নেংটি ইঁদুর এবং ধেড়ে ডাকাত ইঁদুর// আফরোজা অদিতি

মি. ট্রিকল,একজন পরী। তার একটি বিশাল বাড়ি ছিল। সেই বাড়িটিকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য তার অনেক চাকর-বাকর ছিল। রাঁধুনি মিসেস ট্রিম; সে রান্না করতো, হাউস-কীপার লাকী-লু;ঘর-দোর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং বাড়ি দেখাশোনা করতো, কিচেন-মেইড টিপি; রান্নাঘরের কাজ এবং মিস নিডল সেলাইয়ের কাজ করতো।

একদিন মিসেস ট্রিম কিছু পার্সলে পাতা আনতে বাগানে গেল। সেই দিনটি ছিল নববসন্তের উষ্ণ আর সুন্দর একটি দিন এবং পাখিরা গান গাইতে শুরু করেছিল। মিসেস ট্রিম গুনগুনিয়ে গান গাইছিল। বাগানে যেতে যে কাঠ রাখার ঘরটি আছে, সেটি পার হওয়ার সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। সে একটি শব্দ শুনতে পেয়েছিল। কী হতে পারে সেটা? স্ক্র্যাপ,স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাবল, স্ক্র্যাবল, স্ক্র্যাবল, করে শব্দটা হচ্ছিল। এরপর সেই শব্দ থেমে গেল। একটু পরে আবার শুরু হলো স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাপ…

“উ-উ-উ। ইঁদুর” মিসেস ট্রিম চিৎকার করলো। সে ইঁদুর সহ্য করতে পারে না। সে জানে তারা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সে আরও জানে যে সে ইঁদুর দেখে যতোটা ভয় পায় ইঁদুর তাকে দেখে তার থেকেও বেশি ভয় পায়। কিন’ তারপরেও সে ভয় পায় কারণ যখন সে ছোট ছিল তখন একবার তার থেকে বড় একজনকে ইঁদুর দেখে ভয় পেতে দেখেছিল এবং সে-ও ভয় পেয়েছিল। তাই মিসেস ট্রিম সেখানে দাঁড়িয়েই চিৎকার করতে থাকলো “উ-উ। ইঁদুর। এটা যেন দরোজা দিয়ে বাইরে না আসে।” মিসেস ট্রিমের চিৎকার শুনে লুসি-লু দৌড়ে বাগানে এলো।
“কী হয়েছে?” সে চেঁচিয়ে জানতে চাইলো। “আপনি কি ব্যথা পেয়েছেন?”
কাঁপা কাঁপা আঙুল তুলে বন্ধ দরোজা দেখিয়ে মিসেস ট্রিম বলল, “ওখানে কাঠ রাখার ঘরে একটা ইঁদুর। আমি জানি ওটি ওখানে আছে। আমরা এখন কী করবো লুসি-লু?”
আতঙ্কে চিৎকার করলো লুসি-লু। “ইঁদুর। ওহ্‌! এটা আমাদের দিকে আসার আগেই তাড়াতাড়ি চলুন।” বলল লুসি-লু। আবার শব্দ হতে লাগল, স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাবল, স্ক্র্যাবল, স্ক্র্যাবল…।
মিসেস ট্রিম ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। সে বলল,“শব্দ শুনে মনে হচ্ছে এটা অনেক বড় ধেড়ে ইঁদুর, তুমি কি মনে করো, আমাদের মি.ট্রিকলকে জানানো উচিত?”
বাগানে কি হয়েছে দেখার জন্য কিচেন-মেইড টিপি এসে হাজির হলো। ওরা সবকিছু বলল তাঁকে। “তুমি ভাবতে পারো ওখানে একটি ইঁদুর! আমরা খুব ভয় পেয়েছি টিপি।” এই কথা শুনে টিপি-ও চেঁচিয়ে উঠল। কিন’ সে নিজেই জানে না কেন চেঁচালো সে। তবে সে যেহেতু সবাইকে ভয় পেতে দেখেছে সেহেতু সে ভাবলো চেঁচানোটাই ভালো হবে! তার চেঁচানিতে অন্যেরা আরও কেঁপে উঠলো।

কাঠ রাখার ঘরের শব্দটা থেমে গেল। মিসেস ট্রিম বলল, “তুমি ওকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ টিপি। আশা করছি ওটি বাইরে আসবে না।” একটু পরে শব্দটা আবার শুরু হলো এবং সকলে লাফিয়ে উঠলো।
স্ক্র্যাপ- স্ক্র্যাবল-স্ক্র্যাপ-স্ক্র্যাবল; শব্দ শুনে টিপি বলল,“একটা নেংটি ইঁদুরের পক্ষে শব্দটা অনেক বড়ো। এটি নিশ্চয় ধেড়ে ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর না।” এই কথা শুনে সবার চিৎকার আরও বেড়ে গেল! ধেড়ে ইঁদুর!ভয়ঙ্কর! “ধেড়ে ইঁদুর কামড়ায় তাই না?” মিসেস ট্রিম বলল এবং সে একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “ওহ্‌ খোদা! আমাদের এই জায়গাটি কি ধেড়ে আর নেংটি ইঁদুরে ভরে যাবে? আমাদের অবশ্যই মি. ট্রিকলকে বলতে হবে। মিস নিডল দৌড়ে এলো কি হয়েছে দেখার জন্য।
“একটা নেংটি ইঁদুর।” বলল মিসেস ট্রিম।
“না একটা ধেড়ে ইঁদুর।” বলল টিপি। নিজেকে শান্ত রেখেছে সে। “উফ, কী ভয়ঙ্কর, তাই না! শেডের ভেতরে ইঁদুর! আমি আর কখনও এখানে কাঠ নিতে আসবো না।”
স্ক্র্যাপ, স্ক্র্যাবল, স্ক্র্যাপ, ক্র্যশ; শব্দ শুনে চারজন মহিলাই লাফিয়ে উঠলো। কিসের শব্দ! শেষ মাথায় কিছু ভাঙলো? কিছু একটা হবে? তারা দাঁড়ালো, শুনলো এবং কেঁপে উঠলো। তারা হিসহিস শব্দও শুনলো। তখন সেখানে কাঠের বাক্স ধুপ করে পড়ে যাওয়ার আওয়াজ হলো।
“এটি কোন নেংটি অথবা ইঁদুর নয়, এটি কোন চোর হবে।” চিৎকার করে বলল লাকি-লু।
“সেখানে একজন মানুষ হবে!” আর্তস্বরে বলল টিপি।
“আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি।” মিসেস ট্রিম বলল।
“আমাদের অবশ্যই মি.ট্র্রিকলকে ডেকে আনতে হবে।” বলল মিস্‌ নিডল। তারা হুড়মুড় করে বাগানে গেল। টিপি সারা রাস্তা আর্তস্বরে চিৎকার করতে করতে গেল। তারা, মি. ট্রিকলকে তাঁর স্টাডিতে রেগে টং হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। “এখানে তোমরা কি করছো?” তিনি কঠোরভাবে বললেন। “ডিনার চুলার ওপর পুড়ে গেছে। আমি দশ মিনিট ধরে বেল টিপে যাচ্ছি। কী হয়েছে?”
“ওহ্‌, মি. ট্রিকল, আমরা চিন্তা করছি কাঠের শেডের মধ্যে ইঁদুর আছে।” মিসেস ট্রিম বলতে শুরু করলো।
“বোকার মতে কথা বলো না।” মি. ট্রিকল বলল। তিনি আরও বললেন,“এই কথায় নিশ্চয় কষ্ট পাওনি তুমি।”
“কিন’ আমরা ভাবছিলাম নিশ্চয় ইঁদুর।” বলল লাকি-লু। সে ছো্‌ট আর্তনাদ করে বলল,“ওহ্‌, মি. ট্রিকল, একটি ইঁদুর!উ:!”
“বোকা মেয়ে।” মি.ট্রিকল বললেন। তাঁকে খুব রাগি দেখাচ্ছিল। “কাঠের শেড বন্ধ থাকে, নাকি থাকে না? তোমরা, কুকুর সঙ্গে নিয়ে শেডের দরোজা খুলতে?”
“ঠিক কথা, আমরা আর ইঁদুরের কথা ভাববো না।” বলল মিস নিডল।
“মি. ট্রিকল, আমরা চিন্তা করছি সেখানে ডাকাত আছে! সত্যিই শব্দ ছিল! উ:! ডাকাত! আমরা কীভাবে রাতে ঘুমাবো?”
“বেহালার ছড়ি, আবর্জনা এবং আজেবাজে জিনিসে ঠাসা!” মি. ট্রিকল ক্রুদ্ধ বললেন।
“তোমরা কী মনে করে এই সব অদ্ভূত জিনিস নিয়ে ব্যস্ত রয়েছ? এখানে রাতের খাবার পুড়ে গেছে আর তোমরা সকলে মিলে ঝামেলা করছো এখানে! তোমরা চাও…”
“ওহ্‌ মি.ট্রিকল, আমাদের তিরস্কার করবেন না।” মিসেস ট্রিম কেঁদে ফেলল। “ঐ দেখ ওখানে দুইজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাঁদের ডাকি এবং তাঁরা ডাকাতকে অ্যারেস্ট করতে পারে।” মিসেস ট্রিমকে বাধা দেওয়ার আগেই সে দৌড়ে রাস্তায় গিয়ে পুলিশদের ডাকলো। তাঁরা আশ্চর্য হলো। কিন’ তারা যখন ডাকাতের কথা শুনলো তখন তাঁরা খুশি হলো।

“শেডের ভেতরে শব্দ শুনে মনে হচ্ছে সেখানে নিশ্চয় দুইজন ডাকাত আছে।” টিপি বলল। এবং সে আরও একবার আর্তস্বরে চিৎকার করলো।
“আর একবার তুমি চিৎকার করলে তোমাকে পরবর্তী বাসে বাড়ি পাঠিয়ে দিবো আর সেখানেই তুমি থাকবে।” মি. ট্রিকল বললেন।

টিপি আর চিৎকার করলো না। তারা সকলে বাগানে গেল। মি. ট্রিকল-এর নেতৃত্বে কাঠের শেডের কাছে পৌঁছুল সকলে। 

“কে দরোজা খুলবে?” বলল মিসেস ট্রিম। “ওহ্‌ আবার … সেখানে আবার শব্দ হচ্ছে!”
ঠিক কাঠের শেডের ভেতরে যথেষ্ট আওয়াজ হচ্ছিল;অল্প আওয়াজ এবং তারপর ফোঁস। মি. ট্রিকল শুনলো তারপর হাসলো।
“হা হা, হো হো, হি হি! আমি এখন তোমাদের নেংটি ইঁদুর- ধেড়ে ইঁদুর-ডাকাত দেখাবো! মি.ট্রিকল হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দরোজা খুললেন। দুইজন পুলিশ ডাকাত ধরার জন্য প্রস’ত হলো।

 তখন, শেডের অন্ধকারে প্রত্যেকে দেখলো কিছু একটা বুকে হেঁটে গোল হয়ে ঘুরছে, সেটি তার পিঠে বড় কিছু বহন করছে। 
“এটি আমার কচ্ছপ” মি. ট্রিকল বললেন। “আমি এটিকে শীতে ঘুমানোর জন্য তাকের ওপর একটি বাক্সে রেখেছিলাম। এবং আমার মনে হয় এই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় ওটির ঘুম ভেঙেছে এবং সে হাঁটার জন্য বেরিয়েছে।” কচ্ছপটি তার ছোট্ট ফোঁস আওয়াজ করে বের হওয়ার চেষ্টায় আঁচড় কাটলো। যখন সে বের হলো তখন অনেক  জিনিস নিচে পরছিল যা মেঝেতে ছড়িয়ে যাচ্ছিল! এবং কচ্ছপটি নিজেও মেঝেতে পরলো এবং ঐ জায়গা পার হওয়ার জন্য বুকে হেঁটে যাওয়া শুরু করলো।
“ওহ্‌!” মিসেস ট্রিম বলল এবং লজ্জা পেলো।   
  পুলিশের একজন বলল,“দরোজা খোলা এবং কোথায় শব্দ হচ্ছিল দেখলাম; এটি দেখতে খুব সুন্দর!” 
অন্য পুলিশ বিরক্তির সুরে বলল,“আমাদের সময় নষ্ট।”

কচ্ছপটি বুকে হেঁটে রোদে বের হলো। “তাহলে তুমি ঘুম ভেঙে উঠলে।” বললেন মি. ট্রিকল। তিনি আরও বললেন, “ঠিক আছে, তুমি পছন্দ মতো হাঁটো, কিছু খাও তোমার রাতের খাবার হিসেবে, তুমি খুব ভাগ্যবান তুমি যে কোন খাবার খেতে পারো, আমার তো রান্না করে খেতে হয়!”
মিসেস ট্রিম লাল হয়ে গেল লজ্জায়। লজ্জায় লাল হয়ে লাকি-লু,টিপি, মিস নিডল-এর পেছনে লুকালো। মি. ট্রিকল বললেন,“আমাদের কাছে কোন রাতের খাবার নাই। নেংটি ইঁদুর-ধেড়ে ইঁদুর-ডাকাত সম্পর্কিত বিষয় থেকে বের হতে না পারো, তোমরা ইচ্ছো করলে যা রান্না হয়েছে তা খেতে পারো। এবং এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো তাহলে তোমরা তোমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে বাড়ি চলে যাও। আমি আশা করবো, তোমরা তোমাদের কাজের জন্য লজ্জিত হবে! চিন্তা করো তোমাদের মধ্যে কেউ ছয় বছরের মেয়ের মতো দরোজা খুলতে পারলে না – কেন?” মি. ট্রিকল বেরিয়ে গেল।
মিসেস ট্রিম বলল,“আমি নেংটি অথবা ইঁদুর সম্পর্কে বোকা বোকা কথা বলব না। এখানে আমরা ভালো ডিনার হারিয়েছি, দুইজন পুলিশকে শুধু শুধু ডেকেছি এবং আমাদের চাকরি হারানো কাছাকাছি পৌঁছেছিলাম! সবকিছুই ঘটেছে ইঁদুর-ভয়ের কারণে যা এখানে ছিলই না।”
তোমরা এমন করবে? তোমরা দরোজা খুলে ভেতরে দেখবে? অবশ্যই তা করবে এবং আমিও করবো!

(অনুবাদ গল্প : নেংটি ইঁদুর ও ধেড়ে ডাকাত ইঁদুর, একটি অনুবাদ গল্প। দি মাউস অ্যান্ড র‌্যাট রবার, এই গল্পের মূল লেখক এনিড ম্যারি ব্লাইটন (১১ আগস্ট ১৮৯৭- ২৮ নভেম্বর ১৯৬৮)। এনিড ম্যারি ব্লাইটন একজন ইংরেজ শিশুসাহিত্যিক। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। তাঁর বাবা তাকে লেখালেখিতে উৎসাহ দিতেন কিন্তু মা লেখালেখি পছন্দ করতেন না। তাঁর মা মনে করতেন লেখালেখি সময়ের অপচয়। ১৯১৭ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা শিশুদের পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে তাঁর গল্প ও কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে ছাপা হতে থাকে। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘চাইল্ড হুইসপার’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। শিশুদের জন্য ৬০০ এর অধিক বই লিখেছেন তিনি। তিনি প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক। তাঁর বই ৯০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি একাধারে উপন্যাসিক, কবি, শিক্ষক ও ছোট গল্পকার।]

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615