কথাবলা পুতুল// আফরোজা অদিতি (অনুবাদগল্প)

সারাহ্‌-এর চাচা জর্জ দূরে কোথাও গিয়েছিলেন, সেখান থেকে সারাহ্‌-এর জন্য একটি সুন্দর পুতুল এনে বললেন,“তোমার জন্য কি এনেছি! শুধু অনুমান করো!” তিনি লম্বা একটি বাক্স টেবিলের ওপর রাখলেন, সেটি দেখে সারাহ্‌ বলল, “ওহ্‌, আঙ্কল,একটি বড়ো পুতুল, তাই না?”
“ঠিক, এটি একটি বড়ো পুতুল সারাহ্‌ এবং দেখতে জীবন্ত! এটি দাঁড়াতে পারে, হাঁটতে পারে যেমন তুমি পারো!”
সারাহ্‌ লম্বা বাক্সের ঢাকনা খুলে দেখলো, সেখানে টিসু পেপারের মধ্যে তার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর পুতুল শুয়ে আছে। পুতুলটি বড়ো, কোঁকড়ানো বাদামি চুল, সত্যিকারের চোখের পাপড়িসহ নীল চোখ! যখন পুতুলটি উঠালো তখন দেখা গেল পুতুলটি অবিকল সারাহ্‌-এর মতো দেখতে এবং তার সুন্দর হাসিমুখে সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছিল। “আঙ্কল, খুবই সুন্দর একটি পুতুল দেখলাম!” আনন্দে চিৎকার করে আঙ্কল জর্জকে জড়িয়ে ধরে বলল সারাহ্‌, “ওহ্‌, খুব সুন্দর! আমি এটি আমার কাছে রেখে দিবো, কখনও কাকেও দিবো না।”
“এই কথা শুনে আঙ্কল জর্জ বললেন, “ওহ্‌, তুমি এমন স্বার্থপর হয়ো না। তুমি বন্ধুদের সঙ্গে এটি নিয়ে খেলবে। তারাও একে ভালোবাসবে। তুমি তাদের সঙ্গে এটি নিয়ে খেলবে সারাহ্‌।”
“আমি পারবো না।” বলল সারাহ্‌। সুন্দর পুতুলটিকে নিয়ে বুকে জড়িয়ে আদর করতে করতে আরও বলল,“সে শুধু আমার, সম্পূর্ণ আমার। আমি তাকে প্রিন্সেস মেরীগোল্ড বলে ডাকবো কারণ সে দেখতে রাজকন্যার মতো।”
রাজকন্যা মেরীগোল্ড এই শহরের মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর পুতুল যা কখনও দেখা যায়নি। সে শুধু সুন্দর ছিল না, সে চালাক-ও ছিল। সে মানুষের মতো দুই পায়ে ভর দিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াতে পারতো-তার পেছনের চাবি তিন অথবা চারবার ঘোরালে রূমের মধ্যে এক পা আগে-পিছে করে এমনভাবে হাঁটবে যে সবাই আশ্চর্য হবে! সে তার চোখ বন্ধ ও খুলতে পারে। সে এমনভাবে তাকিয়ে থাকবে যে মনে হবে সে জীবন্ত। সারাহ্‌ খুব অহংকারী আর আনন্দিত হলো।
সে রাজকন্যা মেরীগোল্ডকে তার পুতুলদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো দোলনা দিলো এবং সব চাদর এবং কম্বল ধুয়ে দিলো যাতে তার নতুন পুতুল সুন্দর বিছানায় শুতে পারে। সে দিনে দুইবার পুতুলের ড্রেস বদলায়, এবং পুতুলের সুন্দর চুল আঁচড়িয়ে দেয়। সারাহ্‌, পুতুলটির জন্য যা করে আর কেউ-ই যেন তার পুতুলের জন্য তা করতে পারবে না।
প্রথম দিকে সারাহ্‌-এর সঙ্গে ভালো এবং সুখি ছিল প্রিন্সেস মেরীগোল্ড। “কী সুন্দর, দয়ালু ছোট্ট মেয়ে!” একদিন রাতে দোলনাতে শুয়ে তার সুন্দর নীল চোখ বন্ধ করে ভাবছিল “আমি খুব ভাগ্যবান যে এখানে থাকতে পারছি।”
কিন’ কিছুদিন পর তার মনের পরিবর্তন হলো। সারাহ্‌ তার পুতুলের প্রতি খুব দয়ালু ছিল কারণ তাকে নিয়ে গর্বিত ছিল এবং তার সব বন্ধুদের ঐ পুতুলটিকে দেখিয়ে গর্ব অনুভব করতো। সারাহ্‌ অন্যদের প্রতি আচরণে ভালো ছিল না এবং দয়ালুও ছিল না। সে মায়ের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতো, সে অবাধ্য ছিল এবং যে সব ছেলেমেয়ে তার সঙ্গে চা খেতে আসতো তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতো; এককথায়, সে সেইসব অসুখি বাচ্চাদের একজন যাকে কোন না কোন সময় দেখা যায়!
মেরীগোল্ড তার ব্যবহারে খুব কষ্ট পেলো যখন অ্যালেন,প্যাম এবং ক্যারেন চা খেতে এসে নতুন পুতুলটি দেখতে চেয়েছিল। এবং সারাহ্‌ খুব ন্যাকামি করে তার পুতুলটি দেখাচ্ছিল।
সে অ্যালেনের হাঁটুতে ধাক্কা দিলো,প্যামের জামা পেছনে উঠিয়ে আর নামাতে দিলো না। সে ক্যারেনের চুলের ক্লিপ খুলে লুকিয়ে ফেলল। পুরোটা সময় সে ফিকফিক করে হাসলো এবং বকবক করলো, তার এই অসভ্যতামি দেখে বাড়ি যাওয়ার কথা চিন্তা করলো অ্যালেন। সে বলল,“সারাহ্‌ তুমি যদি এমন ব্যবহার করো তবে আমি বাড়ি চলে যাবো। এই রকম বোকা বোকা আচরণ করো না।”
“হ্যাঁ সে নির্বোধ,” গমগমে আওয়াজ হলো। “সে খুব অভদ্র! আমি সবসময় দেখছি সে একটি অসভ্য, নির্বোধ বালিকা। তুমি বাড়ি চলে যাও অ্যালেন।”
সারাহ্‌ ঐ তিন বাচ্চার চারপাশে ঘুরলো,ওদের দেখলো এবং বলল,“কে বলল একথা? কে বলল আমি অসভ্য,নির্বোধ।”
“আমি জানি না।” অ্যালেন শঙ্কিত হয়ে বলল। “আমি বলিনি।”
“আমিও না।” প্যাম এবং ক্যারেন তাদের মাথা ঝাঁকিয়ে বলল। ওদের কেউই জনতো না মেরীগোল্ড কথা বলতে পারে।
“তোমাদের কথা মাকে বলবো আমি।” মাটিতে পা ঠুকে বলল সারাহ্‌।
“বলো, গল্প বলো।” পুনরায় বলল সেই কণ্ঠ। “ভীতু সারাহ্‌, গল্প বলো।”
“আমার নাম ধরে ডাকতে পারো না তুমি।” সারাহ্‌ চিৎকার করলো এবং সে তার খেলনা-আলমারির দরোজার কাছে গেল। সেখানে খেলনাগুলো দাঁড় করানো ছিল তার পাশে বসে পড়লো এবং তাদের টেনে বের করতে করতে বলল,“আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলবো না! আমি তোমাদের সঙ্গে খেলবো না! আমি তোমাদের নতুন পুতুল দেখাবো না!”
“বেবী, নষ্ট বেবী!” কণ্ঠস্বরটি বলল। প্যাম,অ্যালেন এবং ক্যারেন একে অপরের দিকে হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলো। তারা ভাবছিল তাদের মধ্যে কে এইসব কথা বলছিল?
তারা ছোট ছোট পায়ের শব্দ শুনে ঘুরলো। মেরীগোল্ড তাদের দিকে হেঁটে আসছে। ওরা তিনজন আনন্দে প্রায় কেঁদে ফেলল।
“বাহ্‌! কী সুন্দর পুতুল! কেমন চালাক সে! সে হাঁটছে দেখো!”
সারাহ্‌ রাগে ফুঁসছিল। “কে তার হাঁটার জন্য চাবি ঘুরিয়েছে। তোমাদের এত্তো বড় সাহস তোমরা আমার পুতুল ছুঁয়েছো।”
প্রিন্সেস মেরীগোল্ড তাকে অবজ্ঞা করে বাচ্চারা যেখানে হাঁটুগেড়ে বসেছিল সেখানে এলো। সে তার চোখ পিটপিট করে এমনভাবে তাকালো যেন সে জীবন্ত।
“সে আসলেই জীবন্ত।” বলল ক্যারেন। “ওহ্‌, আমার হাঁটুর ওপর এসো মেরীগোল্ড।” কিন্তু সে পুতুলটি নেওয়ার আগেই ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে খুব জোরে ধাক্কা দিলো সারাহ্‌ – এবং পুতুলটি মাটিতে পড়ে গেল।
“সে সবসময়েই অশান্ত আর রূঢ়।” পুতুলটি নালিশ জানালো। “সে কি চড় খেতে চায়!”
“ প্যাম আর তুমি ক্যারেন, তোমাদের এত্তো বড় সাহস, এই কথা আমাকে বলো,?” চিৎকার করে উঠলো সারাহ্‌।
“আমি তোমাদের চপেটাঘাত করবো।” এবং সে ভীত মেয়েদের চড় মারলো। ক্যারেন আর্তনাদ করে উঠলো এবং সারাহ্‌-এর মা সেখানে ছুটে এলেন।
“কী ব্যাপার? তোমরা কি করছো?”
“আমার পুতুল নিয়েছে প্যাম,” হাহাকার করে উঠলো সারাহ্‌। সে সবসময় প্রথমেই নালিশ করে। “সে খুব খারাপ মেয়ে, ক্যারেনও।”
“না, তুমি খারাপ মেয়ে!” পুতুলটি বলল। “তুমি আবার গল্প শুরু করলে। তুমি খুব খুব খারাপ!”
সারাহ্‌-এর মা জানতো না যে পুতুলটি কথা বলতে পারে। সে চিন্তা করলো এটি একটি বাচ্চা পুতুল, এই বাচ্চাদের মতোই একজন! “ওহ্‌ সারাহ্‌” তিনি বললেন,“নিশ্চয় তুমি সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছো? তুমি তো জানো, ওরা তোমার মেহমান!”
“তুমি ওদের পক্ষ নিতে পারো না মা। এটা করতে পারো না তুমি!” সারাহ্‌ চিৎকার করলো। এবং তার মেজাজ সপ্তমে চড়লো। “তুমি খুব খারাপ করছো মা, আমি পছন্দ করি না তোমাকে।”
“সে কি সত্যিই বিরক্তিকর নয়?” পুতুলটি উচ্চস্বরে বলল। “আমি আমার জীবনে এই রকম স্বভাবের মেয়ে কখনও দেখিনি। কেন তাকে কেউ শাস্তি দেয় না?”
সারাহ্‌ এর মা অপ্রস’ত হলো। অ্যালেন, প্যাম আর ক্যারেন কি বলবে! ওহ্‌ সারাহ্‌ আবার খারাপ মেজাজে আছে। সারাহ্‌ এর মা বললেন, “এখন এখন, অপ্রীতিকর কিছু বলবো না, কেউ না। আমরা নিচে চা খেতে যাবো। মেরীগোল্ডও যেতে পারে।”
মেরীগোল্ড বাচ্চাদের সঙ্গে নিচে গেল। সে ভাবলো সে সারাহ্‌-এর পাশে বসবে না। সে অ্যালেনের পাশে বসবে। সে খুব ভালো ছেলে।
মেরীগোল্ড সারাহ্‌ এবং অ্যালেনের মাঝখানে বসলো। চা পর্ব শুরু হলো। খুব ভালো চা চকলেট দিয়ে বানানো এবং সারাহ্‌ এর পছন্দের চা। সারাহ্‌ লোভী ছিল। সে সব একাই নিতে চাইতো। সে গেস্টদের প্লেটের দিকে তাকালো না, তাদের কিছু এগিয়েও দিলো না।
“গেস্টদের দিকে লক্ষ্য করো।” তার মা বললেন।
“ওহ্‌ মা, অসি’র হয়ো না তো।” রূঢ়ভাবে বলল সারাহ্‌। “তারা নিজেরাই নিজেদের দেখতে পারে।”
“মায়ের সঙ্গে এমন ব্যবহার কল্পনাও করতে পারি না।” মেরীগোল্ড এতো উচ্চস্বরে বলল যে সকলেই লাফিয়ে উঠলো। কেউ বিশ্বাস করতে পারলো না যে, পুতুল এমন করে কথা বলতে পারে। তারা তো সুন্দর কথা বলে।
“সে কি লোভী নয়? আর এমন খারাপ ব্যবহার! কাউকে কিছু সাধলো না,দিলো না। আমি অনুমান করছি সবচেয়ে বেশি চকলেট সে গোগ্রাসে খেয়েছে।” পুতুলটি বলল।
সারাহ্‌ কেঁদে ফেলল। “মা কেন তুমি আমার সম্পর্কে অন্য মানুষের মতো কথা বলছো। আমি অ্যালেন,প্যাম অথবা ক্যারেনকে আমার সঙ্গে চায়ের জন্য আর ডাকবো না।”
সে তার চেয়ার থেকে নামলো, টেবিল ক্লথ ঝটকা মেরে টেনে নিচে ফেলল এবং দুধসহ কাপগুলো মাটিতে ফেলে দিলো।
“ওদের কাছে আবার যাবে, ওদের ডাকবে।” পুতুলটি বলল। “অসভ্য,অমার্জিত এবং রূঢ়! বখে যাওয়া একটি মেয়ে।”
“কে বলল এ কথা?” বাচ্চারা মাথা নাড়লো। “আমি বলিনি,” অ্যালেন বলল। এবং প্যাম আর ক্যারেন একই কথা বলল। তখন ক্যারেন আশ্চর্যজনক একটি কথা বলল, “আমার বিশ্বাস এ-কথা বলেছে তোমার নতুন পুতুল!” সে আরও বলল, “আমি নিশ্চিত! আসলে সে চালাক! চোখ খোলে এবং বন্ধ করতে পারে, দাঁড়াতে পারে, হাঁটতে পারে। সে নিশ্চয় কথাও বলতে পারে। আর আমি নিশ্চিত এই কথা বলেছে প্রিন্সেস মেরীগোল্ড।”
“ওহ্‌, না-না সোনা – সে এ কাজ করেনি!” সারাহ্‌ এর মা বললেন। “পুতুল কখনও এভাবে কথা বলতে পারে না। তোমরা বসো। আর সারাহ্‌ তুমি আচরণ ঠিক করো তোমার।”
“কিছুতেই না,” বলল সারাহ্‌ এবং সে পুতলটি তুলে নিয়ে ঘর থেকে চলে গেল। যেতে যেতে বলে গেল,“এ-কথা আমার পুতুল বলেনি। আমি নিশ্চিত অ্যালেন বলেছে! সে শুধুমাত্র আমাকে দোষ দেওয়ার জন্য এই ভয়ঙ্কর কথা বলেছে! আমি তোমাদের কারো সঙ্গে খেলবো না।”
সে দৌড়ে ওপর তলায় চলে গেল। এবং চেয়ারে বসে রইলো, রাগে তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়লো। সে তার পুতুলটি তার পাশে রাখলো।
“ঠিক আছে, তোমার স্বভাবের জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত তোমার!” পুতুলটি নরম স্বরে বলল। এবং তার নীল চোখ বড় করে সারাহ্‌ এর দিকে লক্ষ্য রাখলো। ঘরের মধ্যে সারাহ্‌ আর পুতুল ছাড়া কেউ ছিল না। এবারে সারাহ্‌ জানতে পারলো ঐ কথাগুলো পুতুলের। সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে পুতুলের দিকে তাকালো। “তুমি এমন কথা বলেছ! খুবই আশ্চর্যজনক ঘটনা একটি পুতুলের জন্য- কিন’ তুমি এই রকম কথা বন্ধ করে আমার জন্য সুন্দর সুন্দর কথা বলবে!”
মেরীগোল্ড বলল,“আমি সব সময় যা সত্যি তাই বলি। এই সময়ে যা করেছ তা দেখে সবাই বলবে তুমি একটা স্বার্থপর বখে যাওয়া মেয়ে! সেজন্য যতোক্ষণ না তোমার আচরণ ঠিক করো, আমিও ঐ কথাই বলবো।”
সারাহ্‌ নিচে পুতুলের দিকে তাকালো। এতো খুব খুব অদ্ভুত জিনিস! পুতুল কথা বলে; সত্যি কথা বলে! এরকম কথা বলা পুতুলের মালিক হওয়া আনন্দের বিষয়! মেরীগোল্ডের ওপর বিরক্ত হলো সারাহ – কিন্তু চালাক পুতুলের কাছ থেকে এতোটুকু আনন্দ পাওয়ার মতো কোন সাহায্য পেলো না যে স্কুলে সে এই পুতুলের জন্য দম্ভ করতে পারে! কিন্তু এই সব কথা বলা বন্ধ করতে হবে তাকে।
“তুমি তোমার পছন্দমতো সব কথা বলতে পারো।”মেরীগোল্ডকে বলল সারাহ্‌। “কিন’ আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি- যদি তুমি আমার সম্পর্কে একটিও বাজে কথা বলো আমি তোমাকে বিছানেতেই রেখে দিবো।”
এই কথা শুনে পুতুলটি তাচ্ছিল্যভরে বলল,“আমি তোমার মতো বাচ্চাদের সঙ্গে থাকবো না। আমি হাঁটতে পারি, হেঁটে হেঁটে চলে যাবো।”
“তুমি খুব খারাপ পুতুল।” সারাহ্‌ রেগে বলল “আমি চেয়েছিলাম তোমার পোশাক পাল্টে রাত- পোশাক পরিয়ে দোলনায় শুইয়ে দিতে।”
“খবরদার না!” মেরীগোল্ড বলল এবং তার ছোট পা মেঝেতে ঠুকলো। তখন সারাহ্‌ ঝটকা
মেরে পুতুলকে তুললো এবং তার পোশাক খুলতে শুরু করলো। তারপর বলল, “ঠিক আছে! তুমি অবশ্যই দেখবে আমি খারাপ,দুষ্টু পুতুলের সঙ্গে কী করি!”
পুতুলটি আপ্রান চেষ্টা করা সত্ত্বেও সারাহ্‌ পুতুলের সুন্দর পোশাকটি ছিড়ে ফেললো। সে পেটিকোট ও অন্যান্য পোশাক খুলে মেরীগোল্ডকে রাত-পোশাক পরিয়ে দিয়ে খুব খারাপ ভাবে মেঝেতে বসিয়ে দিলো। তারপর বলল,“আমি একটি চুলের ব্রাশ আনবো তারপর তোমার চুলে ব্রাশ করবো এবং পরে ঐ ব্রাশ দিয়ে তোমাকে মারবো।”
এই কথা শুনে মেরীগোল্ড এক সেকেণ্ডও দেরী করলো না, উঠে দাঁড়িয়ে দরোজার দিকে দৌড় দিলো। এবং সে অ্যালেন,প্যাম ও ক্যারেনকে এদিকে আসতে দেখলো।
“তাকে থামাও, তাকে থামাও!” চিৎকার করলো সারাহ্‌।
“না আমাকে যেতে দাও!” মেরীগোল্ডও চিৎকার করলো আর বলল,“এ রকম একজন ভয়ঙ্কর বালিকার সঙ্গে থাকতে চাই না। আমি অন্য কারো সঙ্গে থাকবো, যেতে দাও আমাকে।”
বাচ্চারা একদিকে দাঁড়িয়ে ছিল। এবং সে দৌড়ে নিচের প্যাসেজে নেমে সিঁড়িতে দাঁড়ালো! এবং পা পিছলে গড়াতে গড়াতে সিড়ির ওপর থেকে নিচে পড়লো। তারপরেও সে উঠে বাগানের দরোজার দিকে দৌড়ে যেতে যেতে বলল, “আমি জানি কোথায় দরোজা! সে হাঁফাচ্ছিল। “আমিই একমাত্র সারাহ্‌ এর আগেই সেখানে পৌঁছুতে পারি!” পুতুলটি পেরেছিল কারণ সারাহ্‌ কে থামাতে চেষ্টা করলো অ্যালেন। সেই সময় ক্রদ্ধ বালিকা নিচে পুতুলটিকে দেখতে পায়নি।
“সে কোথায় যেতে পারে? কেউ দেখেছ? তাকে থামাও, তাকে থামাও!” চিৎকার করে বলল সারাহ্‌। কিন’ কেউই মেরীগোল্ডকে পিছলে পড়ে বাইরে যেতে দেখেনি, সারাহ্‌ তার নার্সারিতে দৌড়ে এসে কান্না শুরু করলো।
সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,“সে খুব সুন্দর এবং চালাক! তার রাত-পোশাকও সুন্দর! কিন’ আমি ভাবতে পারছি না কেন সে আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেল!”
অ্যালেন, প্যাম এবং ক্যারেন পুতুলটির চলে যাওয়ার আসল কারণ সহজেই বুঝতে পেরেছিল কিন্তু তারা এতোই ভদ্র ছিল যে তারা কিছুই বলল না। তারা ভাবলো তাদের বিদায় নিয়ে চলে যাওয়াই ভালো। তারা চলে গেল এবং যেতে যেতে হেসে গড়িয়ে পড়লো।
“সারাহ্‌ পুতুলের জন্য পাগল আর পুতুলটা ওর কাছ থেকে পালিয়ে গেল। আমি শুধু এটাই ভাবছি সে যেন আমার কাছে আসে।” অ্যালেন বলল।

কিন্ত পুতুলটি না অ্যালেন না প্যাম না ক্যারেন কারো বাড়িতে গেল না। আমার মনে হয় সে সারাহ্‌ এর সঙ্গে আবার যদি দেখা হয় সেই ভয়ে পালিয়েছে, কিন্তু সে নিশ্চয় কারো না কারো বাড়িতে গিয়েছে এবং কার বাড়িতে গিয়েছে তা জানতে পারলে আমি খুশি হতাম!

[ কথাবলা পুতুল, একটি অনুবাদ গল্প। দি টকিং ডল, এই গল্পের মূল লেখক এনিড ম্যারি ব্লাইটন (১১ আগস্ট ১৮৯৭- ২৮ নভেম্বর ১৯৬৮)। এনিড ম্যারি ব্লাইটন একজন ইংরেজ শিশুসাহিত্যিক। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। তাঁর বাবা, তাঁকে লেখালেখিতে উৎসাহ দিতেন কিন’ তাঁর মা লেখালেখি পছন্দ করতেন না। তাঁর মা মনে করতেন লেখালেখি সময়ের অপচয়। ১৯১৭ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা শিশুদের পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে তাঁর গল্প ও কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে ছাপা হতে থাকে। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘চাইল্ড হুইসপার’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। শিশুদের জন্য ৬০০ এর অধিক বই লিখেছেন তিনি। তিনি প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক। তাঁর বই ৯০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি একাধারে উপন্যাসিক, কবি, শিক্ষক ও ছোট গল্পকার।]

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615