উত্তরায়নের পথে// আফরোজা অদিতি (প্রবন্ধ)

ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে ‘সংক্রান্তি’ হলো সংস্কৃত শব্দ। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে সূর্যের বারোটি রাশি; মেষ,বৃষ, মিথুন, কর্কট, বৃশ্চিক, সিংহ, কন্যা, তুলা, ধনু, মকর, কুম্ভ, মীন। এই বারোটি রাশি নিয়ে যে রাশিচক্র গঠিত হয় তার মধ্যে ২৭টি নক্ষত্র অবস্থান করে। এই ১২ রাশি এবং ২৭ নক্ষত্র নিয়ে রাশিচক্র পূর্ণ হয়। চাঁদ ২৭ দিনে এই ১২ রাশি এবং ২৭ নক্ষত্র একবার প্রদক্ষিণ করে। পুরাণ অনুসারে জানা যায় যে প্রজাপতি রাজা দক্ষের ২৭টি সুন্দরী কন্যা ছিল। দক্ষ রাজা অনেক চেষ্টা করেও যখন মেয়েদের জন্য উপযুক্ত বর পেলেন না তখন মনস’ করলেন চন্দ্রদেবের সঙ্গে ২৭ জন সুন্দরী কন্যার বিয়ে দিবেন। চন্দ্রদেব বিয়ে করলেন! ২৭ সুন্দরী স্ত্রীকে সামলাতে একটি বুদ্ধি বের করলেন যে ১২ রাশির চক্রের মধ্যে তার স্ত্রীদের এমনভাবে ঘর বেঁধে দিবেন যেন প্রতি মাসে অন্তত একবার স্ত্রীদের সাক্ষাৎ দিতে পারেন। এইভাবেই চন্দ্রদেব তার স্ত্রীদের মাসে একবার দেখা দেন এবং বাঁকি তিন দিন বিশ্রাম নেন। এবং আমরা জানি যে, বারো মাসে এক বছর এবং প্রত্যেক মাসের সংক্রান্তিতেই সূর্যের বারোটি রাশির একটি রাশির পথ পরিবর্তিত হয়। চাঁদের এই রাশি পরিক্রমণকেই আমরা মাস বলি। এটি চান্দ্রমাস। চান্দ্রমাসে তিথি থাকে। ৩০টি তিথি যার ১৫টি তিথি নিয়ে শুক্লপক্ষ আর ১৫টি তিথি নিয়ে কৃষ্ণপক্ষ।

শুক্লপক্ষ আর কৃষ্ণপক্ষ নিয়ে একটি মাস। আর বারোটি মাসে ছয়টি ঋতু। ঋতুর পালাবদলে বাংলাদেশের প্রকৃতির ভিন্নরূপে সেজে ওঠে। এই দেশের ঋতুবৈচিত্রে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের প্রভাব বেশি থাকলেও অন্য চারটি ঋতুও তাদের ভিন্ন ভিন্ন রূপবৈচিত্রে অনন্য। আমাদের ঋতু বৈচিত্রে শীত পঞ্চম ঋতু। পৌষ-মাঘ এই দুটি মাস মিলে শীতকাল হলেও হেমন্ত ঋতুর মাঝামাঝি অর্থাৎ অগ্রহায়নের শেষ থেকেই হালকা শীত অনুভূত হয়। এই সময় সূর্য দক্ষিণে সরে যায়। সূর্য দক্ষিণে সরে যাওয়াতে উত্তর গোলার্ধে সূর্যকিরণ তির্যকভাবে পড়ে। দিন ছোটো এবং রাত্রি বড়ো হয়। এই সময় বায়ুর দিকও পরিবর্তিত হয়। হিমালয় থেকে হিম-বায়ু প্রবাহিত হয়; উত্তুরে হাওয়ায় আসে শীতের আবহ। বাতাসে জলীয়বাষ্প কম থাকে বলেই এই সময় বৃষ্টি কম হয়, তাপমাত্রাও কম থাকে। প্রকৃতিতে আসে পরিবর্তন। গাছের সবুজ পাতা ক্রমশ হলুদ হতে থাকে তারপর ঝরে যায়। হেমন্তে সোনালি ধান কাটা হয়; শীতকালের কিছু ফসল ছাড়া মাঠ প্রায় শূন্যই থাকে। তবে সরিষাফুলে প্রকৃতি সতেজ হয়। শহর থেকে বেরুলে দেখা যায় সরিষাফুল বাতাসের সঙ্গে খুনসুটি করছে! কিশোর-কিশোরীদের সেই সরিষা-মাঠের হলুদ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দৌড়ে বেড়াতে দেখা যায় কখনো-সখনো! সরিষাফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌমাছি। সরিষাফুলের মধুর স্বাদ অন্য মধুর থেকে আলাদা; মধুর স্বাদ মধুর মতোই মিষ্টি।

বাঙালি আনন্দপ্রিয়। বাঙালি সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ থেকে চৈত্রসংক্রান্তি পর্যন্ত একটা না একটা উৎসব লেগেই আছে। তাই বলা হয়ে থাকে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই উৎসব ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। এইসময় হিন্দু ধর্ম-অনুসারীরা পূণ্যস্নান করেন; পূজা-অর্চনা করেন; পৌষসংক্রান্তিতে মেলা হয়, কোথাও মোরগ লড়াইও হয়। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে অনেকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত হওয়ায় পারস্পারিক সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং এক অপরকে জানারও পরিবেশ বা সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ, বসন্তবরণ উৎসবের মতো পৌষসংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তিতে রমনার বটমূলে (অশত্থমূলে) পিঠা-উৎসব হয়। রমনার বটমূল ছাড়াও পিঠা-উৎসব হয় বকুলতলা, রবীন্দ্র সরোবরসহ বেশকয়েকটি স’ানে। এই সময় পিঠা-উৎসবের সঙ্গে বাঙালি ঐতিহ্যের বাউল গান, পালাগান, জারিগানের সুরে মেতে থাকে ছোটোবড়ো সকলে। এই মেলাতে ভাপা,চিতই, দুধচিতই মালপোয়াসহ নানারকম পিঠার আয়োজন হয়ে থাকে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই দিনটিকে ঘিরে নানা উৎসব পালিত হয়। বাংলাদেশে পৌষমেলা বা পৌষ-সংক্রান্তি বললেও এই দিনটি নেপালে মাঘি, থাইল্যান্ডে সংক্রান, মিয়ানমারে থিং ইয়ান কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে নতুন ফসলের উৎসব হিসেবে এবং ‘উত্তরায়নের সুচনা’ হিসেবেও পালিত হয়। শান্তিনিকেতনে (৭ পৌষ থেকে ৯ পৌষ) প্রতিবছর তিন দিন পৌষ-উৎসব হয়। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলাতে লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান, আতসবাজী ও বিভিন্ন রাজ্যের হস্তশিল্পের প্রদর্শনীর আয়োজন
করা হয়ে থাকে।

শীতের ভোর কুয়াশা-আবৃত থাকে। শিশিরে সিক্ত থাকে মাঠের সবুজ ঘাস। নদীতে পানি কম থাকে। শরতের কাশফুল মিইয়ে ঝরে যায়। শীতের সময় আর কাশফুলে সেই সৌন্দর্য থাকে না। কাশবনে কেউ যায় না। মরা নদীর তীরে কেউ হাঁটে না। দিন থাকে শুকনা। শীতের বেলা সূর্য উঠতে উঠতেই ডুবে যায়। তবু কিছু ফুলফল, বৃক্ষপত্র আছে যা প্রকৃতিকে সাজিয়ে মানবমনকে আনন্দ দেয়। এই সময় প্রকৃতির কোলে দেখা যায় গাঁদা, দোপাটি, সর্যমূখী, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, অতসী, অশোক, কুরচি, ইউক্যালিপটাস, ক্যামেলিয়া, বাগানবিলাস, গোলাপ,সরিষা।

শহরে শীতকালের প্রভাব অতটা দেখা না গেলেও শীতের প্রকোপ দেখা যায় গ্রামে। শীত যখন বেশি পড়ে তখন আগুন পোহায় গাঁয়ের কিছু মানুষ। আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে নানা রকম কথা বলাবলি করা, গল্প বলা এমন কি সাংসারিক সুখ-সুবিধা নিয়েও আলাপ আলোচনাও করে থাকে; তবে বর্তমানে গ্রামের এই দৃশ্য কম চোখে পড়ে কারণ হাড়-কাঁপানো দাঁতে দাঁত লাগানো শীত এখন পড়ে না বললেই চলে। শীতের সময় খেজুর গাছে কোমরে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছের বুক চিরে রসের জন্য হাঁড়ি বাঁধে গাছি। শীতের ভোরে গাছে বাঁধা হাঁড়ি থেকে রস খেতে খুব ভালো লাগে কিন’ অনেক সময় রসের হাঁড়িতে সাপ-বাদুড় মুখ দিতে পারে তাই সাবধান হওয়া ভালো। শীতকালে হাটে-বাজারে নতুন খেজুর গুড় ওঠে তখন নানা রকম পিঠা পায়েস খাওয়া হয়। পাটালিগুড়ের বা খেজুর গুড়ের পিঠা-পায়েস(ক্ষীর) খেতে যত ভালো লাগে আখের গুড়ের পিঠা-পায়েস খেতে তত ভালো লাগে না। শুধু রস আর পিঠা নয়, শীতের সময় অন্যান্য শাক-সবজি খাওয়ারও সুবিধা; এই সময় আলু,শিম,মুলা,কপি,বরবটি, লাল শাক,ধনেপাতা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় রুই, কাতল, শিং, মাগুর সব মাছ। বর্তমানে সবকিছুরই চড়া দাম! তবুও শীতের সবজির স্বাদ অন্য সময়ের সবজিতে পাওয়া যায় না বলেই চড়া দামেই কিনে খায় মানুষ। শীতে খাওয়া-দাওয়ার সুখই আলাদা; এই সময় খাবার নষ্ট হয় কম। শুধু খাওয়া-দাওয়া, খেলা-উৎসব নয় এই সময় বস্ত্রশিল্পও প্রাধান্য পায়। নানা রকম উলের সুয়েটার-শাল, কোট, প্যান্ট, ফ্ল্যানেল কাপড়ের জামা বানান হয়; বানানো হয় লেপ-তোষক। তবে যাদের টাকা আছে তারা এইসব বানাতে-কিনতে পারে! দরিদ্রদের কাছে আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র! তবে পরোক্ষভাবে বস্ত্রশিল্প-সংশ্লিষ্টজনেরা কিছুটা হলেও উপার্জনের মুখ দেখতে পায়।

শীতকাল একদিকে ভালো আবার অন্যদিক দিয়ে অনেকটা অসুবিধা নিয়ে আসে। শীতকালে মানুষের মধ্যে একটু জড়তা দেখা দেয়। তবে যখন সূর্য তাঁর মুখের ঢাকনা খুলে উজ্জ্বল বিভা ছড়িয়ে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয় তখন মানুষ আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে। শীতের প্রকোপে সর্দি-কাশি-ঠাণ্ডার প্রকোপ বাড়ে। দরিদ্র জনগণের কাছে অবশ্য শীত একটা অভিশাপের মতো। অনেকের মাথার ওপরে ছাদ নেই, অনেকের নেই গরম কাপড়! আমাদের দেশের জনগণ শুধু দরিদ্র নয়, অনেকেই দরিদ্রসীমার নিচেও বাস করে। অনেক শিশু আছে যারা নিজেদের আহার নিজেরাই সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়। শিশুশ্রম যদিও গ্রহণযোগ্য নয় তবুও আমাদের দেশে শিশুশ্রম না হলে চলে না; ঐ শিশুটির শ্রমেই হয়তো বেঁচে থাকে শিশুটির পরিবার। বর্তমান তো করোনাকাল। এই করোনাকালে মধ্যবিত্তরা এখন দারিদ্রসীমাতে দাঁড়িয়েছে আর দরিদ্ররা দাঁড়িয়েছে দারিদ্রসীমার নিচে। অনেকেই বেকার হয়েছে। বেকারের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে! এমনিতেই করোনা তার ওপরে বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-ঝড়-টর্নেডো উপকুলের মানুষগুলো খাদ্য-বস্ত্র-গৃহহীন হয়ে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615