সখির সংসার // আফরোজ অদিতি (শেষ অংশ)

ইতিমধ্যে সখি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে। সখি বাঁশীকে বলে, ‘ঢাকায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে ; চলো না ফিরে যাই গ্রামে। কি হবে এখানে থেকে।’ সেদিন খাওয়ার টেবিলে কথাটা পাড়ে সখি। সখির কথায় তামান্না বলে, ‘এতো শিগ্‌গির যাওয়ার তো তোর প্রয়োজন নেই। শরীরটা ভালো করে সারুক। তারপর যাস।’
‘নারে এখনই যাই। তারপর না হয় আবার আসবো।’ সখির আপত্তিতে তামান্না কোনো কথা বলে না। বেশ গম্ভীর হয়ে যায়। ভাত খায় না। চোখ দুটো ছল ছল করে। ওকে দেখে সখিরও কষ্ট হয়। পরদিন ওরা ঢাকা ছেড়ে চলে আসে। আসার সময় তামান্না সখিকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলো।

‘ভালোভাবে থাকিস। শরীরের যত্ন নিস। ওষধ খাস। আর অসুবিধা হলে চলে আসিস। আমার ঘর তো ফাঁকাই পড়ে থাকে।’ এরপর বাঁশীর দিকে ফিরে বলে, ‘আপনিও আসবেন। ওর যদি আসতে কষ্ট হয়, আপনি কিন’ আসতে ভুলবেন না।’

সখি, বাড়িতে পৌঁছে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। সংসার দেখাশোনা করে। রান্নাবান্না করে বাঁশীকে খাওয়ায়। বাগানের যত্ন নেয়। সব ঠিকঠাক মতো চলে, কিন' কোথায় যেন কি একটা ফাঁক রয়ে যায়। ওদের সম্পর্কের মনে হয় ফাটল ধরেছে। বাঁশী আর আগের মতো নেই। আগের মতো কথা বলে না। কবিতা পড়ে না। ওকে নিয়ে বেড়াতে যায় না। কি যেনো ভাবে। কোনো কথা বললে চমকে ওঠে। পনেরো দিন পার হয়ে গেছে ঢাকা থেকে আসা। সখির আবার জ্বর আসতে শুরু করেছে। জ্বর শরীরে কিছু ভালো লাগছিলো না ওর। রাতে বাঁশীকে খেতে দিয়ে অল্প কিছু মুখে দেয়। হাত ধুতে ধুতে ওর খেয়াল হলো, ও যে আজ খেলো না। ওর যে জ্বর এ-কথা বাঁশী একবারও বলে নি। জিজ্ঞাসাও করে নি।

ঢাকা থেকে ফিরে এসে এবার সখির জন্য বাঁশী একটা লোক রেখেছে। ওর নাম মর্জিনা। মর্জিনাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে ওর খাবার নিতে বলে ঘরে আসে সখি। আনমনা বসে আছে বাঁশী।
‘এ্যাই, কি হয়েছে তোমার বলো তো।’ সখির কথায় চমকে ওঠে বাঁশী। কই কিছু না তো। তাহলে তুমি কি ভাবো সবসময়? তাছাড়া আজ প্রায় পনেরো দিন তুমি একটাও কবিতা শোনাও নি।
‘কি শুধু কবিতা কবিতা করো। অন্যকথা বলো। কবিতা শোনাতে আর ভালো লাগে না।’ আনমনা বাঁশী কথাগুলো সখিকে বলে। সখি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। পরদিন বাঁশী ঢাকা আসতে চায়।
‘কেনো যাবে ঢাকা?’
‘একটা রিপোর্ট বাকি ছিলো মনে নেই। রিপোর্ট নিয়ে তোমার অসুখের বিষয়ে কনসাল্ট প্রয়োজন।’
‘লাগবে না।’
‘না রে পাগলি না। তুই না থাকলে যে বাড়ি অচল। আমার জীবনের কোনো মূল্য নেই।’ স্বামীর কথা শুনেই সখি বুঝেছে এই কথাগুলো বাঁশী অভ্যাসমতোই বলেছে।
‘তাহলে কি আমার খারাপ অসুখ?’
‘খারাপ অসুখ কি রে? ডাক্তার তো রিপোর্টই দেয় নি।’

বাঁশী এসে তামান্নার এখানে ওঠে। তামান্না খুব খুশি হয়। এখানে ওখানে বেড়াতে নিয়ে যায়। বিশেষ বিশেষ খাবার রান্না করে খাওয়ায়। সপ্তাহ কেটে যায়। সখির রিপোর্টের কথা ভুলে যায় বাঁশী। তাছাড়া যেসব কাজ করার জন্য এখানে এসেছিলো তার কিছুই করা হয় না। তামান্নার জোরজবরদস্তির কাছে বলতে গিয়েও বলতে পারে না। সখি একা একা গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। কখনো নদীর ধারে, কখনো দিঘির পাড়ে, ধানের জমিতে কখনও বাগানে। ওর কিছু ভালো লাগে না। কি হলো বাঁশীর? এই চিন্তায় অধীর পথ চেয়ে থাকে। এদিকে শরীর আরও খারাপ হয়ে যায়। এতো খারাপ যে ওঠার শক্তি থাকে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধুই বাঁশীর কথা ভাবে। বাঁশীকে মনে পড়ে। বাঁশী বাঁশী বাঁশী গো। বাঁশী বাঁশী করতে করতে একটা অদ্ভুত ইচ্ছা জাগে। চিঠি লিখতে। কোনোদিন তো বাঁশীকে চিঠি লেখে নি। আজ লিখবে। প্রথম এবং শেষ চিঠি।

কাগজ-কলম নিয়ে বসে। কলম হাতে নিয়ে সম্বোধন নিয়ে অসি’র ভাবনায় ডুবে যায়। অনেক কিছু লিখে লিখে কোনোটাই পছন্দ হয় না। শেষমেষ বাঁশী আমার সম্বোধন দিয়েই শুরু করে।

বাঁশী আমার,.
কোথায় আছো কেমন আছো জানি না। জানি না করছো কি। জানি না আসবে কবে। তুমি ছাড়া তোমার সখি আর বাঁচবে 
       না। তুমি ফিরে এসো ফিরে এসো। ফিরে এসো এই বাহুডোরে এই কাঙাল ভালোবাসায়। আমি অনন্তের  যে পথ চেয়ে 
       বসে আছি। তুমি ছাড়া আমার তো কিছু ভাল্লাগে না, ভাল্লাগে না। তুমি ফিরে এসো। আমি তোমার ভালোবাসার ভিখেরি 
       যে গো।
                      ইতি
               দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র বউ।

চিঠিটা লিখে নিচে বাঁশীরই বলা কথা কয়টা লিখে ভাবতে থাকে চিঠি পোস্ট করবে কোন ঠিকানায়। বাঁশী কোথায় উঠেছে তা তো জানে না ও। চিঠি বালিশের নিচে রেখে মর্জিনাকে ডাকে।
নদীর তীরে যায়। নদীর তীরে অনেকক্ষণ বসে থাকে সখি। নদীতে নৌকা যায়। নৌকার মাঝি গান গায়। মাঝির ভাটিয়ালিতে ওর মায়ের কথা মনে পড়ে। বাবার কথা মনে হয়। মা-বাবা ওর বিয়ের পরপরই মারা যায় অ্যাকসিডেন্টে। ওদের কোনো ছেলেমেয়ে ছিলো না। তাই ও বাড়িতে আর কখনও যাওয়া হয় নি। তাছাড়া বাঁশীকে ছেড়ে কোথাও একরাত্রি একদিনও থাকে নি সখি। বাঁশীও কোথাও যায় নি। ওরও যাওয়া হয়ে ওঠে নি।

আজ সাতদিন হয়ে গেলো। কিন’ বাঁশী আসছে না কেনো? বাঁশীর কি হয়েছে? বাঁশী ওকেও কেনো বলছে না ওর মনের কথা। তাহলে কি বাঁশী অন্য কোথাও… না না তা নয়। ওকে ছাড়া অন্য কাউকে, এটা কখনও বিশ্বাস করতে পারে না সখি। কখনই হয় না, হতে পারে না। ছি: ছি: এটা ও কি ভাবছে। স্বামীর ওপরে, শুধু স্বামীর ওপরে কেনো, মানুষের ওপরেই বিশ্বাস হারানো পাপ। ছি:! নিজেকেই ধিক্কার দেয় সখি। সখি ভাবনায় এতোই ডুবে ছিলো খেয়াল করে নি দিনের আলো কমে এসেছে। মর্জিনার ডাকে ওর চমক ভাঙে। নদীর তীরে গাছে গাছে পাখির ডাক শুনতে পায়। সখি পায় পায় বাড়ির দিকে এগোয়। কিন’ বাড়ি যেতে ওর ইচ্ছা করে না।

ঐ-দিন রাতে বাঁশী স্বপ্ন দেখে, চমৎকার জোছনা ভরা রাতে নদীতে নৌকায় দু’জন গল্প করছে। কবিতা শোনাচ্ছে সখিকে। হঠাৎ কোথা থেকে উঠে এলো ঝড়, ডুবে গেলো চাঁদ মেঘের আড়ালে, দুলে ওঠে নৌকা। সখি পড়ে গেলো নদীতে। স্বপ্ন দেখে ধড়মড়
করে উঠে বসে বাঁশী। সখিকে মনে পড়ে যায়। এ কি করেছে ও। একলা সখিকে ফেলে রেখেছে ওখানে। ছি: ছি: ছি:! নিজেকে ধিক্কার দেয় বাঁশী। অনেকক্ষণ ছেলেমানুষের মতো কাঁদে। পরদিন তামান্না ওঠার আগেই বের হয়ে আসে। স্টেশনে এসে টিকিট কাটে। তারপর ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট আনতে যায়। সখির ক্যানসার। এইটাই আশংকা করেছিল বাঁশী। যা আশংকা করেছিল তাই হলো। এই অবস’া সখির। আর এইখানে কাটিয়ে দিচ্ছে সময়!

রিপোর্ট নিয়ে বেলা এগারোটায় ট্রেনে চেপে বসে। ট্রেনে বসে ওর মনে হয় খুব আস্তে যাচ্ছে ট্রেন। সখি আছে তো? নাকি নেই সব শেষ করে দিয়ে চলে গেছে? বাঁশী ফিরে আসে গ্রামে। এ যেন দীর্ঘদিন একটানা বর্ষণের পর প্রথম সূর্যোদয়। এ যেন শীতের নরম রোদে বসে খেজুর গুড়ের পায়েস খাওয়া। আগুন পোহানো সকালবেলার মতো আনন্দ উচ্ছল বাঁশী দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে সখিকে। ‘সখি আমার বউ, কেমন ছিলি?’ সখি কথা বলে না। বাঁশীর বুকে মুখ রেখে কাঁদতে থাকে।
‘কাঁদে না বউ। কাঁদে না। এই তো দেখ আমি ফিরে এসেছি। মানুষ তার মূলে ফিরে তো আসেই। আসতেই হয় তাকে। তুই মুখ তোল।’ সখি মুখ তোলে না। এবার বাঁশী জোর করে অশ্রু ভেজা মুখটা তুলে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দেয়।
‘তুমি আমার খোঁজ নিলে না কেনো? এলেও না, আমার বুঝি কষ্ট লাগে না?’ ওর কথা শুনে খুব কান্না পায় বাঁশীর। বলে, ‘আর হবে না বউ। দেখে নিস। তোকে ছেড়ে আর কখনও কোথাও যাবো না।’ ওদের মধ্যে আজ আবার আনন্দ ফিরে আসে। গান আসে, কবিতা আসে, বাঁশী অনেকদিন পর আবার সখিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কবিতা পড়ে শোনায়:
দীর্ঘপথ ঘুরে এলাম আমি
বিদেশের মাটির বাসনায় আমি
শহর বন্দর নগর গ্রাম
অলিগলি সব পথ ঘুরে
আবার ফিরে এলাম, ফিরে এলাম
স্বদেশের বুকে।
তুই স্বদেশের স্নিগ্ধতা, আমার
ছোট দোয়েল, আমি ভুলে ছিলাম
তোর শিসের উচ্ছ্বাস, তোর
হৃদয়ের উচ্ছল কাব্য
আমি হারিয়েছিলাম সত্তা আমার
ক্ষণকালের তরে, তারপর সব ফেলে
আবার ফিরে এলাম তোর বুকে। …..

কবিতা শেষ করে না। অর্ধেক কবিতা পড়ে। তারপর সখিকে বুকে নিয়ে আদর করে। আদর করতে গিয়ে চোখের পানির ফোঁটা সখির কপালে পড়ে।
‘কি হলো কাঁদছো কেনো?’
‘কই কাঁদছি? কাঁদছি না তো।’ বলেই সখিকে জড়িয়ে জোরে কেঁদে ওঠে বাঁশী।

Leave a Reply


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home12/wwwafrozaaditi/public_html/wp-includes/functions.php on line 4615