি রুখে দাঁড়ানো যায় তাহলে হয়তো অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যারোধ করা সম্ভব বলে মনে করা যায়। নৃ-জীবনে একজন ভালো বন্ধুর প্রয়োজন। এমন বন্ধু যাকে মন খুলে সব কথা বলতে পারা যাবে। সে বন্ধু হতে পারে মা-বাবা-ভাই-বোন কিংবা সতীর্থদের কেউ কিংবা পাড়ার কেউ। তবে এমন একজন হতে হবে যাকে মন খুলে সব কিছু বলতে পারা যায়। আত্মহত্যা না করার বিষয়ের শিক্ষা পরিবার থেকেই আসে; জীবনের সফলতা এবং ব্যর্থতা দুটি দিকই মানুষ তাঁর ছোটবেলা থেকে অনুধাবন করতে পারে, দুটি দিক সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল থকে, অনুধ্যান করে, সত্ত্বগুণ প্রবল থাকে তাহলে এই প্রবণতা অনেকাংশে কমে যেতে পারে। আত্মহত্যানিরোধ সম্পর্কিত বিষয় মানুষের মধ্যে প্রচারে সচেষ্ট হতে পারে অনেক সৃজক, মানুষের জীবনের প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে অনেক সৃজক সফল হয়েছেন, আগামিতে হবেনও এই আশাবাদ ব্যক্ত করে শেষ করা যায়! যারা আত্মহত্যার বিপক্ষে তাঁরা শুধু নয় সকলেই জানে এবং বিশ্বাস করে, বিস্তৃত এক কামাক্ষ্যা মায়ায় সহজ স্বাভাবিক জীবন হয় রক্তাক্ত/ শোকার্ত ডহর চারদিকে জল শুধুই জল, জলে ভাসে অগণিত/ সুখের লাশ, সব অন্ধকার, থাকে না আলো, থাকে না বাতাস/ তারপরেও স্বইচ্ছায় যেতে চায় না কেউ…! আত্মহত্যা মানুষের এক নাজুক মুহূর্তের কাজ; তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে এবং আমি অবশ্যই মনে করতে পারি সকল সৃজক তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মহত্যানিরোধকল্পে কিছু কাজ উপহার দিতে চেষ্টা করবেন।
সবশেষে বলা যায়, আমি স্বদেশ নই, ষড়ঋতু বা কাশফুল নই, নই বৃক্ষ, নই পুষ্পলতা-ফড়িং-প্রজাপতি; নই মৃত্যু, নই শব, নই হননকারী বা আত্মহননকারী নই! আমি, অশ্রুভেজা একজন লেখকের একটি হারিয়ে (Delete) যাওয়া পাণ্ডুলিপি।
